রবীন্দ্র উৎসবের ডামাডোলে আমরা মনে হয় বেমালুম ভুলে গেছি মহান বিপ্লবী কিশোর কবি সুকান্তের কথা।


সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়
জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।…

এ আর কোন কথা নয় আমি বলছিলাম কিশোর কবি সুকান্তের কথা। কবি নজরুলকে বিদ্রোহের প্রতীক ধরা হলে এই দুরন্ত কিশোরের লেখাতে বিদ্রোহী সম্রাট নজরুলের আমেজ অনেকটাই পাওয়া যায়। আর যদি তাই না হবে তিনি আর কেন আলোচনার টেবিলের বাইরে থাকবেন।
কিশোর কবি সুকান্ত আমাদের বোদ্ধাদের প্রিয় রবি ঠাকুরের মতো বৃটিশেদের পদধুলিতে ধন্য ছিলেন না। তিনি স্বপ্ন দেখতেন স্বাধীন দেশের আর মাথাটাকে একটু উচু করে চলতে। আর কবি নজরুল যেমন বলে গেছেন .।
@};-মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেইদিন হবো শান্ত. @};-
এই ছোট্ট সুকান্তও বলতে চেয়েছেন @};- জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়@};-
তার পরেও তিনি আজ কেন যেন আলোচনার টেবিলের বাইরেই আছেন। তাইতো আক্ষেপ করে অনেকেই বলেন বাঙালি বেইমান জাতি।
আমি ভেবে পাই না স্বাধীনতার চার চারটি দশক পার করেও আজ এই বাঙালির প্রশ্ন কেন?
আমরা তো স্বাধীন । একটা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক ।
তবু্ও বাঙালির এই অপবাদ ঘুচানো যায় না কেন।
আপসোস স্বাধীনতার চার চার টি দশক পেরুলেও হতভাগা বাংগালি এখনো তাদের দেশের স্বাধীনতারকে স্যালূট দিয়ে বাংলাদেশী হতে পারেনি। তাইতো রবি ঠাকুরের মতো প্রভুর পদচুম্বনে তুষ্ট ব্যক্তিরাই এখানে স্থান পায়। বিদ্রোহী সুকান্তের কোন স্থান নেই। আমাদের এই ব্লগের একজন সিনিয়র ব্লগার আমার অনেক কাছের বন্ধু হেলাল এম রহমান আক্ষেপ করে লিখেছিলেন ।

:((:((:((:(( সবাই আছে নেই কেবল আমাদের চিরদুখী দুখু মিয়া :((:((:((:((

আমরা তাই রবীন্দ্রবন্দনাতে এতটাই মুখর যে আমাদের স্বাধীনতার মহান সব স্বপ্নদ্রষ্টাদের ভুলতে বসেছি। আর এই সব চাটুকাররা যখন শুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে সেই দেশ কলি যুগের আগেই রসাতলে যাবে তা আর বলার অপেক্ষা কই। আপনারা তো নিজে চোখেই দেখছেন।
মনের তীব্র বিতৃষ্ণা কাটাতে একটু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলি। আমাদের দেশ স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার আগেই স্বাধীন ছিল। অর্থাৎ স্বাধীন সুলতানী আমলেও আমাদের দেশ স্বাধীন ছিল। আর তখন ও এই ঢাকা স্বমহিমায় উজ্জল ছিল। তবুও আজকের কিছু নামকরা ঐতিহাসিক আমাদের স্বাধীনতার এই উজ্জল সময় কে ধামাচাপা দিয়ে যখন মোঘল আধিপত্যবাদের যুগ থেকে আমাদের ইতিহাস গনণা শুরু করতে চেষ্টা করে । তখন আর কিছুই বলার থাকেনা।
তবুও অনেকটা ছোট মুখে বড় কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম এই আমি। উদ্দেশ্যছিল এই বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে বের হোক জাতি। কিন্তু তার আর অতো সহজ কই।
আমি দুই টাকা দামের দুই দিনের ব্লগারআমার কথা আর প্রফেসর মুনতাসীর মামুনের কথা কি এক । পাব্লিক তাদের ইতিহাস ব্যবসাকেই হয়তো ভাবছে সত্যি আর আমার চেষ্টাকে অপচেষ্টা বা অতিরঞ্জন ভাবলেও তেমন অবাক হওয়ার কারণ দেখি না। আর অবস্থানের সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন জাতির সাথে বেইমানি করে নিজেদের আখের গুছাতে তৎপর রয়েছেন মুনতাসীর মামুন স্যারদের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ। আমার আপসোস আপনাদের কাছে আর কিছুই চাইনা জাতি আপনাদের সে সম্মানটুকু দিয়েছে আপনারা একটু হলেও তার দাম দিতে চেষ্টা করেন। আর মনে মনে রাখবেন বেইমানি ইতিহাস কখণো ক্ষমাকরেনা।

