স্মরণ: প্রত্নতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ড (প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাবি গবেষণা জার্ণালে প্রকাশিত)


বিশ্বব্যাপী অগণিত শিক্ষার্থী ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষককে শোকগ্রস্ত করে গত ১১ এপ্রিল ২০১১ প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিজ্ঞান নির্ভর ধারণা প্রতিষ্ঠার প্রবাদপুরুষ প্রক্রিয়াবাদী প্রত্নতত্ত্বের জনক প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক লুই রবার্টস বিনফোর্ড নিজ জন্মস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী অঙ্গরাজ্যের কির্কসভিলে পরলোক গমন করেন (Miller,S: 2011)। বিনফোর্ডের মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপী ইতিহাস ঐতিহ্যের গবেষক, নৃবিজ্ঞানী আর প্রত্নতাত্ত্বিকদের মাঝে নেমে আসে এক শোকের ছায়া। ওয়ার্ল্ড আর্কিওলজিক্যাল কংগ্রেস থেকে বের করা শোকবইতে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ও ইতিহাস ঐতিহ্যের অনুরাগীগণ তাদের মতামতে জানাতে থাকেন এই কিংবদন্তীর বিয়োগে গবেষণা অঙ্গন থেকে কিভাবে একটি নক্ষত্রের পতন ঘটেছে (Smith,C: 2011)। ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা হয় পৃথিবীর এমন প্রতিটি দেশের বৈকি আমাদের বাংলাদেশের সংবাদপত্রেও বিশেষ উপসম্পাদকীয়তে এই কিংবদন্তীর বর্ণিল কর্মজীবনের প্রতি আলোকপাত করা হয়। ভারতের জাগরণ জোস (Jagranjosh, 2011), দ্যা হিন্দু (Rajendran,S. 2011) ম্যাগাজিন, বাংলাদেশের আমার দেশ (দৈনিক আমার দেশ,১৩ই মে ২০১১) ও সমকালের (দৈনিক সমকাল ২৩শে মে ২০১১) বিশেষ উপসম্পাদকীয়তে এই কিংবদন্তী প্রত্নতাত্ত্বিকের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানান হয়। 

সাউদার্ন মেথোডিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাগিতিহাসের অধ্যাপক ডেভিড মেল্টজার এক সাক্ষাতকারে এই বিখ্যাত প্রত্নতাত্বিকের স্মৃতিচারণে বলেন ‘বিনফোর্ডের হাত ধরে প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় বিজ্ঞানের সম্পৃক্তি একে দিনের পর দিন একটি বিজ্ঞানভিত্ত্বিক অনুষদে পরিণত করতে চলেছে’ (Meltzer : 2011;Wilford:2011)। প্রখ্যাত প্রতœতাত্ত্বিক ক্লাইভ গ্যম্বল (Gamble: 2011) গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি ইতিহাস নিবন্ধে লুই বিনফোর্ড সম্পর্কে  মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন “প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাতে বিনফোর্ডের আবির্ভাব তেমন বিস্ময়কর কিছু দিতে পারল কিনা এই বিষয়ে ভাবার আগে বলা যায় তিনি প্রতœতাত্ত্বিক আলামত সম্পর্কে গবেষকদের পুরো ধারণাটাই পাল্টে দিয়েছেন”। লুই বিনফোর্ডের দুটি বিশ্বখ্যাত বই’র (ইন পারস্যুট অফ দ্য পাস্ট ও কন্সট্রাক্টিং ফ্রেমস অফ রেফারেন্স) প্রকাশক ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের এক সংবাদ বিজ্ঞতিতে লুই বিনফোর্ডের মৃতুতে শোক প্রকাশ করে ওয়াল্ড আর্কিওলজিক্যাল কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ক্লারি স্মিথের উদ্ধৃতি দিয়ে তাকে নব্য প্রতœতত্বের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বলা হয় (UCP: 2011)।  ওয়ার্ল্ড আর্কিওলজির এন্টিকুয়েটি জার্নালে লুই বিনফোর্ড সম্পর্কিত শীর্ষ নিবন্ধে প্রখ্যাত প্রতœতাত্বিক কলিন রেনফ্রো বলেন “লুই বিনফোর্ড একজন বিশিষ্ট উৎখননকারীই ছিলেন না পাশাপাশি খননের সময় উদ্ভুত নানা সমস্যার সমাধান করার দক্ষতাও তাঁর ছিল। যা পরবর্তিকালে তাঁকে জাতি-প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মতো নতুন ধারার প্রত্নতত্ত্বচর্চার পথ প্রদর্শক হিসেবে  প্রতিষ্ঠিত করে (Renfrew: 2011) । ভারতের বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক কে পাদায়া ১৯৮৬ সালের দিকে ভারত সফরে মাঠকর্মকালীন হুংশি উপত্যকার জটিল ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষিতের অ্যাশুলিয়ান সংস্কৃতির ব্যবহারিক বিন্যাস সম্পর্কে দ্রুত একটি নির্ভরযোগ্য ধারণা প্রদান করায় লুই বিনফোর্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন (Paddayya: 2011)|
 বিনফোর্ডের বিজ্ঞান নির্ভর ধ্যানধারণা প্রত্নতত্ত্বের ভাবনার জগতকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। বিনফোর্ডের পূর্বে প্রত্নতত্বের তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত, চিন্তাজাগতিক উদ্দেশ্য ও ধারণাগত প্রত্যয়গুলো সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনকে ঘিরেই আবর্তিত হতো। যেখানে মনে করা হতো মানুষের সংস্কৃতি কিছু নর্মের সমষ্টি যার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট বস্তুগত নিদর্শনে আর অতীত সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট বস্তুগত উপাদান বিশ্লেষণ করলেই অতীত সংস্কৃতির নর্ম তথা সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মান করা সম্ভব (গড়ৎৎরং: ২০০০)। এই সকল বস্তুগত নিদর্শনগুলোর মধ্য হতে একটি নিদিষ্ট উপাদানকে নির্দিষ্ট সংস্কৃতির জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করে একই সাথে কিছু বৈশিষ্ট সাধারণীকৃত অবস্থায় তার সাথে যুক্ত করে  নমুনায়ন করার মাধ্যমে যে বিবর্তনবাদী ইতিহাস নির্মান করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে তা নির্দ্বিধায় অযৌক্তিক এবং হটকারীও বটে (Hutterer : 1976)| । পাশাপাশি প্রতœতাত্ত্বিক আলামত নির্ভর নির্মিত ইতিহাস অনেকক্ষেত্রে আধিপত্যবাদী জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে গেলে ফলাফল অনেক ভয়াবহ হতে পারে ( Mandal & Ratnagar: 2007 )।  এই নির্মান শব্দটির বিশ্লেষণ করলেই মূল চিত্র আমাদের কাছেন স্পষ্টত ধরা পড়ে যা এই ক্ষুদ্র পরিসরের স্মৃতিচারণে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। এই পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাতে বিণফোর্ডের হাত ধরে বিজ্ঞানের সম্পৃক্তি সংস্কৃতির নর্মাটিভ দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি বর্ণণামূলক ইতিহাস নির্মানের (ঘড়ৎসধঃরাব ারবি ড়ভ ঈঁষঃঁৎব ্ উবংপৎরঢ়ঃরাব ঐরংঃড়ৎু) সনাতনী রীতি অনেকটাই নাকচ করার সুযোগ এসে যায়।

