বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শঙ্খ শিল্প


6987436797_4a8a2ecdff_bইতিহাসের আবর্তন খুঁজতে গেলে পাথর যুগ থেকে শুরু করে সংস্কৃতি ক্রমোন্নয়নের স্বপ্ন সোপান বেয়ে আজকের বাংলাদেশ। সভ্যতার সংঘাতে কালজয়ী মানুষদের ইতিবৃত্ত এদেশকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ইতিহাসের পাতায় যেখানে গৌরবগাথা নিতান্ত মামুলী নয়। শক্ত খোলস বিশিষ্ট সামুদ্রিক প্রাণি শঙ্খ (ঞঁৎনরহবষষধ ঢ়ুৎঁস) এর শুভ্রতা আর বিশেষ গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের কারণে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলার লোক শিল্পের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অনন্য সাক্ষ্য এই শাঁখা শিল্প একদিকে যেমন ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত অন্যদিকে অনুপম এক শিল্পমানের পরিচয়ও বহন করে। হাতে পরিধেয় শঙ্খবলয় যেমনি প্রত্যেক বিবাহিত হিন্দু রমণীর সতীত্ব আর গৌরবের প্রতীক, শঙ্খধ্বনি তেমনি শুভকাজের সূচনায় মঙ্গল বার্তা বয়ে আনে বলে তাদের বিশ্বাস। হাতের বালা হিসেবে বহুল পরিচিত এই শঙ্খ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার হওয়ার পাশাপাশি পবিত্র গঙ্গাজলের আধার এমনকি শঙ্খচূর্ণ রমণীদের রূপচর্চায়ও ব্যবহৃত হতো। হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মের আটটি পবিত্র চিহ্নের একটি এই শঙ্খ আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাতেও বেশ গুরুত্বের সাথে ব্যবহৃত হয়েছে। মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তূপ, মায়া-ইনকা সভ্যতার পাশাপাশি বাংলাদেশের পাহাড়পুর প্রত্নস্থানে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলকে শঙ্খ উৎকীর্ণ থাকা মানব সংস্কৃতির সাথে শঙ্খের প্রাচীনত্য সহজেই বোঝা যায়।

প্রাচীন বাংলা পুঁথি ও সাহিত্য থেকে বাংলাদেশে শঙ্খ শিল্প বিকাশের প্রমাণ পাওয়া যায় যা এর কেন্দ্র ঢাকার বাইরেও নানা স্থানে বিস্তৃত হয়েছিল। সূচনাপর্ব হতে বিকাশকাল পরবর্তী পর্যায়ে বিলুপ্তির কারণগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে। এই প্রবন্ধে শঙ্খ শামুকের প্রজাতিগত বিশেষণ করার পাশাপাশি জাতিতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষার মাধ্যমে ওই বিশেষ প্রজাতির শঙ্খ ব্যবহারের কারণ, প্রাপ্তিস্থান ও তার আনয়ন পথ বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
আভিধানিকভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে শঙ্খ বা এর সমার্থক যেসব শব্দের পরিচয় মেলে সেগুলোও অনেক বৈচিত্র্যময়। বস্তুত এই বিষয়গুলো জাতিতাত্ত্বিক গবেষণার মতো অধ্যয়নে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একটি জাতির আচার আচরণে প্রচলিত বিষয়াদি থেকে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে তার স্থির ও স্থবির প্রেক্ষিত হতে গতিশীল অবস্থায় আনার জন্য জাতি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা করা হয়ে থাকে। সেই দিক বিচারের শঙ্খ শিল্পের উদ্ভব বিকাশ ও স্বরূপ উদ্ঘাটনের জন্য শাব্দিক বিশ্লেষণ ও বুৎপত্তি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করা উচিত।

বিশেষ করে মূল শব্দের বিকৃত রূপ বা অপভ্রংশের মাঝে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য লুকানো থাকে। এই দিক বিচারে বাংলাদেশের শাঁখাশিল্পের উপর জাতি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা পরিচালনার ক্ষেত্রে শঙ্খ ও সংশ্লিষ্ট নানা শব্দের বুৎপত্তি ও অর্থবিন্যাস বিশ্লেষণ করাটা জরুরি। প্রকৃতি ও প্রত্যয়নগত বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায় শঙ্খ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে [্রশম্‌+খ] থেকে। বৈষ্ণব মতাবলম্বীদের উপাস্য দেবতা বিষ্ণুর যে সকল আয়ুধ পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শঙ্খ। বিষ্ণুর চর্তুআয়ুধ এর মধ্যে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। তাই অনেক সূত্রে বিষ্ণুকে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী দেবতা বলা হয়েছে।

