বাংলার ইতিহাসে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক


বাংলায় মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনুধাবন করতে হলে এদেশে মুসলমানদের আগমনের ধারাটি প্রথম বুঝতে হবে। বাংলায় মুসলমানদের সামরিক সাফল্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুসলমানদের আগমন ও মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠা তিনটি পর্বে সংঘটিত হয়েছিল। প্রথম পর্বটির শুরু আট শতক থেকে। এসময় আরব বণিকরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালির সমুদ্র তীরে নোঙর ফেলেন। বাণিজ্যিক কারণে মুসলমান বণিকরা ধীরে ধীরে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত হয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্র তীরাঞ্চলে এসে পৌঁছেছিলেন। এই আরব বণিকরা বাণিজ্যিক কারণে দীর্ঘদিন উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করেন। এদের কেউ কেউ স্থানীয় রমণী বিয়ে করেন। এভাবে সীমিত আকারে ঐ অঞ্চলে একটি মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। অবশ্য এই বণিক শ্রেণির মধ্যে ধর্মপ্রচারের কোনো উদ্দেশ্য কাজ না করায় এ পর্বে মুসলিম সমাজ বিস্তার তেমন গতি পায়নি। তবে এই বণিক মুসলমানদের রচিত পথ ধরেই একদিন

সুফি সাধকদের আগমণ মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচনা এবং তারই ধারাবাহিকতায় তের শতকের শুরুতে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রস্তুত হয়। দ্বিতীয় পর্বে বাংলায় ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুফি সাধকদের আগমন ঘটে। এই পর্বের সময়কাল ১১ থেকে ১৩ শতক। সেন শাসন যুগে তাঁরা খুব নির্বিঘেœধর্ম প্রচার করতে পারেন নি। তৃতীয় পর্বের শুরু ১৩ শতক থেকে। এসময় বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু হয়।

বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পেছনে মুসলমান সেনাপতিদের সামরিক কৌশল আর যোগ্যতা যতটা না কাজ  করেছিল তার থেকে শতগুণ বেশি ভূমিকা ছিল এদেশের তৎকালীন সমাজ সংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের। মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বে বাংলার সমাজ সংস্কৃতির প্রকৃত অবস্থা অনুসন্ধানে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আরো বেশ কিছুকাল পূর্বে। প্রকৃত অর্থে বাংলার সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়েছিল হিন্দু-বৌদ্ধ এক মিশ্র সংস্কৃতির সাথে মুসলিম সংস্কৃতির সংস্পর্শ সৃষ্টির মাধ্যমে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখা যায় সাত শতকের শুরুতে রাজা শশাঙ্কের বৌদ্ধ দলনের প্রতিবাদে বাংলায় বৌদ্ধরা ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বৌদ্ধরা শক্তি সঞ্চয় করতে করতে এক সময় আট শতকের দিকে রাজ ক্ষমতায় বৌদ্ধ ধর্মীয় পাল শাসকদের উত্থান ঘটে। তবে অনেকটাই উদারনৈতিক পাল শাসকদের প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাংলার রাজদণ্ডে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের অধিবাসী সেন রাজারা অধিষ্ঠিত হন। বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোতে মুসলিম শক্তির অধিষ্ঠান আলোচনা করতে গেলে এই প্রেক্ষাপটটি বোঝা বেশ জরুরী। পাল রাজারা বাংলার মাটির সন্তান ছিলেন। তাঁরা দেশের মানুষের  চাওয়া পাওয়াকে মূল্য দিতেন। তাদের সময়ে মানুষ অনেকটা শান্তিতেই ছিল। কিন্তু সুদূর দক্ষিণাত্য থেকে আগত সেন শাসকগণ বাংলার মাণুষের চাওয়া পাওয়ার প্রতি ততটা গুরুত্ব দিতে না পারায় তাদের উপরে দিনের পর দিন বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়তে থাকে এদেশবাসী। একদিকে বৌদ্ধ ধর্মীয় পাল রাজাদের শাসন নীতি যেমন ছিল উদার ও মানবিক, বিপরীতে সেন শাসকদের শাসন নীতি ছিল অনুদার, সঙ্কীর্ণ ও দমনমূলক।