পরবর্তিকালে লুই বিনফোর্ডের ভূমিকায় অতীত গবেষণা পদ্ধতি ও কৌশলের পরিবর্তনের সাথে সাথে এর উদ্দেশ্যসহ নানা আঙ্গিকে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। প্রতœনিদর্শন বা প্রতœবস্তুর ধারণাগত প্রত্যয়ের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় (ইরহভড়ৎফ ১৯৮১ধ.) যেখানে অতীত পরিবেশকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করায় বাস্তুবস্তু বা ইকোফ্যাক্টস্ প্রতœবস্তুর সমান তাৎপর্যবহ হয়ে ওঠে। পরবর্তিকালে সাদার্ণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নাডসান প্রতœবস্তু আর বাস্তবস্তুুর মধ্যে কোন তফাৎ খুঁজে পাননি (কহঁফংড়হ : ১৯৮৫) ।  বিনফোর্ডের চিন্তাধারার প্রভাবে নর্মাটিভ দৃষ্টিভঙ্গিকে ছুঁড়ে ফেলে সংস্কৃতিকে একটি ব্যবস্থা বিবেচনা করতে গিয়ে কিছু প্রশ্ন যেমন আমরা অতীত ইতিহাস কেন জানবো আমরা অতীত ইতিহাসের কোন দিকটি জানতে চাচ্ছি জ্ঞানতাত্ত্বিভাবে এই বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে থাকে। বিশেষত আলাস্কার নুমিয়ান্ট এস্কিমোদের উপর দীর্ঘ গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা(ইরহভড়ৎফ ১৯৭৮) তাঁকে প্রতœতত্বের গবেষণাতে নতুন একটি ধারার উন্মোচনে পথ দেখায়। নুমিয়েন্ট এস্কিমোদের জীবনধারার উপর তাঁর এই মাঠকর্ম জাতি-প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তিতে অতীত প্রতœনিদর্শনের বিশ্লেষণ করে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যখ্যা দাড় করানো গেলে ইতিহাস কিভাবে যুক্তিযুক্ত ও জীবন্ত হয়ে ওঠে তা প্রমাণে যথেষ্ট হয়েছিল। কর্মজীবনের সূচনালগ্নে বিশেষত আমেরিকান এন্টিকুয়েটি জার্নালে প্রকাশিত তার কয়েকটি নিবন্ধে (ইরহভড়ৎফ ১৯৬২, ১৯৬৪, ১৯৬৫) তিনি দেখিয়েছেন নির্দিষ্ট বস্তুগত উপাদানের আলোকে সংস্কৃতিক ইতিহাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে অতীতের ব্যাখ্যাদান কিভাবে সাধারণীকৃত, ভ্রমাত্বক ও একপেশে হয়ে ওঠে। তিনি পরবর্তিকালে সংস্কৃতিক ইতিহাসের  চিন্তাধারাকেই চ্যালেঞ্চ করে বসেন। অতীত মানুষে কর্তৃক পরিত্যাক্ত হওয়ার পর সময় এর সাথে সাথে নিদিষ্ট স্থানিক প্রেক্ষিতে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ডের গঠন প্রক্রিয়া কিভাবে অতীত সংস্কৃতির ব্যবহারিক বিন্যাসকে নানা আঙ্গিক হতে প্রভাবিত করতে পারে (ইরহভড়ৎফ ১৯৮১ধ ্ ন). এই বিষয়কে তিনি গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করার প্রতি মনোনিবেশ করেন। তিনি সাংস্কৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক পরিমন্ডলে প্রতœতাত্ত্বিক রেকর্ডের এই পরিবর্তন অনুসন্ধান করতে গিয়ে মধ্যবর্তী পর্যায়ের তত্বের প্রবর্তন করেন যেখানে অতীত সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত যে কোন প্রতœনিদর্শনের ব্যবহারিক বিন্যাস বুঝতে বর্তমানের সাথে প্রতিতুলনামূলক অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে পূর্বোক্ত সংস্কৃতিক নর্মের সরাসরি নিদের্শক হিসেবে প্রাপ্ত প্রতœবস্তুর ভিত্তিতে অতীত সংস্কৃতির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ধারাকে অনেকটাই চ্যালেঞ্চ করা হয়। পাশাপাশি একজন  গবেষকের সামাজিক অবস্থান, চিন্তুাধারা, রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধানকে কিভাবে প্রভাবিত করে তিনি এই বিষয় সম্পর্কেও ধারণা দিয়েছেন(ইরহভড়ৎফ ্ ঝধনষড়ভভ ১৯৮২) । যার সাথে বিশিষ্ট প্রতœতাত্ত্বিক ডেভিড ক্লার্কের চিন্তাধারার (ঈষধৎশ ১৯৮৭, ১৯৯৩)বেশ মিল ছিল।  তাঁর মতে একজন প্রতœতাত্ত্বিক তার পারিপাশ্বিকতার দ্বারা প্রভাবিত হলে বস্তুনিষ্ঠ প্রতœতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাদান কখনই সম্ভব নয়।
পূর্বোক্ত ধারণার বহুবিধ  সমস্যার মধ্যে একটি হচ্ছে অতীত মানুষ কর্তৃক কোন বস্তুগত নিদর্শন পরিত্যক্ত হওয়ার পর সময় ও স্থানের পরিপ্রেক্ষিতে তা পরিবর্তিত হয়ে একটি স্থির অবস্থানে গিয়ে প্রতœবস্তু হিসেবে স্থান করে নিতে তাতে বহুবিধ পরিবর্তন এবং রূপান্তর সাধিত হয় (ঝযধহশং ধহফ ঞরষষবু : ১৯৮৭)। পরবর্তিকালে এই সকল পরিবর্তিত ও খণ্ডিত উপাত্ত যখন প্রতœতাত্ত্বিকের হাতে এসে পৌঁছায় তখন তা থেকে নির্মিত অতীত ইতিহাস স্বাভাবিকভাবেই খণ্ডিত ও আংশিক হওয়াটাই স্বাভাবিক ।  