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও লৌকিক ধর্মাচারে বিশেষ করে নাগ ভক্তি ধর্ম [ঘধমধ ঈধষঃ] এ কালনাগিনী ও গোখরো সাপের মতো বিষধর সাপের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান লক্ষ করা যায়। একটি বিশাল আকৃতির গোখরো [শরহম পড়নৎধ. ঘধলধ হধলধ] এর অনেকগুলো নামের একটি হচ্ছে শঙ্খচূড়। হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে নারীদের বিশেষ কুসংস্কারে কাউকে শাঁখচুন্নি বলে মনে করা হয়ে থাকে। এদেরকে সধবা নারীর প্রেত বলে মনে করে শাঁখচুন্নি বা শঙ্খচূণী নাম দেয়া হয়ে থাকে। শঙ্খ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রে সাদার পরিপূরক। যেমন এক ধরনের বুক সাদা চিলের নামকরণ করা হয়েছে শঙ্খ চিল। এর পাশাপাশি শঙ্খনিনাদ বা শঙ্খ ঘোষ থেকে শুরু করে শঙ্খ বিষের নাম পাওয়া যায়। তবে এই গবেষণা প্রবন্ধে প্রত্যেক সধবা হিন্দু রমণীর হাতে ব্যবহৃত শঙ্খ বলয়ের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে শঙ্খ শিল্পের বিকাশের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। প্রতিযোগিতামূলক বাজার, মানুষের রুচিবোধে পরিবর্তন, কাঁচামালের সহজলভ্যতা না থাকা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণে এই শিল্প ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে প্রবাহিত হয়। বিভিন্ন লোককাহিনী পৌরাণিক কাহিনী ও ঐতিহাসিক সূত্র বাংলাদেশের শাখা শিল্পের প্রাচীনত্বের প্রমাণ বহন করে। দক্ষিণ ভারতের অনেকগুলো স্থানে খ্রিস্টাব্দ প্রথম শতকের দিকে এই শিল্প উৎপত্তি লাভ করে বিভিন্ন আঙ্গিকে বিকশিত হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ ভারতের ‘পারওয়া’ জাতির হাত ধরে আজ থেকে অন্তত ২০০০ বছর আগে এই শিল্প বিকশিত হয়। ‘বৃহৎবঙ্গ’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে তামিল রাজধানী কোরকাই এবং কয়েলে হতে শাখা শিল্পের নিদর্শন প্রাপ্তির কথা জানা যায় যেটি বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকতে পারে। দক্ষিণ ভারতের মান্নার উপসাগর তীরবর্তী অঞ্চলে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে শঙ্খ শিল্পের ব্যাপক বিস্তৃতির কথা জানা যায়।

ঐতিহাসিকদের মতে, দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, গুজরাট, বেলারি, অনন্তপুর, তিনভেলী প্রভৃতি অঞ্চলে প্রাথমিক দিকে শঙ্খ শিল্প বিকশিত হয়। মালিক কাফুরের আক্রমণে তিনভেলী জেলার শঙ্খ শিল্প ধ্বংস হওয়ার পর অস্তিত্ব সঙ্কট মেটাতে ও জীবিকার দায়ে শঙ্খ শিল্পীগণ ঢাকা চলে আসেন। এর পর থেকে ঢাকা তথা বর্তমান পুরাতন ঢাকা হয়ে উঠে শঙ্খ শিল্পের প্রাণ কেন্দ্র। কিন্তু অনেকে মনে করেন বাংলাদেশে শঙ্খ শিল্পের ইতিহাস এতো নবীন নয়। ঢাকার এই শঙ্খ শিল্প বাস্তবতার বিচারে অনেক নবীন মনে হলেও বস্তুত এমনটি নয়।

