‘মধ্যযুগ’ প্রত্যয়ের সাধারনীকৃত অর্থ ও ইতিহাসের মূল বাস্তবতা (পর্ব এক জুন ২০১১)


প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কৃষিভিত্ত্বিক সমৃদ্ধ অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশের মাটিতে বারবার বিদেশী শক্তি আক্রমণ শানিয়েছে। পেশীশক্তি আর সামরিক কৌশলে দুর্বলতার কারণে পরাজিত হতে হলেও এই ভূখন্ডের মানুষের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্টকে সামনে রেখে বহিঃশক্তির কাছে অসহায় আত্মসমর্পন করার নজির ইতিহাসে নেই। প্রয়োজনে বাংলার মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে তবুও বিবেক বিসর্জন দিয়ে আত্মমর্যাদাকে ধিকৃত করেনি। প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণ আর সুত্র বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশীদের এই গৌরবোজ্জল ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হয় মধ্যযুগে এসে। মধ্যযুগের শুরুতে একে একে বানিজ্য, ধর্মপ্রচার আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলা অভিমুখে সফল অভিযানের ধারাবাহিকতায় তের শতকের গোড়ার দিক থেকে মাঝামাঝি সময়ে রাজদণ্ডে মুসলিম শক্তির আরোহন লক্ষ করা যায়। ভূপ্রাকৃতিকভাবে বাংলার সুরক্ষিত অবস্থান আর অবারিত সম্পদের মোহে পড়ে বাংলার শাসকগণ বার বার দিল্লীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন যা বাংলার সমাজ সংস্কৃতিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে।

বস্তুুত এই স্বাধীনতা ঘোষণার ফলেই তাঁরা দিল্লীর শাসকবর্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নিজেদের অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে বাংলার মানুষকে একান্ত আপন করে নিতে সচেষ্ট হন। নিজেদের প্রয়োজনেই বাংলাকে তারা নিজের দেশের মতো মনে করতেন।  অস্তিত্ত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকতেই তাঁরা পূর্ণ মেধা, শ্রম , নিষ্ঠা আর পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে এদেশীয় ধারার সংমিশ্রনের একটি নতুন সংস্কৃতি বিকশিত হতে ভূমিকা রাখেন। ফলে যাই হোক সমৃদ্ধ হতে থাকে বাংলার সমাজ সংস্কৃতির নানা দিক। অন্যদিকে হিন্দু সমাজের পাশপাশি বেশ দাপটের সাথে মুসলিম সমাজ বিকশিত হতে থাকে। এই সব বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থা,বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, বস্ত্রশিল্প, যাতায়াত ও পরিবহন,বানিজ্য ও অর্থনীতি  শিল্প-সাহিত্য, স্থাপত্যকলা, পোড়ামাটির অলংকরণ ও চিত্রকলা সহ নানাদিকে উন্নতির সুবাতাস বয়ে যায় মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলে। ১২০৪ থেকে শুরু করে ১৭৫৭ সালের দিকে পলাশির প্রান্তরে ইংরেজ উপনিবেশ বাদী শক্তির কাছে বশ্যতা স্বীকারের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘদিন বাংলার মধ্যযুগের শাসণ ক্ষমতায় বিভিন্ন সুলতান অধিষ্টিত ছিলেন একে তিনটি   স্তরে বিভক্ত করে আলোচনা করা হয়ে থাকে। এর মধ্যবর্তী অংশ অর্থাৎ ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে শুরু করে ১৫৩৮ এ সার্বভৌম বাংলার সুলতানদের মোগল শক্তির কাছে পদানত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলার সমাজ সংস্কৃতিতে সবথেকে বেশি উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল। যা ধারাবাহিক আলোচনায় আসবে।
এক.