বিনফোর্ড এক্ষেত্রে শুধু বস্তুর গাঠনিক বিন্যাস ও শ্রেণীকরণ নির্ভর অতীত ইতিহাস নির্মাণের কঠোর সমালোচনা করে বস্তুর সাথে তার পারিপাশ্বিকতাকে সমান গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার কথা বলেন যার মাধ্যমে অতীতের ব্যাখাদান অনেকটাই বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবের কাছাকাছি যায় বলে তিনি মনে করতেন। বিষয়টি বুঝতে গেলে একটি নিদর্শন অতীত মানুষ কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়ার পর কালের আবর্তে যে পরিবেশে থেকে গাঠনিক ও ব্যবহারিক বিন্যাসে পরিবর্তিত হয় (ইঁঃুবৎ: ১৯৮২) তার পাশাপাশি ঐ স্থানের ভূমিরূপ ও ভূ-তাত্ত্বিক বিষয়াবলীকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত ( ঐবৎু ্ এধৎৎরংড়হ : ১৯৯৮)। প্রতœতাত্ত্বিক রেকর্ডের এই রূপান্তর ও পরিবর্তন গবেষণার অনুষঙ্গ হিসেবে স্থান করে নিলে স্থান বা স্থানিক প্রেক্ষিতের ধারণা প্রতœতত্ত্বে বিশেষ গুরুত্ব পায়।  বিনফোর্ড সংস্কৃতিকে কিছু  বস্তুুগত নিদর্শনের শুধু আকারগত বিশ্লেষন আর  গাঠনিক বিন্যাস পর্যবেক্ষন করে তাকে একটি শ্রেণীকরণের মানদণ্ডে বেঁধে ফেলার ঘোর বিরোধী ছিলেন। কারণ একটি প্রতœবস্তুর গাঠনিক বিন্যাস থেকে কোন অর্থ নির্মান করা হলে তা সমাজ সংস্কৃতির চলমান বাস্তবতার সাথে নাও মিলতে পারে। ক্রেগার (কৎবরমবৎ, ১৯৪৪, ঢ়. ২৭৫) বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিনফোর্ড পূর্ববতী সনাতনী ধারার প্রতœচর্চায় বস্তুর শ্রেণীকরণের আলোকে অতীত নির্মান চেষ্টায় মূলত তিনটি সহজ ও সাধারণ প্রশ্নের পরিমণ্ডলেই ঘুরপাক খাওয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন। এই ক্ষেত্রে অতীত সংস্কৃতির পর্যবেক্ষনে ইতিহাসের একটি রূপরেখা দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে সংস্কৃতির দুটি চলক বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত যার পারিপাশিতায় সংস্কৃতির বস্তুগত নিদর্শন আবর্তিত হয়। এখানে অন্তস্থ চলক হিসেবে সমাজে প্রচলিত প্রথা যেমন বিয়ে, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, প্রথা, আইন কানুন ও বিভিন্ন সামাজিক রীতির কথা বিবেচনা যেতে পারে আর বহিস্থ চলক হিসেবে পরিবৈশিক প্রেক্ষিত, ভূ-তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত বা এক কথায় স্থানিক প্রেক্ষিতের কথা বলা যেতে পারে। কারন নর্মাটিভ দৃষ্টিভঙ্গি আর বর্ণনামূলক ইতিহাসের বিপরীতে বিনফোর্ড এর ধারণার আলোকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা প্রস্তাবে সংস্কৃতি সমাজে বিদ্যমান এই সকল বহিস্থ ও অন্তঃস্থ চলকের উপর ভিত্তি করেই বিকশিত হয় যেখানে বহিস্থ চলকের প্রভাবে অন্তস্থ চলকের পরিবর্তন লক্ষণীয়। সংস্কৃতির এই ব্যবস্থার স্বরূপ উদঘাটনে বিনফোর্ড মধ্যবর্তী পর্যায়ের তত্ত্ব   প্রস্তাব করেন যেখানে অনুষঙ্গ হিসেবে স্থান পায় প্রতœতাত্ত্বিক রেকর্ডের গঠন প্রক্রিয়া, জাতি-প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রতœতত্ত্ব ও ট্যাফোনমির  মতো বিষয়াবলী। অন্যদিকে তাত্ত্বিক ধারণা হিসেবে সমরূপীকরণ ও প্রত্যক্ষণবাদ তত্ত্বকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা বিবেচনা করে ভাবা হয় বিজ্ঞানের সম্পৃক্তি ইতিহাসকে অনেকটাই নৈব্যক্তিক করে তুলতে সক্ষম।
প্রতœতত্ত্বের তাত্ত্বিক ঘরাণাতে বিশেষত আমেরিকার প্রতœাতাত্ত্বিক গবেষণা ও অনুশীলণে লুই বিনফোর্ডের চিন্তাকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তুার করতে সক্ষম হয়েছে। ব্রিটিশ প্রতœতাত্ত্বিকদের ঘোর বিরোধিতা, তাঁর প্রবর্তিত প্রতœতাত্বিক চিন্তুাকাঠামোকে উপহাসমূলক নব্য প্রতœতত্ত্ব নামকরণ সহ নানমুখী উদ্যোগ  তাঁর চিন্তাধারার যুক্তিযুক্ত অবস্থান আর বস্তুনিষ্ঠতার কাছে হার মেনেছে। ভারতীয় প্রতœতাত্ত্বিকগণ বিশেষত পুনার ডেকান কলেজের গবেষক ও প্রতœতাত্ত্বিকদের অনেকেই লুই বিনফোর্ডের    চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা প্রখ্যাত প্রতœতাত্ত্বিক কে  পাদায়ার  কথা বলতে পারি। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের প্রতœতাত্ত্বিক গবেষকদের কাছেও লুই বিনফোর্ড জনপ্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব।