হাতের শাঁখা ও শামুক দ্বারা নির্মিত অলঙ্কারাদি বাংলার নারীরা অনেক কাল আগে থেকেই ব্যবহার করে আসছে। দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য এই শাঁখা প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে বহিঃর্ভারতীয় শিল্পীদের হাতে নির্মিত হয়েছিল এমনটি নয়। বিশেষত হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর প্রচলিত বিশ্বাসে শঙ্খকে অনেক পবিত্র মনে করা হতো। পর্তুগিজ লেখক গর্সিয়া দ্য ওর্টা এবং ট্যাভারনিয়ারের বিবরণ থেকেও বাংলার শঙ্খ শিল্প সম্পর্কে ধারণা মিলেছে। উল্লেখ্য, এই দুইজন ইউরোপীয় পর্যটক ব্যবসায়িক কাজ ও ভ্রমণের উদ্দেশে ঢাকায় এসেছিলেন।

জেমস ওয়াইজের ধারণা মতে, মুসলিম আগমনের অনেক আগে সেই সেন আমলে রাজা বল্লাল সেনের সময়কালে ঢাকার শঙ্খশিল্পীরা সুদূর দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে বাংলাদেশে আসেন। বিক্রমপুরে অবস্থিত শাঁখারি বাজার এই মতামতকে অনেক গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে সেন রাজাদের রাজধানী হিসেবে বিক্রমপুরের নাম বলা যায়। একইভাবে জেমস টেলর ঢাকা শহরের পত্তনের সময় শাঁখা শিল্পীদের বাংলায় আগমনের যে বিবরণ দিয়েছেন তথ্য প্রমাণের বিচারে তা অতটা গ্রহণযোগ্য হয় নাই।

বিশেষ করে ট্যাভারনিয়ার এর বিবরণে ১৭ শতকের দিকে ঢাকার বাইরে সিলেট ও পাবনাসহ অন্যান্য অঞ্চলে শঙ্খ শিল্পের বিকাশ ঘটার কথা জানা যায়। ট্যাভারনিয়ার বাংলা তথা ঢাকায় বিকশিত শঙ্খ শিল্পের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি শঙ্খ শিল্পীদের সংস্কৃতির সংরক্ষণশীল নীতিও একই স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন ঢাকা ও পাবনা শহর ছিল সেই সময়ের শঙ্খ শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। তাঁর বিবরণ থেকে সেই সময়ে প্রায় দুই হাজারের মতো শ্রমিকের শঙ্খ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টতার কথা জানা যায়।

এই সময়ে ঢাকা ও পাবনা অঞ্চলে নির্মিত শঙ্খ পূর্ব ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন এলাকায় রপ্তানি হওয়ার কথাও জানা গেছে। ট্যাভারনিয়ারের বিবরণ মতে সেই সময়ে শঙ্খ আমদানি, রপ্তানি ও শঙ্খ অলংকার নির্মাণসহ বিবিধ কর্মকাণ্ড ছিল একটি লাভজনক ব্যবসা যেটি ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছিল। ১৮১০ সালের দিকে ঢাকায় ভ্রমণকারী পর্যটক টমাস উইলিয়ামস ঢাকায় প্রস্তুতকৃত শঙ্খ-অলংকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার বিশেষণে প্রায় সকল শ্রেণীর বাঙালি নারীর শঙ্খ পরিধানের কথা জানা গেছে।

তবে শঙ্খনির্ভর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু ভিন্ন কথাও জানা যায়। অনেক গবেষক মনে করেন বাংলাদেশ থেকে সিংহল তথা বর্তমান শ্রীলঙ্কায় চাল, ডালা ও পরিধেয় বস্ত্র রপ্তানি করা হতো। এর বিনিময়ে শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানি করা হতো বিভিন্ন ধরনের শঙ্খ। এই সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা প্রকাশ করেছেন জেমস টেলর। তিনি এই সময়ে প্রচুর কাঁচামাল শঙ্খ আমদানি ও স্থানীয় মেলায় শঙ্খের অলংকার কেনাবেচা হওয়ার কথা বলেছেন। ঢাকা শহরে প্রায় ৫ শতাধিক কারিগরের উপস্থিতির কথা জানা গেছে যারা কাজ বন্টন করে নিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতো। অন্যদিকে জেমস টেলরের উদ্ধৃতি দিয়ে শিপ্রা সরকার বলেছেন ‘এখানকার (ঢাকার) রমণীরা কনুই থেকে হাতের কব্জি পর্যন্ত পুরো হাতে শঙ্খ নির্মিত বালা পরে থাকতো। এই সকল অলংকার ও সোনা রূপার অলংকার বেশ দামি হওয়াতে সেগুলোর ব্যবহার বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে। অন্যদিকে মুসলিম পরিবারের মেয়েরা এই শঙ্খের পরিবর্তে লাক্ষা বা গালার তৈরি চুড়ি কিংবা কাঁচ ও রূপার তৈরি চুড়ি ব্যবহার করতো।

