প্রত্নতাত্বিক চিন্তাকাঠামোতে লুই বিনফোর্ডের তাত্ত্বিক ঘরানার প্রভাব


সনাতনী ধারার সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারাকে অনেকটা চ্যালেঞ্চ করেই ১৯৬০ সালের দিকে লুই বিনফোর্ড প্রত্নতাত্বিক চিন্তাকাঠামোতে একটি নতুন দিশার সন্ধান দেন। অতীত সংস্কৃতির ব্যাখ্যাতে সরাসরি বিজ্ঞানের ধারণার ব্যবহারের সাথে সাথে নর্মের বদলে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দাঁড় করানোর কৃতিত্ব লুই বিনফোর্ডের। নর্মের মাধ্যমে সংস্কৃতির প্রকৃত চালচিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে নানাবিদ সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষিতে বিনফোর্ডের চিন্তাধারা প্রত্নতাত্বিকদের নতুন করে ভাববার পথ করে দেয়। বিনফোর্ড প্রবর্তিত অতীয় সংস্কৃতির ব্যাখ্যাদানের এই পদ্ধতি ইউরোপীয় প্রত্নতাত্বিকদের প্রভাবে পরিচিত হয় নব্য প্রত্নতত্ত্ব হিসেবে।
প্রচলিত সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ঘরানার প্রত্নতত্ত্ব চর্চার তাত্ত্বিক কাঠামোগত ত্র“টি আর প্রাপ্ত গবেষণা ফলাফলে যুক্তিগত দিকের দুর্বলতা, বিজ্ঞান থেকে দূরত্ব, ফ্যাক্ট ও ফিকশনের দুরত্বের বিচার চিন্তাজাগতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিনফোর্ডের চিন্তাধারাকে বিকশিত হওয়ার পথ করে দেয়। প্রখ্যাত প্রত্নতাত্বিক কে রাজন এর মতে বিনফোর্ডের ধারণার উপর নির্ভরশীল প্রত্নতাত্বিকরা সংস্কৃতির কয়েকটি মানদন্ডনির্ভর পর্যবেক্ষনের বদলে একটি সংস্কৃতির লালনকারী সমাজের অভ্যন্তরস্থ কার্যক্রম বা গতিশীলতাকে বোঝার চেষ্টা করে থাকেন। এখানে বিজ্ঞাননির্ভর অসুসন্ধান বিশেষভাবে লক্ষনীয়। পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন সংস্কৃতিক প্রপঞ্চ সংঘটিত হওয়ার পেছনে বিদ্যমান কারণ সমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টাও করা হয়। একটি নির্দিষ্ট চলক কিভাবে পুরো কালচারাল সিস্টেম বা সংস্কৃতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে এই তাত্ত্বিক ঘরাণার আলোকে কৃত গবেষণাতে তা স্পষ্টত ফুটে ওঠে। এখানে কালচারার ট্রাজিক্ট্রি বা সংস্কৃতির সাংগঠনিক শাখা প্রশাখা সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করা হয়।
বিনফোর্ডের ঘরানার অন্যতম প্রতœতাত্বিক ডেভিড ক্লার্ক সায়েন্স তাঁর বিখ্যাত গবেষণা অভিসন্দর্ভ এনালিটিক্যাল আর্কিওলজিতে বলেছেন ‘‘ প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মাত্র সঠিক প্রশ্নোত্ত্বর প্রদান করার চাইতে অনেক সহজ কাজ বেশ কিছু প্রশ্নকরা । এই সকল প্রশ্ন করার মাধ্যমে যে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়ে ওঠে তাই প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাকে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ, পরিশীলিত, তথ্যনির্ভর, যৌক্তিক ও অর্থবহ করে তোলে। বিনফোর্ডের ঘরানার অন্যতম প্রত্নতাত্বিক জোসেফ ক্যালওয়েল সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত  তাঁর বিখ্যাত গবেষণা প্রবন্ধ দ্য নিউ আমেরিকান আর্কিওলজিতে বলেছেন ‘‘সংস্কৃতিকে একটি ব্যবস্থাহিসেবে দেখতে গেলে অবশ্যই এর অন্তর্গত বিভিন্ন বিষয় বিশেষত পারিবেশিক নিয়ামক, বাস্তুসংস্থান, ও বসতিবিন্যাসের মতো বিষয়কে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে’’। অর্থাৎ আমরা একটি বিষয় স্পষ্টত লক্ষ্য করি যে বিনফোর্ডের প্রভাবে প্রতœতত্ত্বের তাত্বিক ঘরানাতে আমূল একটি পরিবর্তন সাধিত হয়। এ সময়ে প্রতœতাত্ত্বিক সংস্কৃতিকে কোন বিশেষ মানদন্ডের আলোকে গুচ্ছাকারে বর্ণনা না করে প্রতিটি প্রত্নবস্তুকে একটি পৃথক উপাদান হিসেবে বর্ণনার আওতায় আনা হয় যার এক একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতিগত ও অবস্থানগত নির্দিষ্ট প্রত্যয় চিহ্নিত করা সম্ভব। কারণ কোন নির্দিষ্ট নমুনায়িত উপাত্তের আলোকে কোন ঘটনাকে সাধারণীকরণ করে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি সারসত্তায়িত প্রত্যয় আরোপিত হলে এই বর্ণণা সর্বদাই পক্ষপাতদুষ্ট ও ভ্রমাত্মক  হতে পারে। কারণ সংস্কৃতির অন্তস্থ প্রতিটি চলকের একটি স্বতন্ত্র কর্মভূমিকা রয়েছে যা স্ব-স্ব স্থানিক কালিক ও বৈষয়িক মানদন্ডে বিশেষ গুরুত্ববহ। জোসেফ ক্যালওয়েল তার এই প্রবন্ধে আরো বলার চেষ্টা করেছেন।
অন্যদিকে প্রতœতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমাণ ও ঐতিহাসিক  কল্পকাহিনীকে পাশাপাশি দাড় করিয়ে  ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীর সাথে বিজ্ঞানের বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে  অনেকটা বিজ্ঞাননির্ভর আলোচনা ও ফিকশনের বৈপরীত্যের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে লুই বিনফোর্ডের ঘরাণার প্রত্নতত্ত্ব চর্চায়।  প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাস কিভাবে একটি স্বীকৃত মহাবয়ানে প্রভাবদুষ্ট হয়ে  ননর্থক অব্যয় হিসেবে পরিগণিত হতে পারে কিংবা একটি রেপ্রিজেন্টেশনের বাস্তবতায় দিবালোকে মতো স্পষ্ট হয়ে চোখে দৃশ্যমান হতে পারে বিনফোর্ডের ধারণার পূর্বে এসকল চিন্তাধারা অনেকটাই অন্ধকারে ছিল।  কোন কোন ঐতিহ্যের আখ্যান বর্ণণার বাস্তবতায়  যথার্থ, তথাকথিত আধুনিক এবং সঠিক বা যৌক্তিক , আর কোন কোনটি ভিন্নার্থ জ্ঞাপক  তা নির্ধারণকারী মানদন্ড সম্পর্কে প্রতœতাত্বিকরা একটি ধারণা অস্পষ্টভাবে হলেও বিনফোর্ডে ধারণাতে আছে।  প্রত্নতাত্বিক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক ঘরানা ও যুক্তিপ্রমানের ভিত্তিতে যা সত্য বলে পরিগণিত হয়ে ওঠে তা হচ্ছে ‘‘বস্তুগত নিদর্শন বা সাক্ষ্য যা আপাত দৃষ্টিতে অবজেকটিভলি ব্যাখ্যা করা সম্ভব বলে মনে করা হলেও লুই বিনফোর্ড এই ধারণাকে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন। বিনফোর্ড বিজ্ঞাননির্ভর পরীক্ষনের বাস্তবতায় প্রাপ্ত ইতিহাসের প্রমানকে ফ্যাক্ট বলার পক্ষপাতী হলেও একটা বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায় ‘‘ পূর্ণ সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গবেষক অধিপতিশীল রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত মতাদর্শ ও ক্রিয়াশীল অসম ক্ষমতাসম্পর্কের বাইরে কখনই যেতে পারেন না তিনি অবচেতনভাবে হলেও পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মতাদর্শ বা জ্ঞানের সীমানার বাইরে থেকে আলামত হিসাবে এই ফ্যাক্টসমূহ বিশ্লেষণ করে অতীত সম্পর্কে বিভিন্ন উপাত্ত ও তথ্য হাজির করেন বা করতে পারেন যা অনেকটা কোন প্রতœতাত্ত্বিক আলামতের ভ্রমাত্বক বা অতিরঞ্জিত দৃশ্যায়নে তাকে একরকম বাধ্যই করে। সুতরাং প্রতœাতাত্ত্বিক আলামাতের আলোকে বাস্তবতা বা ফ্যাক্ট কে  নৈব্যাক্তিক এবং সর্বজনীন; স্বাধীন ও সার্বভৌম বলে মনে করার পথ থাকছে না। তবে একটা বিষয় স্বীকার করতেই হবে  আলামতের বিশ্লেষণের সময় আমরা যেটাকে  ফ্যাক্ট হিসেবে মনে করি বা করতে বাধ্য থাকি তা  নিজে একটি স্বশাসিত সত্তা নিয়ে বিরাজ করে যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। লুই বিনফোর্ড এর ঘরাণার তাত্ত্বিকদের চিন্তাধারায়  ফিকশন হলো কাল্পনিক, বাস্তবতা বিবর্জিত অথবা বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হলেও তা এককথায়  বাস্তবতার বিকৃতি ভিন্ন কিছু নয়।
বিনফোর্ড এর ঘরানায় এই সকল কাহিনী উপাখ্যান  অর্থ্যাৎ মিথ লিজেন্ড প্রভৃতিকে মানুষের কল্পনাপ্রসূত অবচেতন মনের এক কাকতালীয়  নির্মাণ বলে মনে করা হয়। তবে একটি বিষয় লক্ষনীয় যে মিথের কাঠামোতে যেমন এক অতিলোকিক বা মেটাফিজিক্যাল কুশীলবের আবির্ভাব বা অবতারণা করা হয় কাকতালীয়ভাবে তারাই ঘটনা-ইতিহাসের নিয়ন্তা অথবা প্রভাবক। তবে কালিকতার পরিসরে আমরা কখনই একটি কথা বলতে পারবো না বা নির্দিষ্ট মানদন্ডে সাধারনীকৃত করতে পারবো না কোন সাংস্কৃতিক ট্রেইটস বা প্রপঞ্চ বা তথাকথিত নর্ম আধুনিক রৈখিকতা অনুসরণ করে না, অর্থাৎ তা  যেমন আধুনিক ও সেক্যুলার পরম্পরা কিংবা কার্য-কারণ সম্পর্ক মেনে চলে বাস্তবতার বিচারে তেমনটি হয়ে ওঠেনা । লূই বিনফোর্ড এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের পথ হিসেবে  উভয়ের সীমানা ও সংজ্ঞা নির্ধারণ করে পরস্পরের সঙ্গে তুলনামূলক ও বৈপরীত্যমূলক সম্পর্ক নির্ধারণেই থেকে থাকার ঘোর বিরোধী।
সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারাতে মনে করা হতো অতীত সংস্কৃতি আার কিছুই না কিছু নর্মের সমস্টি যার দিবালোকের মতো প্রতিফলন ঘটে ঐ সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদানে। কিন্তু অনেকটা হাস্যকর হলেও সত্য এখানে বোঝার কোন চেষ্টা করা হয়নি কোন সংস্কৃতির সকল বস্তুগত উপাদান কখনই অক্ষত অবস্থায় প্রতœতাত্ত্বিকের হাতে এসে পৌছানো সম্ভব নয় ফলে যে একটা কালানুক্রমিক শূণ্যতা সৃষ্টি হয় তা ইতিহাসের বাইরেই থেকে যায়। আর তাদের প্রচলিত ধারণাতে   প্রতœতত্ত্ব যে ইতিহাস পুণর্গঠন করে সেই ইতিহাস যেহেতু বস্তু নির্ভর আর বস্তুকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা ফ্যাক্ট হিসেবে তুলনা করা