আর তাদের এই দমনমূলক শাসনের সময় মানুষ যখন অতিষ্ঠ ঠিক তখনই বিদেশী সুফিরা এদেশে আসতে থাকেন। সুফিদের মূল উদ্দেশ্য ধর্ম প্রচার হলেও প্রথমত জনগণের সাথে তাঁরা মিশে যেতে থাকেন। আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ঠাঁই পেয়ে যান সুফিদের  খানকাহয়। সুফিদের সাফল্যে তৎকালীন তুর্কি যোদ্ধারাও অনুপ্রাণিত হতে থাকেন। ইতিহাসের একটু পেছনের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখি সেন শাসন আমলে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে বাংলার সর্বস্তরের মানুষের উপর তাদের একাধিপত্য সাধারণ মানুষকে হতাশ করেছিল। ধর্মচর্চা আর শাস্ত্রজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ছিল তাদের একচ্ছত্র দাপট। এ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে মুসলিম আধিপত্য বিস্তারের পর ভারতের হিন্দু সমাজ নিভু নিভু অবস্থায় কোনো রকম টিকে ছিল। শ্রী চৈতন্যদেব যখন শাস্ত্রচর্চায় আমজনতাকে অধিকার প্রদান করেন তখনো তাঁর বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ সমাজ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। একটি বিষয় বলা যায়, তৎকালীণ ব্রাহ্মণ শ্রেণী অন্তজ শ্রেণীকে সমাজে অবহেলিত নিগৃহীত করে রেখেছিল। তাই তাদের কাছে হিন্দু ধর্মের সেন রাজাদের পতনে ভিনদেশী ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মুসলিম শাসকদের অনাহূত মনে হয়নি। বরঞ্চ সেন শাসনে অত্যাচারিত জনগণ নতুন একটি শাসকগোষ্ঠীর আগমনের পর তাদের আচরণ পরীক্ষা করার সুযোগই যেন নিতে চাইছিল। এই সেন মদদপুষ্ট ব্রাহ্মণরা শুধু ধর্মীয় আর সামাজিক বিধিনিষেধ আরোপ করেই তাদের কাজে ক্ষান্ত দেয়নি বরং মানুষের জীবন যাত্রায় সরাসরি নাক গলিয়ে তাদের সামাজিক জীবনের পাশাপাশি রাতের ঘুম দিনের স্বস্তিটুকু কেড়ে নিতেই যেন বদ্ধপরিকর হয়েছিল। ইতিহাসের সূত্র থেকে পাওয়া যায় সাধারণ হিন্দুদের সহায় সম্পত্তি গ্রাস করা এমনি তাদের হত্যা করলেও ব্রাহ্মণগণ বিচারের আওতায় আসতেন না। শেক শুভোদয়ার সূত্র থেকে অত্যাচারী লক্ষণসেনের শাসনামলে তার স্ত্রী বল্লভা আর তার শ্যলক কুমার দত্ত কর্তৃক সাধারণ মানুষের প্রতি নির্মম আচরণের কথা জানা যায়। পাশাপাশি বল্লাল সেনের তান্ত্রিক মতবাদের প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ আর কৌলিণ্য প্রথা জনগণ ও রাজশক্তিকে অনেকটাই বিপরীতমুখী অবস্থানে এসে দাঁড় করায়। এই শ্রেণীভেদ ইসলাম বিস্তারের জন্য একটি পটভূমি রচনা করে যার উপরে দাঁড়িয়েই ধর্ম প্রচার করেছিলেন সুফি সাধকরা। তাদের কর্মে প্রাথমিক সফলতা চূড়ান্ত সফলতায় রূপ নেয় সেন রাজবংশের পতনের পর থেকে।
বাস্তবতা বিচার করতে গিয়ে দেখা গেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাধা, ধর্ম পালনে  নানাবিধ বিধিনিষেধ  আর সমাজে লাঞ্ছনার পাশাপাশি সামন্তবাদী অর্থনীতি নিম্ন শ্রেণির মানুষকে আর্থিকভাবেও সর্বশান্ত করতে থাকে। জনমনে বিভ্রান্তির  ঠিক এই সময়েই আগমন ঘটতে থাকে সুফি সাধকদের। মুসলিম শক্তির রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে সুফি-সাধকদের  বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ধর্ম প্রচারের পথ অনেক বেশি সুগম হয়। যদিও তাঁদের কর্মকাণ্ডই রাজ্য বিস্তারের প্রামমিক ভিত্তি রচনা করেছিল। প্রকৃত অর্থে সুফিদের জীবনযাত্রার সরলতা আর মানবতার জয়গান শুনে দলে দলে মানুষ জমায়েত হতে থাকে সুফিদের পতাকাতলে। ভারতের প্রেক্ষাপটে বিচার করতে গেলে ইসলাম প্রচার ঘটেছিল মূলত দুইভাবে। এর একটি সুফিয়ানা তরিকা আর অন্যটি তুর্কানা তরিকা। সুফিয়ানা তরিকা হচ্ছে সুফিসাধক কর্তৃক আল্লাহর প্রেমবাণী প্রচার করে ইসলামের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করা। অন্যদিকে তুর্কানা তরিকা হচ্ছে তুর্কি যোদ্ধাদের ধর্ম প্রচারে বল প্রয়োগ করা। বাংলায় মূলত সুফিয়ানা তরিকার মাধ্যমেই ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হয়েছে। মানবতার বাণীতে আকৃষ্ট করে মানুষকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করার প্রমাণ রয়েছে অনেক। বার শতকের শেষ বা তের শতকের শুরুর দিকে ভারতের রাজদণ্ড মুসলমান শাসকদের হাতে চলে আসলে তাঁরা বিভিন্ন দূরবর্তী প্রদেশ দখল করার চেষ্টা করতে থাকেন। তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে মুহাম্মদ বিন সাম বা মুহাম্মদ ঘোরীর  সেনাপতি বখতিয়ার খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন। তাঁর নদীয়া আক্রমণ ও লক্ষণ সেনের পরাজয়কে দেশের প্রচলিত ইতিহাসে বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয় বলা হলেও একে বাংলা বিজয় বলাটা একদমই ঠিক হবে না। কারণ তাঁর নদীয়া ও লখনৌতি বিজয় পশ্চিম ও উত্তর বাংলার কিয়দংশই জয় করা। বাংলার বাকী অংশে সেন রাজা ও স্থানীয় হিন্দু রাজাদের ক্ষমতাই প্রতিষ্ঠিত ছিল। বখতিয়ারের নদীয়া বিজয়ের তারিখ ও শাসক হিসেবে তাঁর মর্যাদা জানার সুযোগ এতকাল তেমন ছিল না। পরে বখতিয়ারের মুদ্রা বলে শনাক্ত করা মোহাম্মদ বিন সাম নামাঙ্কিত গৌড় বিজয়ের স্মারক মুদ্রা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১২০৪ সালে নদীয়া বিজয়ের পরের বছর বখতিয়ার লখনৌতি বা গৌড় দখল করেন। তিনি শাসন ব্যবস্থার সুবিধার জন্য তার অধিকারকৃত পুরো অঞ্চলগুলোকে কয়েকটি ইকতা বা প্রদেশে বিভক্ত করেছিলেন। সামাাজিক কর্মকাণ্ডের অংশ  হিসেবে বখতিয়ার খলজি মসজিদ, মাদ্রাসা  নির্মাণ করেন।।
বখতিয়ার খলজির হাত ধরে বাংলার প্রচলিত সংস্কৃতির সাথে বিদেশী সংস্কৃতির সংমিশ্রণে নতুন ধারার চর্চার যে পথ রচিত হলো তা চলেছিল দীর্ঘদিন। এরপর বখতিয়ার খলজির মৃত্যুর পর তার অনুসারী খলজিরা নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে শাসন ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়। তারপর ১২২৭ সালের দিকে সুলতান শাসস উদ্দিন ইলতুতমিশের বড় ছেলে নাসির উদ্দিন মাহমুদ গিয়াস উদ্দিন ইওয়াজ খলজিকে পরাজিত ও হত্যা করে বাংলা দখল করেন। ১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবনের মৃত্যু পর্যন্ত বাংলা দিল্লীর অধীনে ছিল। এই অবস্থায় লখনৌতির কোনো কোনো শাসক স্বাধীনতা ঘোষণার চেষ্টা করলেও তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পরবর্তিকালে বলবনের মৃত্যুর পর বুগরা খানের পুত্র কায়কাউস রুকন উদ্দীন কায়কাউস উপাধি ধারণ করে অনেকটা দিল্লির সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলা শাসন করতে থাকেন। এরপর বাংলার শাসন ক্ষমতায় আসেন শাসস উদ্দিন ফিরুজ শাহ।
বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটে ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্যদিয়ে। যা মোগল অধিকারে পূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। পরবর্তীকালে বাংলার শাসন কাঠামোতে কয়েকজন বিখ্যাত সুলতানের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহ, সিকান্দর শাহ, গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। পরবর্তীকালে হিন্দু রাজা গণেশ বাংলার শাসন ক্ষমতায় কিছুদিনের জন্য অধিষ্ঠিত থাকলেও জৌনপুরের ইব্রাহীম শর্কির হস্তক্ষেপে গণেশ পরাভূত হন। এরপর পরবর্তী ইলিয়াসশাহী বংশের শাসনকালে আমরা রুকন উদ্দীন বারবক শাহ, শামস উদ্দিন ইউসুফ শাহ, জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ প্রমুখ সুলতানের শাসনের পর হাবশী দাস বংশীয় শাসনের ফলে বাংলার শাসনকাঠামো অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর হুসেন শাহী বংশের চারজন সুলতান রাজত্ব করেন। তাদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ও নাসির উদ্দিন নুসরত শাহ। শাসক হিসেবে তাঁরা তাঁদের  খ্যাতি ছড়িয়ে দেন।
আমাদের প্রচলিত ইতিহাস গ্রন্থে রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ সহজলভ্য বলে বর্তমান লেখাগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের কাহিনী বাদ দিয়ে সমাজ সংস্কৃতিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এর ধারবাহিক পরবর্তী পর্বে বাংলায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠায় সুফিদের ভূমিকা কেমন ছিল, শ্রী চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলন কিভাবে বাংলার হিন্দু সমাজকে জাগ্রত করাতে পেরেছিল, শ্রী চৈতন্য হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের যাঁতাকল ভেঙে বের হয়ে এসে কিভাবে ভক্তি আন্দেলনকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন তা আলোচিত হবে।
