রাজধানী ঢাকার চারশ’ বছর শিরোনামে ইতিহাস বিকৃতিকারী এই হটকারীতার অবসান কবে হবে ?


ইতিহাসের সুত্র আর প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমানকে অনেকটা পায়ে মাড়িয়ে  কয়েকবছর যাবত এক শ্রেনীর ইতিহাস ঐতিহ্যের বানিজ্যকারী  ব্যবসায়ী প্রকৃত ইতিহাসচর্চার অভাবে বাংলাদেশের মানুষ বিশেষ করে ঢাকাবাসী গত তিন বছর ধরে চারশ বছর জ্বরে আক্রান্ত। গত প্রায় এক যুগ ধরে বাংলার ইতিহাসে নতুন গবেষণার ফসল যুক্ত হয়েছে। তার আলোকে গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছেÑপুনর্গঠিত হয়েছে ইতিহাসের কোনো কোনো অধ্যায়। কিন্তু এসব চর্চার সাথে সম্পর্ক না থাকায় বা অন্য কোনো কারণে ইতোমধ্যে পরিত্যাজ্য পুরোন ইতিহাস ধারণার ওপর ভর করেই কিছু সংখ্যক ইতহাস ঘরানার মানুষের সিদ্ধান্তে ঢাকার প্রাচীনত্ব চারশ বছরে এনে দাঁড় করান হয়েছে।

আবার সরাসরি জ্ঞান চর্চায় যুক্ত না থেকে সুশীল সমাজের অনেকেই ইতিহাসের সত্য না খুঁজেÑনতুন গবেষণার খোঁজ না রেখে এ ধারার ইতিহাসবিদদের অনুসরণ করে ঢাকার চারশ বছরের গৌরব গাঁথা নিয়ে নানাভাবে মত্ত থেকেছেন। একারণে চারশ বছর আগে ঢাকায় মোগল আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন এধারার নাগরিকরা। যেন চারশ বছর আগে  ‘মোগলদের তৈরি’ ঢাকার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার অহংকারের বীজ উপ্ত হলো। তাই এযুগের আমরা মোগল আধিপত্যবাদীদের বরণডালায় অভিবাদন করতে উন্মুখ।
এর প্রধান কারণ আমাদের ইতিহাস গবেষণা অনেকটা আটকে আছে ঔপনিবেশিক কালপর্ব থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কালের ভেতর। ফলে বাংলা অঞ্চলের মানুষের হাজার বছরের কৃতি আর তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য অনেকটাই আলোতে আসেনি তেমনভাবে। তাই চারশ বছর আগে সতের শতকের শুরুতে মোগল আধিপত্য যখন আড়াইশ বছর স্থায়ী বাংলার স্বাধীনতার অবসান এবং বাংলার ধ্র“পদী সংস্কৃতির পতন ঘটাল তখন ইতিহাস বিচ্ছিন্ন আমরা এ সময়ে এসে বিশাল এক উদারতায় যেন মোগল আধিপত্যবাদকে স্বাগত জানালাম। ঐতিহাসিক নগরী ঢাকার প্রাচীনত্বের খোঁজ না রেখে এপর্যন্ত পাওয়া গবেষণা সূত্রের আলোকে বললেও প্রায় অর্ধেক কালপরিসর ছেটে ফেলে ইতিহাস বিচ্ছিন্ন নগরবাসী থেকে শুরু করে দেশবাসীকে বোঝাতে অনেকটাই সফল হয়েছি যে ঢাকা নগরী গড়ে ও বেড়ে উঠেছে চারশ বছর আগে। রাজধানীর মত একটি বিভ্রান্তিকর ঐতিহ্য খোঁজা হয়েছে চারশ বছর আগে থেকে।
বাংলার মানুষের হাজার বছরের স্বাধীনতার সংগ্রামের ঐতিহাসিক সূত্র আমরা হারিয়ে ফেলেছি বলেই এই বিভ্রান্তি ছড়ানো সম্ভব হয়েছে। প্রাচীনতমকাল থেকে পথ পরিক্রমণ করে যদি স্বাধীন সার্বভৌম আজকের বাংলাদেশে প্রবেশ করি তো দেখবো এই ভূখণ্ডের মানচিত্রের রেখায় বহুবার রূপান্তর ঘটেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তিত হয়েছে অনেকভাবে। রাজদণ্ডের হাত বদল হয়েছে নানা জাতির রাজন্যবর্গের কাছে। তাই রাজনৈতিক জীবনধারার উপরিকাঠামোটিকে সহজেই চেনা যায়। ক্ষমতার পালা বদলের ইতিহাস তাই আমাদের কাছে স্পষ্ট। কিন্তু আবহমানকালের বাংলার মানুষের যে জীবনবোধ, তার স্বাধীন সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করার যে তীব্র আকাক্সক্ষা তাকে আবিষ্কার করা হয়নি তেমনভাবে। তাই একাত্তরে বাঙালির বিস্ফোরণকে ততোটা সূক্ষ্মভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। একই কারণেই বোধহয় মোগল আধিপত্যবাদ অনেকের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ায় সমালোচিত হয়নি।
ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারাক্রম যদি অস্বীকার না করি তবে মানতেই হবে যে আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ছিল পরাভব না মানা মুক্তি প্রত্যাশী বাঙালির অবধারিত পরিণতি। কারণ হাজার বছর ধরেই বাঙালি তার সংগ্রামী চেতনাকে ধারণ করে এগিয়েছে।
ভারত ভূমিতে বিদেশী শক্তির আবির্ভাব বৈদিক সাহিত্যের সূত্রে দু’হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে দৃশ্যমান হয়েছে। আর্য শক্তি গ্রাস করেছিল ভারতভূমি। এক হাজার বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের সুসংহত অবস্থান তৈরি করে চলছিল আর্য শক্তি। ভারতের কৌম জাতিগোষ্ঠী পরাভব মেনে নিয়েছিল অনেকটা নীরবেই। আন্তঃমিশ্রণের মধ্যদিয়ে তারা আর্য বংশোদ্ভূত জাতিগোষ্ঠীর নামাবরণে অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু প্রাচীনকালে বাঙালি তাদের আÍমর্যাদাবোধকে বিকিয়ে দেয়নি। বৈদিক সাহিত্যই স্বীকার করেছে বাঙালিরা আর্য বংশোদ্ভূত নয়। বাঙালির বীরত্ব যে আর্য আগমনকে রুখে দিয়েছিল তা বৈদিক সাহিত্যে পরাজিতের ক্ষোভ থেকেই বোঝা যায়। ইতিহাসের এ সত্যটি অনুভব করতে হবে মধ্য এশিয়ার যাযাবর আর্যরা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনেই ঐশ্বর্যশালী ভারতভূমিতে এসেছিল। প্রাচীনতমকাল থেকেই বাংলার ঐশ্বর্যের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল বহির্ভারতে। তাই সাধারণ যুক্তিতেই বাংলাকে গ্রাস করার আকাক্সক্ষা থাকবে আর্যদের। অথচ ভিন্ন কথা বলছে বৈদিক সাহিত্য। ‘শতপথ ব্রাহ্মণে’র প্রথম খণ্ডের চতুর্থ অধ্যায়ের পাঠ বিশ্লেষণ করলে এ রহস্যের একটি সমাধান মেলে। বলা হয়েছে আর্য মুনি বিদেঘের মুখ দিয়ে আগুন বেরুতো। সে আগুনে পুড়ে পবিত্র করা হতো ভারতভূমি। আর এই পবিত্র জায়গায় বসতি গড়তো আর্যরা। মুনি বিদেঘ সরস্বতী নদীর তীর থেকে যাত্রা করে সদানীরা নদী পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে থেমেছিলেন। সদানীরা নদীর পশ্চিমে কোশল (অযোদ্ধা) আর পূর্বে বিদেহ (বিহারের একটি অংশ)। অর্থাৎ আরো কিছু অগ্রসর হলে বাংলায় প্রবেশ করা যেতো। সময়ের হিসেবে দেখা যায়, আর্যরা বাংলায় উপনিবেশ স্থাপন করে বৈদিক যুগের শেষে বা তারপরে। বাংলার ঐশ্বর্যের কথা জেনেও এতকাল তারা বাংলায় প্রবেশ করেনি কেন? ইতিহাসের যুক্তিতেই বলতে হবে, বাংলার মানুষের প্রতিরোধের মুখেই তাদের গতি রুদ্ধ হয়েছিল। তাইতো পরাজিতের বেদনা আর ক্ষোভ নিয়ে আর্যগ্রন্থ নিন্দা করেছে বাংলার অধিবাসীদের। বলেছে, বাংলার মানুষ বর্বর, তারা পক্ষীর ভাষায় কথা বলে। নীল রক্তের ধারক আর্যরা তাই সেখানে বসত করেনি! পরে এক সময় অশ্ব আর লৌহাস্ত্রের শক্তিতে বলীয়ান আর্যজাতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি বাংলার জনগণের। তখন তো ‘অস্পৃশ্য’ বাংলায় বসতি গড়ায় কোনো সংকোচ ছিল না আর্যদের!
