উদারতার বিনিময়ে স্ফীত উদর তার শেষ পরিণতি করুণ মৃত্যু


————————বড় চুল কানে দুল এর কারণে বাইরে থেকে সনাক্ত করা বেশ কঠিন হবে এটা ছেলে না মেয়ে।

তবুও বোঝা যায় সে ইমন। কদিন আগেই তার জীবনে এসেছিল বসন্তের সু-বাতাস কিন্তু বেশিদিন টেকেনি তা । কোন এক প্রলয়ংকারী কালবৈশাখী যেন সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে গেল যা সে জানতেও পারেনি হয়তো জানার চেষ্টাও করেনি, হয়তোবা সুযোগ হয়নি। জীবনের বসন্তে ফূল ফূটলেও মালা গাঁথা আর হয়ে ওঠেনি। এর জন্য সে নিজেও অনেকটা দায়ী।
অদুরে লেকের নীল স্বচ্ছ পানিতে ভাসছে এক যুবতী মেয়ের লাশ।দীঘল ব্লন্ডিং চুল ভাসছে কালোপানার মতো,পরনে অনেকটা উদ্ধত রকমের জিন্স টি শার্ট । বোঝাই কষ্টকর এটা একটা মেয়ের লাশ।

আর কেউ না এটা জিমা। যার সাথে সবসময় জড়িয়ে ছিল একটা নাম ইমন। কিন্তু কিছুক্ষন পূর্ব থেকে এসবই কেবল এক ধুসর বর্ণের স্মৃতি। লেখকরা বলে থাকেন বেদনার রং নাকি নীল কিন্তু স্বপ্ন কিভাবে ধূসর হয় তা আজ দেখা গেছে। ক্ষনিকের ভালবাসা। কিছুটা ভাবাবেগ। তারপর আরো গভীরতা। শেষ পরিণতি এটা হবে কেউ তা ভাবেনি। আসলে এই পরিস্থিতিতে যারা পড়ে তাদের ভাবার সময় খুব কম। তাদের জীবনকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় এক ধরণের ঝড়। যাকে কিভাবে সামাল দেয়া যায় তা সে নিজেও জানে না বোধ হয়। আর তা সে জানবেই কিভাবে তাদের প্রিয় আধুনিকার দর্শন বলে এই ভালবাসা এই প্রেম নাকি বড়ই খাপছাড়া, এটা উদ্ভান্ত অনেকটা টর্ণেডোর মতো ধেয়ে আসে। তাই তাদেরই বা দোষ কোথায়।

এরা নিজেদের ভাবে আধুনিক। তারা নিজেদের যুগের থেকে একধাপ এগিয়ে নিতে চায় । বেশি উদার হতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত স্ফীত উদরের মালিক হয় । আর তার পরিণতি হয় তৃতীয় একটি জীবনকে সাথে নিয়ে এক গহীন অন্ধকারের পথে অগস্ত্য যাত্রা । এই বিষাদ নিনাদ যে একদিন কোন কারণ বাদেই বেজে উঠবে এটা ছিল অনেকটা অনুমিত। তবু এতটা করুণ হবে এই নিনাদের সুর তা কে জানতো। কিন্তু এই প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিপাকের আবর্তে যারা নিজেদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তারা হয়তো এভাবে ভাবেনি। হয়তোবা ভেবে দেখার অবকাশ পায়নি। অনেকে বলে এ নাকি এক অবুঝ অনুভূতি । প্রেম নাকি তাদের করেছিল অবুঝ । কিন্তু তাদের কেন এমন হলো আর কেনই বা মধুর সম্পর্ক তাদের গাড়িতে চিরনিদ্রায় শুইয়ে দিল আর লেকের পানিতে সবার সামনে নিতান্ত অসহায়ের মতো ভাসিয়ে দিল এর ইতিহাস সাধারণ বুদ্ধির মানুষের ও অজানা নয়।