মুসলিম আগমনের আদিপর্বে মুসলিম সংস্কৃতির সাথে হিন্দু সামাজিক রীতি ও প্রথার সংমিশ্রণের ফলে একটি নতুন ধারার সমাজ কাঠামো গড়ে উঠতে দেখা যায়। এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে। তা হল গ্রহণ বর্জনের উদারতা। হিন্দু ধর্মে ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র আধিপত্য আর শ্রেণি ভেদের বিপরীতে মুসলিম সমাজের সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হিন্দু সমাজকেও আলোড়িত করে। অন্যদিকে ভারতের বৈচিত্রময় হিন্দু সংস্কৃতি মুসলিম শাসকবর্গসহ অন্যান্যদের প্রভাবিত করে। রাজদণ্ড ধারণের পর মুসলিম শাসকবর্গের সভাসদ, রাজদরবারের কর্মচারী, অমাত্যসহ নানাপদ অলংকৃত করার মাধ্যমে হিন্দু জনগোষ্ঠী মুসলিম শাসকদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায়। অন্যদিকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিবেশী হিসেবেও হিন্দুগণ মুসলমানদের সংস্পর্শে আসেন। বাস্তবতার নিরীখে পর্যবেক্ষণ করলে  দেখা যায় শাসকগোষ্ঠী শাসিত শ্রেণিকে তাদের আদর্শ, সংস্কৃতি আর জীবনধারার নানাদিকে প্রভাবিত করে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে বৃটিশ শাসন আমলে এদেশীয় সংস্কৃতির উপর নানামুখী প্রভাবের কথা বলা যেতে পারে। একই ভাবে ভারতে মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর রাজদণ্ড ধারণের পর এদেশীয় হিন্দুদের অনেকেই তাদের বৈচিত্রময় সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হন। তৎকালীন কবি জয়ানন্দের বিবরণ হতে এর সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। মধ্যযুগের কবি জয়ানন্দ লিখেছেন ‘জগাই ও মাধাই নামক দুইজন ব্রাহ্মণ ফারসি কবিতা আবৃত্তি করতো এবং মাংস ভক্ষণ করতো’। তিনি আফসোস করে বলেছেন ‘বিধবা রমনীরা এখন মাছ মাংস ভালবাসতে শিখেছে পাশাপাশি অগুণিত ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর ও মাছ মাংসের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে’। আমরা গোড়া মতাদর্শের কবি জয়ানন্দের দেয়া সূত্র থেকে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এখানে আমরা দেখি মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর রাজদণ্ড ধারণ তৎকালীন গোড়া মতাদর্শের হিন্দু সমাজের সংস্কৃতির নানা দিক, খাদ্যাভাস, শ্রেণিভেদ, নারীর সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা, পোশাক-পরিচ্ছদসহ নানা আঙ্গিকে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিল। মানিক চন্দ্র রাজার গানে একজন হিন্দু রাজপুত্রের পাগড়ী পরিধান করার কথা জানা যায়। অন্যদিকে নতুন কলিঙ্গ শহর পত্তনের পর সেখানকার কালকেতুর রাজদরবারে যাওয়ার সময় জনৈক কায়স্থ ভাড়ুদত্তও পাগড়ি পরেছিলেন বলে জানা যায়। এছাড়া মুসলিম ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানে আগত হিন্দু অতিথিদের অনেকে মুসলমানদের মতো পোশাক পরিধান করতেন। মুহাম্মদ কবির রচিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থে মধুমালতীতে যুবরাজ মনোহরের পাগড়ি ও আবা নামক ঢিলা জামা পরিধানের তথ্য রয়েছে যা একান্তই মুসলিম সমাজে প্রচলিত ছিল। অন্যদিকে প্রখ্যাত হিন্দু কবি রামায়ণের রচয়িতা কৃত্তিবাস, মনসা মঙ্গলের রচয়িতা বিজয়গুপ্ত, মনসা বিজয়ের রচয়িতা বিপ্রদাস পিপিলাই এবং বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবতের মধ্যে তৎকালীন সম্ভ্রান্ত হিন্দু রমণীদের মুসলমানি পোশাক পরতে দেখা যায়। বিবরণীতে তাঁদের ঘাগরা, কামিজ, সালোয়ার, ওড়না এবং চোলি ব্যাবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি অনেকে মুসলমান সমাজে প্রচলিত নানা ধরণের সুগন্ধিও ব্যবহার করতেন। এই সকল তথ্যসূত্রের আলোকে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ দীনেশ চন্দ্র সেন মন্তব্য করেছেন ‘মুসলিম আমলে হিন্দু অভিজাত সম্প্রদায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মতোই পোশাক পরিধান ও কেশবিন্যাস করতেন। শুধু সিঁথিতে সিঁদুর আর কপালে তিলক বা চন্দনের ফোঁটার উপস্থিতিতে তাদের হিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হতো। অন্যদিকে হিন্দু সমাজ থেকে সাধারণ মুসলিম সমাজে লুঙ্গি, ফতুয়া, ধুতি পাঞ্জাবীর মতো পোশাক প্রচলিত হতে দেখা যায়। অনেক মুসলিম রমণীকে ভারতীয়দের আদলে শাড়িতে অভ্যস্ত হতে দেখা যায়। পরবর্তিকালে শাড়িই হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে প্রায় সকল ভারতীয় রমণীদের সাধারণ পোশাকে পরিণত হয়। তবে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের  মানুষই এই দেশের আবহাওয়া জলবায়ুর কথা বিবেচনা করে আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করতো না বললেই চলে। প্রায় সবাই ঢোলা  পোশাকে অভ্যস্ত ছিল।