ভারত উপমহাদেশে সাম্রাজ্যের আদলে বিশাল রাজ্যপাট খুলে বসে মৌর্য রাজারা। মৌর্য শাসনপর্ব শুরু হয় ৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। বাংলায় আর্য ধারার ব্যাপক প্রবেশ মৌর্য শাসন পর্বে। মৌর্য সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে (২৬৯-২৩২ খ্রি. পূ.) উত্তর বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। বগুড়ার মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে এভাবে প্রাচীন নগরী ‘পুণ্ড্র নগরের’ পত্তন হয়। বাংলা মৌর্যদের গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের মর্যাদা পায়। কিন্তু বিদেশী শাসকদের অধীনতায় স্বস্তি ছিল না বাংলার স্বাধীনচেতা মানুষের। বাংলার কোনো কোনো অঞ্চলে তারা সুযোগমতো স্বাধীন রাজত্ব গড়ার প্রয়াস পেয়েছে। বাংলার ‘গঙারিডি’ রাজ্য এরই প্রমাণ। গঙ্গানদীর তীর ঘেঁষে বাংলার মানুষের এই শক্তিশালী রাজ্যটি মৌর্যযুগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চার হাজার সুসজ্জিত হস্তীবাহিনীতে সমৃদ্ধ গঙারিডির শক্তিশালী রাজার সুখ্যাতি গ্রিক বিবরণীতে পাওয়া যায়।
মৌর্যদের পরে সর্বভারতীয় রাজবংশের পত্তন করেছিল গুপ্তরাজারা। ৩০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষলগ্ন থেকেই তাদের রাজ্যপাট গড়া শুরু হয়। ক্রমে বাংলা গুপ্ত শাসনভুক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়। কিন্তু বহির্ভারতীয় এই শাসন তখনো বাংলার মানুষকেকে স্বস্তি দেয়নি। স্বাধীনতা প্রত্যাশী এদেশবাসী বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের উত্থান ঘটিয়েছে। আর এভাবেই গুপ্ত শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বাংলায় কয়েকটি স্বাধীন রাজত্বের উত্থান ঘটে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সমতট রাজ্য আর পশ্চিম বাংলার পুষ্করণ রাজ্য। গুপ্ত শাসন এক সময় বাংলার স্বাধীন রাজ্যগুলোকে গ্রাস করে। তবে শেষ পর্যন্ত সমতট রাজ্য নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল।
৬০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধেই ভারতে বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। দুর্ধর্ষ পাহাড়ি জাতি হূণদের আক্রমণে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় গুপ্ত সাম্রাজ্য। এ সুযোগে সমগ্র উত্তর ভারতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক রাজবংশের উদ্ভব হয়। এভাবে গুপ্ত পরবর্তীকালে উত্তর ভারত জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এই অস্থিরতার ঢেউ এসে লাগে বাংলাতেও। নতুন করে মুক্তির পথ খোঁজে বাংলার মানুষ। অবশেষে বাংলায় দুটো স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটে। এর একটি ছিল প্রাচীন ‘বঙ্গরাষ্ট্র’। এর অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবাংলার দক্ষিণাঞ্চলে। দ্বিতীয় স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম ‘গৌড় রাজ্য’। এর অবস্থান ছিল বাংলার পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল জুড়ে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি এদেশের মানুষ। দাক্ষিণাত্যের চালুক্যবংশের রাজা কীর্তিবর্মনের হাতে বঙ্গ রাষ্ট্রের স্বাধীনতার অবসান হয়। একই সময়ে সমতট রাজ্যে ভদ্র, খড়গ, রাট প্রভৃতি স্বাধীন সামন্তরাজাদের উত্থান ঘটে।