হয় বলে প্রতœতাত্ত্বিক বয়ান, আখ্যান বা ডিসকোর্স প্রশ্নাতীতভাবে ফ্যাক্ট হিসেবে বা বাস্তব হিসেবে পরিগণিত হবে বিধায় প্রতœতাত্ত্বিক আলামতের ভিত্তিতে নির্মিত প্রদর্শিত বা দৃশ্যায়িত বয়ানকেই ইতিহাসের বাস্তবতা বলে মেনে নেয়া ভিন্ন দ্বিতীয় কোন পথ থাকছে না। অন্যদিকে বাস্তবতার নিরীখে গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষন করলে বিনফোর্ডের ঘরাণার প্রতœতত্ত্ব চর্চাকে অল্পদিনেই একটি  দাপুটে জ্ঞান ও অনুশীলনের মাধ্যম হিসেবে আমেরিকা ও ল্যটিন আমেরিকার মতো দেশগুলোতেক প্রতিষ্ঠা পেতে দেখি যদিও তার বিবরণ-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সত্যতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলেও সত্য এই তর্ক-বিতর্ককে অবশ্যই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমান নির্ভর বৈকি বিজ্ঞান নির্ভর অর্থাৎ ঘুরে ফিরে ওই একই বস্তুর উপর নির্ভর করতে হয়।
বিনফোর্ডের চিন্তাধারা তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে বস্তুর বিশ্লেষনে বিজ্ঞাননির্ভর একটি পদ্ধতি প্রচলন করেন যা খুব দ্রুত একটি দাপুটে ও আধিপত্যশীল ঘরানায় রূপান্তরিত হয়ে উঠে। তবে এখানে একটা বিষয় সুস্পষ্ট ছিলনা  ‘বস্তুগত উপাদানের বিজ্ঞাননির্ভর বিশ্লেষণই পারে  নিরপেক্ষভাবে ও অধিপতিশীল দাপুটে অনুশীলন ও ক্ষমতার প্রভাব মুক্ত  শর্তসমূহর বাইরে থেকে অতীত সম্পর্কে সত্য ইতিহাস উৎপাদন করতে যা অনেকাংশে সঠিক নয়।
হালের প্রতœতাত্ত্বিকরা বিনফোর্ডের প্রবর্তিত এই সকল ধারণার সাথে যে সকল বিষয়ে তর্কের অবতারণা করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাস্তবাতা ও অতিকথনের বা কল্পকাহিনীল ভেদরেখাকে যেভাবে প্রচলিত ডিসকোর্সসমূহে বিবেচনা করা হয় সেটাও বিভিন্ন অবস্থা ও চলকের সাপেক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। বাস্তবতার এই বিচারে প্রমানিত এই তথাকথিত সত্য কোন কোন ক্ষেত্রে অবাস্তব হয়ে উঠতে পারে আবার এই অতিকথন, কল্পকাহিনী বা  ফিকশন কখনো কখনো  সত্যতার দিক থেকে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারে। প্রতœতত্ত্ব চর্চার ইতিহাসের খেরোখাতায় নজর দিলে আমরা দেখি প্রতœতত্ত্ব, প্রচলিত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত আধিপত্যশীল দাপুটে আখ্যান বা ডিসকোর্সগুলোতে অতীতের ফ্যাক্টনির্ভর যে-সব আখ্যান বা বয়ান চালু আছে সে-গুলো ফিকশনের সঙ্গে সতত অংশীদারিত্বমূলক কোন কোন ক্ষেত্রে আমারা দেখি এগুলো একে অন্যের পরিপূরক। তবে একটি বিষয় স্পষ্টত প্রতীয়মান যে  ইতিহাস, প্রতœতাত্ত্বিক ও নৃবৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে উপনিবেশ কালীন ও উপনিবেশ উত্তরকালে আধুনিকীকরণ প্রকল্প ও তথাকথিত সেক্যুলারকরণের ইতিহাসের সঙ্গে উপনিবেশকালীন ও পরবর্তী জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের আকাঙ্খাগুলোর একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