লুই বিনফোর্ডের মতো বড় মাপের  একজন প্রতœতাত্ত্বিক গবেষকের কর্মকাণ্ডকে একটি ছকে বেঁধে এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা অসম্ভব। তবুও সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা উপলদ্ধি করতে পারি সনাতনী ধারার সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও বিবর্তনবাদী প্রতœচর্চার ধারাকে অনেকটা চ্যালেঞ্চ করে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে সংস্কৃতির সঙ্গায়নে বিনফোর্ডের প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। সাংস্কৃতিক নর্মের তথাকথিত প্রতিফলনকারী বস্তুগত উপাত্তের মাধ্যমে সংস্কৃতির প্রকৃত চালচিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে নানাবিদ সমস্যা, অস্পষ্টতা আর জটিলতা  বিনফোর্ডের   চিন্তাধারা প্রতœতাত্ত্বিকদের নতুন করে ভাববার একটি ভিত্তিভূমি তৈরী করে। পাশাপাশি এই সনাতনী ঘরানার প্রতœতত্ত্ব চর্চার তাত্ত্বিক-কাঠামোগত আঙ্গিকে সীমাবদ্ধতা আর প্রাপ্ত গবেষণা ফলাফলে যুক্তিগত দিকের দুর্বলতা, বিজ্ঞান থেকে দূরত্ব, ফ্যাক্ট-ফিকশনের-লিখিত উপাত্তের মানদণ্ড নির্ধারণে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব চিন্তাজাগতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিনফোর্ডের চিন্তাধারাকে বিকশিত হওয়ার পথ করে দেয়। বিনফোর্ড তাঁর বি¯তৃত গবেষণাকর্মে সংস্কৃতির কয়েকটি মানদন্ডনির্ভর পর্যবেক্ষনের বদলে একটি ব্যাবস্থা বিবেচনা করে সংস্কৃতির লালনকারী সমাজের অভ্যন্তরস্থ কার্যক্রম বা গতিশীলতাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন যেখানে বিজ্ঞাননির্ভর অসুসন্ধান বিশেষভাবে লক্ষনীয়। এখানে বিভিন্ন সংস্কৃতিক প্রপঞ্চ সংঘটিত হওয়ার পেছনে বিদ্যমান কারণ সমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণার পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট চলক কিভাবে পুরো কালচারাল সিস্টেম বা সংস্কৃতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে তার দিকে একটি সজাগ দৃষ্টি বিনফোর্ডের ছিল। আমাদের কাছে বিনফোর্ডের কর্মকাণ্ডের একটি দিক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে ‘‘সংস্কৃতিকে একটি ব্যবস্থাহিসেবে দেখতে গিয়ে তিনি এর অন্তর্গত বিভিন্ন বিষয় বিশেষত পারিবেশিক নিয়ামক, বাস্তুসংস্থান, ও বসতিবিন্যাসের মতো বিষয়কে বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন’’ ফলে তাঁর গবেষণা হয়েছে অনেকটা গ্রহনযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত। আমরা একটি বিষয় স্পষ্টত লক্ষ্য করি প্রতœতাত্ত্বিক সংস্কৃতিকে কোন বিশেষ মানদন্ডের আলোকে প্রতিনিধিত্বশীল অনুজ্ঞায় গুচ্ছাকারে বর্ণনা না করে প্রতিটিকে একটি পৃথক সত্তা বিবেচনা করে গবেষণার আওতায় আনা সম্ভব হলে তার একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতিগত ও অবস্থানগত নির্দিষ্টতা সত্ত্বাতাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্টিত করা সম্ভব। কারণ কোন নির্দিষ্ট নমুনায়িত উপাত্তের আলোকে কোন ঘটনাকে সাধারণীকরণ করে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি সারসত্ত্বায়িত প্রত্যয় আরোপিত হলে এই বর্ণণা সর্বদাই পক্ষপাতদুষ্ট ও ভ্রমাত্মক  হতে বাধ্য। যেখানে সংস্কৃতির অন্তস্থ প্রতিটি চলকের একটি স্বতন্ত্র কর্মভূমিকা রয়েছে যা স্ব-স্ব স্থানিক কালিক ও বৈষয়িক মানদন্ডে বিশেষ গুরুত্ববহ যেখানে নমুনায়ন নির্ভর মানদণ্ডের ভিত্তিতে সংস্কৃতির ব্যখ্যাদান অবশ্যই অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর।
অন্যদিকে প্রতœতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমাণ ও ঐতিহাসিক  কল্পকাহিনীকে পাশাপাশি দাঁঁড় করিয়ে  ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীর সাথে বিজ্ঞানের বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে  অনেকটা বিজ্ঞাননির্ভর আলোচনা ও যু্িক্তনির্ভর বৈপরীত্যের মাধ্যমে বোঝার একটা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে লুই বিনফোর্ডের ঘরাণার প্রতœতত্ত্ব চর্চায়। আমরা মনে করি  প্রতœতত্ত্ব ও ইতিহাসের বাস্তবতা কিভাবে একটি স্বীকৃত মহাবয়ানের প্রভাবদুষ্ট হয়ে  ননর্থক অব্যয় হিসেবে পরিগণিত হতে পারে কিংবা একটি রেপ্রিজেন্টেশনের বাস্তবতায় দিবালোকে মতো স্পষ্ট হয়ে চোখে দৃশ্যমান হতে পারে বিনফোর্ডের ধারণার পূর্বে এসকল চিন্তাধারা অনেকটাই অন্ধকারে ছিল।  কোন কোন ঐতিহ্যের আখ্যান বর্ণণার বাস্তবতায়  যথার্থ, তথাকথিত মানদণ্ডে  আধুনিক এবং সঠিক বা যৌক্তিক , আর কোন কোনটি ভিন্নার্থ জ্ঞাপক  তা নির্ধারণকারী মানদন্ড সম্পর্কে প্রতœতাত্বিকরা কোন পথ অনুসরণ করতে পারেন তার একটি দিকনির্দেশনাও বিনফোডের্র ধারণাতে ছিল বলে আমরা মনে করি।