৬০৬ খ্রিস্টাব্দে গুপ্ত অধিকৃত গৌড়কে স্বাধীন করেন শশাঙ্ক। গৌড়ের শক্তিকে তিনি বিস্তৃত করেন উত্তর ভারত পর্যন্ত। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর একশ বছরের অরাজকতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বাংলা। কিন্তু হতাশা বিপন্ন করতে পারেনি বাংলার মানুষকে। দীর্ঘদিনের সংগ্রামী অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে নতুন প্রত্যয়ের জন্ম দিয়েছিল। অন্ধকার থেকে জাতিকে আলোতে ফিরিয়ে আনতে হলে চাই সঠিক নেতৃত্ব। এই উপলব্ধিতে সচেতন হয় বাংলার সাধারণ মানুষ বিশেষ করে অভিজাতবর্গ। তাম্রশাসনে যাদের বলা হয়েছে ‘প্রকৃতিপুঞ্জ’। তারা সেই দ্বন্দ¡বিক্ষুব্ধ সময়ে ইতিহাসে অচেনা গোপালকে এনে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়েছিল। মানুষের নির্বাচন যে ভুল হয় না গোপাল তার প্রমাণ। অচিরেই গোপাল অরাজকতার অবসান ঘটালেন। প্রতিষ্ঠিত হলো পাল সাম্রাজ্য। প্রায় চারশ বছর ধরে পাল বংশের শাসনকাল অব্যাহত ছিল। এভাবে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলার মানুষ প্রথম বৃহত্তর ভূখণ্ড জুড়ে নিজের স্বাধীন রাজত্ব পেল।
পাল রাজাদের দীর্ঘ শাসনকালে অনেক সমৃদ্ধি আর গৌরবের কথা রয়েছে ইতিহাসে। কিন্তু শেষ দিকের পাল রাজারা সম্ভবত গণমানুষের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে ব্যর্থ হন। বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে থাকে। পাল শাসন অবসানের প্রায় দুশ বছর পর একটি কোষকাব্য সঙ্কলিত হয়েছিল। নাম ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’। গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কবিতা-ছড়া নিয়ে এই কোষকাব্যটি শ্রীধরদাস সঙ্কলন করেন। এখানে গ্রাম-বাংলার দারিদ্রপীড়িত মানুষের করুণ চিত্র রয়েছে। ইতিহাসেও দেখা যায় অধিকারের প্রশ্নে সাধারণ মানুষ এ সময় প্রতিবাদ করেছিল শাসকদের বিরুদ্ধে। এগার শতকের শেষলগ্নে পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের সময় উত্তর বাংলায় সংঘটিত কৈবর্ত বিদ্রোহ এরই সরব প্রকাশ। একই সঙ্গে বিদেশী আক্রমণ দুর্বল করে ফেলে বাংলাকে। বিশাল সাম্রাজ্যে দেখা দেয় ভাঙ্গন। এই দুঃসময়ে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও এদেশের মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এর প্রকাশ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় কয়েকটি স্বাধীন রাজ্য। আট শতকের শুরুতেই দেবদের উত্থান ঘটেছিল। দেববংশের চার বিখ্যাত রাজার নাম পাওয়া যায়। এঁরা হচ্ছেন : শ্রী কান্তিদেব, শ্রী বীরদেব, শ্রী আনন্দদেব ও শ্রী ভবদেব। নয় শতকে প্রাচীন হরিকেল বর্তমানে সিলেট অঞ্চলে স্বাধীন রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন রাজা কান্তিদেব। পরে কান্তিদেবের রাজত্ব চলে যায় ‘চন্দ্র’ বলে এক নতুন বংশের নিয়ন্ত্রণে। ক্রমে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় চন্দ্ররা হয়ে পড়েন সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্বাধীন রাজত্বের শাসক। কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয় তাদের। সিলেট ছাড়াও চন্দ্রদের অধিকারে আসে বরিশাল অঞ্চল।