জনতা গালি দিচ্ছে ধাঁড়ি মেয়েটি, যে কিনা বাবা মায়ের সম্মান সব ধুলায় মিশালো,
কি বা হলো, তুই নিজে তো মরলি আর বাবা মা একদিকে চোখের পানি মুছবে অন্যদিকে সামলাবে পুলিশ কেস আর আদালত। কারন আমাদের দেশ । মজার এক দেশ। রঙ্গভরা বঙ্গদেশ। এখানে রঙ্গের নাই কোন শেষ। এখানে মাণুষ হাসি দেয় । গরিলার অট্টহাসির মতো। মাণুষ এখানে কাদে । খুব ভালো করেই কান্দে। তবু কেন যেন এটাকে হায়েনার কান্নার মতো মনে হয়। যাক কি আর করা এইট নিয়তি। যার উপরে কারও নাকি কোন হাত নেই।
পরিচিতজন অনেকেই থুথু দিচ্ছে।
বেঁচে থেকে বাবা মায়ের শান্তি হারাম করেছিস আর মরার পরেও অন্যথা হতে নেই। তোকে জন্ম দেয়াটাই তোর বাবা মায়ের সবথেকে বড় পাপ। কি হয়েছে কি পেলি তুই। হ্যা ।
যৌবন আসছে তো কি!!! আর কারও কি যৌবন আসেনি!‍!!!! ওরে ও হতভাগী তোর উচ্ছাস কি কোন বাধাই মানে না?
জটলা থেকে কানাঘুষা চলছিল।

———————এইতো সেদিন ইমন আর জিমা এক অন্যকে কতটুকু জানতো।
শুধু একই জুডো সেন্টারে মারপিট শিখতে যেত।
হটাৎ করেই পরিচয়। বন্ধুত্ব । গভীর বন্ধুত্বের পরিণতি প্রেম।

কে এফসি! ওয়েস্টার্ন গ্রিল! জিনজিয়ান! কিয়াংসী! থেকে নন্দন এর কনসার্ট এহেন জায়গা নেই তারা দাপিয়ে বেড়ায়নি।
তারপর। আজ তার নিজের গাড়ির মধ্যেই পচে ফূলে ফেপে উঠেছে ইমনের দেহ।
একান্ত আপন জিমার ঠাঁই হয়েছে আজ লেকের পানিতে।

হাজার যাই হোক এটা বাংলাদেশ আর অবিবাহিত মেয়ের পেটের বাচ্চা বলে কথা। মহাভারত অশুদ্ধ হলে ব্যাপারনা । তবে এটা যে সাক্ষাত সূর্য পশ্চিমে ওঠার শামিল। আধুনিক যুগে এটা কিছু না বলেই চালাতে চেয়েছিল ইমন। আর সরল বিশ্বাসে সেই শিশুকাল থেকে না শব্দটি যার অভিধানে নেই সেই জিমা এটা মেনে নিয়েছিল ঠিকই। কি দেখলো সে । কি পেল। তা কেউ জানতে পারলো না। এই ইমনকেই কিনা আজ সে অনেকটা আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে তারই বান্ধবী লুবনার সাথে। জবাবে ইমন ওকে শোনালো মন মানসিকতা একটু উদার করো। আর জিমা তার মানসিকতাকে ইমনের মতো সবার জন্য হয়তো উদার করতে পারেনি। তাইতো তাকে লেকের পানিতে আবিষ্কার করে একজন বাদাম ওয়ালা।

———————–আজ দুপুরে তার আম্মা হটাৎ করেই সংঘটিত দূর্ঘটনা আন্দাজ করে। আর মান সম্মান বাবার স্ট্যাটাস প্রভৃতির কথা তুলে অনেকটা কান ঝালাপালা অবস্থা। সেটাও অনেকটা সামলে নিয়েছিল জিমা। কিন্তু হটাত ইমনের ফোন আসে। বেরিয়ে যায় সে। তারপর মনের জ্বালা জুড়োতে জঘন্য রকমের ড্রিংক করে জিমা আর ইমন দুজনেই। ওই অবস্থায় রাতে বাসায় ফিরে সরাসরি বাবার সামনে। বাবা পায়ের থেকে চটি স্যান্ডেলটা খুলে গোটা দুচ্চার দুমদাম লাগাতে ভুল করেননি।