প্রত্যেক বিবাহিত হিন্দু রমণীকে অবশ্যই শাঁখা পরতে হয়। এর পেছনে একটি পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায় শঙ্খচূড় ছিল মারাত্মক বিষাক্ত নাগ বা সাপ। শঙ্খচূড় ব্রহ্মার কাছ থেকে বর হিসেবে অমরত্ব লাভ করে। স্বর্গের দেবতারা এতে ভীত হয়ে তার অমরত্ব নষ্ট করার জন্য দেবতা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু দেবতাদের মান রক্ষার জন্য উপায়ন্তর খুঁজতে থাকেন। বিষ্ণু শঙ্খচূড়ের অমরত্ব নষ্ট করার একটি সুযোগ খুঁজে পায়। বিষ্ণু বুঝতে পারে শঙ্খচূড়ের স্ত্রী তুলসীর সতীত্ব নষ্ট করা গেলে শঙ্খচূড়ের অমরত্ব আর থাকবে না। শঙ্খচূড় যুদ্ধের ময়দানে ব্যস্ত থাকলে বিষ্ণু তুলসীর সতীত্ব হরণের সুযোগ খুঁজে পায়। চরম হটকারীতার পরিচয় দিয়ে বিষ্ণু শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করে তুলসীর ঘরে এসে তার সঙ্গে দৈহিকভাবে মিলিত হন। শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করলেও তুলসী বিষ্ণুর মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করে তাকে ধরে ফেলেন। দৈহিক মিলন শেষে তুলসী পথ আগলে দাঁড়িয়ে বিষ্ণুকে স্বমূর্তি ধারণে বাধ্য করে। বিষ্ণু নিজ রূপ ধারণ করলে ক্ষিপ্ত তুলসী তাকে অভিশাপ দিলে আতঙ্কিত বিষ্ণু তুলসী ও শঙ্খচূড়কে এটি বর দেয়। এর বর থেকে তুলসী পৃথিবীর মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবে তুলসী গাছ হয়ে, যার পাতা ছাড়া পূজা হবে না। অন্যদিকে শঙ্খচূড় সমুদ্রের তলায় শঙ্খ হয়ে বেঁচে থাকবে বছরের পর বছর। এরপর থেকেই শঙ্খ কেটে তৈরি শাঁখা হিন্দু রমণীর সতীত্বের প্রতীক।