স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়া আবার নতুন উদ্যমে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করা বাংলার মানুষের জীবনের অঙ্গ হয়ে পড়েছিল। এগার শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিদেশী আক্রমণে পরাভূত হয় চন্দ্ররা। একইভাবে ধীরে ধীরে দক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে আসা সেন বংশের সেনা-পুরুষরা  গ্রাস করে বাংলা। সেন শাসন বলে পরিচিত এই বিদেশী শক্তি শতাধিক বছরের জন্য বাংলার স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে। ব্রাহ্মণ সেন রাজাদের তীব্র শোষণ চলতে থাকে বাংলার সাধারণ হিন্দু-বৌদ্ধ জনগণের ওপর। সরব প্রতিবাদের সামর্থ্য না থাকলেও সেন শাসনযুগে বিক্ষুব্ধ হতে থাকে এদেশের সাধারণ মানুষ। তার প্রকাশ অনুভব করা যায় তের শতকের শুরুতে। বহির্ভারতীয় মুসলমান সেনাপতি বখতিয়ার খলজীর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বাংলার সীমানায় যখন সেন রাজারা বিধ্বস্ত হয় তখন সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করেনি। সেন শাসনে তারা এতোটাই বিপন্নবোধ করেছিল যে, অবাঙালির মুসলমান শাসকদের মুক্তির অগ্রদূত ভেবেছিল।
এভাবে অচিরেই বাংলা অবাঙালি মুসলমান শাসনাধীনে চলে আসে। কিন্তু কি চরিত্র ছিল এ সময়ের শাসন পর্বের? এ যুগে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি হয় বাংলার ইতিহাসে। বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মাটি, বাংলার পরিবেশ মুক্তির গান শোনায়। স্বাধীনতার প্রেরণা নেয়। তাই অবাঙালি মুসলমান সুলতানরা কর্মভূমিকার মধ্য দিয়ে অচিরেই যেন বাঙালি হয়ে যান। বিদেশী শাসকের কোনো চরিত্র তাঁদের মধ্যে আর অবশিষ্ট থাকেনি। প্রথমে এঁরা এসেছিলেন দিল্লির মুসলমান সুলতানদের গভর্নর হয়ে। বাংলার মাটিকে ভালোবেসে অচিরেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাদের স্বাধীনতা পাকাপোক্ত হয় ১৩৩৮ সালে থেকে। টানা দুশ বছর স্বাধীন সুলতানদের শাসন অব্যাহত ছিল। বাঙালির কল্যাণের জন্যই সুলতানরা তাঁদের যাবতীয় সামর্থ্য ব্যয় করেছেন। আর তাই বাঙালির সামাজিক সাংস্কৃতিক জীবনে সুবাতাস বয়ে যায় এই কালপরিসরে।
স্বাধীন সুলতানি শাসনের অবসানের পর বাঙালির ভাগ্যাকাশে আবার মেঘের ঘনঘটা দেখা দেয়। ষোল শতকের মাঝামাঝি আফগান নেতাদের হাতে চলে আসে রাজদণ্ড। দ্বন্দ¡-বিক্ষুব্ধ সময় কাটে আফগানদের। তাই সুলতানগণ যে সমৃদ্ধির জোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন তা রুদ্ধ হতে থাকে। বঞ্চিত বাঙালিকে নতুন করে অধিকার সচেতন হতে হয়। ইতোমধ্যে পালাবদল ঘটে দিল্লির সিংহাসনে। মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভারতে। স্বাভাবিকভাবেই মোগল সম্রাটগণ সমৃদ্ধ বাংলাকে নিজ অধিকারে রাখতে চাইবেন। সম্রাট হুমায়ুন প্রথম দিকে কিছুটা সফল হয়েছিলেন। কিন্তু আফগানদের কারণে বাংলা চূড়ান্তভাবে মোগল অধিকারভুক্ত হয়নি। অবশেষে ষোল শতকের শেষপর্বে আফগানদের পরাজিত করে বাংলা উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল মোগল সম্রাট আকবরের অধিকারে চলে যায়। কিন্তু পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের বৃহৎ অঞ্চলে শত চেষ্টায়ও প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি সম্রাট আকবরের। বিদেশী মোগলের বিরুদ্ধে বাংলার জমিদাররা গড়ে তুলেছিলেন শক্ত প্রতিরোধ। বারভুঁইয়া নামে পরিচিত এই জমিদারদের ঐক্যজোট বাংলার স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখে প্রায় অর্ধশতক। শেষ পর্যন্ত পরাভব মেনে নিতে হয়। সতের শতকের প্রথম দশকেই মোগল অধিকারে চলে যায় পুরো বাংলা। এভাবে মোগলরা প্রায় আড়াইশ বছর স্থায়ী বাঙালির স্বাধীনতা কেড়ে নেয়।