পশ্চিমা দৃষ্টবাদী ও প্রত্যক্ষণবাদী চিন্তার প্রভাবে ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে রচনা করা যায় এমন বিবেচনা করার অনুশীলন থেকে উদ্ভূত  ফ্যাকট ও ফিকশনের ধারণায়নের  মাধ্যমে ইতিহাস ঐতিহ্যের  বিনির্মান কিভাবে  বাস্তবতা বিবর্জিত ও অলীক হয়ে ওঠে তা লুই বিনফোর্ডের চিন্তাধারাতে ততটা প্রবলভাবে প্রতিফলিত না হলেও অন্তত বিজ্ঞানের গুরুত্বপ্রদান করার হেতু বস্তুর পাশাপাশি যুক্তিবাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে । ফলে তা পূর্বের ন্যায় কাঠখোট্টা নিরস বস্তুর বিবরণের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকেনি বরঞ্চ কলেবলে বৃদ্দি পেয়েছে।  তবে এর একটি গুরুতর দিক এই যে এখানে বস্তুগত নিদর্শনের সাথে বিজ্ঞানের ধারণার সংযোগেমনে করা হয় যে ইতিহাসের বিবরণেও একনিষ্ঠ সত্যের প্রতিফলন সম্ভব যা পরবর্তিকালের চিন্তকদের কাছে কঠো সমালোচনার স্বীকার হয়। সাম্প্রতিক বিশ্বের কিছু স্থানে প্রতœতাত্ত্বিক আলামতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা দেখে অনেকটাই হতাশ হতে হয়। উদাহরণ হিসেবে নুহ আঃ এর নৌকা আবিষ্কার, ইহুদীবাদীদের হাতে সলোমন  টেম্পল বা টেম্পল মাউণ্ড দখলের ঐতিহাসিক বৈধতা প্রদান, ভারতে চরমপন্থি মৌলবাদীদের হাতে বাবরী মসজিদ এর ধ্বংস অনেককেই হতাশ করেছে। এর মাধ্যমে একটা বিষয় স্পষ্টত ফুটে উঠেছে বৈজ্ঞানিক ইতিহাস যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় তার ফলাফল কতটা মারাত্বক হয়ে ওঠে। আর ধর্মের বানিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই প্রতœতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক অনুজ্ঞা বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হলে তার পরিণাম কতটা অজ্ঞাতকুলশীল আর ক্ষতিকর হবে তা বোধকরি সাধারণ বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষই জানতে পারবেন। যার ফলে বিনফোর্ড প্রবর্তিত এই বিজ্ঞান নির্ভর প্রতœতত্ত্বচর্চাও অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে এই বিচারে যে  অ-বিকৃত বা বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয় তা যেকোন আঙ্গিক হতে পক্ষপাতদুষ্টতা মুক্ত থাকতে পারেনা। এক্ষেত্রে অনেকে বিনফোর্ডকে চ্যালেঞ্চ করে যদি বলতে চান বিজ্ঞানের ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট ইতিহাস যখন পাওয়অ যায়না  তবে বিনফোর্ডের পদ্ধতির নতুনত্ব বা বিশেষত্ব কোথায়। আসলে বিনফোর্ড যে বিজ্ঞান নির্ভর একটি  সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন তা প্রত্যক্ষণবাদী চিন্তাকাঠামো অনুসরণ করে অতীতের নৈর্ব্যক্তিক, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পুনর্গঠন সম্ভব না হলেও ইতিহাসের খেরোখাতায় একটি নতুন পাতার আবির্ভাব ঘটাতে সক্ষম ছিল এটা নিদ্বিধায় বলা যায়।
