৬০০০ বছর পূর্বের চুম্বন আর তেপ্পে হানসালুর যুগল সমাধি


6268_514231081966321_1854063880_n
হানসালুর সেই কঙ্কাল

অতীত মানুষের নির্মিত ব্যবহৃত বা প্রভাবিত বস্তুগত উপাদানের বিশ্লেষণ করে তাদের জীবনযাত্রার ইতিবৃত্ত তুলে ধরে প্রত্নতত্ত্ব। এক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে কৌতুহলোদ্দীপক ঘটনা যেমন ঘটে। তেমনি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা নিয়ে কিংবদন্তীর সংখ্যাও কম নয়। ঔপনিবেশিক সময় থেকেই এই প্রবণতা আরো বেড়ে গেছে। পিল্ডডাউন মানবের কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ভ্রষ্টাচার বিশ্বে ছেয়ে গেছে। মানুষ ইতিহাসকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে গিয়ে এর যাচ্ছেতাই ব্যবহারের পরিমাণ বাড়িয়েই চলেছে। অন্যদিকে এক শ্রেণির সংবাদলোভী শ্রেণি এগুলোকে ব্যবহার করছে তাদের ওয়েব সাইটের ট্রাফিক বাড়ানোর কাজে। এমনি একটি ঘটনা ঘটেছে ইরাণের হানসালু প্রত্নস্থানে প্রাপ্ত একটি যুগল সমাধিকে নিয়ে। ফেসবুকের ব্যবহার করে প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সবসময় নিজের আয়ত্বে রাখার চেষ্টা করি। বিশ্বের নানা দেশের নামকরা প্রত্নতত্ত্ব ভিত্তিক পেইজগুলো লাইক দিয়ে রাখি, সেই সাথে অনেকগুলো প্রত্নতত্ত্ব নির্ভর বিশ্বজনীন পেইজের অ্যাডমিনও হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সেদিন একটি আাজারবাইজানের পেইজে লেখা দেখলাম “6000 years old kiss found in Hasanlu, Iran”। সত্যি আঁতকে ওঠারই কথা। আমাদের দেশে যেখানে মাত্র আড়াই হাজার বছরের পূর্বের রাস্তা আবিষ্কার প্রত্নতাত্ত্বিকদের সহ্য হয়না। তারা এর বিরুদ্ধে বাদ-প্রতিবাদ শুরু করতে সময় নেননা। ইরানীদের হলো কি? তারা কি সুরেশ খাঁটি সরিষার তেল নাকে দিয়ে ঘুমুচ্ছে নাকি?

যোগাযোগের চেষ্টা করলাম ইরানের সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পের দুইজন বিখ্যাত গবেষক মাসউদ আযারনৌস ও বারবারা হেলউইং এর সাথে। তাদের একটি প্রবন্ধও পড়ে ফেললাম। সেখানে তাদের এই ৬ হাজার বছর পূর্বের চুম্বন নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখিনি। এবার টপিকে ফিরে আসি। ইরান বলতে আমরা বুঝি শিল্পকলার ঐতিহ্য ধারণকারী পারস্য সভ্যতার পীঠস্থান। এখানে অনেক পূর্বেই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিলো যা কারো অজানা নয়। গত কয়েকদিন ফেসবুকে, ব্লগার্সে ও ওয়ার্ডপ্রেসের বিভিন্ন সাইট ঘুরে কিছু ফেসসিক পত্রিকাতেও স্থান করে নিয়েছে এই ৬ হাজার বছর পূর্বের চুম্বন কাহিনী। সবথেকে অবাক করার বিষয় হচ্ছে এই ধরণের ঘটনা ঘটুক আর নাই ঘটুক ছবিটা আসল। এবং রেডিও কার্বন ডেটিং এর এই কঙ্গালটির বয়স নিধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার বছর। প্রায় ১০ টি কর্মবর্ষে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চলা এই তেপ্পে হানসালু প্রত্নস্থানটি অনেক বিখ্যাত একটি ঐতিহ্য নিদর্শন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত চলে আসা ১০ টি বর্ষের খনন পরিচালনা করে পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটি আর নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম।এর পরেও এখানে খনন কাজ চলতে থাকে। তেপ্পে হানসালু থেকে আবিষ্কৃত হয় অনেক আশ্চর্য ধরণের কিছু জিনিস।

