আসুন শত ব্যস্ততার মাঝে ১ টি ঘন্টা ব্যয় করি সহজ উপায়ে ৩০টা ভোট দিয়ে আমাদের সুন্দরবনকে বিজয়ী করতে পারলে সে আনন্দ সে গৌরব আমাদের সবারই

আমার ব্লগার বন্ধু অনির্বান রায় যে কিনা এই ব্লগের সহ লেখক অনেক কষ্ট করে বের করেছে কিভাবে সহজ উপায়ে ভোট দিয়ে আমরা সুন্দরবনকে একটি গৌরবের স্থানে নিয়ে যেতে পারি।

একটি ওয়েবসাইট আছে যেখান থেকে খুব সহজেই আপনি ১০ সেকেন্ড এ ১টা মেইল আইডি খুলতে পারবেন । তার পর ওই আইডি দিয়ে সু্ন্দরবনকে ভোট করা যাবে,প্রতি মিনিট এ একটা করে ভোট দিতে পারবেন ।

আমরা সবাই জানি দেশের কোন অর্জন হয় সবার। আর বিশ্বের দরবারে দেশ যখন কোন বিষয়ে মাথা তুলে দাড়াতে সক্ষম হয় তখন আমাদের সবার বুকটাই গর্বে ভরে ওঠে। বিশ্বকাপে আপনার সবাই গ্যালারিতে গিয়ে পতাকা হাতে চিৎকার করেছিলেন তাইতো বাংলাদেশ জিতে আপানাদের বুককে ভরিয়ে দিয়েছিল। তাই আজ আসুন আজকে মাঠে গিয়ে বাঘের গর্জন করতে হবে না। আজ আমাদের দেশের বাঘের আবাস সুন্দরবনকে বিজয়ী করতে সবাই মিলে কাধেঁ কাঁধ মিলিয়ে মাঠে নামি।

আগ্রহীদের সুবিধা বিবেচনা করে আমি সবগুলো বিষয় তুলে ধরছি। 

আসুন শুরু করি
 বাংলাদেশ থেকে এস এম এস এর মাধ্যমে ।

সবার ই একাধিক সিম আছে । একটু কষ্ট করে দিন না কয়েকটা ভোট ।

সুন্দরবনকে SMS এর মাধ্যমে ভোট দিতে পারেন খুব সহজে । শুধু SB টাইপ করুন এবং সেন্ড করুন 16333 নাম্বারে । চার্জ 2 টাকা /SMS । আসুন
প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে সুন্দরবনকে ভোট দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাই

ফোন কলের মাধ্যমে (যে কোন দেশ থেকে)ঃ

যুক্তরাষ্ট্রের/ ইন্টারন্যাশনাল যে কোন ফোন থেকে, যে কোন সিটি থেকে আগ্রহীরা আন্তর্জাতিক ফোন নম্বর +৪৪ ৮৭ ২১৮ ৪০০ ০৭ অথবা +৪৪ ২০ ৩৩৪ ৭০৯ ০১ ডায়াল করলে নিউ সেভেন ওয়াল্ডার্স অব নেচার ভোটিং লাইনের সাথে ফোন লাইন সংযুক্ত হয়ে যাবে। সুন্দরবনের কোড হচ্ছে ৭৭২৪ (সেভেন সেভেন টু ফোর)।


ইমেইল এর মাধ্যমেঃ

আমরা ইমেইল খোলার একটি সহজ উপায় পেয়েছি , যার মাধ্যমে আপনি ১০ সেকেন্ড এ কোন কিছু ছাড়াই একটা ইমেল আইডী পাবেন , আর তা ব্যবহার করে ভোট দিতে পারবেন । একটা ভোট দিতে সময় লাগবে ১মিন,যেহেতু ইমেইল আইডি খুলার কোন ঝামেলা নাই। তাই ভোট দিতে সমস্যা হওয়ারও কথা নয়।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেভাবে ভোট দিবেনঃ

ওয়েব পেজ www.new7wonders.com এ প্রবেশ করুন।

Vote Now for the new7wonders of Nature আইকনটিতে click করুন।

Step-1: ২৮টি finalist থেকে ৭টি স্থানকে মনোনীত করুন।

Step-2: এ আপনার ব্যাক্তিগত তথ্যাদি প্রদান করতঃ Register করুন।

ভোট প্রদান নিশ্চিত করতে আপনার ই-মেইল একাউন্ট লগইন করে info@new7wonders.com থেকে প্রেরিত link এ ক্লিক করুন।

এরপর আপনি voting confirmed message পাবেন।

এখন আসুন শুধু দেশের কথা বিবেচনা করে এই কাজটি করি  ভোট দেই বিজয়ী করি সুন্দরবনকে।

হ্যাকিং করুন আর ইন্টার নেট এর মাধ্যমে ভোট দিন মিনিট এ ১টা করে

১ম ধাপঃ
মিলিয়ানেটর ডট কম ওয়েবসাইটটিতে যান

২য় ধাপঃ
Check your inbox! এর নিচের বক্স এ যেকোন একটি Random ID লিখুন।

যেমন : abcd1234 অথবা আপনার ইচ্ছা মত যেমনঃ  goru, vodor. utdumba 

একটি ইনবক্স ওপেন হবে। যেখানে এরকম একটি লেখা দেখতে পাবেন:

Alternate Address for this Inbox: M8R-wd1xf11@mailinator.com

এক্ষেত্রে M8R-wd1xf11@mailinator.com এটা হচ্ছে আপনার ইমেইল এড্রেস। এই ইমেইল এড্রেস ব্যাবহার করে সুন্দরবন কে যে ভাবে ভোট দেয় , সেভাবে www.new7wonders.com এড্রেস এ গিয়ে ভোট দিন । ১ মিনিট অপেক্ষা করুন। এবার মেইলইনেটরের ইনবক্সটি রিফরেশ(রিলোড) করুন।

দেখবেন সুন্দরবন কে ভোট দেওয়ার কনফার্মেশন লিঙ্ক আপনার ভুয়া ইমেইল এড্রেস এর ইনবক্স এ চলে  এসেছে । এখন লিঙ্ক এ ক্লিক করে আপনার ভোট কনফার্ম করুন আর সেই সাথে সাথী হোন দেশেকে বিজয়ী করার এক মহান কাজে।

undefined

ভোট দেওয়ার জন্য ইমেইল আইডী খোলা সবচেয়ে বড় ঝামেলার তাই অনেক ভোট দিতে ইচ্ছা পোষণ করলেও পারেননা। আমাদের দেখানো এই পধতিতে খুব সহজেই যেহেতু মেইল আইডি পাচ্ছেন  । তবে আসুন না মাত্র  ১ মিনিট বা তার থেকেও কম সময় নিয়ে আমাদের সুন্দরবনকে বিজয়ী করতে ভোট দেই । আশাকরছি সবাই দেশাত্ববোধকে কাজে লাগিয়ে নিজের বিকের প্রশ্নে জাতির মাথা উচু করার স্বার্থে অন্তত  ৩০টা ভোট দিবেন । অনির্বান রায়ের এই আবিষ্কার কাজটাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে । এভাবে কাজ করতে পারলে আমরা প্রথম হবোই যদি স্রষ্টা আমাদের সহায় হন।

Published in
Archaeology Of Humankind 
By.
Anirban Roy 

Satellite archaeological survey with infra-red satellite images traced a number of ancient Egyptian pyramids

 A recent announcement from BBC of 17 new pyramids discovered in Egypt arouses the interest on the archaeology aided by satellites imagery [1]. The idea is that of observing the archaeological sites from above, to have a better view of the landscape. In some cases, the survey of a region ends with the discovery of new archaeological sites or with the precise location of an ancient lost town. These archaeological surveys are usually performed by means of airplanes, but satellites give different opportunities and in the case of Goggle Maps, a free opportunity too.

BBC announced that the University of Alabama used some data from NASA infrared equipped satellites to survey the archaeological sites in Egypt. According to a researcher of this University, Sarah Parcak, it is possible to see the ancient structures under the sand. Waiting for a scientific report on the subject with details on the method, we can tell that the infrared inspection is based on collecting the radiances in various wavelength bands, in the infrared range of the electromagnetic spectrum. The resulting profiles depend on the methods used to obtain the surface data from radiances. To have a good detection, the surface must be free from clouds.

The Egypt’s Minister of State for Antiquities Affairs, Zahi Hawass, seems to be quite interested to the new technologies, but, as he told Ahram Online, the satellite infrared images are only able to locate the remains beneath the sand [2]. It is then necessary, according to Hawass, to identify them with archaeological researches on the spot. From the news on the Web it is not clear how many sites have been analyzed by the team of the University of Alabama. It seems to be a huge number.

Besides the analysis with infrared imagery, let us consider that there are other remote sensing techniques that can be useful in archaeology: among them we have the LIDAR system, which is, as we discussed in [3], able to see under the canopy of the forests, and the SIR-C/X-SAR imaging radar system, which has waves that can penetrate the clouds, and, under certain conditions, vegetation, ice and dry sand [4]. Of course, these facilities are not freely available and needs financial supports.

We could then ask ourselves if a free satellite service, such as Google Maps, can help in some archaeological researches in Egypt. It is my opinion that the answer is positive. In studying the Merowe Dam and the paleochannels of the Nile we compared the images from SIR-C/X-SAR imaging radar system, with those of the Google Maps [5]. After a suitable image processing with some freely downloadable programs (GIMP, IRIS, AstroFracTool), the Google Maps revealed astonishing details of the network of old buried channels of Nile in the Nubian region. The same for the “raised fields” near the Titicaca Lake in Peru: the processing of Google Maps revealed the network of these ancient earthworks and canals.

Let us then try to apply the image processing to the Google Maps of those areas in Egypt, where according to the press, the infrared satellite imagery is giving good results. We see that one of these investigated areas is that of Tanis, a town of the ancient Egypt. In Fig.1, it is shown what we can have after processing the image from Google Maps. This image seems to contain quite clear information on the buried town too.

Another example is the site where there is a buried pyramid, according to the researchers of the University of Alabama [7]. The site is at Saqqara: Figure 2 shows two images, differently processed, of the Google Maps. The reader is invited to compare these images with those published on the Web, copyrighted BBC. I guess that after comparison, the reader can draw some positive conclusions about the Google Maps and its use for an archaeological survey of Egypt.

As Zahi Hawass is telling, it is necessary to understand whether some “anomalies” revealed by the satellite remote sensing are archaeological remains or not. This means that archaeology can only receive benefits for geophysics researches and the related use of remote sensing.
Archaeology Of Humankind 
Collected From Archaeogate
Md. Adnan Arif Salim Aurnab 

References
1. Egyptian pyramids found by infra-red satellite images, F. Cronin, BBC New, 24 May 2011,
2. News broadcast by BBC is inaccurate, says Hawass, N. El-Aref, Ahramonline, 26 May 2011,
3. Lines under the forest, A.C. Sparavigna, , and http://arxiv.org/abs/1105.5277.
4. SIR-C X-SAR Earth-Imaging Radar for NASA’s Mission to Planet Earth, Infopage.
5. The Merowe Dam on the Nile, A.C. Sparavigna, http://www.archaeogate.org/, and, Merowe Dam and the inundation of paleochannels of the Nile, A.C. Sparavigna, http://arxiv.org/abs/arXiv:1011.4911
6. The geoglyphs of Titicaca, A.C. Sparavigna, http://www.archaeogate.org/ and Symbolic landforms created by ancient earthworks near Lake Titicaca, A.C. Sparavigna, http://arxiv.org/abs/1009.2231
7. http://www.dailymail.co.uk/sciencetech/article-1390667/Seventeen-lost-pyramids-thousands-buried-Egyptian-settlements-pinpointed-infrared-satellite-images.html?ito=feeds-newsxml
8.The satellite archaeological survey of Egypt – by Amelia Carolina Sparavigna
9. Egyptian Pyramids Discovered with Infra-red Satellites
10.Buried city revealed by satellite
11.Museum must return mask to Egypt

Some Picture of this Imagery   
     
An infra-red satellite image shows a buried pyramid, located in the centre of the highlight box.  
Tanis as can be observed after processing an image from Google Maps. It is seems that the image is giving quite good details, comparable with the infrared images
This is the Saqqara area where there is a buried pyramid. The two images have been obtained after processing in two different ways the Google image. According to Ref.[7], the pyramid is in the marked area.