দুই ধর্মের পারস্পরিক সংস্পর্শের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারি হিন্দু সমাজে প্রচলিত লক্ষ্মীসরার মতো মুসলিম সমাজে কদমরসূল এর প্রচলন। যদিও বিষয়টি বিশ্লেষণ করার অবকাশ রয়েছ্।ে গবেষণালব্ধ তথ্যে অনুমান করা যায় এদেশে মাজারের জনপ্রিয়তা হিন্দু সমাজের পুজা থেকে চলে আসতে পারে। যদিও বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণ করার অবকাশ আছে। হিন্দু সমাজে প্রচলিত পণ প্রথা থেকে মুসলিম সমাজের রক্ত রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে যৌতুক নামক ভয়াবহ এক সামাজিক ব্যাধি। তৎকালীন ভারতের হিন্দু আর মুসলিম রাজদরবারের মধ্যে একটা বিষয়ই কেবল ভিন্ন ছিল আর তা হচ্ছে মুসলিম প্রশাসনে প্রাধাণ্য ছিল কাজি বা বিচারকদের এবং হিন্দু প্রশাসনে প্রাধান্য ছিল ব্রাহ্মণদের। হিন্দু জমিদারগণ মুসলিম আচার অনুষ্ঠান পালন করার পাশাপাশি সুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ রাজকার্যে নিয়োগ করতেন। মুকুন্দরামের চণ্ডিমঙ্গল কাব্যের তথ্যে জানা যায় গুজরাটের নতুন শহরের রাজা কালকেতু তার সৈন্যদলের অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য বেশ কয়েকজন মুসলিম সৈন্য নিয়োগ করেন। এ থেকে ধারণা করা যায় হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক সময়ের আবর্তে অনেকটা নৈকট্য লাভ করে।
ইতিহাস ও সাহিত্যিক নানা সূত্র থেকে দেখা যায় সেন শাসনামলে এসে হিন্দু সম্প্রদায় ব্রাহ্মণদের মাধ্যমে নানা শোষণ নির্যাতনের শিকার হতো। কিন্তু মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলমানদের সমাজের সংস্পর্শে এসে হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণদের সেই একধিপত্য অনেকাংশে খর্ব হয়। তাদের অধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে সাধারণ হিন্দু জনগোষ্ঠী অনেকাংশেই মুক্তিলাভ করতে সক্ষম হয়। প্রেক্ষাপট বিচার করলে আমরা বলতে পারি মুসলিম শাসকদের ভূমিকায় ব্রাহ্মণদের একাধিপত্য খর্ব করার পরেই সাধারণ শ্রেণীর হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থগুলো পাঠ করা, বিশ্লেষণ করা কিংবা সমালোচনা করার সুযোগ পায়। গোয়ালা রামনারায়ণ গোপ, ভাগ্যমন্ত ধুপি প্রমুখ নিচু শ্রেণীর হিন্দুর পাশাপাশি নাপিত, হাড়ি ও সাহারাও কাব্যচর্চা ও বিদ্যালাভের সুযোগ পায়। আমরা এর অনুষঙ্গ হিসেবে গণমানুষের দেবী মণসাকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাব্য লিখিত হতে দেখি। তবে হিন্দু সমাজের এহেন পরিবর্তনের পেছনে মুসলিম শাসকবর্গের ভূমিকাকে নেহায়েত ত্চ্ছু করে দেখার অবকাশ ছিল না। ইতিহাস যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায় বাংলায় হিন্দুদের সমাজ সংগঠনে সুলতানদের রাজদরবারে কর্মরত হিন্দু কর্মকর্তা কর্মচারীদের একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল। আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এই দিক দিয়ে সবার চেয়ে বেশি এগিয়ে ছিলেন। দবির খাস ও সাকর মল্লিক উপাধি খ্যাত দুই ভাই রূপ-সনাতন ছিলেন হুসেন শাহের দরবারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। সুখময় মুখোপাধ্যায়ের দেয়া (বাংলার ইতিহাসের দুশো বছরÑস্বাধীন সুলতানদের আমল) কিছু খোঁড়া যুক্তিকে কেন্দ্র করে পরবর্তিকালের ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন (ঞযব জরংব ড়ভ ওংষধস ধহফ ঃযব ইবহমধষ ঋৎড়হঃরবৎ) একটু তর্ক করার অবকাশ খুঁজে পান। তাঁর মতে এই রূপ-সনাতন-এর উচ্চপদে নিয়োগ তৎকালীন সময়ে হিন্দু মুসলিম সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক প্রমাণে যথেষ্ট নয়। তাঁরা এটিকে নিছক রাজনৈতিক কৌশল বলে দাবি করেছেন। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায় আলাউদ্দিন হুসের শাহের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন মুকুন্দ দাস। আলাউদ্দিন হুসেন আর যাই হোক রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করতে গিয়ে কখনই নিজের জীবন নিয়ে খেলবেন না। হুসেন শাহের তাই আমরা যুক্তিবিচার আর তথ্যপ্রমাণের আলোকে রিচার্ড ইটনের খোঁড়া যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারছি। পরবর্তিকালে রিচার্ড ইটনের মতো ইতিহাস লেখকদের প্রভাবে আচ্ছন্ন কোনো কোনো রচনাও মধ্যযুগের সমাজ ইতিহাসের সত্য খণ্ডিত করেছে।