সাম্রাজ্যবাদী মোগলরা যে দুঃশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল এমন নয়। তবে ঢাকার চারশ বছরের প্রচারকরা মোগলদের হাতে এই নগরীর পত্তন ও বেড়ে ওঠার যে সাতকাহন প্রচার করছেন তাতে ঐতিহাসিকতার সংকট রয়েছে। সাদা চোখে কতগুলো সত্য অস্বীকার করা যায় না। যেমন মোগল যুগে নাগরিক জীবন বিকাশের কতগুলি লক্ষণ ফুটে উঠেছিল। ঢাকায় জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটেছিল। দেশি বিদেশি বণিকদের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। অনেক মোগল স্থাপত্য তৈরি হয়েছে ঢাকা শহর ঘিরে।
কিন্তু এসব কি নতুন বা অভিনব ঘটনা? স্বাধীন হোক বা পরাধীন হোক নগরায়নের স্বাভাবিক গতিতেই সময়ের পরিক্রমায় জনবি¯তৃতি ঘটবে। পরিবর্তিত চাহিদার সাথে সমন্বয় করে বিন্যাস ঘটবে নানা পেশা ও বাণিজ্যের। স্বাভাবিক প্রয়োজন ও চাহিদার কারণেই স্থাপনা তৈরি হবে। পরাধীন ইংরেজ শাসন যুগে কি ঢাকার অধগতি হয়েছিল? পাকিস্তান শাসন আমলেও কি ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়েনি? সামাজিক ও প্রশাসনিক স্থাপত্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি? ব্যবসা বাণিজ্য বিকশিত হয়নি? তবে প্রশ্ন হতে পারে স্বাধীন ও আধিপত্য স্থাপনকারী শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নিয়ে। মোগল সম্রাটরা সাম্রাজ্য জুড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বাংলা সুবার ক্ষেত্রেও তাঁদের মনোভাব অভিন্ন ছিল। তবে বাংলায় নিয়োজিত সুবাদারদের কর্মপ্রয়াস নিয়ে কিছু প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। বাংলার স্বাধীন সুলতানগণ এই সার্বভৌম দেশটির কল্যাণে পূর্ণ মনযোগ দিয়েছিলেন বলে সমগ্র দেশজুড়ে সমৃদ্ধির প্রতিফলন দেখা যায়। শিল্প ও কৃষি অর্থনীতির বিকাশ ঘটে এই পর্বে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়। তৎকালীন পর্যটকদের বিবরণীতে তার ছবি স্পষ্ট। সমৃদ্ধ অর্থনীতি ছিল বলে সুলতানী বাংলায় কেন্দ্রীয় মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কমপক্ষে ১৬টি টাকশাল নগরী গড়ে উঠেছিল। সারা দেশেই স্থাপিত হয়েছিল মসজিদ। কোথাও কোথাও নির্মিত হয়েছিল আবাসিক মাদ্রাসা। সেই তুলনায় পরাধীন দেশের সংকট মোগল পর্বে স্পষ্ট হয়। রাজধানী শহর বলে ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী দু একটি অঞ্চল ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে মোগল স্থাপনা খুব কমই পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সুশাসন প্রতিষ্ঠার পূর্ব শর্ত হিসেবে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ তেমভাবে হয়নি। বাংলায় নিজস্ব কোন মুদ্রা ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। যে দু একটি টাকশালেন নাম পাওয়া যায় তাও দিল্লীর টাকশালের শাখা মাত্র।