শাব্দিক বিচারে ‘মধ্যযুগ’ । প্রেক্ষিতঃ  বর্হিবিশ্ব, ইউরোপ ও তৎকালীন বাংলা
ইতিহাসের বিচারে ইউরোপে ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে আলোকময়তাপর্বের সময়কাল শুরুর পূর্ববর্তী সময়কালকে ‘মধ্যযুগ’ বলে ধরা হলেও ভারত বর্ষের মধযুগ ধরা হয় মুসলিম আগমণের পর থেকে। জেমস মিলের ভারতের ইতিহাসের যুগ বিভাজনে হটকারী আচরণ করে ধর্মকে মূল মানদণ্ড বিবেচনা করেন। কিন্তু যখনই ইংরেজ যুগ শুরু হয় তাকে বেশ দক্ষতার সাথে খ্রিষ্ট্রান যুগ বা বলে বলা হয় বৃটিশ যুগ বা আধুনিক যুগ। এই ভাবে নামকরণ থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপের ইতিহাস রচনা, অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণে সতর্কতা অবলম্বন না করা হলে প্রতিক্ষেত্রেই এই রকম গোলকধাঁধার সামনে পড়তে হয়। এখানে ভারতবর্ষ তথা বাংলার ইতিহাসের মধ্যযুগকে বুঝাতে একটি প্রত্যয় ব্যবহার করা হয় ‘মুসলিম যুগ’। বর্তমান বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে লাদেন, সন্ত্রাসবাদ আর জঙ্গিবাদ যেমন সমার্থক হয়ে উঠেছে। ‘মধ্যযুগ’ শব্দটির সাথে তেমনিভাবে সারসত্তায়িত করা হয়েছে নৃশংসতা আর বর্বরতাকে এবং ইতিহাসের সাথে মিল রেখে এই সারসত্তায়নকে একটি বৈধতাও দেয়া হয়েছে। ধারাবাহিক রচনার শুরুতে আমি ’মধ্যযুগ’ শব্দটির স্বরূপ নিয়ে বিশেষত এই শব্দটির উপরে কিভাবে বর্বরতা ও নৃশংসতা আরোপিত হলো সেটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো। আসলে একটি শব্দ সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন ব্যবহারের মাধ্যমে তার পরিচিতি পায়। তাই প্রকৃত অর্থে কোন শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ নাই তার উপর অর্থ আরোপ করা হয়। যেমন আমরা যদি ছেলেবেলাতে কাঁঠাল গাছকে বাঁশ হিসেবে চিনে আসতাম সেখানে বড় হওয়ার পরেও তাকে বাঁশই বলতাম। তাকে কোনদিনই কাঁঠালগাছ বলে ভুল করতাম না। একটি শব্দ কোন বিশেষ সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে যখন ব্যবহৃত হয় তার উপর একটি অর্থ আরোপিত হয় যা তার পরিচিতি জ্ঞাপক। ‘মধ্যযুগ’ শব্দটি আর বর্বরতা বা নৃশংতা আজ কেন সমার্থক ?? কিভাবে কি ধরণের সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের উপর ভিত্তি করে এটি এর এই পরিচিতি লাভ করেছে এটি বুঝতে আমাদের সে সময়ের পারিপার্শিকতাকে বুঝতে হবে। আমাদের দেশে প্রাপ্ত প্রচলিত ইতিহাস গ্রন্থগুলো প্রায় সবই বৃটিশদের হাতে কিংবা তাদের পেটোয়া কোন বোদ্ধাদের হাতে রচিত যারা ভারত বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যতটা না জানতেন তার থেকে বহুগুণ বেশি আগ্রহী ছিলেন ইউরোপ ও ইউরোপের ইতিহাস সম্পর্কে। সারাটি জীবন ইউরোপ ইউরোপ গান করা আর বৃটিশ উপনিবেশবাদীদের পদলেহনে আত্মতুষ্টির পথ প্রশস্তকারী এই সব ইতিহাসবিদ যখন ভারতের ইতিহাস রচনার গুরুদায়িত্ব লাভ করেন। তখন তাদের কাছে ভারত আর ইউরোপ সাধারণীকৃত হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়। বরঞ্চ সারমেয় হিসেবেএকান্ত বিশ্বস্ত থেকে এই কর্ম যদি সফলভাবে সম্পাদন করে ভারতীয়দের হেয় করা যায় তখন এক আধটা শুকনো হাড্ডি জুটে যাওয়ার সম্ভাবণাও ছিল বৈকি। এই ইতিহাসবিদরা দেখেছেন  বৃটিশদের পায়ের ধুলায় স্থান চেয়ে কারো ভাগ্যে বর হিসেবে প্রভুর পক্ষ থেকে নোবেল জুটেছে। তাই তাঁরা ভেবেছেন  যদি পায়ের ধুলায় গড়াগড়ি দিয়েই নোবেল পুরষ্কার আসে তাহলে পায়ের তালুটা যদি একটু চেটে দেয়া যায় স্বয়ং রাণীর কাছ থেকে বর আসলেও আসতে পারে।