নিজেদের আভিজাত্যের অচলায়তনের ভেঙ্গে যাওয়ায় বৈষ্ণব প্রভাবিত নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের প্রতি ব্রাহ্মণরা খর্গহস্ত হয়ে পরে। কারণ তাদের মনে এক ভীতির সঞ্চার হয় যে এই নিুশ্রেণি যাদের তারা চিরকাল পায়ের নিচে দলিত মথিত করেছে তাঁরা যদি একবার শিক্ষা-দীক্ষা আর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্্রাহ্মণদের থেকে এগিয়ে যায় তাহলে কোনদিনই আর ব্রাহ্মণরা সমাজে তাদের অবস্থান ফিরে পাবে না। দারুন হতাশায় জর্জরিত ব্রাহ্মণদের তূণ থেকে বের করা একেকটি তীর যখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছিল তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় একটি অভিনব পদ্ধতি অনুসরণ করে বাঙলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে সাম্প্রদায়িকতার বিষে নীল করতে হবে। তারা এই প্রচারও চালায় নিু শ্রেণীর মানুষ যদি ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে তাহলে এর ক্রিয়া শক্তি বিনষ্ট হবে। কিন্তু তৎকালীন হিন্দুদের সামনে জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন। যদি স্বয়ং সুলতান থেকে শুরু করে সবাই পড়লে জাত না যায়, হিন্দু ধর্মগ্রন্থ তাহলে এক ব্রাহ্মণ বাদে অন্যরা পড়লে বা চর্চা করলে বা বিশ্লেষণ করলেও কোন জাত যাবে না।
মুসলমান শাসকদের কৌশলে বিভিন্ন নিুশ্রেণীর হিন্দুরা যেখানে নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেয়ে তাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিলেন সেখানে অনেক  ব্রাহ্মণও পরিস্থিতির চাপে পড়ে তাদের নীতিগত দিকে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন। এই সময়ে ব্রাহ্মণ্যবাদে সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে বিশেষত কায়স্থ শ্রেণির হিন্দুরা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়েছিল। বিদ্যাচর্চার দ্বার উন্মুক্ত হওয়াতে এই সকল ব্যক্তিবর্গ তাদের প্রতিভার সাক্ষর রেখে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশেষ উন্নতি সাধনে সহায়তা করেছিল। প্রখ্যাত কবি গুণরাজ খান বা মালাধর বসু, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, যশোরাজ খান, কাশীরাম দেব, বিজয় গুপ্ত, লোচনদাস, কৃষ্ণদাস  কবিরাজ, গোবিন্দ দাস প্রমুখ কবি সাহিত্যিকদের প্রায় সবাই ছিলেন বৈদ্য কিংবা কায়স্থ শ্রেণীর।
বাংলার রাজদণ্ডে মুসলিম শক্তির আগমনের পর সব থেকে উল্লেখযোগ্য সামাজিক সংস্কার ছিল কুলীন বা কৌলিণ্য প্রথার উচ্ছেদকরণ। কুলীন প্রথার মাধ্যমে একটি শ্রেণিকে সমাজের সিংহাসনে বসানো ও অপর জাতিগোষ্ঠীর সম্মান ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল সেন শাসক বল্লাল সেনের আমলে। সেন রাজা লক্ষণ সেনের আমলে হিন্দু ব্রাহ্মণদের একধিপত্য, মাত্রাতিরিক্ত গোঁড়ামি আর অনুদার ধর্মনীতি হিন্দু সমাজের ভিত্তিকে একেবারেই দুর্বল করে দিয়েছিল। ব্রাহ্মণদের ভূমিকার কারণে এসময় হিন্দু ধর্ম একটি বিশেষ শ্রেণির প্রধান্য আর কিছু আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের সারসংক্ষেপ হয়ে যায়। তথাকথিত সুবিধাভোগী লোভী আর সুবিধাবাদী ব্রাহ্মণগণ যেখানে তাদের নিচু শ্রেণীকে ঘৃণার পাশাপাশি মুসলিম শাসকদের ম্লেচ্ছ এবং অস্পৃশ্য বলে কৃত্রিমভাবে দূরে থাকার ভান করতো সেখানে নিচু শ্রেণির হিন্দুরা সামাজিকভাবে একটি মর্যাদা লাভের আশায় ধীরে ধীরে মুসলমানদের সাহচর্যে আসতে শুরু করে।
ব্রাহ্মণ্যবাদ বিকাশে পুরোহিতদের একধিপত্য সমাজে নারীর অবস্থানের সাথে কোনো ভোগ্যপণ্য কিংবা পশুর অবস্থানের তেমন পার্থক্য রাখেনি। কিন্তু মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার পর নারীরাও তাদের কৃতিত্বের যথাযথ মর্যাদা পেতে শুরু করে। আসলে তখনকার সমাজকে মুসলিম সমাজ বলাটা ঠিক হবে না। তখন আসলে গ্রহণ বর্জনের উদারতার মধ্য দিয়ে হিন্দু মুসলিম সংস্কৃতির একটি মডারেট রূপ বাংলায় বিরাজ করছিল। কুলীন উপাধিধারী ক্ষমতালোভী আর স্বার্থান্বেষী ব্রাহ্মণদের নানামুখী চোখরাঙানি এমনি সমাজচ্যুত করার হুমকিকেও অগ্রাহ্য করে নিচু শ্রেণির হিন্দুরা মুসলমানদের সাহচার্যে আসতে থাকে। ফলে তারা