 তবে বিনফোর্ডের চিন্তাধারায় ভৌত বিজ্ঞান আর সামাজিক বিজ্ঞানের ব্যখ্যাা পদ্ধতি অনেকটাই একীভূত হওয়াতে তাঁর প্রস্তাবিত পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতা লক্ষনীয় যেটা বেশ পরবর্তীকালের ধারণা। একটি বস্তু সমাজের বিদ্যামান মানুষের সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে যখন গতিশীল থাকে এর  নিছক কিছু ক্রিয়াগত অর্থ থাকে না।  পরিবেশের বাস্তবতায় বস্তুর ক্রিয়াগত অর্থের পাশাপাশি তার প্রতিকী অর্থ, তৎসংশ্লিষ্ট দেহাতিরিক্ত ও আধ্যাত্বিক বা মেটাফিজিক্যাল কিছু প্রত্যয়কে অনেক ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ববহ হয়ে উঠতে দেখা যায়। বিনফোর্ড তাঁর চিন্তুাধারাতে বিজ্ঞান নির্ভর চিন্তাকে বেশি প্রাধান্য দেয়াতে এই বিষয়গুলো অনেকটা বিবেচনার বাইরে ছিল। বিনফোর্ড বিজ্ঞাননির্ভর পরীক্ষনের বাস্তবতায় প্রাপ্ত ইতিহাসের প্রমানকে ফ্যাক্ট বলার পক্ষপাতী হলেও এ বিষয়ে একটি সন্দেহ থেকেই যায় ‘পূর্ণ সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গবেষক অধিপতিশীল রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত মতাদর্শ ও ক্রিয়াশীল অসম ক্ষমতা সর্ম্পকের বাইরে কখনই যেতে পারেন না বিধায় তিনি অবচেতনভাবে হলেও পক্ষপাতদুষ্ট যা ইতিহাসকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মতাদর্শিক অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার কোন পথ না থাকায় তথাকথিত এই ফ্যাক্টসমূহ বিশ্লেষণ করে কোন গবেষক যখন অতীত সম্পর্কে বিভিন্ন উপাত্ত ও তথ্য হাজির করেন বা একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান তা অবচেনতভাবে হলেও প্রতœতাত্ত্বিক আলামতের ভ্রমাত্বক বা অতিরঞ্জিত দৃশ্যায়নে গবেষককে একরকম বাধ্যই করে। তবে একটা বিষয় স্বীকার করতেই হবে  আলামতের বিশ্লেষণের সময় আমরা যেটাকে  ফ্যাক্ট হিসেবে মনে করি বা করতে বাধ্য থাকি তা  নিজে একটি স্বশাসিত সত্তা নিয়ে বিরাজ করে যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ফলে প্রতœাতাত্ত্বিক আলামাতের ভিত্তিতে প্রতিষ্টিত তথাকথিত বাস্তবতা বা ফ্যাক্ট কে ব্যক্তিপ্রভাব বর্জিত বা নৈব্যাক্তিক, সর্বজনীন; স্বাধীন ও সার্বভৌম বলে মনে করার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি অনেকটাই দূর্বল হয়ে যায়। কারণ যতই বিজ্ঞান ভিত্তিক গবেষণা করা হোক না কেন একটি সাংস্কৃতিক ট্রেইটস বা প্রপঞ্চ বা তথাকথিত নর্ম আধুনিক রৈখিকতা অনুসরণ করে না, অর্থাৎ সেটিকে যেমন আধুনিক ও সেক্যুলার পরম্পরা কিংবা কার্য-কারণ সম্পর্ক মেনে চলার কথা বলা হয় বাস্তবতার বিচারে তেমনটি হয়ে ওঠেনা । লূই বিনফোর্ড এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের পথ হিসেবে  উভয়ের সীমানা ও সংজ্ঞা নির্ধারণ করে পরস্পরের সঙ্গে তুলনামূলক ও বৈপরীত্যমূলক সম্পর্ক নির্ধারণেই থেমে থাকার ঘোর বিরোধী।