ভারতের মধ্যযুগে বিভিন্ন নগর ভিত্ত্বিক শাসনকাঠামো পরিলক্ষিত হয়। যার উদাহরণ হিসেবে আমরা প্রচুর প্রাচীর বেষ্টিত সুরক্ষিত মধ্যযুগীয় দুর্গনগরী পাই। আর বাংলার ক্ষেত্রে বিষয় ছিল আরো অনেক বেশি বৈচিত্রময়। এখানে মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতির চুড়ান্ত বিকাশের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে টাকশাল নির্ভর শহর গড়ে উঠতে দেখা যায় যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। অন্যদিকে এই একই সময়ের ইউরোপের দিকে নজর দিলে আমরা দেখি সেখানে কৃষিনির্ভর গ্রাম্য সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল। ম্যানর বা এই সকল গ্রামের অধিপতি নাইটরাই ছিল সর্বেসর্বা আর সাধারণ মানুষের মর্যাদা ছিল পশুদের থেকে নিচে। নাইটরা তাদের ক্ষমতার কলেবর বৃদ্ধি করতে তাদের ম্যানরের পরিধি বাড়াতে সদা সোচ্চার ছিল। তারা প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিগ্রহ করতো, আইন আর পেশী শক্তি যেখানে ছিল সমার্থক। কোন দরিদ্র কৃষকের ঘরে সুন্দরী মেয়ে থাকলে তা অনেকটা অলিখিতভাবেই ওই সব নাইটদের হেরেমের সম্পত্তি বলে বিবেচিত হতো। সামাজির নিরাপত্তার অভাব, নিপীড়ন-নির্যাতন, মানহানী আর প্রাপ্য ন্যায্য অধিকার হরণে নারীরা তখন কোনঠাসা হয়ে পড়েছিল। ধর্মচর্চাকে অনেকটাই রবিবারের নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়ে শুধু ভোগবিলাস,লাম্পট্য, মারাহারি, খুন, ধর্ষন, নারী-নির্যাতন আর দখল-বেদখল নিয়েই তখনকার ইউরোপের রাজনীতি আবর্তিত হতো। এভাবে নাইটদের মারামারি খুনোখুনিতে মানুষের অসন্তুুষ্টির পাশাপাশি আরেকটি শ্রেণীও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। তারা তখনকার ইউরোপের পোপ বা খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা। একটি সময়ে তারা দেখিয়েছিলেন ধর্ম কতটা সুন্দর এবং শৈল্পিকভাবে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একজন মানুষকে শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম। এই সকল ধর্মগুরু বা পোপরা একদিকে রাজা রাজড়াদের উপরে ছড়ি ঘুরাতেন অণ্যদিকে সাধারণ মানুষকেও বেশ সুন্দরভাবে লালটুপি পরিয়ে তাদের কাছ থেকেও কলাটা মুলোটা কম আদায় করতেন না। নাইটদের দাপটে পোপের ক্ষমতা অনেকাংশেই কমে যায় তার কলা মুলোর সরাবরাহও বন্ধ হতে থাকে। তাই বিচক্ষন পোপ বুঝলেন এই নাইটদের ঝগড়া বিবাদ থামাতে গেলে তাদের রোষানলকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে। তাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এক সভায় পোপগণ সম্মিলিতভাবে ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের ডাক দেন। পিটার দ্য হার্মিট কৃষক আর নাইটদের মধ্যে এই মর্মে বাণী প্রচার করেন যারা ক্রুসেডে যোগ দেবে তাদের সকল অন্যায় মহান যীশু মাফ করে দিবেন। তার বর্ণণায় ক্রুসেডে যাত্রা আর স্বর্গের টিকিট অনেটাই সমার্থক হয়ে ওঠে। তারপর পরপর সংঘটিত কয়েকটি ক্রসেডে নাইটদের জিঘাংসা চরিতার্থকারী নির্মম বর্বরতা পুরো মধ্যযুগের ইতিহাসকেই কলঙ্কিত করে। ১২১২ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত শিশু ক্রুসেড পৃথিবীর ইতিহাসের সকল বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যায়।