প্রচলিত  ইতিহাস ও প্রতœতত্ত্ব কালনির্দেশকরণ ছাড়া কোন কালেই তার অভীষ্ট লক্ষে গমন করতে পারেনা। শাস্ত্র হিসাবে ইতিহাস ও প্রতœতত্ত্বে এই সময়কাল বা কালিকতার প্রশ্নটি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এখানে বিজ্ঞানের ধারণার প্রয়োগ এর ফলে অনেক আজগুবি ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রমাদ গোনার প্রহরের যে একরকম শেষ হয়েছে তা নিদ্বিধায় বলা যায়। সময়কালের নির্দেশ ছাড়া প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাসকে অস্বাভাবিক বলে মনে করার বাস্তবতায় লুই বিনফোর্ড প্রদত্ত ঘরানার বিজ্ঞান নির্ভর কালনিরুপণ পদ্ধতিগুলো অনেক সহায়ক হয়েীছিল এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যদিও তার পরম অবস্থান নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। অনেকটা বিনফোর্ডের বিজ্ঞান নির্ভর কাঠামোকে অনুসরণ করেই আধুনিক কালিকতা বা সময়ের ধারণাকে নির্দেশ করা হয় একটি রৈখিক কাঠামো অনুসরণ করে যেখানে সময়কে ‘সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া’, বিমূর্ত, সংখ্যার মাধ্যমে মাপনযোগ্য ও প্রকাশযোগ্য ও নির্গুণ একটি সেক্যুলার প্রপঞ্চ হিসাবে মনে করা হয় যা আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ মনে হলেও অনেকাংশে সাধারণীকৃত। বিনফোর্ড প্রবর্তিত  এই আধুনিক ইতিহাসের ধারণার আরেকটি সারবত্তাগত বৈশিষ্ট্য হলো ‘‘ ইতিহাস নির্মাণ’’ যা একে অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই পারে।     ফলে ‘অতীত’ সম্পর্কিত আখ্যান হয়েও ইতিহাস হয়ে ওঠে ‘বর্তমানকে’ ‘সচেতন সক্রিয়তার’ মাধ্যমে পরিবর্তন করে ‘ভবিষ্যতকে’ পূর্বাভাসযোগ্য মনে করার পরিসর যেখানে ব্যক্তির চিন্তাকাঠামো আর রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই এককথায় বলতে গেলে বিনফোর্ডের এই বিজ্ঞাননির্ভর ইতিহাসের এই আধুনিক অবস্থানকে সিনথেসিস বা সংশ্লেষ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে যা বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে যেমন গুর“ত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তেমনি নতুন নতুন জাতি-রাষ্ট্রের শর্তাধীনে এই জ্ঞানই জাতি-রাষ্ট্রের এবং দাপুটে ডিসকোর্সের অবিভাজ্যতা ও আধিপত্যকে শক্তিশালী করে তুলেছে। যার স্পস্ট উদাহরণ হিসেবে আমরা ভারতবর্ষ বা আফ্রিকার উপনিবেশ উত্তরকালের প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাস চর্চার কথা বলতে পারি। অথাৎ ইতিহাসের প্রাচীনত্বের প্রতি লালসা কিংবা একটি স্বর্ণযুগের ধারণা ইতিহাসকে চরম মাত্রায় বিকৃত না করুক বিতর্কিত করে তা আর বলার অবকাশ রাখে না।
তবে প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাসের গবেষণাতে মানুষের সংস্কৃতি ও পরিবেশের মধ্যবর্তী সম্পর্ক অনুধাবনের চেষ।