বেচারা জলিল সাহেব কি আর করবেন। তিনি তো আর কম করেননি।
এইচ , এস সি পাস করার পর কোন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মুরোদ না হওয়াতে ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় জিমা। তারপর পড়াশুনার চাপ আর নানা দিকে না পেরে দুই সেমিষ্টার ড্রপ করে জিমা।কঠোর আইন কানুন অনুসরণ করা ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনেকটা অর্ধচন্দ্র দেয়। কি আর করা ডিগবাজি খেয়ে তারা ঠাঁই মেলে এশিয়া প্যাসিফিক এ। তবুও তারা জাতের স্বভাব পাল্টায়নি।একদিন নতুন কারের বাহানা উঠলেও জলিল সাহেব একমাত্র মেয়ের আব্দার বলে আর না করতে পারেননি। সেই কার নিয়ে মাসে একাধিক বার বয়ফ্রেন্ড বদলানো আর পুরো ঢাকা চষে বেড়ানো বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ হয়েছে তার।

পক্ষান্তরে বাবা মায়ের কোন কথাটা রেখেছে সে । হাত গুনলে হয়তো দুই চারটিও না।পরিণতি কলঙ্ক মাথায় নিয়ে, জীবন দিতে হয়েছে তাকে। একমাত্র মেয়ের মৃত্যুতে অনেকটাই বেশামাল জলিল সাহেব। অধিক শোকে যেন কেমন পাথর হয়ে গেছেন। তবুও তার কেমন যেন একটা ভাবলেশহীন মনোভাব। আসলে তিনি তাঁর মেয়ের জীবনে কোন না রাখেন নি। তবুও মেয়ের জীবনটাই যখন একটা বড় না হয়ে গেল তার কিছুই করার থাকলো না। তিনি চেয়েছিলেন তার মেয়ে হবে অনেক বেশি স্মার্ট হবে, যুগের থেকে কয়েক ধাপ সামনে এগিয়ে থাকবে। তাই গিটার, ড্রামস, ডান্সিং, জুডো, কারাতে কোনটাই তিনি আর বাদ রাখেননি। মেয়ের আব্দারের সময় না শব্দটি বরাবরই অনুপস্থিত ছিল তার অভিধানে। কিন্তু এর পরিণতি এত নির্মম এতো বেদনার আর অসহ্য হবে তা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।

এমনি কত কাল? গ্রহন লাগার আগেই ডুবে যাবে নানা তিথীর চাঁদ।
জলিল সাহের তার ড্রাইভাররের দিকে অনেকটা কাতর স্বরেই বললেন মামুন গাড়ি ঘোরাও। তার দুচোখে তখন রাজ্যের আধার আর আষাঢ়ের ঢল নেমেছে।

——————-বলধা গার্ডেনের কাছে গাড়ি যাওয়ার সময়টাতে হটাৎ কি মনে করে তিনি জানালার দিকে তাকান। দেখেন তাঁর একান্ত আদরের জিমার মতোই কে যেন একটা ছেলের হাত ধরে বসে।
তিনি রাগে দুঃখে আবারো চোখ বন্ধ করেন । তাঁর শূণ্য বুক অনেকটা মনের অজান্তেই কেমন যেন চাপা অভিমানে হাহাকার করে উঠে আর ভাষা পায়না, খেই হারিয়ে ফেলে।
মারে কাউকে পছন্দ হলে প্রেম কর, কিন্তু আমার মতো আরও কতজনকে তোদের এই ভুলের জন্য বাকি জীবন চোখের জলে ভাসতে হবে। তোদের কি একবারের তরেও আমাদের কথা মনে পড়ে না। তোদের মতো সন্তাকে জন্ম দেয়াটাই কি আমাদের এক আজন্ম পাপ। আর কতকাল আরো কতদিন। আর কত বাবা মা কাঁদবে তোদের জন্য।
দু-ফোঁটা অশ্রু অনেকটা তাঁর মনের অজান্তেই টুপ করে দু-গণ্ডে ঝরে পড়ে ।
ধূসর দৃষ্টি তাঁর এক অনিশ্চয়তার দিকে।
আর বুকে কেমন যেন একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
Md. Adnan Arif Salim Aurnab
Archaeology of Humankind

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s