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু আবার হরতাল ও কিছু সাম্প্রতিক ভাবনা

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু আবার হরতাল ও কিছু সাম্প্রতিক ভাবনা

আমার বর্ণমালা ব্লগের পোস্ট
সোনারবাংলাদেশ ব্লগের পোস্ট
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন পুরো পোশাক ভিজে চুপসে আছে। আসলে আমি কোন বাচ্চাদের হিসু করার কথা বলিনি। বলছি দেশের আমজনতার সাধারণ চিত্রের কথা। আমাদের দেশে তো এখন বিদ্যুত যায়না মাঝে আসে। এই হটাৎ করে বিদ্যুত আসাতে হয়তো কেউ খুশি মনে কিছুক্ষন ঘুম দিয়েছেন আর ভোর রাতে কিংবা সকালের দিকেই তার সমুচিত জবাব পেয়েছেন।
ঘাড়ে প্রচন্ড ব্যাথা, কথা বলতে কষ্ট হয়, গলাটা অস্বাভাবিকভাবে দেবে গেছে, ভাবলেন এককাপ কফি খাবেন পকেটে হাত দিয়ে দেখেন কোন খুচরা টাকা-পয়সাই নেই। থাকবে কেমনে তেল গ্যসের দাম বাড়ানোর পর বাসের ভাড়া বেড়েছে। সথে একটার কিনলে একটা ফ্রি হিসেবে যুক্ত হয়েছে প্রতিদিনের রুটিন ঝগড়া আর ক্যাচাল। সেই সাথে নতুন করে বাসভাড়া বাড়ানোর সাথে সাথে মহাসড়কগুলোথেকে কেমন করে যানবাহনগুলো ভোজবাজির মতো গায়েব হয়ে গেছে। বাসের হ্যান্ডেলে বান্দরের মতো ঝুলতে ঝুলতে এসে কিংবা ভিতরে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে দাড়ালে আপনার ঘাড়ে ব্যাথা তো হবেই। আর পেশাদার ঝগড়াটে বাস কন্ডাকটার আর হেল্পারদের সাথে একটু পাল্লাদিলে গলা তো ভাংবেই। ভাববেননা আদা দিয়ে এক কাপ চা খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। কারণ আপনি নিজেও জানেন না রাজধানীর জ্যাম পাড়ি দিয়ে কখন আপনি বাসার দেখা পাবেন। আসার গেলেই আপনি কিভাবে ভাবলেন আপনার বাসার চুলাতে গ্যাস আছে আর লাইনে পানি আছে। না আপনাকে এসব ভাবার কোন সময় নাই। কারন এখন আমি আপনি বাস করছি এক ডিজিটাল যুগে । যেখানে সবাই এক একটি রোবট। এই রোবটদের জীবনে কোন আরাম বিরাম নেই, নেই কোন সাধ আহলাদ, নেই কোন চাওয়া পাওয়ার মূল্য। শুধু এরা দ্বিদলীয় স্বৈরাচার তন্ত্রের কুশীলবদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার জন্যই জম্নেছে। ভাবলাম ডিজিটাল দেশের মানুষ ডিজিটাল হবে কিন্তু তাদেরকে রোবট ভেবে যাচ্ছেতাই অবস্থানে ঠেলে দেয়া হবে এমনটা কেউ ভাবেনি। দেশের গনতন্ত্র হত্যকারী নপুংশক ফখরুদ্দীন মইনুদ্দিন ও তার চেলাদের হটানোর আশায় দেশে একটা নির্বাচিত সরকারের চেহারা দেখে ওই অবাঞ্চিত প্রশাসনের হাত থেকে শাপমুক্তির প্রত্যাশায় জনগণ যে প্রমান গুণছিল আজ কি তা আবার ১ থেকে শুরু করতে হবে নাকি এই বিষয়ে মনে হয় জল্পনা কল্পনা শুরু হয়ে গেছে।

https://i2.wp.com/i344.photobucket.com/albums/p352/watchdog_bd/khoyrul.jpg

যাহোক মানুষের রোবটিকরণের কেচ্ছাবাদ দেই এই এখন এই রোবটদের নিয়ে তৈরী একটু নতুন প্রোগ্রামের দিকে নজর দেই। তা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়কসরকার ইস্যু।
তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রশ্নে প্রধান দুটি দলের অবস্থান এখন স্বভাবসুলভভাবেই পরস্পরবিরোধী। আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো একদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে বলছেন অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে কথা বলছে। কিন্তু সকল সমস্যার অবসান এখানেই হচ্ছে না ,তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখা হলে ৫৮গ(৩) ধারা মতে সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকই হবেন প্রধান উপদেষ্টা যার ব্যাপারে বেগম জিয়া তথা বিএনপির রয়েছে প্রবল আপত্তি। বি এনপির মতে তিনি দুই-দুইবার জেষ্ঠতা লংঘন করে তার উপরের কর্তাব্যক্তিদের ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। উপরন্তু তার দেয়া সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায় এবং বেগম জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি সংক্রান্ত রায় তাকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। পরিস্থির দায় মেটাতে বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করলেই চলবে না, বরং দলটিকে একটি বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে নতুবা রাজপথে সরগরম করে করে তুলতে হবে যা অনেকটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অংগনের নির্মম বাস্তবতা । আর বি এন পি যদি নতুন কোন প্রস্তাব দেয়ও তা থেকে ফলাফল যে মস্ত বড় একটা শূন্য হবে তা দেশের সবাই জানেন।
তবে এই ইস্যুতে হরতাল দিয়ে নতুন করে যে ‘রাজনীতি’ শুরু হল, তাতে করে আগামীতে দেশে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটে পড়তে যাচ্ছে এ কথা অনেকটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বি এন পি যদি লাগাতার হরতালে পথ বেছে নেয় তখন এই ডিজিটাল দেশের প্রায় সব ডিজিটের নবই ভেঙে পড়বে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এতে সরকার বা বিরোধী দল যারই স্বার্থ হাসিল হোক ভোগান্তিতে পড়বে এই একমাত্র শ্রেণী ‌‌” হতভাগ্য জনগণ” । এমন একটা সময়ে এসে লাগাতার হরতালে কথা বলে বলে বি এন পি চোখ রাঙাচ্ছে যখন সরকারের বয়স রয়েছে আরও প্রায় ৩২ মাস যেটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোন ক্রমেই ছোট হওয়ার নয়। কারন এটা সেই দেশ যেখানে রাজনীতি চলে দুটো প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনে আর জনগণ যেখানে নীরব দর্শক। অনেকটা এমন জনগণ একটা লন টেনিস বলের মতো তাদের যতো খুশি পেটায় দুই রাজনৈতিক দল। এই দীর্ঘ পরিসরের ক্ষমতার মেয়াদ আর হরতালের যোগসুত্র থেকে দেশের সামনের শ্রেনীর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের আশংকা করছেন অনেক আগে থেকেই। দুটি বড় দলের মাঝে জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে তা সংকটকে আরও গভীরতর করবে যা বলার অপেক্ষা রাখেনা । বিগত ৫ মে’র হরতাল একটা দাবিকে অনেকটা ছাইচাপা আগুনের মতো উষ্কে দিয়েছে আর পরিণতি কোথায় দাঁড়ায় তা দেখার অপেক্ষামাত্র ।

পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্যটি করলেন, তা তার সরকারের বক্তব্য বলে ধরে নেয়া ভিন্ন দ্বিতীয় কোন পথ থাকছে না । এই ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশ্ন থেকেই যায় । তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে এই ‍‌”’গণতন্ত্র”’ শব্দটি যেভাবে হাস্যকর হয়ে উঠছে , তার সঙ্গে উন্নত বিশ্বের গণতন্ত্রকে মেলানো যাবে না। উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্রের ভিতকে আরও শক্তিশালী করার জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যার মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। আর বাংলাদেশের মতো দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ এই কথা বলা বিচিত্র হবে না।
প্রধানমন্ত্রী যখন সংবাদ সম্মেলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার কথা জানালেন তখন সবাই অনেক সহজেই মনে করতে পেরেছেন ১৯৯৪-৯৬ সালে তিনিই ছিলেন এর প্রবক্তা। ওই সময় আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিল। সংবিধান অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল বটে, কিন্তু আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর নিশ্চয়ই এসব ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
আওয়ামী লীগের চাপের মুখেই ষষ্ঠ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, যা কিনা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী নামে অভিহিত। সেদিন বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সেদিন এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেনি। বরং সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, যা কিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারও গঠন করেছিল। গেল ১৪ বছরে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনো বড় ধরনের বিতর্ক হয়নি। ২০০৭ সালে ওই ফখরুদ্দীন- মইনুদ্দিন সংকটের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যে বিতর্ক, তার প্রেক্ষাপট অবশ্যই ভিন্ন ছিল ।

ইতিহাস বিবেচনা করলে এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৩টি নির্বাচন হয়েছে। সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এসব নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। আজ যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কথা বলছেন, তারাই ১৯৯৪-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন সবচেয়ে বেশি। যদি উচ্চ আদালতের রায় অনুসরণ করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করতে হয়, তাহলে উচ্চ আদালতের সুপারিশও গ্রহণ করা যেতে পারে। অর্থাত্ পরবর্তী দু-দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় আয়োজন করা। এই সুপারিশ গ্রহণ করা না হলে, সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

কেন এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা দরকার তার আগে আমাদের কিছু বিষযের দিকে নজর দিতে হবে। স্বাধীনতার চার দশক পেরুলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসেনি, যাতে করে দলীয় সরকারের আওতায় আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারি। ভোলার উপনির্বাচনের দৃষ্টান্ত আমাদের সম্মুখে আছে। কী হয়েছিল ভোলার উপনির্বাচনে, একথা নিশ্চয়ই আমাদের সবার মনে আছে। গত ২৪ এপ্রিল, ২০১০ এই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছিল কিনা আসুন সংবাদপত্রগুলোর মন্তব্যের দিকে চোখ বুলাই। ‘ভোলায় কেন্দ্র দখলের মহোত্সব’ এই মন্তব্য করেছিল নয়াদিগন্ত। প্রথম আলো লিখেছিল, ‘ভোটারদের পথে পথে বাধা। ভোটকেন্দ্রের বাইরে ও আশপাশে ভোটারদের বাধা দেয়া, হামলা এবং কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে’। মানবজমিন বলেছে, ‘ব্যাপক সহিংসতা, জাল ভোট, এজেন্টদের পিটিয়ে বুথ থেকে বের করে দেয়া ও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়ার মধ্য দিয়ে ভোলা-৩ আসনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে’। ইত্তেফাকের মন্তব্য ছিল এ রকম, ‘কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে বিএনপি এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। বিএনপি কর্মীদের কুপিয়ে জখম করা হয়। জালভোট দেয়া হয়েছে’। অন্যান্য পত্রিকার মন্তব্যগুলো আর উল্লেখ করলাম না। এসব মন্তব্য আমাদের কী ইঙ্গিত দেয়? ইঙ্গিত দেয় একটাই—আমাদের রাজনীতিবিদদের মনমানসিকতায় আদৌ কোনো পরিবর্তন আসেনি। যেখানে ভোলার উপনির্বাচন আমরা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে পারলাম না, সেখানে দলীয় সরকারের আওতায় জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করি কীভাবে?
দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের স্বার্থে পৃথিবীর অনেক দেশে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যা সংবিধান পরিপন্থী। কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা ও একটি গ্রহণযোগ্য সমাজব্যবস্থা উপহার দেয়ার স্বার্থেই সংবিধান বহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। দৃষ্টান্ত কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ে। এ দুটি দেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ ছিল না। কিন্তু ব্যাপক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে সেখানে গণতন্ত্র নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে আমরা বিকাশমান গণতন্ত্রকে নতুন একটি মাত্রা দিয়েছিলাম। তাই তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে নতুন করে ভাবার সময় এখনো আছে। সংঘাতময় রাজনীতি আমাদের কারোই কাম্য নয়।

দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের স্বার্থে পৃথিবীর অনেক দেশে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যা সংবিধান পরিপন্থী। কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা ও একটি গ্রহণযোগ্য সমাজব্যবস্থা উপহার দেয়ার স্বার্থেই সংবিধান বহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। দৃষ্টান্ত কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ে। এ দুটি দেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ ছিল না। কিন্তু ব্যাপক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে সেখানে গণতন্ত্র নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে আমরা বিকাশমান গণতন্ত্রকে নতুন একটি মাত্রা দিয়েছিলাম।

[m]ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি সহ প্রায় সকল দলের অংশগ্রহনে অভিন্ন কর্মসূচি হিসেবে ’৯৪, ’৯৫ ও ’৯৬ সালে ডাকা হরতাল, অবরোধ এবং অসহযোগের ঘটনাগুলো। আন্দোলনে উত্তাল বিভীষিকাময় সেই দিনগুলো যেন দেশের উন্নয়নের গতিকে অনেকটাই রুদ্ধ করে দিয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে নতুন করে ভাবার সময় এখনো আছে। সংঘাতময় রাজনীতি আমাদের কারোই কাম্য নয়। স্বাধীন দেশে শান্তিতে বসবাস সবার প্রাণের দাবি। [m]

এখন আমি পত্রিকার পাতা থেকে সেই সময়ের আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি। যার মাধ্যমে সহজেই বোঝা সম্ভব হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু কোন সাধারণ ইস্যু নয়।

১৯৯৪ সাল : ২৬ এপ্রিল ( হরতাল), ১০ সেপ্টেম্বর (অবরোধ), ১১, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর (হরতাল), ২৭ সেপ্টেম্বর (অবরোধ), ৩০ নভেম্বর (অবরোধ), ৭ ও ৮ ডিসেম্বর (হরতাল), ২৪ ডিসেম্বর (অবরোধ), ২৯ ডিসেম্বর (অবরোধ)।
১৯৯৫ সাল : ২, ৩ ও ৪ জানুয়ারি (হরতাল), ১৯ জানুয়ারি (অবরোধ), ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি (হরতাল), ১২ ও ১৩ মার্চ (লাগাতার ৪৮ ঘণ্টা হরতাল), ২৮ মার্চ (ঢাকা অবরোধ), ৯ এপ্রিল (৫ বিভাগে হরতাল), ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর (লাগাতার ৩২ ঘণ্টা হরতাল), ৬ সেপ্টেম্বর (সকাল-সন্ধ্যা হরতাল), ১৬, ১৭, ১৮ সেপ্টেম্বর (লাগাতার ৭২ ঘণ্টা হরতাল), ৭ এবং ৮ অক্টোবর (পাঁচ বিভাগে লাগাতার ৩২ ঘণ্টা হরতাল), ১৬, ১৭, ১৮ এবং ১৯ অক্টোবর (লাগাতার ৯৬ ঘণ্টা হরতাল), ৬ নভেম্বর (ঢাকা অবরোধ), ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫ এবং ১৬ নভেম্বর ( প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল), ৯, ১০ এবং ১১ ডিসেম্বর (লাগাতার ৭২ ঘণ্টা হরতাল), ১৭ ডিসেম্বর (সকাল-সন্ধ্যা হরতাল), ৩০ ডিসেম্বর (দেশব্যাপী অবরোধ)।
১৯৯৬ সাল : ৩ ও ৪ জানুয়ারি (লাগাতার ৪৮ ঘণ্টা হরতাল), ৮ ও ৯ জানুয়ারি (লাগাতার ৪৮ ঘণ্টা হরতাল), ১৭ জানুয়ারি (সকাল-সন্ধ্যা হরতাল), ২৪ জানুয়ারি (সিলেটে ১১ ঘণ্টা হরতাল), ২৭ জানুয়ারি (খুলনায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল), ২৮ জানুয়ারি (খুলনায় অর্ধদিবস হরতাল), ২৯ জানুয়ারি (ঢাকায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল), ৩০ জানুয়ারি (চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল), ১ ফেব্রুয়ারি (বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হরতাল), ৩ ফেব্রুয়ারি (অর্ধদিবস হরতাল), ৭ ফেব্রুয়ারি ফেনীতে (সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত হরতাল), ৮ ফেব্রুয়ারি (ফেনীতে হরতাল), ১০ ফেব্রুয়ারি (রাজশাহীতে হরতাল), ১১ ফেব্রুয়ারি (সিরাজগঞ্জে হরতাল), ১৩ ফেব্রুয়ারি (দেশব্যাপী অবরোধ), ১৪ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি (দেশব্যাপী ৪৮ ঘণ্টা লাগাতার হরতাল), ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি লাগাতার অসহযোগ), ৯ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত লাগাতার ২২ দিন অসহযোগ।

তারপর এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর এক এগারোর কলঙ্কিত দিন। তার আজকের এই বিতর্ক । আফসোস একটাই বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেশ স্বাধীনকরার পরেও আজ স্বাধীনতার চার দশক পার করেও দেশের জনগন একটু স্বস্বির সাথে স্বাধীনতার সুবাতাস উপভোগ করতে পারলো না।
Archaeology Of Humankind
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ব বিভাগ , জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মহাস্থানগড়ের প্রত্ননিদর্শনের নির্বিচার ধ্বংসসাধন

