প্লিজ বলোনা দাদু এই ডিজিটাল টা কি ধরণের টাল ??


গতকালের বিভীষিকাময় রাতের কথা। প্রায় ১০৪ ডিগ্রী জ্বর। প্রচণ্ড রকম শ্বাসকষ্ট সাথে কাশিও ছিল। প্রতিদিন সকালে পরিবহন নামের কলঙ্ক তিতাসে বাধ্যতামূলক আরোহন, প্রচণ্ড গরমের ঘর্মদেবের একান্ত আশির্বাদ, বিদ্যুত বিভ্রাত থেকে শুরু করে নানাবিধ কারণ আযরাঈল ভাইয়ের সাক্ষাত অনেকটা সময়ের ব্যাপার করে দিয়েছিল। আমি অনেকটাই পরিষ্কারভাবে দুনিয়ার ওপারে আমার আব্বা আর দাদাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ঘুমাতে পারছিলাম না। বার বার বিদ্যুত যাওয়াতে আই পি এস চার্য নিতে পারেনি একটুকুও। তাই ফ্যান ঘুরছে না। জানালার পাশে বালিশে হেলান দিয়ে হটাত করেই ভাবতে শুরু করেছি।
কেন যেন সেই ছেলে বেলা থেকে দুটো কথা শুনে আসছি

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই আই মিন সত্য বলে কিছু নেই,
এখানে নাকি কথা দেয়া হয় না রাখার জন্য …………………
প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় নাকি ভাঙার জন্য। …………………….