১২৯২ এর পর ক্রুসেডের উন্মাদনা থেমে আসলেও সেই অপকর্মের প্রমান হিসেবে পুরো মধ্যযুগের ইতিহাসই কলঙ্কিত হয়ে যায় তার সাথেই অনেনটা সাধারণীকরণের ফলে বিকৃত হয়েছে বাংলার মধ্যযুগ।
গত মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রোমানা মঞ্জুরের প্রতি তাঁর বিকৃত মস্তিকের স্বামী সাইদের আক্রমণের খবর অনেকটা হটকেকের মতোই বিকিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রচারমাধ্যম আর ডিজিটাল যুগে ব্লগ-ফেসবুক-টুইটার পাড়াও ছিল সরগরম। কর্পোরেট যুগের প্রচার নির্ভর বানিজ্যের প্রপাগন্ডায় একজন নারী কিভাবে পণ্যে পরিণত হন তা আমরা এর আগেও অনেক দেখেছি। কিন্তু  এই ক্ষেত্রে একজন অসহায়ের বিপদের দিনে গ্রীষ্মের দাবদাহের মাঝেও কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থেকে বেশ পরে বাজার দখলের লড়াইয়ে হটাৎ করে সহানুভুতির নামে মিডিয়া  যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশে মেতে ওঠে। দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা তাদের জ্ঞানের কুয়ো থেকে বের হতে না পারায় দেশের নামকরা পত্রিকার সম্পাদকীয় আর উপসম্পাদকীয় পাতাগুলো একটি  বস্তাপচা শব্দের নানামুখী উপমার রসালো উপস্থাপনায় টইটম্বুর হতে থাকে। এই বস্তাপচা ফসিল শব্দটিকে আমি চিহ্নিত করেছি ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ হিসেবে আর মনস্থ করেছি একে একটি ধারাবাহিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।প্রথমত যায় যায় দিন পত্রিকায় সাপ্তাহিক হিসেবে লিখতে মনস্থ করেছিলাম কিন্তু দশদিক পত্রিকাতে প্রতিমাসে একবার লিখতে হবে তাই অনেক সময় পাবো এই ভেবে শেষ পর্যন্ত এখানে লিখতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি। আমদের দেশের বাস্তবতায় মধ্যযুগ আর অন্যান্য দেশ এমনকি ভারতের মধ্যযুগও যে ভিন্ন ছিল এটা প্রমাণিত সত্য। কিন্তু ইতিহাস থেকে দিনের পর দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে সিনেমায় দেখা ক্রুসেডার নাইটদের বর্বরতাকে আমাদের দেশের সাথে অনেকটাই সাধারণীকৃত করে ফেলে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। আর পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে একটি বস্তাপচা শব্দ বছরের পর বছর বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেউ এসিড নিক্ষেপ করুক, স্ত্রীকে তালাক দিক, কোন অভিনেত্রী মডেলের সাথে তার ছেলে বন্ধুর ফস্টিনষ্টির ভিডিও ক্লিপ বের হোক,নারী নির্যাতন হোক, ইভ টিজিং হোক আর পাগলা বাবার চিকিৎসায় মানুষ বিভ্রান্ত হোক এ সবই যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতা। বাংলাভাষার সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডারে এর বাইরে মনে হয় আর কোন শব্দই নেই।