যাহোক আজকে কবি সুকান্তের মুত্যু বার্ষিকী।
আমার বর্ণমালা ব্লগ পরিবারের সবার পক্ষ থেকে এখানকার একজন ব্লগার হিসেবে আমি এই মহান বিপ্লবীকে সালাম জানাচ্ছি।

চিরদিনের বিপ্লবী সুকান্ত বালক থেকে কৈশোরে পা রাখেন। দেশজুড়ে তখন বেজে উঠেছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ডামাডোল। কিছু চাটুকার নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার মানসে যখন ব্রিটিশ নিপীড়কদের পদলেহনে ব্যস্ত। তখন অন্য ধাতুতে গড়া সুকান্ত বুঝেছিলেন আর পদলেহন নয়। এখন আমাদের মুক্তির দিন। তাই তিন কষাঘাতের বদলে পদাঘাত করার গর্জন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষনজন্মা এই সাহসী বিপ্লবী কবি আর পারলেন কই । দুরারোগ্য যক্ষা তার প্রাণ কেড়ে নিল। তবুও তিনি যা রেখে গেছেন তাই বা কম কিসে।

বস্তুত এই মহান বিপ্লবী কবিতা লিখে আর বক্তৃতা দিয়ে সবাইকে স্বাধিকারের শপথ নিতে উজ্জীবিত করেন। মানুষ যখন আপন অধিকার নিয়ে সোচ্চার হলো, সুকান্ত তখন গর্বিত হলেন তার দেশবাসীদের নিয়ে। বিপুল প্রত্যয় আর অহঙ্কার নিয়ে লিখলেন কালজয়ী বেশ কিছু কবিতা। এই সকল কবিতা পরাধীন জাতির জমে যাওয়া ধমনীতে অনেকটাই রক্ত সঞ্চালনের পথ দেখায়। তবুও আমাদের তথাকথিত সুশীলদের কাছে তিনি অনেকটাই আলোচানার বাইরে। আর তাতো তিনি থাকবেনই। কারণ রনি ঠাকুরের গান গুলো অনেক সহজে পাওয়া যায় গান গুলো শুনলে যে কারো ঘুম আসে। আর ঘুমন্ত জাতির উপরে মুন্সিয়ানা দেখানো অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।এস এম জাকির হোসেনের একটা বই এর নাম দেখেছিলাম অন্ধকারের বস্ত্রহরণ। আর আমাদের সুশীল সমাজ দিনের পর দিন তাদের স্বর্গ রাজ্যে জাতির বিবেকের আসনে বসে জাতির ইজ্জত হরণ করেও কিভাবে পার পায় তা আমার বোধগম্য নয়।