মহাস্থানগড়ের প্রত্ননিদর্শনের নির্বিচার ধ্বংসসাধন

উপসম্পাদকীয়,
আমার দেশ, ১০ মার্চ ২০১১

ঐতিহ্যের মহাস্থানগড়

হাইকোর্টের জারিকৃত বিধি অমান্য করে কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, কুচক্রী সরকারি আমলা ও প্রভাবশালী মহলের নির্লজ্জ ভূমিকায় ইতিহাস, ঐতিহ্য আর পর্যটনে সমান গুরুত্ববহ প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার নিদর্শন মহাস্থানগড় আজ ধ্বংসের পথে। এই নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন মানুষ বৈ কি, সমগ্র জাতিকে আজ করেছে বিস্মিত হতবাক। কিংবদন্তিকে আশ্রয় করা বলখি মাহি সওয়ারের মাজারকে কেন্দ্র করে যে নব্য লালসালু আখ্যান রচিত হয়েছে, তার মঞ্চায়নই আমাদের প্রাচীন সভ্যতার এই বিরল নিদর্শনের ধ্বংসযজ্ঞে বৈধতা দিচ্ছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিবর্গ আর সরকারি কতিপয় আমলার ভূমিকা। আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে ফ্রান্স-বাংলাদেশ যৌথ খনন প্রতিবেদনের রেডিও কার্বন তারিখকে সূত্র ধরে এর সময়কাল জানতে পারি খ্রিস্টপূর্ব তিন থেকে চার শতক। অর্থাত্ বহুল পরিচিত ভ্রমণ কেন্দ্র ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ার মহাস্থানগড়কে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা বলাটা অযৌক্তিক হবে না। চারদিকে প্রাচীরবেষ্টিত এই সুপ্রাচীন আদি ঐতিহাসিক সময়কালের বিখ্যাত দুর্গনগরীটি বিকশিত হয়েছিল বগুড়া শহর থেকে উত্তরে প্রায় তেরো কিলোমিটার দূরে নদীমাতৃক বাংলা ভূখণ্ডের অন্যান্য সভ্যতার মতো করতোয়া নদীর কূল ধরে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে এর রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী দেয় মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোকের শিলালিপি। প্রাচীন ব্রাহ্মী হরফে উত্কীর্ণ এই লিপিতে পুডনগল বা পুণ্ড্রনগর তথা এই মহাস্থানগড়ের তত্কালীন শাসক দুমদিনকে দুর্ভিক্ষপীড়িত জনগণকে সাহায্য করার কথা বলা হয়, যা মৌর্য শাসনামলে মহাস্থানগড়ের গৌরবকে তুলে ধরতে যথেষ্ট হয়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে এই উক্তিগুলো তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করলাম তাদের জন্য যারা একেবারে নবীন অর্থাত্ বিজ্ঞানের বা বাণিজ্যের ছাত্রছাত্রী বা সাধারণ মানুষ। তারা কিছুটা হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির মূল অবস্থা বোঝার পথ পাবেন। মৌর্য আমল থেকে শুরু করে এর ধারাবাহিক গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে ধারণ করেছিল গুপ্ত ও পাল রাজাদের আমলের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে, যা আজ নেই কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই সময়ের নির্বাক জড় পদার্থগুলো ইটের দেয়াল, দুর্গের নিদর্শন আর মূর্তি হয়ে। বিস্তৃত পরিসরে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, অনুসন্ধান ও কয়েক দফা উত্খননের ফলে মহাস্থানগড়ে উন্মোচিত প্রত্ননিদর্শনগুলোর মধ্যে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে পারি ভাসু বিহার, ভীমের জাঙ্গাল, বৈরাগীর ভিটা, গোবিন্দ ভিটা, কালিদহ সাগর, জিয়ত কুণ্ড, গোকুল মেধ বা কিংবদন্তির বেহুলা-লখীন্দরের বাসর ঘর, খোদার পাথর ভিটা, মানখালীর কুণ্ড, বন্দুকধারা, হাতিবান্ধা, ধোপাপক্রা বা ধোপার পুকুর, হাতিডোবা পুকুর, মনিরঘোন, শিলাদেবীর ঘাট, মথুরা চিঙ্গাসপুর, কাঞ্জিরহাট, ছেলীরধাপ, গোদার ধাপ, কানাইধাপ প্রভৃতি। এটির প্রাচীর ও পরিখাবেষ্টিত দুর্গ নগরীর চারদিকে অনেক বিক্ষিপ্ত মানববসতির চিহ্নও ছিল। যেগুলো ইতিহাস-ঐতিহ্যের গৌরবকে তুলে ধরার পাশাপাশি মহাস্থানগড়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এছাড়া মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হিসেবেও মহাস্থানের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। কিংবদন্তি অনুযায়ী প্রখ্যাত কামেল হজরত শাহ সুলতান বলখী মাহী আছোয়ার বা মাহীসওয়ার (রহ.) এই স্থানের রাজা পরশুরামের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হন; যার ফলে পরবর্তীকালে মহাস্থানগড় পরিচিতি পায় মুসলমানদের বসতি এলাকা হিসেবে আর তা একে হাজার হাজার মুসলিম জনতার কাছে পবিত্র স্থানের মর্যাদা দিতে যথেষ্ট হয়। এরপর থেকেই মহাস্থানে সমাগম হতে থাকে হাজার হাজার মানুষের, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন অনেকটা তীর্থযাত্রীদের মতো। আর বলখী মাহীসওয়ারের মাজারকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা অনেকটা জমি তৈরি করে দেয় এই নব্য লালসালু নাটকের বৈধ মঞ্চায়নের। নাটকটির কুশীলবরা ক্ষমতার যাচ্ছেতাই অপব্যবহার ও প্রচলিত আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের ঐতিহ্য বিনষ্ট করে হুমকির সামনে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের সোনালি অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নকে। মহাস্থানগড়ের সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেশ-বিদেশের পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়েছে। এটি ইতিহাস-ঐহিহ্যের লীলাভূমি হওয়ার পাশাপাশি আত্মপ্রকাশ করেছে অনেকটা বিনোদন পার্কের মতো দর্শনীয় স্থান হিসেবে। এর পাশাপাশি মহাস্থানগড় মাজার এলাকাতে প্রতি বছর বৈশাখ মাসে বিশাল মেলা বসে, যা দর্শক আকর্ষণের অন্যতম কারণ। হারিয়ে যাওয়া অতীত ইতিহাসের সেই সোনালি যুগের স্থাপত্যকে দু’চোখ ভরে দেখতে, একটু কাছে থেকে একান্ত নিজের করে অনুভব করতে, নিজের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করতে, চাই কি একটু নির্মল বিনোদন নিতে প্রতিদিন হাজারো শিশু, নারী ও পুরুষের সমাগম ঘটে মহাস্থানগড়ে। প্রধানত ছুটির দিনগুলোতে ও হিন্দু-মুসলিম ধর্মানুষ্ঠানের সময় এই স্থানে আপামর জনতার উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। মহাস্থানগড়ের অতীত ঐতিহ্য ও পর্যটন ক্ষেত্রে এর গুরুত্বকে উপলব্ধি করে ১৯৬৭ সালের দিকে এখানে প্রত্নস্থানভিত্তিক জাদুঘর নির্মাণ করা হয়, যেটি বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর এখানে প্রদর্শিত হতে থাকে উত্খনন ও উপরিপৃষ্ঠ সংগ্রহে প্রাপ্ত অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষী নানা বস্তুগত নিদর্শন। পাশাপাশি নিকটস্থ নানা স্থান থেকে সংগ্রহকৃত প্রত্ননিদর্শনও এখানে স্থান পায়। যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন পাথর নির্মিত ও ধাতব মূর্তি, ধাতব পাত্র, মৃত্ পাত্র, পোড়ামাটির নিদর্শন, মুদ্রা, শিলালিপি, অস্ত্রশস্ত্রসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য নানা সামগ্রী। আর পর্যটকদের কথা বিবেচনা করে এখানে নির্মিত হয়েছে অত্যাধুনিক ইমারত। মহাস্থান জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা কাস্টডিয়ানের অনুমতি সাপেক্ষে এখানে পর্যটকরা থাকার সুবিধা লাভ করেন। মহাস্থান জাদুঘরের খতিয়ান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকেই এটির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার তথ্য মেলে। যার সাক্ষী মহাস্থান সংলগ্ন জাদুঘরের রেকর্ড বইতে সংরক্ষিত ক্রমবর্ধমান দর্শকের সংখ্যা। ১৯৯৫-৯৬ সালের দিক থেকে এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯৮-৯৯ সালে এখানে দর্শনার্থী ছিল দুই লাখের মতো। আর ২০০০-০১ সালের দিকে তা প্রায় সাড়ে তিন লাখে গিয়ে দাঁড়ায়। ২০০২-০৪ সালের দিকে এটি বেড়ে হয় প্রায় আট লাখের মতো, আর তা ২০০৪-০৬ সালে এসে দশ লাখ ছাড়িয়ে যায় এবং আজ অবধি বেড়েই চলেছে। বাকি সবকিছু বাদ দিলে কেবল টিকিট বিক্রি থেকেই বার্ষিক আয় পাঁচ কোটি টাকার ওপর।। পুরাবস্তুতেই আমরা প্রত্নতাত্ত্বিকেরা খুঁজে ফিরি অতীতের প্রতিবিম্ব। এই মূক-বধির ইটগুলো, এই পাথরের নির্বাক মূর্তিগুলোই আমাদের সোনালি অতীতের একমাত্র তথ্যপ্রমাণ যা আজ ধ্বংসের পথে।
মহাস্থানগড়ের অতি সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞটি শুরু করা হয় গত বছরের ২৭ নভেম্বর, যার বিরুদ্ধে দেশের ঐতিহ্য সচেতন ব্যক্তিবর্গ তত্ক্ষণাত্ তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করলেও তা সাড়ম্বরে চলতে থাকে। মহাস্থানের প্রত্নস্থানভিত্তিক জাদুঘরের কাস্টডিয়ান নাহিদ সুলতানা স্থানীয় সুধীজন ও সাংবাদিকদের সহায়তায় এর বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নেন এবং প্রতিরোধের চেষ্টা করেও প্রভাবশালী মহলের কারণে বার বার ব্যর্থ হন। একটি কথা প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, অতীত নিদর্শনে ভরপুর মহাস্থানগড়ের যে কোনো স্থানে একটু খনন করলেই সেখানে মূল্যবান প্রত্নসামগ্রীর দেখা মেলে। আর তাতেই উত্সাহিত হয়ে এখানকার অতীত নিদর্শনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানো কোনো নতুন ঘটনা নয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের মাঝামাঝি স্থানীয় শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতায় একটি রাস্তা নির্মাণে বড় টেঙরা ধাপের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করা হয়। ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর এই মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদে হিউম্যান রাইটস ফর পিস ইন বাংলাদেশ এই ধ্বংসযজ্ঞের দ্বারা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দাখিল করে। বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয় ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণে এর অন্তর্ভুক্ত অংশে পুরাকীর্তির ক্ষতিসাধন করে যে কোনো স্থাপত্য নির্মাণ আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এই নির্মাণের নামে ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে দ্রুত রুল জারি করেন। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা, বিভাগীয় কমিশনার আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মদতে হাইকোর্টের রুল ভঙ্গ করে এই এলাকাতে অবৈধভাবে খনন পরিচালনা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি মহাস্থানগড় সংযুক্ত একটি ঢিবি নিতাই ধোপানীর পাটের মাটি সরিয়ে সেখান দিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্দেশ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক অপর একটি কর্মসৃজন প্রকল্প হাতে নেয়া হলে তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা দ্রুত এর প্রতিবাদ জানান। হাইকোর্টের ওই একই বেঞ্চ দশ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তাদের অধিকাংশই সরকারি আমলা, পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাদের ধারণাও সুস্পষ্ট নয়। পাশাপাশি এলাকার প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদতে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর এড়াতে এখন রাতের আঁধারে খনন কাজ চলছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে শ্রমিক লাগিয়ে মাজার উন্নয়ন কমিটির পক্ষে মহাস্থানগড়ের মূল মাজার এলাকায় উঁচু স্থানের ওপর প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ পুণ্ড্র গেট বা ‘পুণ্ড্র নগরীর প্রবেশদ্বার’ এলাকায় ব্যাপক খোঁড়াখুঁড়ির মাধ্যমে এই স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা হয়। খননের সময় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমৃদ্ধ মহাস্থানগড়ের মাটির নিচ থেকে প্রচুর প্রত্ননিদর্শন বের হয়ে এলে সেগুলো গুম করতে নিকটবর্তী একটি স্থানে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়, যেগুলো গত বুধবার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেন। প্রত্যক্ষদর্শী, এলাকবাসী ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, রাত ১২টার পর লোকচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে শ্রমিক লাগিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। তারা সবাই গভীর রাতে শ্রমিকদের কাজ করার প্রমাণ হিসেবে সকালে পুণ্ড্র গেট সংলগ্ন স্থানে বালি বিছানো দেখতে পান। পরে আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে জানা গেছে, সেখানে রাতে শ্রমিকরা খনন কাজ করেছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই স্থানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান নাহিদ সুলতানার অভিমত—‘অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যারা খনন কাজ করেছে তারা প্রথমে চিন্তাই করেনি সেখানে প্রাচীন নিদর্শনাবলি থাকতে পারে। পরে নিদর্শনগুলো বের হয়ে এলে সেগুলো গুম করতে রাতেই সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। প্রচেষ্টা হিসেবে আগেই খুঁড়ে রাখা একটি গর্তের মধ্যে নিদর্শনগুলো ফেলে মাটিচাপা দেয় তারা। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত বুধবার সকালে আলগা নতুন মাটি দেখে সন্দেহ হলে মাটি সরাতে শুরু করেন। তারা মাটি সরিয়ে ব্ল্যাক স্টোন, প্রাচীন স্থাপত্যের অংশ হিসেবে ইট, অমূল্য কিছু টেরাকোটা নিদর্শন ও মূর্তির ভগ্নাংশ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এ ঘটনার পর থেকে অপকর্মের নায়কসহ প্রায় সব কুশীলব এবং মহাস্থান মাজার উন্নয়ন কমিটির নেতারা গা-ঢাকা দিয়েছেন। পাশাপাশি এই ঘটনাটি প্রকাশ না করার জন্য তাদের মাঠকর্মীদেরও বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, বারবার খননের জন্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঠিক করা স্থানটির নিচেই লুকিয়ে থাকতে পারে ইতিহাস-ঐতিহ্যের পুণ্ড্র নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভবন। কারণ মূল মাজার ও মসজিদ সংলগ্ন টিলার মতো উঁচু জমিটি মূল পুণ্ড্র নগরীর অংশ, যেখানে বসবাস করতেন রাজা ও তার অমাত্যবর্গ। ফলে পুণ্ড্র রাজার রাজপ্রাসাদ ও প্রশাসনিক ভবন এখানেই থাকার কথা। জমিটি মাজার কমিটির বলে দাবি করা হলেও সংবিধান অনুযায়ী এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় পড়ে। এখানে ইচ্ছে করলেই কেউ খোঁড়াখুঁড়ি কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবে না। কিন্তু তাদের লোকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে রাতের আঁধারে খোঁড়াখুঁড়িতে প্রাপ্ত অমূল্য প্রত্নসামগ্রী অবলীলায় হাপিস করা হচ্ছে। নাহিদ সুলতানা জানান, তিনি ঘটনাটি দেখার পর এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেও তেমন কোনো ফল পাননি। গত বুধবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, পুণ্ড্র নগরীর নিদর্শনগুলোর একেবারে কেন্দ্রস্থলে হজরত শাহ সুলতান বলখি মাহী সওয়ারের (র-.) মাজারের পশ্চিম পাশে প্রায় ২০০ বর্গফুট এলাকায় খনন কাজ করা হয়। ফরিদপুর জেলার অধিবাসী সোলেমান আলী রাতে খনন কাজ প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি জানান, রাতে যখন খনন করা হয় তখন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বেশকিছু পাথর ও ভাঙা ইটের অংশ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলতেও দেখেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক বলেন, আমরা সব দেখি-শুনি, তারপরও মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না কারণ প্রাণের মায়া প্রত্যেকেরই আছে। গর্ত খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাছে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা আড়াই হাজার বছর আগের নিদর্শনের কোনো দাম নেই, পাশাপাশি অতিরিক্ত মজুরির লোভে তারা মহামূল্যবান এই অতীত নিদর্শনগুলো অবলীলায় ধ্বংস করার কাজে মত্ত হতে পারছে। মহাস্থান মাজার উন্নয়ন কমিটির সদস্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ এই কাজের দায়িত্ব নিজেদের ঘাড়ে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার পর সেখানে খোঁড়াখুঁড়ির কোনো অর্থ হয় না। তবে বাইরের কেউ এই কাজ করতে পারে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে তিনি মুখ খোলেননি। মহাস্থান মাজার কমিটির সভাপতি বগুড়ার জেলা প্রশাসক ইফতেখারুল ইসলামের কাছে স্থানীয় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না। তিনি এটি শনাক্ত করতে শিবগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।
আমরা দেখেছি, ভারতের মৌলবাদী গোষ্ঠী বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির নির্মাণ করেছে। আফগানিস্তানের তালেবান আমলে ধ্বংস করা হয়েছে বামিয়ানের বিশাল বৌদ্ধ প্রতিকৃতিগুলো। আর ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর বাগদাদ জাদুঘরে চালানো হয়েছে লুণ্ঠন। কিন্তু আজ বাগদাদ-বামিয়ান নয়, ভারতের বাবরি মসজিদ নয়—আমাদের বাংলাদেশে এটা কী হচ্ছে? এই প্রশ্ন আমার আপনার সবার। আমাদের প্রশ্ন জাতির বিবেকের কাছে। খোদ সরকারি নির্দেশকেই অমান্য করে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ধৃষ্টতা যারা দেখাচ্ছে, সরকারের উচিত একটিবারের জন্য হলেও প্রমাণ করা—কোনো অন্যায়কারীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আসলে ষণ্ডাতন্ত্র ঐতিহ্যের কথা দূরে থাক, নিজের মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই অপারগ, আপাতত সেখানে বলার কিছু থাকে না। তারপরও এসব প্রভাবশালী মহলের মদতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের ছা-পোষা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি আর হয়রানি করার যে প্রক্রিয়া চলছে; আমরা চাই প্রশাসন এর বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। যার মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যের পাশাপাশি কয়েকজন কর্তব্যনিষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে। আর এই একুশ শতকে বাস করেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লার লালসালু উপন্যাসের বাস্তব রূপায়ণের এই নীল নকশা রুখে দেয়া সম্ভব হবে। এই অপকর্ম রোধে বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা মিললে মহাস্থানগড় হয়তো একটি বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করবে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলাকালীন ভারতের নানা স্থানে প্রদর্শিত বিলবোর্ডগুলোর অধিকাংশই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও প্রত্নকীর্তি সম্পর্কিত। আর এটাকে উদাহরণ হিসেবে নিলে বাংলাদেশের জন্য অন্যতম হবে এই মহাস্থানগড়। তাই দেশে পর্যটন শিল্পের প্রসার, সুস্থধারার নির্মল বিনোদনলাভের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের রাজস্বে সমৃদ্ধি আর পর্যটনকেন্দ্রিক বাণিজ্যের বিকাশে অনেকেই হয়তো মুক্তিলাভের সুযোগ পাবে দারিদ্র্য আর বেকারত্বের অভিশাপ থেকে। আর আমরাও এগিয়ে যেতে পারব এক সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দিকে।
জয়ন্ত সিংহ রায়
সহকারী অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাবি,
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাবি।

পুরাতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ডের মহাপ্রয়াণে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

পুরাতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ডের মহাপ্রয়াণে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

মো. আদনান আরিফ সালিম অর্ণব

প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিজ্ঞাননির্ভর ধারণা প্রতিষ্ঠার প্রবাদপুরুষ প্রক্রিয়াবাদী প্রত্নতত্ত্বের জনক, প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক লুই রবার্টস বিনফোর্ড বিশ্বব্যাপী তাঁর অগণিত শিক্ষার্থী এবং গবেষককে শোক সাগরে ভাসিয়ে গত ১১ এপ্রিল ২০১১ জন্মস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী অঙ্গরাজ্যের কির্কসভিলে চিরবিদায় লাভ করেছেন। ১৯৩১ সালের ২১ নভেম্বর জন্ম নেয়া বিনফোর্ডের মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘ ৫০ বছরের কর্মজীবনে তিনি দেড় শতাধিক গ্রন্থ এবং গবেষণা প্রবন্ধ রচনা ও সম্পাদনা করে গেছেন। আলাস্কার নুমিয়ান্ট এস্কিমোদের ওপর দীর্ঘ গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রত্নতত্ত্বের গবেষণায় নতুন একটি ধারার উন্মোচনে পথ দেখায়। তাঁর সঙ্গে ভারতের পুনার ডেকান কলেজের গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটা ভালো যোগ ছিল। ডেকান কলেজের প্রখ্যাত পুরাতাত্ত্বিক কে. পাদায়ার উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতের একটি ইংরেজি দৈনিক বলেছে,
মৃত্যুকালে তিনি হৃদরোগে ভুগছিলেন। আধুনিক ইউরোপে সামাজিক বিজ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই তাত্ত্বিক ঘরানার নানা মারপ্যাচে উপনিবেশবাদের ভিত্তি মজবুত করতে সচেষ্ট ছিল। সমাজ গবেষণার অন্যতম বিষয় হিসেবে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বাইরে ছিল না বরঞ্চ এটি উপনিবেশবাদী শক্তির ভিত্তিমূলকেই ইস্পাতদৃঢ় করতে কাজ করেছে, যা থেকে তিনিই প্রথম বেরিয়ে আসার পথ দেখান। প্রত্নতত্ত্বের প্রাথমিক দিকে প্রচলিত নীতির কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে আবির্ভাব ঘটেছিল ক্ষণজন্মা গবেষক লুই বিনফোর্ডের। তিনি অতীত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পূর্বতন হঠকারী বস্তুগত উপাদানের উপস্থাপননির্ভর সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার মাধ্যমে অতীত গবেষণার প্রস্তাবনা আনেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারার অতীত চর্চায় প্রকৃত অর্থে ঔপনিবেশিক শক্তি কোনো অঞ্চলে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করার পর উপনিবেশকে বৈধতা দেয়ার জন্য ওই স্থানের সঙ্গে তাদের অতীত সম্পর্ক প্রমাণের ঐতিহাসিক সত্তাকে আগে থেকেই নির্মাণ করে নিত। আর তাকে বাস্তবসম্মত করতে ব্যবহার করত প্রত্নতত্ত্ব বা নৃবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোকে। এখানে তারা ইউরোপীয় দর্শনের দুটি ধারা বিশেষত দৃষ্টবাদ ও প্রত্যক্ষণবাদকে গুরুত্ব দিয়ে অতীত মানুষের সংস্কৃতি সম্পর্কিত বস্তুগত উপাদানকে সরাসরি সাংস্কৃতিক নর্মের উপস্থাপন বলে প্রমাণে সচেষ্ট হলে তখনকার প্রত্নতত্ত্ব চর্চার সঙ্গে পুকুর খোঁড়া বা কবর খুঁড়ে মাটি তোলার বিশেষ পার্থক্য ছিল না। তখনই লুই বিনফোর্ড তার সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ধারণা নিয়ে অনেকটা ধূমকেতুর মতোই আবির্ভূত হন। তিনি পূর্বের এসব বিষয়কে নাকচ করে দিয়ে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার কথা বলেন যেখানে পরিবেশের ভূমিকাও অনেক গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। ফলে মাটি খোঁড়া আর প্রয়োজনীয় বস্তুর আলোকে ইচ্ছামতো তৈরি করা ইতিহাস রচনার মাধ্যমে কোনো জনগোষ্ঠীর অতীতকে খেলো করার পথে অনেকটা কাঁটা বিছিয়ে দিয়ে ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের চক্ষুশূল হন বিনফোর্ড। তাঁরা বিনফোর্ডের প্রবর্তিত ঘরানাকে অনেকটা হাস্যকর প্রতিপন্ন করে নব্যধারার প্রত্নচর্চা বলে নামকরণ করে। কিন্তু বহুলাংশে বস্তুনিষ্ঠতা আর বাস্তবতার যোগ থাকাতে বিনফোর্ডের প্রবর্তিত অতীত গবেষণা পদ্ধতি ধীরে উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আর আজও তা আমেরিকার মতো দেশে অন্যতম দাপুটে একটি রীতি হিসেবে গবেষক মহলে সমাদৃত। নতুন প্রজন্মের ইতিহাস ঐতিহ্য ও নৃবিজ্ঞানের গবেষকদের কাছে বিনফোর্ড একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।
Archaeology Of Humankind 
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব 
শিক্ষাথী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাবি
aurnabmaas@gmail.com

কালজয়ী পুরাতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ড


কালজয়ী পুরাতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ড
আদনান আরিফ সালিম
লুই বিনফোর্ড
অমোঘ নিয়তির কাছে নতি স্বীকার করে প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্তি্বক গবেষক লুই রবার্টস বিনফোর্ড নিজ জন্মস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের কির্কসভিলে ১১ এপ্রিল ২০১১ তার কর্মময় জীবনের ইতি টেনেছেন। ১৯৬০ সালের দিকে সামাজিক বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞানের গবেষণাতে সরাসরি বিজ্ঞানের বিধির ব্যবহার করে এক বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন লুই বিনফোর্ড। দীর্ঘ ৫০ বছরের বৈচিত্র্যময় কর্মজীবনে তার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ আর গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। আলাস্কার নুমিয়ান্ট এস্কিমোদের ওপর দীর্ঘ গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতায় তিনি প্রত্নতাত্তি্বক তত্ত্ব ও অনুশীলনে নতুন একটি ধারা উন্মোচনের পথ খুঁজে পান, যা তাকে গবেষণার পরিসরে কিংবদন্তির আসন করে দেয়। তার সঙ্গে ভারতের পুনার ডেকান কলেজের গবেষক ও প্রত্নতাত্তি্বকদের একটা ভালো যোগ ছিল। সমাজ গবেষণার অন্যতম বিষয় হিসেবে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বাইরে ছিল না

বরং এটি উপনিবেশবাদী শক্তির ভিত্তিমূলকেই ইস্পাত দৃঢ় করতে কাজ করেছে, যা থেকে তিনিই প্রথম বেরিয়ে আসার পথ দেখান। প্রত্নতত্ত্বের প্রাথমিক দিকে প্রচলিত নীতির কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে আবির্ভাব ঘটেছিল ক্ষণজন্মা গবেষক লুই বিনফোর্ডের। তিনি অতীত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বস্তুগত উপাদানের উপস্থাপননির্ভর সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার মাধ্যমে অতীত গবেষণার প্রস্তাবনা আনেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারায় অতীত চর্চার ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে ঔপনিবেশিক শক্তি কোনো অঞ্চলে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করার পর উপনিবেশকে বৈধতার জন্য ওই স্থানের সঙ্গে তাদের অতীত সম্পর্ক প্রমাণের ঐতিহাসিক সত্তাকে আগে থেকেই নির্মাণ করে নিতেন। আর তাকে বাস্তবসম্মত করতে ব্যবহার করতেন প্রত্নতত্ত্ব বা নৃবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো। এখানে তারা ইউরোপীয় দর্শনের দুটি ধারা বিশেষত দৃষ্টিবাদ ও প্রত্যক্ষণবাদকে গুরুত্ব দিয়ে ইতিহাস নির্মাণে অন্ধের যষ্ঠির মতো অতীত মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট বস্তুগত উপাদানকে এক এবং একমাত্র পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। তাদের কর্মকাণ্ডে বাদ সাধেন বিনফোর্ড, তিনি আগের এসব বিষয়কে নাকচ করে দিয়ে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার কথা বলেন, যেখানে পরিবেশের ভূমিকাও অনেক গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। ফলে পুকুর কাটা বা কবর খোঁড়ার গর্ত করা আর প্রয়োজনীয় বস্তুর আলোকে ইচ্ছামতো তৈরি করা ইতিহাস রচনার মাধ্যমে কোনো জনগোষ্ঠীর অতীতকে খেলো করার পথে অনেকটা কাঁটা বিছিয়ে দিয়ে ইউরোপীয় প্রত্নতাত্তি্বকদের চক্ষুশূল হন বিনফোর্ড। তারা বিনফোর্ডের প্রবর্তিত ঘরানাকে অনেকটা হাস্যকর প্রতিপন্ন করে নব্য ধারার প্রত্নচর্চা বলে নামকরণ করে। নতুন প্রজন্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নৃবিজ্ঞানের গবেষকদের কাছে বিনফোর্ড একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত।
লেখক: মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থী প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,
aurnabmaas@gmail.com