ছেলেবেলার কথা বাদ দেই। তখন ছিলাম একজন দুইদিনের পুঁচকে যে কিনা ঘৃণাভরে বরাবর সংবাদ পত্রের প্রায় সব পাতা উপেক্ষা করে শুধু খেলার পাতা আর সিনেমার পাতা দেখতো তার তেমন কিছু বোঝার নেই। আজ এক এক করে আর দশ বারোটি বছর পেরিয়ে গেছে। এখন স্নাতক সম্মান শেষ বর্ষের ছাত্র। এখন বুঝি পাড়ার আর দশটা মুরুব্বির সাথে বসে দাদু যখন সেই শীতের সন্ধায় চাদর মুড়ি দিয়ে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতেন আর বলতেন দেশটা শেষ। একেবারে পচে গেছে। আমি অনেকটা শীতে জুবুথুবু হয়ে দাদুর কোলে সেই চাদরের ভেতর থেকেই একদিন প্রশ্ন করেছিলাম দাদু আমাদের দেশটা কি একটা সফেদা, আম কাঁঠাল নাকি কোন মিস্টি কুমড়া। দাদু বলেছিলেন ধুর বোকা । আমি তারপর কিছুই বুঝিনি সে সময় হয়তো বোঝার চেষ্টা করার মতো বয়স তখন হয়নি।
এখন সময় পাল্টেছে। প্রতিদিনই যতো কাজ থাক না কেন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিটি পত্রিকার আর যাই হোক সম্পাদকীয় উপসম্পাদকীয়গুলো পড়ার চেষ্টা করি। ভাল খারাপ মিলিয়ে চলছে একরকম। কাজে আর কথায় যাই হোকনা না কেন আমাদের একটা কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ।সেই সাথে নারী নির্যাতন, নিপীড়ন, লাঞ্ছনা ইত্যোকার আরো কত কি। আমি ভাবছি দেশের প্রথম সারির বুদ্ধিজীবির আসনগুলো জবরদখলকারী কিচু জানোয়ার কিভাবে জাতির বিবেককে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে যাচ্ছে। নারী নির্যাতনের যদি শাস্তি থাকে, দেশ ও মাতৃতুল্য । তাহলে মায়ের অবমাননাকারীদের কেন শাস্তি হয়না। আবার চোখে সানগ্লাস দিয়েও রক্ষা নাই। টিভির পর্দায় চোখ রাখেলও আর যাই হোক ওই মাতৃঘাতী দুর্মুখদের চেহারা দর্শন করতে হয়। জানিনা এই আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে কখন যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে যাই।
স্পষ্ট দেখেছি। আমার দাদু পাশে জমির চাচা, আলতাফ চাচা, ইদ্রিস ভাই কাপে চা ঢালছে। আমি দাদুর চাদর একটু ফাঁক করে উকি দিচ্ছি। দাদুকে বার বার ডিস্টার্ব করছি। দাদু মোটেও বিরক্ত হচ্ছেন না। চিরদিনের হাসিখুশি দাদুই ছিলেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাকে এভাবে দেখতে পাবো ভাবিনি। হটাত আব্বার আগমন। আব্বা আমাকে দাদুর কাছ থেকে নেয়ার অনেক চেষ্টা করেও ক্ষান্ত দিলেন। হটাত বেরসিকের মতো দাদুকে প্রশ্ন করে বসি দাদু তুমি তো আমাকে বলতে পারোনি দেশ কিভাবে পচে!! তাই না । কিন্তু আজ তোমাকে বলতেই হবে-আমাদের এলাকার সাত্তার পাগলার মাথাটা নাকি টাল, মেকারের কাছে শুনেছি গত পরশু সাইকেল রিক্সার চাকা অনেক দিন ব্যবহারে টাল হয় কিন্তু আজ দুপুরে বিটিভিতে শুনলাম একটা নতুন শব্দ ‍’ ডিজিটাল বাংলাদেশ’ । দাদু প্লিজ বলোনা এই ডিজিটাল টা কি ধরণের টাল ?? আমার কাছে কেমন কেমন ঠেকছে । দাদু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। জমির চাচার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন ‘ ছেলেটা কি রকরে পাজি হয়েছে, গত পরশু জানতে চাইছে ‘ দাদু যারা খেলে তারা তো খেলোয়াড়, তাইলে যারা বেশি জানে তারা কি জানোয়ার না??। আমি বেশি জানবো না। আমার যদি বাড়ির ছাগল টিনটিনের মতো একটা লেজ গজায় আর শিং উঠে ?? আমি লজ্জা পেয়ে চাদরের নিচে গা ঢাকা দিয়েছে। বাইরে ততক্ষনে হাসির রোল। জমির চাচা হাসতে হাসতে চেয়ার নিয়ে উল্টে পড়েছেন। কিন্তু অবাক করে দিয়ে দাদু আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করেছেন ” ভাইরে কি আর বলবো এই ডিজিটাল এমন এক ধরনের টাল যখন দেশ টালমাটাল হয়। যেমন বাজারে গিয়ে গোটা খাসির দরে মুরগী কিনে ফিরতে হয়।তারপর দেখ তোমার বড় ভাইয়া গত পরশু একটা আস্ত ইলিশের দামে পুটিঁ মাছ কিনে ফিরেছে,শীতকালে যেমন আগুন পোহাতে হয় এই সময় বাজারে এমনিতেই আগুন জ্বলে, দেশের নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকার ভাড়া দিতে হবে না হেঁটেই পার হওয়া যাবে, আমি প্রতি শীতে রিস্কায় করে আবুলকে সাথে নিয়ে পাখি মারতে যাই, এখন ওর থেকেও ভয়ানকভাবে সীমান্তে মানুষকেই হত্যা করা হয়, বাসে উঠেই তুমি প্লেনের স্বাদ পাবে মানে প্লেনের ভাড়া দিয়ে তোমাকে বাসে যাতায়াত করতে হবে। তারপর তুমি দেশে থেকেই আরব দেশের স্বাদ পাবে, কলে পানি থাকবেনা, চুলায় রান্নার গ্যাস থাকবেনা। পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে পানি-চুক্তি করাতে গ্রীষ্ম আরো ভয়ানক হবে। আমি এতোক্ষনে মুখ বের করেছি দাদু আরো কিছু হবে নাকি, .. দাদু বলতেই থাকেন রাতে কারেন্ট থাকবে না, বিদ্যুত বাতি জ্বলবে না, তোমরা কোনদিনই আর সিনবাদ, আলিফ লায়লা, ম্যাকগাইভার দেখতে পারবে না, তোমরা আপুরা নিরাপত্তার অভাবে রাস্তায় বেরুতে পারবে না, তোমার আপুদের স্কুলের শিক্ষক হবে পরিমল হোসনে আরার মতো কিছু পশু যারা আমাদের ভুতো কার্তিক মাসে যেমন দৌড়াদৌড়ি করে তেমন স্বভাবের হবে। জমির চাচা সহ্য না করে বলেন চাচা আপনি থামবেন। ছোট বাচ্চা ছেলে ভয় পাবে তো। .
আমি আসলেই ভয় পাই। আমি চিতকার করি দাদু আমি চাইনা এই ডিজিটাল দেশ। আমি তোমার সাথে যাবো। দাদু আমি তোমার সাথে যাবো। দাদু তোমার সাথে যাবো। হটাত তন্দ্রা কেটে যায়। হাসফাঁস করতে করতে উঠে বসি। ঘেমে গা ছপছপে। তখনো বিদ্যুত আসেনি। ভাবলাম একটু বাথরুমে গিয়ে গামছা ভিজিয়ে গা মুছি যদি জ্বরের উপর একটু আরাম লাগে। ট্যাপ ঘুরালাম পানি নেই। তখন মনের অজান্তেই বললাম ” দাদু তোমার দেখা যখন পেলামই কেন আমায় ওপারে নিয়ে গেলেনা। এই ডিজিটাল বাংলাদেশ আমার কেন যেন সহ্য হচ্ছে না।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s