বিনফোর্ডের চিন্তাধারা তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে বস্তুর বিশ্লেষনে বিজ্ঞাননির্ভর একটি পদ্ধতি প্রচলন করে যা খুব দ্রুত একটি দাপুটে ও আধিপত্যশীল ঘরানায় রূপান্তরিত হয়ে উঠে। এই ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে তর্কের অবতারণা করা যায় তা হচ্ছে বস্তুপ্রমাণ নির্ভর ততাকথিত বাস্তবতা ও অতিকথনের বা কল্পকাহিনীর ভেদরেখাকে যেভাবে প্রচলিত ডিসকোর্সসমূহে বিবেচনা করা হয় সেটাও বিভিন্ন অবস্থা ও চলকের সাপেক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। বাস্তবতার এই বিচারে প্রমানিত এই তথাকথিত সত্য কোন কোন ক্ষেত্রে অবাস্তব হয়ে উঠতে পারে আবার এই অতিকথন, কল্পকাহিনী বা  ফিকশন কখনো কখনো  সত্যতার দিক থেকে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারে। প্রতœতত্ত্ব চর্চার ইতিহাসের খেরোখাতায় নজর দিলে আমরা দেখি প্রতœতত্ত্ব, প্রচলিত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত আখ্যান বা ডিসকোর্সগুলোতে অতীতের ফ্যাক্টনির্ভর যে-সব আখ্যান বা বয়ান চালু আছে সে-গুলো ফিকশনের সঙ্গে সতত অংশীদারিত্বমূলক। কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা দেখি এগুলো একে অন্যের পরিপূরক। তবে একটি বিষয় স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়েছে ইতিহাস, প্রতœতাত্ত্বিক ও নৃবৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে উপনিবেশ কালীন ও উপনিবেশ উত্তরকালে আধুনিকীকরণ প্রকল্প ও তথাকথিত সেক্যুলারকরণের ইতিহাসের সঙ্গে উপনিবেশকালীন ও পরবর্তী জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের আকাঙ্খাগুলোর একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান যাকে বোঝার সুযোগ বিনফোর্ডের চিন্তাকাঠামোতে অনুপস্থিত ছিল। এসকল বিষয় বাদ দিলে বিনফোর্ডের আবির্ভাব প্রতœচর্চাকে একটি নতুন দিশার সন্ধান দিয়েছে যা পূর্বের ন্যায় কাঠখোট্টা নিরস বস্তুর বিবরণের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকেনি বরঞ্চ নানা আঙ্গিক ও কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে।  তবে এর একটি গুরুতর দিক এই যে এখানে বস্তুগত নিদর্শনের সাথে বিজ্ঞানের ধারণার সংযোগে মনে করা হয় যে ইতিহাসের বিবরণেও একনিষ্ঠ সত্যের প্রতিফলন সম্ভব যা পরবর্তিকালের চিন্তকদের কাছে কঠোর সমালোচনার শিকার হয়।

