ফারাক্কা থেকে টিপাইমুখ-ফেলানী থেকে মিরাজ হোসেন বন্ধুত্বের এই সব উপহার বাংলাদেশীরা রাখবে কোথায়


ফারাক্কার শোষনে তৃষ্ণার্ত বাংলাদেশীদের অনেকে হয়তো ঘুমের মধ্যেও পানি পানি বলে আর্তচিৎকার করে ওঠেন যার সাথে বন্ধুত্বের উপহার হিসেবে যোগ হতে যাচ্ছে টিপাইমুখ। তাতেই মুক্তি কই ? কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা সীমান্তে বন্ধুত্বের নিনাদ হিসেবেই যেন বারংবার গর্জে ওঠে বন্দুক ,অনেকটা নিয়তির অলিখিত নিয়মে ফেলানীর মতো অভাগা কিশোরী কিংবা মিরাজ হোসেনের মতো নির্যাতিত অসহায় বাংলাদেশীর বলিদান থেকে রক্তক্ষুধা মেটায় বি এস এফ। বছরের ঠিক গোড়ার দিকে লাশ হয়ে কাঁটাতারে নির্মমভাবে ঝুলতে দেখেছিলাম ১৪ বছরের বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানিকে আর গতকাল একটি অনলাইন নিউজপেপারে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার চাঁপাতলা সীমান্তে বাসকারী মিরাজ হোসেনের নির্মম হত্যকাণ্ডের খবর পাই। পরবর্তিতে তৎক্ষনাৎ প্রতিক্রিয়া জানাতেন দেশের অন্যতম প্রধান বাংলাব্লগ আমার বর্ণমালাতে  “ পানিকষ্টে মেরেও সন্তুষ্ট না হয়ে বারংবার গর্জে ওঠে বন্দুক , এই আজগুবি বন্ধুত্বের বলি হবে আর কতো ফেলানী আর কতো মিরাজ হোসেন???? শিরোনামে একটা পোস্ট করি। তাতে তরুন সমাজের নানা আক্ষেপের বাণী আছড়ে পড়তে দেখে অনেকটাই বুঝতে পারি এরা সেই শহীদ সালাম ,বরকত, রফিক, জব্বারেরই বংশধর যারা তাজা রক্তদিয়ে পিচের পাষাণ রঞ্জিত করেছে তবু নিজেদের আতœসম্মানকে  কারো হাতের পুতুল হতে দেয়নি। 

ফিরে যাই বছরের শুরুরদিকে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল পরদিন কিন্তু ঘাকত বি এস এফ এর নির্মম বুলেট বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার আগেই ঠান্ডা করে দিয়েছে ফেলানীকে । তারপর তার নিথর দেহকে নির্মমভাবে ঝুলিয়ে রেখেছিল কয়েক ঘণ্টা। এই বছরের জানুয়ারিতে  লাশ হয়ে ঝুলে থাকা ফেলানির ছবি বিভিন্ন  দৈনিক পত্রিকায়  যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের হৃদয় কতটুকু হাহাকার করে উঠেছিল, আমি বলতে পারব না। কিন্তু দেশের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ অনেককেই হাহাকার করে পকেট থেকে রুমাল বের করে, লূঙ্গির খুটায়, শাড়ির আচল বা ওর্ণাতে নীরবে চোখ মুছতে আমি দেখেছি। ঘটনার সময়  ভোর সোয়া ৬টা হবে, দিল্লিতে কর্মরত নির্মাণকর্মী বাবা  মেয়ের বিয়ে ঠিক করে দেশে এসেছিলেন। পোড়খাওয়া বাবা কাঁটাতার পার হতে পারলেও মেয়ে ফেলানির জামা আটকে গিয়েছিল কাঁটাতারের বেড়ায় পরিণতিতে বি এস এফ বাবার চোখের সামনেই পাশবিক বর্বরতায় গুলি করে হত্যা করেছিল তাকে।  মৃত্যূর আগে বেশ কিছুক্ষন পানি পানি বলে চিৎকার করলেও প্রাণভয়ে তার ডাকে সাড়া দিয়ে  কেউ এগিয়ে আসার সাহস দেখায়নি, ৩০ ঘণ্টা পর ফেলানির লাশ ফেরত দিয়েছিল বিএসএফ।
অন্যদিকে প্রাপ্ত তথ্যমতে ঝিনাইদহের  মহেশপুর উপজেলার চাঁপাতলা গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে মিরাজ হোসেন তার বাবা মায়ের উপর অভিমান করে বুধবার রাতে ভারতে ছুটিপুর গ্রামে তার ফুফুর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। ভারতীয় সীমান্তের ৬১ নম্বর মেইন পিলার পার  হয়ে ভারতে প্রবেশকালে ফতেপুর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন করে। এতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে বুধবার ভারতরে   অভ্যন্তরে কৃষ্ণনগর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বৃহস্পতিবার সকালে তিনি মারা যান। মিরাজ হোসেনের মৃত্যুর খবর চাঁপাতলা গ্রামে  পৌঁছুলে এলাকার লোকজন তার লাশ ফেরত নিতে শ্রীনাথপুর বিজিবি ক্যাম্পে আবেদন করার দীর্ঘ সময় পর বৃহস্পতিবার দুপুরে শ্রীনাথপুর বিজিবি ক্যাম্প ও ফতেপুর বিএসএফ ক্যাম্পের মধ্যে পতাকা বৈঠকের পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে লাশ ফেরত দেয়া হয়। এভাবেই এই ফেলানি মিরাজ হোসেনদের  গুলি করে মেরে একের পর এক ‘বন্ধুত্বের’ প্রতিদান দিয়ে চলেছে আমাদের বন্ধুবর ভারতের বিএসএফ। এর চেয়ে আর ‘বন্ধুত্বের’ প্রতিদান কী হতে পারে! আমরা কি এই বন্ধুত্ব চেয়েছি? ফেলানির সেই কাটাতারে ঝুলন্ত মৃতদেহের  নির্যাতনে নীল মুখচ্ছবি কিছুতেই ভোলার নয় আর বি এস এফ এর নির্মমতায় মিরাজ হোসেনের করুণ আর্তনাদ কানে না পৌছুলেও অনেকটাই হৃদয় থেকে অনুভব করা যায়।