Teppe+Hasanlu_02
তেপ্পে হানসালু প্রত্নস্থান

এগুলো মানুষের কৌতুহল বাড়িয়ে দেয়। উক্ত কঙ্কালটি আবিষ্কৃত হয় ১৯৭২ সালে। জাদুঘরের ব্লগে এই ছবিটাকে বলা হয়  “The Lovers’ from 1972 season at Hasanlu. Hasanlu is an archaeological excavation site in Iran, Western Azerbaijan, Solduz Valley. Theses skeletons were found in a Bin with no objects. The only feature is a stone slab under the head of the skeleton on the left hand side (SK335). Penn Museum Image #97482.”

এই ছবিটিকে নিয়ে পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ও অনেকটা সমার্থক মন্তব্যই করেছিলো। তারা এই কঙ্কালের আলোকচিত্রকে ‘Hasanlu Lovers’ শিরোনামে ১৯৭৪ সালে প্রদর্শনী করে।তাদের বিবরণ মতে এই যুগলের মৃত্যু ঘটেছিলো ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তাদের কেউ কেউ একে সহমরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তাদের অবস্থান ও স্থানিক বিন্যাস থেকে একে ৮ হাজার বছর পূর্বের চুম্বন বলার কোনো যৌক্তিকতা তারা খুঁজে পাননি। এটা সত্যি যে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মনে হতেই পারে এই যুগল কি অবস্থায় ছিলো। কিন্তু সেটা আজকালের কথা না। ৬ হাজার বছর পূর্বের ঘটনা। আমরা জানি কোনো স্থান মানুষ কর্তৃক ব্যবহৃত হওয়ার পর পরিত্যক্ত হয়। সেখানে নানামুখী পরিবর্তন ও রূপান্তরের ঘটনা ঘটে। এই রূপান্তর ও পরিবর্তনের ফলে কখনোই প্রত্নবস্তু পূর্বের প্রকৃত অবস্থায় থাকে না। সেক্ষেত্রে এই কঙ্কাল দুটির অবস্থানকে অবশ্যই কাকতালীয় হিসেবে ধরে নিতে হবে।ফলে ফেসবুক, ব্লগ আর কিছু সংবাদপত্রে যে খবর চাউর হয়েছে সেটা গুজব মাত্র। আর প্রত্নতাত্ত্বিকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এর বয়স ৮০০ বি.সি সুতরাং তা কোনোমতেই ২৮১৩ বছরের বেশি হওয়ার কথা না। এখানে গুজব টা রটেছে তাহলে দুটি ক্ষেত্রে। প্রথমত এর অবস্থানগত গুজব, দ্বিতীয়ত এর বয়সের গুজব। তাই সচেতন পাঠক হিসেবে আমাদের উচিত এসব গুজবে কান না দেয়া।

ইরানের জাদুঘরে রক্ষিত পানির পাত্র
নকশাকরা মৃৎপাত্র
টেরাকোটা প্লাক

তথ্যসূত্র:

১. Massoud Azarnoush and Barbara Helwing, Recent archaeological research in Iran– Prehistory to Iron Age.
২. D.B.Stronach & M.D.Roaf, Excavations at Tepe Nush-i, Part-1: A third interim report. Iran, Jan. 16,
3.www.hoaxorfact.com
4.www.reddit.com

About these ads

One thought on “৬০০০ বছর পূর্বের চুম্বন আর তেপ্পে হানসালুর যুগল সমাধি”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s