বিভিন্নভাবে লাভবান হয়। অন্যদিকে মুসলমানরাও একান্ত বিশ্বস্ত এদেশীয় একটি শ্রেণির সহায়তা লাভ করে তাদের শাসন কাঠামোর ভিত্তি মজবুত করার পথ পেয়েছিল। বিশেষত ব্রাহ্মণদের সাথে বিরোধের ফলে সমাজচ্যুত হয়ে হিন্দু বেশ কয়েকটি নতুন দলের জন্ম দেয়। তারা পরবর্তিকালে মুসলমানদের সাথেই যুক্ত হয়েছিল। বিশেষত এই সব সমাজচ্যুত হিন্দুদের মধ্যে শেরখানী, শ্রীমন্তখানী আর পিরালি শ্রেণীর প্রভাবেই কৌলিণ্য প্রথা তিরোহিত করা সম্ভব হয়। তবে অবাক করার বিষয় হলো এই গোঁড়া ব্রাহ্মণদের কেউ কেউ সামাজিক অবস্থান সংহত করতে মুসলিম শাসকবর্গ এমনকি নিচু শ্রেণীর হিন্দুদের সাথে পর্যন্ত আপোস করেছে। দেবীবর ঘটক নামক এক ব্রাহ্মণের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যকে ব্রাহ্মণরা সমাজচ্যুত করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত  পরিবার রক্ষার্থে তিনি একটি নিয়ম বের করেন। যার আওতায় তারা তাদের প্রাক্তন সামাজিক অবস্থান উদ্ধার করতে সক্ষম হন। ঠিক এর পাশাপাশি কায়স্থ সমাজেও একটি সংস্কারের ছোঁয়া লাগে। একজন কায়স্থ প্রধান পরমানন্দ বসু কায়স্থদের সমাজে প্রচলিত কৌলিণ্য প্রথার উপর ভিত্তি করে বিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়ম কানুনে বেশ কিছু পরিবর্তন সাধন করেন। তৎকালীন বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্কারের ফসল হিসেবে সকল সাম্প্রদায়িকতার নাগপাশ ছিন্ন করে কবি চণ্ডিদাস-এর কন্ঠে উচ্চারিত হয়Ñ
‘ শুনহে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ’॥
ধর্মপুজা নামে একটি লৌকিক ধর্মীয় বিশ্বাস হিন্দু সমাজের উপর মুসলিম সমাজ ও জীবনাচারণের প্রভাব প্রমাণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা সম্প্রদায়ের মূল বৈশিষ্ট্য এরা একেশ্বরবাদী ছিলেন। ধর্মঠাকুর নামে পরিচিত এই সম্প্রদায় সকল ধর্মমতের মানুষের একাতœ হয়ে ও মিলেমিশে বসবাস করার পক্ষপাতী ছিলেন। এই বিশেষ সম্প্রদায়ের উত্থান পরবর্তীকালে হিন্দু সমাজে ভেদাভেদ  ও বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি বিন্যাস রোহিতকরণে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। পরবর্তীকালে অনেকটাই মুসলিম সুফি মতবাদের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত  বৈষ্ণব মতবাদেও শ্রেণীভেদের বদলে মানুষের ঐক্যের প্রতি জোর দেয়া হয়। প্রকৃত অর্থে মুসলিম সমাজের দৌর্দণ্ড প্রতাপের মাঝে শ্রী চৈতণ্যদেবের মানব ধর্ম প্রচারের জন্যই হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু সমাজ টিকে যায়। বৈষ্ণব মতাদর্শী কীর্তনীয়ারা তাই যত বেশি মুসলিম সমাজের সাথে বিরোধিতায় জড়িয়েছিলেন তার থেকে ঢের চক্ষুশূল হন ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের। বর্তমান সময়ের মধ্যযুগের আঁকর সূত্র বিশ্লেষণ না করা কোনো কোনো ইতিহাস চর্চাকারী বিশেষত ভারতের সাবঅল্টার্ণগ্র“প-এর চোখে দুই একটি অংসঙ্গতি অনেক বড় হয়ে ধরা পড়েছে। তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলার চেষ্টা করেছেন মুসলিম শাসকবর্গ কীর্তনীয়াদের অবাধ কীর্তনে বাধা দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসের সূত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে গভীর রাত্রে মানুষের ঘুমানোর সময় সমস্যা করে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম বলে ঢোল করতাল পিটে চিৎকার করায়’ সমাজের সকল শ্রেণি পেশার মানুষের অনুরোধে কাজি এই ধরণের কোন আদেশ দিতে বাধ্য হয়ে থাকতে পারেন। এই ধরণের বিষয়কে সামনে রেখে সাবঅল্টার্ণ গ্র“প যেভাবে চোখ বন্ধ করে বর্তমান সময়ের হিন্দু মুসলিম দা-কুমড়া সম্পর্কের বিপরীতে অতীতের সেকুলার ইতিহাসকে একটি নির্মিত আদিকল্প বলে উপস্থাপনের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে তা নিতান্তই অমূলক, বিভ্রান্তিকর এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষে বিষাক্ত। বরঞ্চ চৈতণ্য চরিত কাব্যে হিন্দু কবিদের জবানী থেকেই জানা যায় চৈতণ্য বিরোধী অভিযোগ যাচাই করে নদীয়ার কাজী কোনো দোষ দেখতে পাননি। তাই তিনি চৈতণ্যদেবকে স্বাধীনভাবে তাঁর কীর্তন প্রচারের অনুমতি দিয়েছিলেন।