সুবাদাররা যে বাংলাদেশকে ভালোবেসে পূর্ণ মনযোগে এদেশের উন্নয়নে নিজেদের মেধা ও শ্রম যুক্ত করেছেন তেমন মনে হয় না। তার প্রথম প্রমাণ ঢাকায় সুবাদাররা নিজেদের জন্য কোনো প্রাসাদ নির্মাণ করেননি। শুষ্ক অঞ্চল থেকে আসা সুবাদাররা বৃষ্টি বাদল, ঝড় আর জল কাদার দেশে বেশি দিন থাকতে পছন্দ করতেন না। বদলী হয়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টাই করতেন বেশি। প্রশাসনিক প্রয়োজনে লালবাগ দুর্গের মত প্রাসাদ দুর্গ তৈরি করলেও সেখানে নিজেদের জন্য প্রাসাদ গড়ার চিন্তা করেননি। সূত্র মতে দুর্গের ভেতরে তাঁবু খাটিয়ে, দুর্গের বাইরে বুড়িগঙ্গায় বজরাতে অথবা বড় কাটরায় থেকে তাঁরা তাঁদের সুবেদারির সময়কাল কাটিয়ে দিতেন।
দুর্গ, কাটরা ইমারত বা মোগল যুগের মসজিদগুলোর স্থাপত্য শৈলী ও আঙ্গিকের সাথে দিল্লী, আগ্রা, ফতেহপুরসিক্রির মোগল স্থাপত্যের তুলনা করলে বাংলায় নির্মিত স্থাপত্যের দৈন্য সহজেই চোখে পড়বে। দখলকৃত দেশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকারী শক্তির চিরকালীন নেতিবাচক দৃষ্টি বাংলার প্রতি ছিল বলেই বাংলাকে তারা স্থাপত্যের দিক থেকে সমৃদ্ধ করতে চাননি। অথবা চাননি অধীনস্ত প্রদেশে অত খরচ করে স্থাপনা নির্মাণ করতে। তাছাড়া মীরজুমলা ও শায়েস্তাখান ছাড়া অন্য সুবাদারদের স্থাপত্য নির্মাণের  কৃতিত্ব খুবই কম। বাংলায় কৃষি ও বস্ত্রবয়ন শিল্পে মোগল শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা যতটা না এদেশে শিল্প বিকাশের স্বার্থে তারচেয়ে বেশি ছিল মোগল অর্থনীতির প্রয়োজনে। মোগল সুবাদার ঢাকা অধিকার করার পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মানসিকতায় প্রথমেই ‘ঢাকা’ নামটি পাল্টে নিজ সম্রাটের নামে ‘জাহাঙ্গীরনগর’ রেখেছিলেন। পুরো মোগল শাসন যুগেও জাহাঙ্গীরনগর নামাবরণে ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা নিয়ে থাকতে পারেনি। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্যে দুর্বলতা দেখা দেয়ার সময়ে আঠারো শতকের শুরুতে ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে নেয়া হয় মুর্শিদাবাদে।
সুতরাং ইতিহাসের এসব বাস্তবতা বিচার করলে মোগল আধিপত্যবাদের হাতে স্বাধীনতা হারা বাংলার ছবিটিই স্পষ্ট হয়। তাই ইতিহাসের সূত্র অনুযায়িই ইংরেজ শাসকদের হাতে বাংলার মানুষ স্বাধীনতা হারানোর আগে মধ্যযুগের মোগল পর্বে আরেকবার স্বাধীনতা হারিয়েছিল। আজ আমরা যারা মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস চর্চা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি তারা চারশ বছর আগের পরাধীনতার বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে সময়টাকে নন্দিত করছি। চারশ বছর আগে ১৬১০ সালে বাংলার স্বাাধীনতা রক্ষার শেষ সংগ্রামী বারোভুঁয়াদের পরাজিত করে ঢাকা দখলের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশকে দিল্লীর অধিকারভুক্ত করা সম্পন্ন হয়। এ কারণে মোগল আধিপত্যবাদীদের বংশধররা ‘ঢাকার চারশ বছর’ বলে বিজয় উৎসব করতে পারলেও মানতে হবে এটি বাঙালির জন্য পরাধীনতার দিন। এই বিচারে ঢাকা নগরী বা রাজধানী ঢাকার চারশ বছর বলে কোন উৎসব আয়োজনের অবকাশ অন্তত এদেশবাসীর জন্য নেই। ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি রেখে এই পরাধীনতার স্মৃতি স্মরণে নানা ধরণের উৎসব মুখর হওয়ার মধ্যদিয়ে আত্মমর্যাদাহীন ইতিহাস বিচ্ছিন্ন মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব 
aurnabmaas@gmail.com
শিক্ষার্থী প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s