টা প্রথমত লুই বিনফোর্ডের হাত ধরেই চালু হয়। সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অনুধাবনের জন্য এ সকল আন্তঃসম্পর্ক বোঝা বিনফোর্ড পরবর্তিকালের চিন্তকদের কাছে অনেকটাই জরুরী হয়ে উঠতে দেখা যায়। অতীতের আদর্শগত ও প্রতীকী বিষয় বাদে এই সকল বিষয় পর্যবেক্ষন ব্যাখ্যা ও বিশ্নেষণে লুই বিনফোর্ডের ধারণা অনেক বেশি গুরুত্ববহ হয়ে ওঠার অবকাশ পায়। এখানে বহুল আলোচিত পরবর্তিকালে পশ্চিমা জ্ঞানাতাত্ত্বিক কাঠামোতে অনেক বেশি দাপুটে হয়ে ওঠা          চিন্তাকাঠামো  হিসেবে আমরা সিস্টেম থিররির কথা বলতে পারি। এই সিস্টেম থিওরীর অধীনে একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে একটি ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন মানুষের আচরণ, জীবনধারা, প্রচলিত প্রথা ও অনুশাসন প্রভৃতির পেছনে বিদ্যমান কারনগুলোর ব্যাখ্যাদান অনেক বেশি সহজ হয় । এখানে প্রকৃত অর্থে সংস্কৃতিকে একটি উন্মুক্ত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় যেখানে বাইরের বিভিন্ন প্রভাব ও প্রেরণা জড়িত থাকবে।  এই সকল বিষয় বিবেচনা করে লুই বিনফোর্ড সংস্কৃতির তিনটি উপব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।
    সামাজিক সংগঠন সংশ্লিষ্ট
     বিজ্ঞান প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট
    প্রথা ও আদর্শ সংশ্লিষ্ট
আমরা বিষয়গুলোর আবর্তনের প্রেক্ষিতে প্রতœবস্তুর প্রচলিত আঙ্গিকে বহুল ব্যবহৃত আর্টিফ্যাক্টের সাথে যোগ হতে দেখি টেকনোফ্যাকট, সোসিও ফ্যাকট, আইডিও ফ্যাকট, জিও ফ্যাকট, ইকো ফ্যাক্ট সহ নানাবিধ বিষয়। বৈষয়িক এই পরিবর্তন প্রতœতত্ত্ব চর্চার তাত্ত্বিক ঘরাণাকে পরোক্ষভাবে বেশ খানিকটা প্রভাবিত করেছিল।
পাশাপাশি লুই বিনফোর্ড বিভিন্ন প্রতœতাত্ত্বিক প্রেক্ষিত হতে প্রাপ্ত প্রতœতাত্ত্বিক উপাত্ত ও তথ্যের বিণ্যাস ও কার্যকারন সম্পর্ক নিয়ে  বেশি আগ্রহী ছিলেন। যার ফলে অতীত পরিবেশ সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরী হয়। প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাতে যুক্ত হয় ভূ-তত্ত্ব, প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান,পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ভূগোল প্রভৃতি বিষয়।
আর সেই সাথে নৃবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দিক প্রতœতাত্ত্বিক উপাত্ত্বের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্বলাভের এক পর্যায়ে আমরা অনেকটাই নৃবিজ্ঞান এর তত্ত্ব নির্ভর জাতি প্রতœ তত্ত্বকে প্রতœতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাদানের বিশেষ পথ হিসেবে গৃহীত হতে দেখা যায়। আর সমরূপতার তত্ত্বেরউপর নির্ভব করে এই একই সাথে প্রচলন করা হয় পরীক্ষামূলক প্রতœতত্ত্বকে। সুতরাং বিনফোর্ডের চিন্তাধারা প্রতœতাত্কি গবেষণার ক্ষেত্রে শুধু একটি প্রভাব বিস্তার করেনি বরঞ্চ এটি প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাকে একটি নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে।
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
Archaeology Of Humankind

Advertisements

One thought on “প্রত্নতাত্বিক চিন্তাকাঠামোতে লুই বিনফোর্ডের তাত্ত্বিক ঘরানার প্রভাব”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s