বাস্তব জীবনে ১৯৪১-৪২ সালে এশিয়া ভূখণ্ডেও যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল, সুকান্ত তখন মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এসময় তার নেতৃত্বে সারা বাংলা অঞ্চলে ‘কিশোর বাহিনী’ নামে একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন গড়ে ওঠে। সে সঙ্গে ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের বিভাগ ‘কিশোর সভা’-এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন।
হাজারও ব্যস্ততার মাঝে ১৯৪৬ সালে একুশ বছরের আঙ্গিনায় পা রাখেন সুকান্ত। বন্ধু আর শুভাকাঙ্ক্ষীরা তার দীর্ঘায়ু কামনা করে। কিন্তু সে বছরেরই মাঝামাঝি সুকান্ত হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন। কাশির সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে আসে মাঝেমাঝেই। সঙ্গে সঙ্গে সুকান্তকে রেড এইড কিয়োর হোম নামের এক ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। এখান থেকে সুস্থ হলে তাকে তার মেজ বউদির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। সুকান্তকে তখন যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ হাসপাতালের লেডি মেরি হার্বার্ডস ক্লকের ১ নম্বর বেডে সুকান্ত যখন মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন, তখন তার বন্ধু সত্যজিত্ রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়সহ অনেকে ‘ছাড়পত্র’ বইটি দ্রুত ছাপানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। সুকান্ত হাসপাতালে শুয়ে বইটির প্রুফও দেখে দিয়েছেন। কিন্তু মুদ্রিত বইটি দেখার ভাগ্য তার হয়নি। কারণ বইটি বাঁধাই হয়ে আসার মাত্র কয়েকদিন আগে ১৯৪৭ সালের ১৩ মে (২৯ বৈশাখ ১৩৫৪) সকাল ১০টার সামান্য পর মৃত্যু তাকে ছিনিয়ে নেয়।

১৯৪৭ সালের এইদিনে কলিকাতার ১১৯, লাউডন স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
এ উপলক্ষে কবির পৈতৃক ভিটা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উনশিয়া গ্রামে সুকান্ত স্মৃতি সংসদ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে— কাঙালিভোজ ও আলোচনা সভা।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯২৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতার ৪২, মহিম হালদার স্ট্রিটে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নিবারণ ভট্টাচার্য। মায়ের নাম সুনীতি দেবী। কবির পূর্ব পুরুষরা এদেশ থেকে চলে যাওয়ার পরে তার পৈতৃক ভিটা দস্যুদের দখলে চলে যায়। দীর্ঘদিন দখলে থাকার পর ২০০৫ সালে ভিটাটি দখল মুক্ত হয়। কবির স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য তার পৈতৃক ভিটায় সরকারিভাবে একটি অডিটরিয়াম এবং একটি লাইব্রেরি করা হয়েছে।
কবির পৈতৃক ভিটাসহ সারাদেশে সরকারিভাবে কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের দাবি জানিয়েছেন কোটালীপাড়া শিল্পকলা একাডেমির শিক্ষক হবিবুর রহমান মুকুল ও দীলিপ ভাবুক বলে দৈনিক আমার দেশের খবরে প্রকাশ।

আমরা আজ একটু হলেও বুঝতে চেষ্টা করি আজকের একুশ শতকের অনেক আগেই কিশোর কবি সুকান্ত দীপ্ত সাহসে বলেছিলেন
হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ’ নিয়ে বলেছিলেন, ‘এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।
ইতিহাস স্বাক্ষী,বাংলাদেশের মানুষ কোনদিন কোন অপরাধীকে ছেড়ে কথা বলতে জানেনি। আজও জানবে না জানার কোন প্রয়োজন নাই।
ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বদলে পাওয়া টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া; বেনাপোল থেকে তামাবিল এই ছোট্ট ভূখন্ডের প্রতিটি মানুষ তাদের বীরত্ব গাথাকে নতুন করে ভাবার সুযোগ পাক।
তাদের স্বাধীনতার সকল স্বপ্ন সারথিকে সম্মান দিতে শিখুন। তারা জানুক শহীদের তাজা রক্ত দিয়ে অর্জিত এদেশ কারো দয়া দাক্ষিণ্যের ফসল নয় – তার নীরব স্বাক্ষী হয়ে লাখো শহীদের রক্ত এই পদ্মা-যমুনার স্রোতে মিশে আছে। এখানে সে যেই হোক বাংলাদেশের ইতিহাসে অপরাধীর মুক্তি নাই। পাশাপাশি প্রকৃত বীরদের তাদের ন্যয্য সম্মান দেয়া হোক। তবেই এই দেশকে সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। নয়তো শুশীল সমাজের নামধারী কিছু চাটুকার দিনের পর দিন জাতিকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের স্বর্গরাজ্য সাজাতে থাকবে।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
লেখক ও কলামিস্ট
Archaeology of Humankind

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s