ইতিহাস বিচার করলে দর্শনে আলোকপ্রাপ্তর পর বা তথাকথিত আধুনিক ইউরোপে সামাজিক বিজ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই তাত্ত্বিক ঘরাণার নানা মারপ্যাচে উপনিবেশবাদের ভিত্তি মজবুত করতে সচেষ্ট ছিল। এখানে প্রতœতত্বের মতো সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে কোন সাধারণ শিক্ষামূলক বা গবেষণামূলক অনুষদ না বলে উপনিবেশবাদ সম্প্রসারণের বৈধতাদান ও যুক্তিযুক্ত ভিত্তিপ্রদানকারী একটি প্রকল্প বললে অত্যুক্তি করা হবে না। নির্বাচিত বা ট্রেডমার্ক প্রতœবস্তুর সাহায্যে সাংস্কৃতিক নর্ম চিহ্নিতকরণনির্ভর সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মানকারী প্রতœতত্বের উপনিবেশবাদী প্রকল্পের বেড়াজাল ছিঁড়ে তিনিই প্রথম বেরিয়ে আসার পথ দেখান। সংস্কৃতিক প্রক্রিয়া অনুধাবন করে প্রতিটি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনায় আনার তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদানের মাধ্যমে প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণায় লুই বিনফোর্ডের আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি অতীত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পূর্বতন হটকারী বস্তুগত উপাদানের উপস্থাপন নির্ভর সংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার মাধ্যমে অতীত গবেষণার প্রস্তাবণা আনেন। পূর্বতন সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারার অতীত চর্চার আদিকল্পে প্রকৃত অর্থে উপনিবেশিক শক্তি কোন অঞ্চলে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করার পর উপনিবেশকে বৈধতা প্রদানের জন্য ঐ স্থানের সাথে তাদের অতীত সম্পর্ক প্রমানের ঐতিহাসিক সত্তাকে পূৃর্ব থেকেই নির্মান করে নিত। আর তাকে যুক্তিযুক্ত একটি ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে বাস্তবে মেলে ধরার ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়া হতো প্রতœতত্ত্ব বা নৃবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোকে। এখানে তারা ইউরোপীয় দর্শনের দুটি ধারা বিশেষত দৃষ্টবাদ ও প্রত্যক্ষনবাদকে গুরুত্ব দিয়ে অতীত মানুষের সংস্কৃতি সম্পর্কিত বস্তুগত উপাদানকে সরাসরি সংস্কৃতিক নর্মের উপস্থাপন বলে প্রমানে সচেষ্ট হলে তখনকার প্রতœতত্ত্ব চর্চার সাথে পুকুর খোঁড়া বা কবর খুঁড়ে মাটি তোলার বিশেষ পার্থক্য ছিল না। এক্ষেত্রে লুই বিনফোর্ড প্রবর্তিত  সংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ধারণার, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের তুলনামূলক অধ্যয়ন, প্রত্নতাত্বিক রেকর্ডের গঠন প্রক্রিয়া অনুসন্ধান ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রেক্ষিতগত সমাবেশ বিশ্লেষণ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
১৯৩১ সালের ২১ নভেম্বর জন্ম নেয়া বিনফোর্ডের মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। দীর্ঘ ৫০ বছরের কর্মজীবনে তিনি দেড় শতধিক গ্রন্থ এবং গবেষণা প্রবন্ধ রচনা ও সম্পাদনা করে গেছেন যার বিবরণ এই ক্ষুদ্র পরিসরে দেয়া সম্ভব হয়নি। শিক্ষাজীবনে নর্থক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে øাতক সম্মান, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেটিভ আমেরিকান এবং ভার্জিনিয়াতে প্রথম ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপন প্রক্রিয়ার উপরে øাতকোত্তর ও ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। কর্মজীবনে পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।