প্রত্নতাত্বিক চিন্তাকাঠামোতে লুই বিনফোর্ডের তাত্ত্বিক ঘরানার প্রভাব

সনাতনী ধারার সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারাকে অনেকটা চ্যালেঞ্চ করেই ১৯৬০ সালের দিকে লুই বিনফোর্ড প্রত্নতাত্বিক চিন্তাকাঠামোতে একটি নতুন দিশার সন্ধান দেন। অতীত সংস্কৃতির ব্যাখ্যাতে সরাসরি বিজ্ঞানের ধারণার ব্যবহারের সাথে সাথে নর্মের বদলে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দাঁড় করানোর কৃতিত্ব লুই বিনফোর্ডের। নর্মের মাধ্যমে সংস্কৃতির প্রকৃত চালচিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে নানাবিদ সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষিতে বিনফোর্ডের চিন্তাধারা প্রত্নতাত্বিকদের নতুন করে ভাববার পথ করে দেয়। বিনফোর্ড প্রবর্তিত অতীয় সংস্কৃতির ব্যাখ্যাদানের এই পদ্ধতি ইউরোপীয় প্রত্নতাত্বিকদের প্রভাবে পরিচিত হয় নব্য প্রত্নতত্ত্ব হিসেবে।
প্রচলিত সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ঘরানার প্রত্নতত্ত্ব চর্চার তাত্ত্বিক কাঠামোগত ত্র“টি আর প্রাপ্ত গবেষণা ফলাফলে যুক্তিগত দিকের দুর্বলতা, বিজ্ঞান থেকে দূরত্ব, ফ্যাক্ট ও ফিকশনের দুরত্বের বিচার চিন্তাজাগতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিনফোর্ডের চিন্তাধারাকে বিকশিত হওয়ার পথ করে দেয়। প্রখ্যাত প্রত্নতাত্বিক কে রাজন এর মতে বিনফোর্ডের ধারণার উপর নির্ভরশীল প্রত্নতাত্বিকরা সংস্কৃতির কয়েকটি মানদন্ডনির্ভর পর্যবেক্ষনের বদলে একটি সংস্কৃতির লালনকারী সমাজের অভ্যন্তরস্থ কার্যক্রম বা গতিশীলতাকে বোঝার চেষ্টা করে থাকেন। এখানে বিজ্ঞাননির্ভর অসুসন্ধান বিশেষভাবে লক্ষনীয়। পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন সংস্কৃতিক প্রপঞ্চ সংঘটিত হওয়ার পেছনে বিদ্যমান কারণ সমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টাও করা হয়। একটি নির্দিষ্ট চলক কিভাবে পুরো কালচারাল সিস্টেম বা সংস্কৃতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে এই তাত্ত্বিক ঘরাণার আলোকে কৃত গবেষণাতে তা স্পষ্টত ফুটে ওঠে। এখানে কালচারার ট্রাজিক্ট্রি বা সংস্কৃতির সাংগঠনিক শাখা প্রশাখা সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করা হয়।
বিনফোর্ডের ঘরানার অন্যতম প্রতœতাত্বিক ডেভিড ক্লার্ক সায়েন্স তাঁর বিখ্যাত গবেষণা অভিসন্দর্ভ এনালিটিক্যাল আর্কিওলজিতে বলেছেন ‘‘ প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মাত্র সঠিক প্রশ্নোত্ত্বর প্রদান করার চাইতে অনেক সহজ কাজ বেশ কিছু প্রশ্নকরা । এই সকল প্রশ্ন করার মাধ্যমে যে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়ে ওঠে তাই প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাকে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ, পরিশীলিত, তথ্যনির্ভর, যৌক্তিক ও অর্থবহ করে তোলে। বিনফোর্ডের ঘরানার অন্যতম প্রত্নতাত্বিক জোসেফ ক্যালওয়েল সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত  তাঁর বিখ্যাত গবেষণা প্রবন্ধ দ্য নিউ আমেরিকান আর্কিওলজিতে বলেছেন ‘‘সংস্কৃতিকে একটি ব্যবস্থাহিসেবে দেখতে গেলে অবশ্যই এর অন্তর্গত বিভিন্ন বিষয় বিশেষত পারিবেশিক নিয়ামক, বাস্তুসংস্থান, ও বসতিবিন্যাসের মতো বিষয়কে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে’’। অর্থাৎ আমরা একটি বিষয় স্পষ্টত লক্ষ্য করি যে বিনফোর্ডের প্রভাবে প্রতœতত্ত্বের তাত্বিক ঘরানাতে আমূল একটি পরিবর্তন সাধিত হয়। এ সময়ে প্রতœতাত্ত্বিক সংস্কৃতিকে কোন বিশেষ মানদন্ডের আলোকে গুচ্ছাকারে বর্ণনা না করে প্রতিটি প্রত্নবস্তুকে একটি পৃথক উপাদান হিসেবে বর্ণনার আওতায় আনা হয় যার এক একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতিগত ও অবস্থানগত নির্দিষ্ট প্রত্যয় চিহ্নিত করা সম্ভব। কারণ কোন নির্দিষ্ট নমুনায়িত উপাত্তের আলোকে কোন ঘটনাকে সাধারণীকরণ করে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি সারসত্তায়িত প্রত্যয় আরোপিত হলে এই বর্ণণা সর্বদাই পক্ষপাতদুষ্ট ও ভ্রমাত্মক  হতে পারে। কারণ সংস্কৃতির অন্তস্থ প্রতিটি চলকের একটি স্বতন্ত্র কর্মভূমিকা রয়েছে যা স্ব-স্ব স্থানিক কালিক ও বৈষয়িক মানদন্ডে বিশেষ গুরুত্ববহ। জোসেফ ক্যালওয়েল তার এই প্রবন্ধে আরো বলার চেষ্টা করেছেন।
অন্যদিকে প্রতœতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমাণ ও ঐতিহাসিক  কল্পকাহিনীকে পাশাপাশি দাড় করিয়ে  ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীর সাথে বিজ্ঞানের বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে  অনেকটা বিজ্ঞাননির্ভর আলোচনা ও ফিকশনের বৈপরীত্যের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে লুই বিনফোর্ডের ঘরাণার প্রত্নতত্ত্ব চর্চায়।  প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাস কিভাবে একটি স্বীকৃত মহাবয়ানে প্রভাবদুষ্ট হয়ে  ননর্থক অব্যয় হিসেবে পরিগণিত হতে পারে কিংবা একটি রেপ্রিজেন্টেশনের বাস্তবতায় দিবালোকে মতো স্পষ্ট হয়ে চোখে দৃশ্যমান হতে পারে বিনফোর্ডের ধারণার পূর্বে এসকল চিন্তাধারা অনেকটাই অন্ধকারে ছিল।  কোন কোন ঐতিহ্যের আখ্যান বর্ণণার বাস্তবতায়  যথার্থ, তথাকথিত আধুনিক এবং সঠিক বা যৌক্তিক , আর কোন কোনটি ভিন্নার্থ জ্ঞাপক  তা নির্ধারণকারী মানদন্ড সম্পর্কে প্রতœতাত্বিকরা একটি ধারণা অস্পষ্টভাবে হলেও বিনফোর্ডে ধারণাতে আছে।  প্রত্নতাত্বিক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক ঘরানা ও যুক্তিপ্রমানের ভিত্তিতে যা সত্য বলে পরিগণিত হয়ে ওঠে তা হচ্ছে ‘‘বস্তুগত নিদর্শন বা সাক্ষ্য যা আপাত দৃষ্টিতে অবজেকটিভলি ব্যাখ্যা করা সম্ভব বলে মনে করা হলেও লুই বিনফোর্ড এই ধারণাকে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন। বিনফোর্ড বিজ্ঞাননির্ভর পরীক্ষনের বাস্তবতায় প্রাপ্ত ইতিহাসের প্রমানকে ফ্যাক্ট বলার পক্ষপাতী হলেও একটা বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায় ‘‘ পূর্ণ সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গবেষক অধিপতিশীল রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত মতাদর্শ ও ক্রিয়াশীল অসম ক্ষমতাসম্পর্কের বাইরে কখনই যেতে পারেন না তিনি অবচেতনভাবে হলেও পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মতাদর্শ বা জ্ঞানের সীমানার বাইরে থেকে আলামত হিসাবে এই ফ্যাক্টসমূহ বিশ্লেষণ করে অতীত সম্পর্কে বিভিন্ন উপাত্ত ও তথ্য হাজির করেন বা করতে পারেন যা অনেকটা কোন প্রতœতাত্ত্বিক আলামতের ভ্রমাত্বক বা অতিরঞ্জিত দৃশ্যায়নে তাকে একরকম বাধ্যই করে। সুতরাং প্রতœাতাত্ত্বিক আলামাতের আলোকে বাস্তবতা বা ফ্যাক্ট কে  নৈব্যাক্তিক এবং সর্বজনীন; স্বাধীন ও সার্বভৌম বলে মনে করার পথ থাকছে না। তবে একটা বিষয় স্বীকার করতেই হবে  আলামতের বিশ্লেষণের সময় আমরা যেটাকে  ফ্যাক্ট হিসেবে মনে করি বা করতে বাধ্য থাকি তা  নিজে একটি স্বশাসিত সত্তা নিয়ে বিরাজ করে যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। লুই বিনফোর্ড এর ঘরাণার তাত্ত্বিকদের চিন্তাধারায়  ফিকশন হলো কাল্পনিক, বাস্তবতা বিবর্জিত অথবা বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হলেও তা এককথায়  বাস্তবতার বিকৃতি ভিন্ন কিছু নয়।
বিনফোর্ড এর ঘরানায় এই সকল কাহিনী উপাখ্যান  অর্থ্যাৎ মিথ লিজেন্ড প্রভৃতিকে মানুষের কল্পনাপ্রসূত অবচেতন মনের এক কাকতালীয়  নির্মাণ বলে মনে করা হয়। তবে একটি বিষয় লক্ষনীয় যে মিথের কাঠামোতে যেমন এক অতিলোকিক বা মেটাফিজিক্যাল কুশীলবের আবির্ভাব বা অবতারণা করা হয় কাকতালীয়ভাবে তারাই ঘটনা-ইতিহাসের নিয়ন্তা অথবা প্রভাবক। তবে কালিকতার পরিসরে আমরা কখনই একটি কথা বলতে পারবো না বা নির্দিষ্ট মানদন্ডে সাধারনীকৃত করতে পারবো না কোন সাংস্কৃতিক ট্রেইটস বা প্রপঞ্চ বা তথাকথিত নর্ম আধুনিক রৈখিকতা অনুসরণ করে না, অর্থাৎ তা  যেমন আধুনিক ও সেক্যুলার পরম্পরা কিংবা কার্য-কারণ সম্পর্ক মেনে চলে বাস্তবতার বিচারে তেমনটি হয়ে ওঠেনা । লূই বিনফোর্ড এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের পথ হিসেবে  উভয়ের সীমানা ও সংজ্ঞা নির্ধারণ করে পরস্পরের সঙ্গে তুলনামূলক ও বৈপরীত্যমূলক সম্পর্ক নির্ধারণেই থেকে থাকার ঘোর বিরোধী।
সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারাতে মনে করা হতো অতীত সংস্কৃতি আার কিছুই না কিছু নর্মের সমস্টি যার দিবালোকের মতো প্রতিফলন ঘটে ঐ সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদানে। কিন্তু অনেকটা হাস্যকর হলেও সত্য এখানে বোঝার কোন চেষ্টা করা হয়নি কোন সংস্কৃতির সকল বস্তুগত উপাদান কখনই অক্ষত অবস্থায় প্রতœতাত্ত্বিকের হাতে এসে পৌছানো সম্ভব নয় ফলে যে একটা কালানুক্রমিক শূণ্যতা সৃষ্টি হয় তা ইতিহাসের বাইরেই থেকে যায়। আর তাদের প্রচলিত ধারণাতে   প্রতœতত্ত্ব যে ইতিহাস পুণর্গঠন করে সেই ইতিহাস যেহেতু বস্তু নির্ভর আর বস্তুকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা ফ্যাক্ট হিসেবে তুলনা করা হয় বলে প্রতœতাত্ত্বিক বয়ান, আখ্যান বা ডিসকোর্স প্রশ্নাতীতভাবে ফ্যাক্ট হিসেবে বা বাস্তব হিসেবে পরিগণিত হবে বিধায় প্রতœতাত্ত্বিক আলামতের ভিত্তিতে নির্মিত প্রদর্শিত বা দৃশ্যায়িত বয়ানকেই ইতিহাসের বাস্তবতা বলে মেনে নেয়া ভিন্ন দ্বিতীয় কোন পথ থাকছে না। অন্যদিকে বাস্তবতার নিরীখে গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষন করলে বিনফোর্ডের ঘরাণার প্রতœতত্ত্ব চর্চাকে অল্পদিনেই একটি  দাপুটে জ্ঞান ও অনুশীলনের মাধ্যম হিসেবে আমেরিকা ও ল্যটিন আমেরিকার মতো দেশগুলোতেক প্রতিষ্ঠা পেতে দেখি যদিও তার বিবরণ-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সত্যতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলেও সত্য এই তর্ক-বিতর্ককে অবশ্যই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমান নির্ভর বৈকি বিজ্ঞান নির্ভর অর্থাৎ ঘুরে ফিরে ওই একই বস্তুর উপর নির্ভর করতে হয়।
বিনফোর্ডের চিন্তাধারা তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে বস্তুর বিশ্লেষনে বিজ্ঞাননির্ভর একটি পদ্ধতি প্রচলন করেন যা খুব দ্রুত একটি দাপুটে ও আধিপত্যশীল ঘরানায় রূপান্তরিত হয়ে উঠে। তবে এখানে একটা বিষয় সুস্পষ্ট ছিলনা  ‘বস্তুগত উপাদানের বিজ্ঞাননির্ভর বিশ্লেষণই পারে  নিরপেক্ষভাবে ও অধিপতিশীল দাপুটে অনুশীলন ও ক্ষমতার প্রভাব মুক্ত  শর্তসমূহর বাইরে থেকে অতীত সম্পর্কে সত্য ইতিহাস উৎপাদন করতে যা অনেকাংশে সঠিক নয়।
হালের প্রতœতাত্ত্বিকরা বিনফোর্ডের প্রবর্তিত এই সকল ধারণার সাথে যে সকল বিষয়ে তর্কের অবতারণা করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাস্তবাতা ও অতিকথনের বা কল্পকাহিনীল ভেদরেখাকে যেভাবে প্রচলিত ডিসকোর্সসমূহে বিবেচনা করা হয় সেটাও বিভিন্ন অবস্থা ও চলকের সাপেক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। বাস্তবতার এই বিচারে প্রমানিত এই তথাকথিত সত্য কোন কোন ক্ষেত্রে অবাস্তব হয়ে উঠতে পারে আবার এই অতিকথন, কল্পকাহিনী বা  ফিকশন কখনো কখনো  সত্যতার দিক থেকে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারে। প্রতœতত্ত্ব চর্চার ইতিহাসের খেরোখাতায় নজর দিলে আমরা দেখি প্রতœতত্ত্ব, প্রচলিত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত আধিপত্যশীল দাপুটে আখ্যান বা ডিসকোর্সগুলোতে অতীতের ফ্যাক্টনির্ভর যে-সব আখ্যান বা বয়ান চালু আছে সে-গুলো ফিকশনের সঙ্গে সতত অংশীদারিত্বমূলক কোন কোন ক্ষেত্রে আমারা দেখি এগুলো একে অন্যের পরিপূরক। তবে একটি বিষয় স্পষ্টত প্রতীয়মান যে  ইতিহাস, প্রতœতাত্ত্বিক ও নৃবৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে উপনিবেশ কালীন ও উপনিবেশ উত্তরকালে আধুনিকীকরণ প্রকল্প ও তথাকথিত সেক্যুলারকরণের ইতিহাসের সঙ্গে উপনিবেশকালীন ও পরবর্তী জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের আকাঙ্খাগুলোর একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