মুসলিম অধিকারের  আদিপর্বে বখতিয়ার খলজীর মুদ্রা আবিষ্কারের পর থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে হিন্দু প্রতীকের ব্যবহার, মসজিদের নামকরণ, তোঘরা লিপিতে স্বরস্বতীর বাহন রাজহাঁসের সাঁতার কাটার দৃশ্যে হিন্দু প্রভাবের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। পাশাপাশি হিন্দু সমাজে নানা ধর্ম সম্প্রদায়ের উত্থান তৎকালীন সময়ে হিন্দু মুসলিম সুম্পর্কের প্রতিই ইঙ্গিত করে। দুই একটি বিচ্ছিন্ন বিতর্ক কখনই ইতিহাস হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। এগুলো শুধু বিতর্কের টেবিল আর বক্তৃতার মঞ্চে ঝড় তুলতে পারে মাত্র।
বিচ্ছিন্ন দুই একটি শত্র“তার বিষয় বাদ দিলে হিন্দু মুসলিম সমাজে উন্নত একটি সামাজিক সম্পর্ক ছিল।  মোঘল আক্রমণের সময় বারভুঁইয়াদের নেতৃত্বে হিন্দু মুসলিম সম্মিলিত বাহিনীর প্রতিরোধেই মোঘল বাহিনী বার বার পর্যুদস্ত হয়। বিশেষত শ্রীপুরের রাজা চাঁদ রায় ও কেদার রায় সোলায়মান লোহানীকে তাদের সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেন। এগুলো আর কিছুই নয় হিন্দু-মুসলিম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রমাণ। ভুলুয়া তথা বর্তমান নোয়াখালীর হিন্দু জমিদার অনন্ত মাণিক্য তার বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেছিলেন মির্জা ইউসুফ বারলাসকে। কবি বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্য হতে জানা যায় চাঁদ সওদাগরের জাহাজে অনেক মুসলমান কর্মচারী ছিলেন। পাশাপাশি চাঁদ সওদাগরের ছেলে লক্ষীন্দরের বিয়েতে নয়শত মুসলিম গায়ক যোগদান করেছিলেন। আর চাঁদ সওদাগর তার ছেলের বিয়েতে হাসনাহাটির কাজিকে প্রচুর পান প্রদান করেছিলেন। এই রকম আরো অনেক বিষয় আছে যা তৎকালীন সমাজে হিন্দু মুসলিম সুসম্পর্কের প্রতি ইঙ্গিত করে। পাশাপাশি হিন্দু ব্রাহ্মণদের অধিকার হরণ করে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে ব্রাহ্মণগোষ্ঠী কোনদিনই মুসলিম সম্প্রদায় কিংবা মুসলিম শাসকদের মেনে নিতে পারেনি। তারা মুসলমানদের প্রতি যবন ও ম্লেচ্ছ শব্দ প্রয়োগে একটি চিরস্থায়ী বিবাদের বিষবৃক্ষ রোপন করেছিলেন তা আজ অবধি তাদের অনুসারীরা জারি রেখেছে। আর বাংলার ইতিহাসের পাঠপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের হাতেই রচিত। এখানে বর্ণিত হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক আর তথাকথিত নিচু শ্রেণীর কাহিনী মনসা মঙ্গলের কাহিনীতে আকাশ পাতাল ফারাক স্পষ্টত ধরা পড়ে। আমরা রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতো একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদকেও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার উর্ধে উঠতে দেখিনি যা কখনই কাম্য ছিল না। তিনি বখতিয়ার খলজির বাংলা জয়কে খাট করেন লিখেন ‘…বখতিয়ার নামক একজন তুর্কি জায়গীরদার বাঙলা দখল করে’। তিনি এখানে আর একটি বিষয় বেমালুম ভুল করেন। বখতিয়ার জয় করেছিলেন নদীয়া ও লখনৌতি, সমগ্র বাংলা নয়। এখন রমেশ চন্দ্র মজুমদারের পথ ধরে যদি কোন মুসলিম উগ্রপন্থি ইতিহাসবিদ বর্ণণা দিতে শুরু করেন ‘লক্ষণ সেন নামক একজন সেন বংশীয় বৃদ্ধ রাজাকে পর্যুদস্ত করে তুর্কি বীর বখতিয়ার মাত্র সতের জন সৈন্যের সহায়তায় রূপকথার কাহিনীকে হার মানিয়ে নদীয়া জয় করেন’ তখন আমাদের আর বিশ্লেষণ করে বলার অপেক্ষা রাখে না। পাঠক আপনারাই বুঝবেন এই ইতিহাস আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার প্রদত্ত বাণীর মাঝে কোন তফাৎ থাকছে না।
আমাদের বুঝতে হবে ইতিহাসের তথ্যসূত্রের আলোকে বের হয়ে আসা মূল বাস্তবতাকেই গ্রহণ করতে হয়। নতুন নতুন তথ্যসূত্র প্রাপ্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমেই ইতিহাস  স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে পরিবর্তিত হয়, হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তাই বর্তমানের দৃষ্টিভঙ্গিতে অতীত ব্যাখ্যা করা হলে তা হবে নিতান্তই বিভ্রান্তিকর ও অযৌক্তিক। একজন ইতিহাস গবেষকের মূল দায়িত্ব আঁকর বা প্রতœতাত্ত্বিক সূত্রের সহায়তায় ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করে মূল সত্যের কাছাকাছি উপনীত হতে চেষ্টা করা। তবেই ইতিহাসের পাতায় বাস্তবতার যোগসূত্র স্থাপন করা সম্ভব।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s