লেখকদ্বয়ঃ 

মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া
সহযোগী অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থী-গবেষক; প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
aurnabmaaa@gmail.com

References & Notes:

Binford, L.R. 1962. Archaeology as anthropology. American Antiquity 28: 217-25.
– 1964.  
A consideration of archaeological research design.  American Antiquity 29:   425-41.
– 1965.
Archaeological systematics and the study of culture process. American Antiquity 31: 203-210.
– 1978a.
Nunamiut ethnoarchaeology. New York: Academic Press.
– 1981a.
Bones – ancient men and modern myths. New York: Academic Press.

-1981b. Middle range research and the role of actualist studies, in Bones – ancient men and
modern myths: 21-30. New York: Academic Press.

Binford, L. R. & J. A. Sabloff. 1982. Paradigms, systematics and archaeology. Journal of Anthropological Research 38: 137-53.

 Butzer, K.W. 1982.  Archaeology as human ecologyContext in archaeology. p-3-14.  Cambridge University Press, 1982.
 Herz,N &  Garrison,E. 1998. Geomorphology in Archaeology;  Geological methods for archaeology. Oxford University Press, 1998. p-26-45.

Hutterer, K. L. 1976. An evolutionary approach to the Southeast Asian cultural sequence . Current Anthropology, Vol. 17, No. 2, Jun., 1976 .p-221-223.

Knudson, S.J. 1985. Culture in retrospect: the basic units of archaeology, Artifacts. Waveland press, Inc. Prospect heights, Illinois 60070. p-23.  

Kreiger, A. 1944 ‘The typological concept’, American Antiquity 9. , p-275.

Mandal, D and Ratnagar,S. 2007.  Ayodhya: Archaeology After Excavation. Tulika, 2007 ,New    Delhi  .Manohar Publishers & Distributors.

Meltzer,D. 2011.  “Lewis Binford led the charge that pushed, pulled and otherwise cajoled archaeology into becoming a more scientific enterprise.” David Meltzer,

Professor of Prehistory at Southern Methodist University, Dallas. SMU’s Lewis Binford left legacy of change, innovation. Dallas (SMU). April 13, 2011.

Miller,S. APRIL 15, 2011. Archaeologist Binford Dug Beyond Artifacts : The Wall Street Journal Remembrance.

 Morris,I. 2000. Archaeology as cultural history : words and things in Iron Age Greece. Wiley-Blackwell, 2000. P-3-5.

Paddayya,K.  2011. Antiquiti : A Quarterly review of World Archaeology. Edited by: Martin Carver.  Special online publication on Lewis Binford (21 November 1931 – 11 April 2011); Appreciation by K. Paddayya

Rajendran,S. 2011.Legendary archaeologist Lewis Binford passes away. The Hindu news. Bangalore, April 14, 2011.

Renfrew,C.  2011. Antiquiti : A Quarterly review of World Archaeology. Edited by: Martin Carver. Special online publication on Lewis Binford (21 November 1931 – 11 April 2011); Appreciation by Colin Renfrew.

Shanks, M and Tilley, C. 1987 : Social Theory and   Archaeology. University of new Mexico press, Albuquerque. 1987. P-79.

UCP. April 14th, 2011.  In Memoriam: Lewis Binford. University of California Press.

Wilford, J.N. April 22, 2011. Lewis Binford, Leading Archaeologist, Dies at 79 : The New York Times.  

websites:

Jagranjosh, 2011.Current Affairs . April 2011. Renowned Archaeologist & Founder of New Archaeology, Lewis Binford Expired.  http://www.jagranjosh.com/current-affairs/Renowned-Archaeologist-Founder-of-New-Archaeology-Lewis-Binford-Expired-1302787447-1.

Gamble,C. 17 May 2011. Lewis Binford obituary : Advocate of a rigorous, scientific approach to archaeology. guardian.co.uk.

Smith,C. 2011. World archaeological congress: Lewis Binford Memorial Book, http://www.worldarchaeologicalcongress.org/home/lewis-binford.

 
১.সালিম,এম.এ.এ,  ২০১১। পুরাতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ডের মহাপ্রয়ানে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলী। উপসম্পাদকীয়,দৈনিক আমার দেশ,১৩ই মে ২০১১।
২.সালিম, এম এ.এ, ২০১১। কালজয়ী পুরাতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ড। উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সমকাল ২৩শে মে ২০১১।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s