পশ্চিমা দৃষ্টবাদী ও প্রত্যক্ষণবাদী চিন্তার প্রভাবে ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে রচনা করা যায় এমন বিবেচনা করার অনুশীলন থেকে উদ্ভূত  ফ্যাকট ও ফিকশনের ধারণায়নের  মাধ্যমে ইতিহাস ঐতিহ্যের  বিনির্মান কিভাবে  বাস্তবতা বিবর্জিত ও অলীক হয়ে ওঠে তা লুই বিনফোর্ডের চিন্তাধারাতে ততটা প্রবলভাবে প্রতিফলিত না হলেও অন্তত বিজ্ঞানের গুরুত্বপ্রদান করার হেতু বস্তুর পাশাপাশি যুক্তিবাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে । ফলে তা পূর্বের ন্যায় কাঠখোট্টা নিরস বস্তুর বিবরণের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকেনি বরঞ্চ কলেবলে বৃদ্দি পেয়েছে।  তবে এর একটি গুরুতর দিক এই যে এখানে বস্তুগত নিদর্শনের সাথে বিজ্ঞানের ধারণার সংযোগেমনে করা হয় যে ইতিহাসের বিবরণেও একনিষ্ঠ সত্যের প্রতিফলন সম্ভব যা পরবর্তিকালের চিন্তকদের কাছে কঠো সমালোচনার স্বীকার হয়। সাম্প্রতিক বিশ্বের কিছু স্থানে প্রতœতাত্ত্বিক আলামতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা দেখে অনেকটাই হতাশ হতে হয়। উদাহরণ হিসেবে নুহ আঃ এর নৌকা আবিষ্কার, ইহুদীবাদীদের হাতে সলোমন  টেম্পল বা টেম্পল মাউণ্ড দখলের ঐতিহাসিক বৈধতা প্রদান, ভারতে চরমপন্থি মৌলবাদীদের হাতে বাবরী মসজিদ এর ধ্বংস অনেককেই হতাশ করেছে। এর মাধ্যমে একটা বিষয় স্পষ্টত ফুটে উঠেছে বৈজ্ঞানিক ইতিহাস যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় তার ফলাফল কতটা মারাত্বক হয়ে ওঠে। আর ধর্মের বানিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই প্রতœতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক অনুজ্ঞা বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হলে তার পরিণাম কতটা অজ্ঞাতকুলশীল আর ক্ষতিকর হবে তা বোধকরি সাধারণ বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষই জানতে পারবেন। যার ফলে বিনফোর্ড প্রবর্তিত এই বিজ্ঞান নির্ভর প্রতœতত্ত্বচর্চাও অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে এই বিচারে যে  অ-বিকৃত বা বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয় তা যেকোন আঙ্গিক হতে পক্ষপাতদুষ্টতা মুক্ত থাকতে পারেনা। এক্ষেত্রে অনেকে বিনফোর্ডকে চ্যালেঞ্চ করে যদি বলতে চান বিজ্ঞানের ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট ইতিহাস যখন পাওয়অ যায়না  তবে বিনফোর্ডের পদ্ধতির নতুনত্ব বা বিশেষত্ব কোথায়। আসলে বিনফোর্ড যে বিজ্ঞান নির্ভর একটি  সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন তা প্রত্যক্ষণবাদী চিন্তাকাঠামো অনুসরণ করে অতীতের নৈর্ব্যক্তিক, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পুনর্গঠন সম্ভব না হলেও ইতিহাসের খেরোখাতায় একটি নতুন পাতার আবির্ভাব ঘটাতে সক্ষম ছিল এটা নিদ্বিধায় বলা যায়।
প্রচলিত  ইতিহাস ও প্রতœতত্ত্ব কালনির্দেশকরণ ছাড়া কোন কালেই তার অভীষ্ট লক্ষে গমন করতে পারেনা। শাস্ত্র হিসাবে ইতিহাস ও প্রতœতত্ত্বে এই সময়কাল বা কালিকতার প্রশ্নটি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এখানে বিজ্ঞানের ধারণার প্রয়োগ এর ফলে অনেক আজগুবি ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রমাদ গোনার প্রহরের যে একরকম শেষ হয়েছে তা নিদ্বিধায় বলা যায়। সময়কালের নির্দেশ ছাড়া প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাসকে অস্বাভাবিক বলে মনে করার বাস্তবতায় লুই বিনফোর্ড প্রদত্ত ঘরানার বিজ্ঞান নির্ভর কালনিরুপণ পদ্ধতিগুলো অনেক সহায়ক হয়েীছিল এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যদিও তার পরম অবস্থান নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। অনেকটা বিনফোর্ডের বিজ্ঞান নির্ভর কাঠামোকে অনুসরণ করেই আধুনিক কালিকতা বা সময়ের ধারণাকে নির্দেশ করা হয় একটি রৈখিক কাঠামো অনুসরণ করে যেখানে সময়কে ‘সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া’, বিমূর্ত, সংখ্যার মাধ্যমে মাপনযোগ্য ও প্রকাশযোগ্য ও নির্গুণ একটি সেক্যুলার প্রপঞ্চ হিসাবে মনে করা হয় যা আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ মনে হলেও অনেকাংশে সাধারণীকৃত। বিনফোর্ড প্রবর্তিত  এই আধুনিক ইতিহাসের ধারণার আরেকটি সারবত্তাগত বৈশিষ্ট্য হলো ‘‘ ইতিহাস নির্মাণ’’ যা একে অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই পারে।     ফলে ‘অতীত’ সম্পর্কিত আখ্যান হয়েও ইতিহাস হয়ে ওঠে ‘বর্তমানকে’ ‘সচেতন সক্রিয়তার’ মাধ্যমে পরিবর্তন করে ‘ভবিষ্যতকে’ পূর্বাভাসযোগ্য মনে করার পরিসর যেখানে ব্যক্তির চিন্তাকাঠামো আর রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই এককথায় বলতে গেলে বিনফোর্ডের এই বিজ্ঞাননির্ভর ইতিহাসের এই আধুনিক অবস্থানকে সিনথেসিস বা সংশ্লেষ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে যা বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে যেমন গুর“ত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তেমনি নতুন নতুন জাতি-রাষ্ট্রের শর্তাধীনে এই জ্ঞানই জাতি-রাষ্ট্রের এবং দাপুটে ডিসকোর্সের অবিভাজ্যতা ও আধিপত্যকে শক্তিশালী করে তুলেছে। যার স্পস্ট উদাহরণ হিসেবে আমরা ভারতবর্ষ বা আফ্রিকার উপনিবেশ উত্তরকালের প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাস চর্চার কথা বলতে পারি। অথাৎ ইতিহাসের প্রাচীনত্বের প্রতি লালসা কিংবা একটি স্বর্ণযুগের ধারণা ইতিহাসকে চরম মাত্রায় বিকৃত না করুক বিতর্কিত করে তা আর বলার অবকাশ রাখে না।
তবে প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাসের গবেষণাতে মানুষের সংস্কৃতি ও পরিবেশের মধ্যবর্তী সম্পর্ক অনুধাবনের চেষ।টা প্রথমত লুই বিনফোর্ডের হাত ধরেই চালু হয়। সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অনুধাবনের জন্য এ সকল আন্তঃসম্পর্ক বোঝা বিনফোর্ড পরবর্তিকালের চিন্তকদের কাছে অনেকটাই জরুরী হয়ে উঠতে দেখা যায়। অতীতের আদর্শগত ও প্রতীকী বিষয় বাদে এই সকল বিষয় পর্যবেক্ষন ব্যাখ্যা ও বিশ্নেষণে লুই বিনফোর্ডের ধারণা অনেক বেশি গুরুত্ববহ হয়ে ওঠার অবকাশ পায়। এখানে বহুল আলোচিত পরবর্তিকালে পশ্চিমা জ্ঞানাতাত্ত্বিক কাঠামোতে অনেক বেশি দাপুটে হয়ে ওঠা          চিন্তাকাঠামো  হিসেবে আমরা সিস্টেম থিররির কথা বলতে পারি। এই সিস্টেম থিওরীর অধীনে একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে একটি ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন মানুষের আচরণ, জীবনধারা, প্রচলিত প্রথা ও অনুশাসন প্রভৃতির পেছনে বিদ্যমান কারনগুলোর ব্যাখ্যাদান অনেক বেশি সহজ হয় । এখানে প্রকৃত অর্থে সংস্কৃতিকে একটি উন্মুক্ত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় যেখানে বাইরের বিভিন্ন প্রভাব ও প্রেরণা জড়িত থাকবে।  এই সকল বিষয় বিবেচনা করে লুই বিনফোর্ড সংস্কৃতির তিনটি উপব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।
    সামাজিক সংগঠন সংশ্লিষ্ট
     বিজ্ঞান প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট
    প্রথা ও আদর্শ সংশ্লিষ্ট
আমরা বিষয়গুলোর আবর্তনের প্রেক্ষিতে প্রতœবস্তুর প্রচলিত আঙ্গিকে বহুল ব্যবহৃত আর্টিফ্যাক্টের সাথে যোগ হতে দেখি টেকনোফ্যাকট, সোসিও ফ্যাকট, আইডিও ফ্যাকট, জিও ফ্যাকট, ইকো ফ্যাক্ট সহ নানাবিধ বিষয়। বৈষয়িক এই পরিবর্তন প্রতœতত্ত্ব চর্চার তাত্ত্বিক ঘরাণাকে পরোক্ষভাবে বেশ খানিকটা প্রভাবিত করেছিল।
পাশাপাশি লুই বিনফোর্ড বিভিন্ন প্রতœতাত্ত্বিক প্রেক্ষিত হতে প্রাপ্ত প্রতœতাত্ত্বিক উপাত্ত ও তথ্যের বিণ্যাস ও কার্যকারন সম্পর্ক নিয়ে  বেশি আগ্রহী ছিলেন। যার ফলে অতীত পরিবেশ সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরী হয়। প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাতে যুক্ত হয় ভূ-তত্ত্ব, প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান,পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ভূগোল প্রভৃতি বিষয়।
আর সেই সাথে নৃবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দিক প্রতœতাত্ত্বিক উপাত্ত্বের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্বলাভের এক পর্যায়ে আমরা অনেকটাই নৃবিজ্ঞান এর তত্ত্ব নির্ভর জাতি প্রতœ তত্ত্বকে প্রতœতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাদানের বিশেষ পথ হিসেবে গৃহীত হতে দেখা যায়। আর সমরূপতার তত্ত্বেরউপর নির্ভব করে এই একই সাথে প্রচলন করা হয় পরীক্ষামূলক প্রতœতত্ত্বকে। সুতরাং বিনফোর্ডের চিন্তাধারা প্রতœতাত্কি গবেষণার ক্ষেত্রে শুধু একটি প্রভাব বিস্তার করেনি বরঞ্চ এটি প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাকে একটি নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে।
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
Archaeology Of Humankind