শঙ্খ শিল্প নিয়ে আরো বেশ কিছু পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘কৃষ্ণ একবার সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী এক অসুরকে হত্যা করে। এই অসুরের নাম ছিল পঞ্চজন যে মৃত্যুর পূর্বে কৃষ্ণের কাছে বর চায়। তার প্রার্থনাকৃত বর ছিল যে হাতে তার মৃত্যু হয়েছে সেই হাত যেনো সে যুগের পর যুগ অনুভব করতে পারে। কৃষ্ণ তখন পঞ্চজনের হাড় দিয়ে বিশেষ ধরনের শঙ্খ নির্মাণ করে। এরপর তাকে আরেকবার বর চাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। তখনকার বর হিসেবে কৃষ্ণ বলেন, যে বাড়িতে প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলায় শঙ্খধ্বনি বেজে উঠবে সে বাড়িতে লক্ষ্মী নারায়ণের অবস্থান স্থিতিশীল হবে। এর পাশাপাশি পূজা-অর্চনাসহ বিবিধ পবিত্রকাজে গঙ্গাজলের অভাব দেখা দিলে শঙ্খে রাখা পানি থেকে সেই কাজ করা যাবে। অপর একটি পৌরাণিক কাহিনী থেকে শঙ্খ শিল্পের উদ্ভব সম্পর্কে জানা গেছে। দেব সভায় আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে একবার শিব ও দুর্গাকে নিমন্ত্রণ করা হয়। স্বর্গলোকের সকল দেবীর দেহে বিভিন্ন অলংকার শোভা পাচ্ছিল কিন্তু পার্বতীর পরিধেয় কোনো অলংকার ছিল না। বিব্রত অবস্থায় শিব স্ত্রীর এই কথা বিশ্বকর্মাকে জানান। বিশ্বকর্মা জানিয়ে দেন পৃথিবীর সকল রত্ন দেবীদের অলংকার তৈরিতে ইতিপূর্বেই ব্যবহৃত হয়েছে। কেবলমাত্র শঙ্খই অবশিষ্ট আছে যেটি দিয়ে তিনি দেবী দুর্গার জন্য অলংকার তৈরি করে দিতে পারেন। কোনো উপায় না দেখে শিব তাতেই রাজি হয়ে যান। দুর্গা যখন এই শঙ্খ নির্মিত অলঙ্কার পরে দেবসভায় গেলেন তখন তার সৌন্দর্যের কাছে অন্যান্য দেবীদের মণিমানিক্য নির্মিত অলঙ্কারের ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে যায়। এরপর থেকেই হিন্দুধর্মের বিধানে বিবাহিত নারীদের সধবা অবস্থায় দুইটি শঙ্খবলয় পরিধানের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে পটশিল্প অঙ্কনকারী পটুয়া শিল্পীরা তাদের আঁকা ছবি প্রদর্শনের পাশাপাশি একটি কবিতা গানের মতো সুর করে পরিবেশন করে থাকেন। তাদের এই কবিতার ভাবার্থ হচ্ছে। একবার পার্বতী শিবের কাছে একজোড়া শাঁখার জন্য অনুরোধ করলে শিব পার্বতীকে শাঁখাজোড়া কিনে দিতে অপারগ হন। এতে মন খারাপ করে পার্বতী তার বাবার বাড়িতে চলে যান। অনেক দিন পার হয়ে গেলেও পার্বতী যখন তার স্বামীর কাছে প্রত্যাবর্তন করছেন না তখন শিব দুশ্চিন্তা অনুভব করেন। তিনি তখন শাঁখারির ছদ্মবেশ ধরে পার্বতীর কাছে শাঁখা বিক্রি করতে যান। পার্বতী শাঁখা ভেঙে যায়। তখন ছদ্মবেশী শিব এ ঘটনার জন্য পার্বতীর পতিভক্তিহীনতার কথা বললে পার্বতী অনেক রাগান্বিত হন। এরপর পার্বতী শাঁখারির দিকে এখন অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করেন যাতে তার চুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ছদ্মবেশী শিবের কিছু না হওয়াতে পার্বতীর কাছে তার ছদ্মবেশ স্পষ্ট হয়ে যায়। স্বামীর কাছ থেকে শাঁখা উপহার পেয়ে খুশি মনে পার্বতী স্বামীর ঘরে ফিরে যান। এরপর থেকে বিবাহিত হিন্দু নারীদের শঙ্খ পরিধানের বিষয়টি প্রচলিত হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানের বিবরণ মতে বিশ্বকর্মার ঔরসে গোপকন্যাবেশী ঘৃতাচীর গর্বে নয়জন পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করেন। তারা হচ্ছেন মালাকা, কর্মকার, শঙ্খকার, কুর্ন্দিবক, কুম্ভকার, কাংস্যকার, সূত্রধর, চিত্রকার ও স্বর্ণকার সমপ্রদায়ের আদি পুরুষ। এই পুরানের বিবরণ মতে শাঁখারিরাই একমাত্র শ্রেণী যারা শঙ্খবলয় পরার সময় মাপ দেয়ার জন্য উঁচু নিচু সকল শ্রেণীর হিন্দুনারীর অঙ্গস্পর্শ করতে পারে। তাদেরকে সম্মান করে কখনো কখনো শাঁখারি বাওয়ান বা ব্রাহ্মণ কিংবা শাঁখারি ঠাকুর বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