ধিক !! এই বিভ্রান্তির ইতিহাস লালনকারীদের জন্য। ধিক!! এই বস্তাপচা একটি শব্দের ব্যবহারে দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে কলঙ্কিতকারীদের এই কুপমন্ডুকতাকে। ইতিহাসের বাস্তবতায় সেই পাথর যুগ থেকে এক ধারাবাহিক সংস্কৃতিক উন্নয়ন আমাদের দেশের ইতিহাসকে তার দিশা দিয়েছে। যেখানে বিভিন্ন বহিঃশক্তি বার বার জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে সংস্কৃতিকে তার মূল ধারা থেকে গতিমন্থর করতে পারলেও একেবারে স্তব্ধ করে দিতে পেরেছে এমনটি নয়। ইতিহাসের সুত্র আর প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণকে সুত্র বিবেচনা  করে রাজনৈতিক ইতিহাসের বিপরীতে সমাজ সংস্কৃতির দিকে নজর দিলে বাংলার মধ্যযুগ ছিল এক উজ্জল অধ্যায়। আমার ধারবাহিক রচনাগুলো যদি চালিয়ে যেতে পারি সেখানে রাজনৈতিক ইতিহাসের থেকে মধ্যযুগের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সবসময় আলোচনার টেবিলে অনুপস্থিত সমাজ সংস্কৃতির চিত্রই স্থান বেশি পাবে।  তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বাংলার মধ্যযুগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকেও কিছুটা দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। শাসতন্ত্রের ধারার উপর ভিত্তি করে আমরা মোটাদাগে বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসকে দুটি কালপর্বে বিভক্ত করতে পারি সুলতানী ও মোগল আমল। যেখানে বাংলার স্বাধীন সুলতানী যুগ গৌরবোজ্জল অধ্যায়ের সাক্ষর বহন করে।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম ১৯৫৯ সালের দিকে তাঁর অমর গ্রন্থ প্রকাশের পর থেকেই বাংলার মধ্যযুগের সমাজ সংস্কৃতি লেখক, গবেষক আর বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি সুখময় বন্দোপাধ্যায় ড.এম এ রহিম এবং সাম্প্রতিক গবেষকদের মধ্যে অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ এর গবেষণায় ধীরে ধীরে বাংলার মধ্যযুগ বিশেষত মধ্যযুগের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস একটি আলোর দিশা পায়। ড আবদুল করিমের গবেষণায় আমরা বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমল পর্যন্ত যেখানে রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। পরবর্তিকালে অধ্যাপক ড. শাহনাওয়াজ মধ্যযুগের মুদ্রা ও শিলালিপি বিশ্লেষণ করে সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে একটি বস্তুনিষ্ঠ ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তবে মুদ্রা ও শিলালিপি গুলো যেগুলো বিশেষত সুলতান বা সম্রাটদের দ্বারা জারি করা সেখানে রাজশাসন, শাসনের সময়কাল আর শাসণ কাঠামো সম্পর্কিত তথ্য যতটা সুন্দর ভাবে পাওয়া যায় সেখানে সমাজ সংস্কৃতির ধারণা করা অনেকটাই কঠিন। তবুও মুদ্রায় উৎকীর্ণ প্রতীক, চিহ্ন অলংকরণ প্রভৃতি থেকে সমাজ সংস্কৃতির নানা দিক সম্পর্কে ধারণা লাভ করে ঐ সময়ের প্রচলিত লোককথা-লোকগাথা বিভিন্ন ভ্রমণ-বৃত্তান্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে প্রতিতুলনা করে বাস্তব ইতিহাসের ধারণা লাভ করা সম্ভব। পরবর্তী পর্বে বাংলায় মুসলিম আগমন ও দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ এর ফলাফলের পাশাপাশি বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পটভূমি নিয়ে আলোচনা করা হবে।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থ-গবেষক,প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
aurnabmaas@gmail.com
Archaeology Of Humankind
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s