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ


আদনান আরিফ সালিম
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া বেনাপোল থেকে তামাবিল_ এই ছোট্ট ভূখণ্ডের অতীত যে কত সমৃদ্ধ তা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিকল্প নেই

গত ৩০ মে দৈনিক সমকালের উপসম্পাদকীয়তে আবু সাঈদ খানের ‘পুরাকীর্তি ধ্বংসের প্রক্রিয়া রুখতে হবে’ শিরোনামে লেখাটি পড়লাম। তিনি যতটা না পুরাতাত্তি্বক দৃষ্টিকোণ থেকে, তার থেকে অনেক বেশি স্বাধীন বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের পুরাতাত্তি্বক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতামূলক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এ অর্থে তিনি অবশ্যই একান্ত কৃতজ্ঞতা ও সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার।
আবু সাঈদ খান বলতে চেয়েছেন, নতুন প্রজন্মকে অতীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে আমাদের সভ্যতা ও ঐতিহ্যের আবিষ্কার এবং সংরক্ষণে আজ ব্যাপক উদ্যোগ প্রয়োজন। আমি তার সঙ্গে এ ব্যাপারে পুরোপুরি ঐকমত্য পোষণ করে বিনয়ের সঙ্গে আরও কিছু বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আমাদের দেশের প্রচলিত পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইনটি দুর্বলতার কারণে বর্তমানে একটি অকার্যকর আইনে পরিণত হয়েছে। এখানে কিছু বিধিনিষেধ প্রকৃত অর্থে আইনের ফাঁকে পুরাকীর্তির ধ্বংসকেই বৈধতা দিয়েছে। অন্যদিকে জনসচেতনতার অভাব, ধর্মীয় গোঁড়ামি ইত্যাদি দেশের প্রত্নতাত্তি্বক ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একটি গোষ্ঠী হজরত শাহ সুলতান মাহী সওয়ারের মাজারকেন্দ্রিক লালসালু আখ্যানের বাস্তব রূপায়ণে মহাস্থানগড়ের বিরল প্রত্ননিদর্শন একের পর এক বিনষ্ট করে যাচ্ছে। পাহাড়পুরের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শন এখন গোচারণভূমি। গুপ্ত যুগের নিদর্শন ভরত ভায়নাতেও একই হারে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। ময়নামতির শালবন বিহারের প্রত্নস্থলের ভেতরে এখন সিনেমার শুটিং হয়। একদিন লালবাগ কেল্লায় গিয়ে মহাসমারোহে প্রত্নস্থানের মধ্যেই শুটিং হতে দেখলাম।
আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে, আমরা নিজেরাই আমাদের ঐতিহ্যের রূপকার। আর ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট হয়, আমাদের সংস্কৃতি কোনো বহিঃশক্তির কাছে প্রাপ্ত বা ধার করা নয়, নিজেদের সৃষ্টি। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে নিদর্শনগুলো আবিষ্কৃত হওয়ার পর আজ আর কোনো সংশয় নেই যে, যিশুর জন্মেরও বহুদিন আগে বাংলায় আমাদের পূর্বপুরুষরা সভ্যতার আলোকবর্তিকা প্রজ্বলনে সক্ষম হয়েছিলেন। কালের পরিক্রমায় ক্রমাগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এসেছে আজকের বাংলাদেশিদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি কখনও কখনও বিভিন্ন অপশক্তির করাল গ্রাসে তার ঔজ্জ্বল্য হারালেও একেবারে দীপ্তিহীন হয়ে যায়নি।
আমাদের নিজেদের অতীত সম্পর্কে আমরা যদি জানতে চেষ্টা করি, যদি গণসচেতনতা তৈরি করা সম্ভব হয় তবেই আমাদের হাজার বছরের এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারব। তবে প্রভাবশালী মহল, শিক্ষিত স্বার্থান্বেষী মহলের পাশাপাশি কিছু ব্যক্তির স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্রই যখন পুরাকীর্তি ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, পরিস্থিতি তখন সত্যিই তা এক ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করে। আবু সাঈদ খান তার প্রবন্ধে ময়নামতির পুরাকীর্তি ধ্বংস করে সেই ইট খুলে সরকারি ভবন নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা হরহামেশাই ঘটছে। সাম্প্রতিক কিছু মর্মান্তিক বিষয় হচ্ছে বগুড়ায় জেলা প্রশাসক কর্তৃক মোগল মসজিদ সম্প্রসারণ, বাগেরহাটে খানজাহান আলীর মাজার ঘেঁষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্ত্রীর কবর তৈরি, স্থানীয় সাংসদ কর্তৃক খানজাহান আলী মাজারসংলগ্ন পুকুরটি আধুনিক টাইলস দিয়ে মোড়ানো, মহাস্থানগড়ের পুরাকীর্তি ধ্বংস করে সেখানে মাজার সম্প্রসারণ, জৈন্তাপুরের মেগালিথিক সমাধির পাথর নিয়ে গিয়ে খাসিয়া পল্লীতে বাড়ির সিঁড়ি তৈরি, ভরত ভায়নায় ইট চুরি, ময়নামতিতে ইট চুরি, প্রত্নস্থানে নাটক-সিনেমার শুটিং করা প্রভৃতি। পুরাকীর্তি সংস্কারের নামে যখন ধ্বংসলীলা চালানো হয় তার পরিণাম আরও ভয়াবহ। পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইনকে অনেকে সময় বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রাচীন কীর্তির ওপরেই তাঁবু খাটানো, সংরক্ষিত এলাকায় অফিস, রেস্ট হাউস, বাসভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। আবার সংরক্ষণ ও উৎখননে যোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ না করা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকায় পুরাকীর্তি ধ্বংসের মাধ্যমে ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটছে। আমাদের দেশের জাতীয় জাদুঘরে কোনো প্রশিক্ষিত প্রত্নতাত্তি্বক নেই। দেশের একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রত্নতত্ত্ব শিক্ষাদান করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে জাদুঘর বিদ্যা মৌলিক অংশ হিসেবে কোর্স শিরোনামে উল্লেখ থাকলেও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে পাস করে বের হওয়া ছাত্রছাত্রীদের দেশের জাদুঘরগুলোতে উপেক্ষিতই রাখা হয়।
আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনি বিভিন্ন জাদুঘরে কী পরিমাণ পুরাকীর্তি রয়েছে, তার হিসাব প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে নেই। বেশিরভাগ অরক্ষিত নিদর্শনের কথা বাদ দিলেও জাদুঘরে রাখা নিদর্শনগুলোকে যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। আবু সাঈদ খান উলি্লখিত বিষয়ের সঙ্গে আমি যোগ করতে চাই (সমকাল, ২৯ মার্চ ২০১১-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন), জাতীয় জাদুঘর থেকে ১৬টি নিদর্শন খোয়া যাওয়ার পাশাপাশি বিগত ৩০ বছরে হারিয়েছে ১৭২টি নিদর্শন, যার কোনো স্পষ্ট তালিকাও পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিকভাবে দুর্বল দু’বছরের জন্য দেশের গণতন্ত্র হত্যাকারী ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন গংয়ের অরাজকতার শাসনকালে প্যারিসের গিমে জাদুঘরে দেশের ১৮৭টি পুরাকীর্তি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের সংস্কৃতি সচেতন মানুষ প্রায় সবাই এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। ফলে সেখানে পাঠানো ৪২টি নিদর্শন ফেরত আনা হলেও জাতির কাছে একটা বিষয় আজও ধোঁয়াচ্ছন্নই রয়ে গেছে_ ফেরত আনা নিদর্শনগুলো আসল, না নকল!
আমাদের জাতীয় পরিচয়কে তুলে ধরতে গেলে সভ্যতা ও ঐতিহ্যের আবিষ্কার এবং সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশিক্ষিত প্রত্নতাত্তি্বক, ভূতাত্তি্বক, প্রত্ন সংরক্ষণবিদ, প্রত্ন রসায়নবিদ, ভূ-প্রত্নতাত্তি্বক, দূর-অনুধাবন ও জরিপ বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন বিষয়ের অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সহায়তায় আমাদের দেশের বৈচিত্র্যময় এই সাংস্কৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ সম্ভব। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, বেনাপোল থেকে তামাবিল_ এই ছোট্ট ভূখণ্ডের অতীত যে কত সমৃদ্ধ তা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা একান্তভাবে কাম্য। পাশাপাশি দেশের মানুষকে যদি ঐতিহ্য-সচেতন করে তোলা যায়, তবে সরকারের কাজটি আরও সহজ ও সাবলীল হবে বলেই বিশ্বাস।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম : শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 
Aurnab arc