সেই ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ বড় ধরনের ভারতীয় পানি আগ্রাসনের সম্মুখীন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বাংলাদেশের মানুষ যখন গঙ্গার পানির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তখন নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তিস্তায় পানি না পাওয়া এবং টিঁপাইমুখ বাঁধ নিয়ে। পাবনা, কুষ্টিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্নজেলা আজ মরুকরণের পথে। বাংলাদেশে পানির অন্যতম উৎস প্রবল প্রমত্তা পদ্মা নদী শুকিয়ে এখন ধুধু বালুচর, কোথাও হচ্ছে চাষ হচ্ছে শষ্যের কিংবা কোথাও বিরাণ কাশবনে বাসা বেধেছে খেকশিয়ালের দল। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ভারত একটি দ্বিপাক্ষীক  চুক্তি  হলেও তার একটি শর্তও পালন না করায় এ মারাত্বক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে রংপুর এর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় ‘তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের অনৈতিক স্বেচ্ছাচারীতা, হঠকারিতা ও অনৈতিক আচরণের ফলে এ নদীর বাংলাদেশ অংশ জুড়ে এখন মরুভূমির ছবি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তারপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘাঁ এর মতো  যুক্ত হয়েছে টিঁপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বাংলাদেশের অশনি সংকেত।
উজানে বাঁধ দিয়ে  রক্তচোষক ভ্যাম্পায়ারের মতো পানি আগ্রাসন আর সীমান্তে স্বেচ্ছাচার আচরণের দ্বারা দিনের পর দিন বাংলাদেশকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বাঞ্চিত করছে ভারত। ভারতের আগ্রাসন একদিকে যেমন বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে তার ন্যায্য অধিকার থেকে, অন্যদিকে কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ভারত বাংলাদেশকে চাপে ফেলে তাদের স্বার্থ আদায় করে নিতে চাইছে। ভারতের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় সহযোগিতা করছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবিতে কর্মরত কিছু ভারতীয় বংশদ্ভুত কর্মকর্তা। কিন্তু বাংলাদেশের পানি সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে  ভারত কোনদিনই আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তারা বাংলাদেশের এই ’জীবন মরণ সমস্যা’ কে কোনদিন সমস্যা হিসেবে দেখেনি বরঞ্চ উপহাস করেছে। যেখানে সার্ক এর আওতায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানের একটি উদ্যোগ নেয়া যেতো, সেখানে তা না করে সমস্যাটিকে ’জিইয়ে’ রেখে ভারত তার স্বার্থ উদ্ধার করে নিতে চায়।
বাংলাদেশে বহমান অধিকাংশ নদীর উৎসস্থল হচ্ছে ভারত আর উজানে অবস্থান হওয়াতে ভারত পানিকে জিম্মিকরে বাংলাদেশের প্রতি তার দাপট চিরস্থায়ী করেছে।  ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবাহিত নদীর সংখ্যা ৫৪টি। ভারত শুধুমাত্র গঙ্গার পানি এককভাবে প্রত্যাহার করেই তাদের রক্তচোষক মনোবৃত্তি চরিতার্থ করেনি এর পাশাপাশি ব্রক্ষপুত্র ও তিস্তার পানি দিকে ঘাতক দৃষ্টি দিয়েছে। ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যার মাধ্যমে ভারত ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহার করে নিলে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য হবে এক বড় ধরনের হুমকি। আর টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হলে, হাওর বেসিন ক্ষ্যাত বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল পরিণত হবে মরুভূমিতে। ভারতের এ ’পানি আগ্রাসন’ আজ বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিয়েছে যা এক কথায় বললে এই ভূখন্ডে বসাবাসকারী প্রতিটি জীবের প্রাণ আজ ওষ্ঠাগত।