শাঁখা শিল্পের কাঁচামাল শঙ্খ শামুক এক সময় বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পাওয়া যেতো। সামপ্রতিককালে এটাকে সংগ্রহ করা হয় শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে। এছাড়াও মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও আন্দামান থেকে এই শামুক পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি ভারতের গুজরাট ও মাদ্রাজ হতেও শাঁখা শামুক আমদানি করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানকৃত শঙ্খের অলংকার তৈরির জন্য বেশ কয়েক প্রজাতির শঙ্খ ব্যবহৃত হলেও তিতকৌড়ি শামুক সব থেকে সুন্দর ও বেশ দামি। এটি শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। সামুদ্রিক প্রাণি শঙ্খকে বিভিন্ন আকার ও প্রজাতির হলেও মাত্র অল্প কয়েক প্রজাতির শঙ্খ শাঁখা তৈরি কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি হচ্ছে তিতপুটী, রামেশ্বরী, ঝাঁজী, দোয়ানি, মতি-ছালামতি, পার্ট, গারবেশী, কাচ্চাম্বর, ধলা, জাককি, কেলাকর, জামাইপার্ট, এলকারপাটী, নায়াখাদ, খগা, সুর্কীচোনা, তিতকৌড়ি, জাহাজী, গড়বাকী, সুরতীত, দুয়ানপটী আবং আলাবিলা। তবে এই শ্রেণীর শঙ্খ থেকে শাঁখা তৈরির পূর্বে তাদের গুণগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু শ্রেণীতে বিভক্ত করে নেয়া হয়। তবে শঙ্খের গুণাবলীর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জনের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। যেমন কেউ আলাবিলা শঙ্খকে সর্বোৎকৃষ্ট দাবি করেছেন। কারো দৃষ্টিতে এই শঙ্খই হয়ে গেছে নিকৃষ্ট মানের। হর্নেল এটিকে নয়টি গ্রেডে বিন্যস্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই গ্রেডগুলো এই স্বল্প পরিসরের আলোচনায় স্থান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অনেক দিনের প্রাচীন শিল্প হওয়াতে শাঁখারি সমপ্রদায় সময়ের সাথে সাথে বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি তেমন সুনিশ্চিত ছিল না। বিশেষ করে বাংলার দেওয়ান রাজা রাজবলভের ছেলে রাম রায় প্রায়ই প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে শাঁখাটি সমপ্রদায়ের সুন্দরী মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যেতো। তবুও প্রবল পরাক্রমশালী রাম রায়ের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। তবে অনেক গবেষক শাঁখা তৈরিকে অনেক জটিল ও সময় শ্রমসাধ্য কাজ বলে বিবরণ দিয়েছে। বিশেষত যখন জানা যায়, একটি শঙ্খ ভেঙে কেবলমাত্র একটি বালা তৈরি করা সম্ভব এটি অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব ও বিশ্বাসের অযোগ্য বলে মনে হয়েছে। তবে এটি যে অনেক বিকশিত শিল্প ছিল নিঃসন্দেহে একটি ধারণা করা যেতে পারে। শঙ্খ তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করার জন্য স্থানী শিল্পীদের অনেক সময় শ্রীলঙ্কা ও ভারতের বাইরের আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের উপর নির্ভর করতে হতো এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই সময়ে একজোড়া শাঁখা ছয় আনা থেকে দুই টাকায় বিক্রি হতো বলে জানা গেছে। বর্তমানে সামাজিক গতিশীলতা ও ধর্মবিশ্বাসসহ নানা আঙ্গিকের পরিবর্তন এই শিল্পকে পথে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে তুলতে এই শিল্প সংরক্ষণে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।

তথ্যসূত্র :
১. অমিয়কুমার বন্দোপ্যাধ্যায় বঙ্গলক্ষ্মীর ঝাঁপি, কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৭৯। ২. সেন, দীনেশচন্দ্র, বৃহৎবঙ্গ, দ্বিতীয় খণ্ড, কলকাতা, দে’জ পাবলিশিং, ১৯৩৫। ৩. শঙ্খশিল্প, শিপ্রা সরকার, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭। ৪. যতীন্দ্রমোহন রায়, ঢাকার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), কলকাতা, যামিনীমোহন রায় কর্তৃক প্রকাশিত, ১৯১১।

মানব জমিনের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত।

About these ads

One thought on “বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শঙ্খ শিল্প”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s