পরিবেশের এই বিপর্যয় রুখতে বাংলাদেশ যদি আগামি ২০ বছর পরের পরিস্থিতি চিন্তা করে এখনই একটি সুদূরপ্রসারী পকিল্পনা গ্রহণ না করে, তাহলে এ দেশ ২০৩০ সালে দিকে বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি সংকট আর মরুকরণের বিপর্যয় পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের পর হিরোশিমা নাগাসাকির  সঙ্কটের ভয়াবহতাকেও ম্লান করে দেবে। উভয় দেশের এই সঙ্কট  সমাধান করতে হবে পারস্পারিক বিশ্বাস ও আস্থা রেখে এবং বহুপাক্ষিক সমঝোতার ভিত্তিতে এগিয়ে গেলে কিছু একটা করা যেতে পারে। যেমন ভারতের উজান নেপালে জলাধার নির্মাণ করে হিমালয়ের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে খরার মৌসুমে ফারাক্কায় পানি প্রবাহ ১ লাখ ৩০ হাজার কিউসেক থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাতে করে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই লাভবান হবে। তাছাড়া জলাধারের সাহায্যে নেপাল প্রতি বছর প্রায় সাড়ে দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে যা থেকে নেপালের পাশাপাশি ভারত বাংলাদেশ উভয়েই লাভবান  হতে পারে।

 ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে, অর্থাৎ ১৯৭৭ সাল থেকে ৫০ বছর পর। এ ৫০ বছরে জনসংখ্যা বাড়বে তিনগুণ সেই সাথে পানির প্রয়োজনও ও হবে তীব্র থেকে তীব্রতর। । কিন্তু ১৯৭৭ সালে আমরা যে পানি পেয়েছিলাম, ৫০ বছর পর পর্যন্ত তা ধীরে ধীরে কমতে কমতে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এটাই এক বড় প্রশ্ন। গুরুতর একটি বিষয় ’বাংলাদেশ কান্ট্রি ওয়াটার রিসোর্সেস এসিসট্যান্স’ নামে একটি ধারণাপত্রের কথা শোনা গিয়েছিল বছর তিনেক আগে থেকেই । তথাকথিত  পানি উন্নয়নের নামে তৈরী ওই ধারণপত্রে গঙ্গার পানি প্রবাহের অপ্রতুলতাকে স্বাীকার করে ব্রহ্মপুত্রের পানির ওপর ভিত্তি করে পানি উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা বলা যা প্রকৃত অর্থে ভারতীয় আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনাকেই সমর্থন করে। পরিবেশ বিপর্যয় আর মরুকরণ কথা চিন্তা করে কোনদিনই বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের এ ধারণাপত্র সমর্থন করতে পারে না। গঙ্গার পানি বন্টন প্রশ্নে ভারত বাংলাদেশ আলোচনার পর আলোচনা করে যাবে সাথে যোগ হবে ব্রহ্মপুত্রও তবু এই সমস্যার সমাধান  কবে তা বলার সাধ্যি কারও নেই। ক্ষমতার দাপট দেখানো আর বিরোধীতার খাতিরে বিরোধিতা করা বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মাঝে আলোচনায় বসার পথকে অনেকটাই সিলগালা করে বন্ধ করে দিয়েছে। আগামী প্রজন্মের কথা মনে করে হলেও এই দুটি দলকে রাজনৈতিক সকল ভেদাভেদের উর্দ্ধে থেকে এক হওয়ার সময় এসেছে। জীবন বাঁচানোর দায় যেখানে বড় দায় রাজনৈতিক বিভেদ সেখানে ঠূনকো বিষয়। ফারাক্কার শোষনে যেখানে আজ ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা এর সাথে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আওয়ায় এর সাথে আরও কিছু যুক্ত হতে থাকলে শেষ পরিণতি কি হবে তা কে জানে। আর এই আজব বন্ধুত্বের অগ্নিস্বাক্ষী হয়ে আরও কত নদীর সুজলা সুফলা তীর হবে মরুভূমি তা ভাবতেই একটা হিমশীতল ধারা শীরদাড়া বেয়ে নিচে নামে। সেই সাথে আরও কত ফেলানী আর মিরাজ হোসেন জীবন দিলে এই মহান বন্ধুর রক্তক্ষুধা মেটানো সম্ভব হবে  তার উত্তর একান্ত অজানা।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
ব্লগার ও কলামিস্ট

aurnabmaas@gmail.com.
Archaeology Of Humankind
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s