এ লজ্জা পুরো জাতির জন্য। এ বর্বরতা যেন ক্রুসেডীয় আর ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী পিশাচদেরও হার মানায়।


এ লজ্জা পুরো জাতির জন্য। এ বর্বরতা যেন ক্রুসেডীয় পিশাচদেরও হার মানায়। বলছিলাম নৃশংস পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমানা মনজুর এর করুণ পরিণতির কথা। দেশের সেরা বিদ্যাপীঠের একজন শিক্ষিকার নিরাপত্তা যে রাষ্ট্র দিতে পারেনি তার আবার আইন, সেই দেশের তথাকথিত নারীবাদের ধ্বজাধারীদের মুখে থু। পশ্চাতে লাথি। এই ঘটনার পর ইভ টিজিং আর নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালাকে আমার কাছে চার্লি চ্যাপলিনের জোকারির থেকেও বেশি মজার, বেশি চটকদার বলে মনে হয়েছে। আজকের প্রথম আলোর খবরে প্রকাশ ল্যব এইডে চিকিৎসাধীন শিক্ষিকার এ করুণ পরিণতির কথা।

হতভাগ্য শিক্ষিকা রুমানা মিডিয়াকে জানান ‌‌” কম্পিউটারে কর্মরত রুমানা ম্যাডামের কক্ষে ঢুকেই পেছন থেকে হামলা চালায় পিশাচ সাইদ। চুলের মুঠি ধরে দুই চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। কামড়ে নাক-মুখ ক্ষত-বিক্ষত করে। রক্তে পুরো শরীর ভরে যায়। একপর্যায়ে মেঝেতে পিছলে পড়েন এক রক্তের সাগরে। তারপর আর কিছুই তার মনে নেই । জ্ঞান ফিরলে নিজেকে আবিষ্কার করেন ল্যাবএইড হাসপাতালের বিছানায়।’

এই বর্বর পাশবিকার পর কিছু বিষয় আমার মনের অজান্তেই ভাবনার জগৎকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। জীবনের করিডোরে যেখানে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে নিজেরাই শেষ পর্যন্ত নিজেদের সংসার চালাবে- সেখানে তাদের নিজেদের পছন্দের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে শুধু পরিবার আর ক্যারিয়ার আর মোটা অংকের টাকা দেখে কিভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা হয় ????? আর এই ধরনের পাষন্ড নরাধমদের একটি মাত্র সনদের ভিত্তিতে কিভাবে দশ-দশটি বছর একই ছাদের নিচে প্রতিপালন করা হয়। একটি গৃহপালিত জানোয়ারও তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি কেমন একটু অনুভুতি দেখায়।

একটি বিষয় অতীব দুঃখের হলেও সত্যি যে ধনী, জ্ঞানী আর প্রবাসী ছেলে পাওয়া গেলে বাবা-মা এবং ক্ষেত্রবিশেষে মেয়েরাও আর কিছুই দেখতে চান না! তারা যেন বেমালুম ভুলে যান অর্থ জীবনে অনর্থের ও কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। এই উচ্চ শিক্ষার মধ্যে যদি কুশিক্ষার ধইঞ্জার বীজ থাকে তা একদিন বর্বর আচরণকেই স্পষ্ট করে দেবে। সাইদ নামের এই পশুটি তো ধনী পিতারই সন্তান আর সে তো বুয়েটের মতো শিক্ষায়তন থেকে পাস করা। যে কিভাবে হিংস্র হায়েনার মতো এই কাজ করতে পারলো।
আধুনিকতার সংস্কৃতির লাল নীল আলোর মোহনীয় আবেশে আকৃষ্ট হয়ে দেশীয় সংস্কৃতির বাধন খুলে মেয়েরা যখন দেহপসারিনীদের সাথে পাল্লাদিয়ে দেহ সৌষ্ঠব প্রদর্শনে সুন্দরী প্রতিযোগীতার নামে নিজেকে বিকিয়ে দিতে নামে নামে তখন অনেক বাবা মা নির্বিকার কেননা এত একদিন টাককড়ি প্রসবের সমুহ সম্ভাবনা থেকেই যায়। কিন্তু তারা বেমালুম ভুলে থাকেন জীবনের জন্যই ক্যারিয়ার আর কখনোই ক্যারিয়ারের জন্য জীবন না।
অন্যদিকে নেশাগ্রস্ত মোহ আর প্রেম ভালবাসার ভাবার্থই যৌন সংস্কৃতির চর্চা এমুন ভাবনা এদেশের মানুষের নারীদের প্রতি সম্মান কমিয়ে দিয়েছে। প্রভা-রাজিব নির্ঝর-চৈতি প্রেম ভালবাসার নামে যে অখাদ্য নগ্নতা বাজারজাত করেছে তাতে এহেন নারী পুরুষের প্রেমের প্রতি বরাহ শাবকও বোধ করি মুত্র বিয়োগ ব্যতিত দ্বিতীয় কোন কর্ম সম্পাদনের ইচ্ছাপোষণ করবে না। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে নির্যাতিত হয়েছেন একজন মা। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একজন শিক্ষিকা। তাই যাদের মানুষের হৃদয় আছে তাঁরা তো কিছুটা হলেও বিচলিত হবেন।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এই শিক্ষিকা গত ৫ জুন রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাবার বাড়িতে স্বামী হাসান সাইদের হাতে এমনি নির্মমভাবে নির্যাতিত হন । জঘণ্য এই নির্যাতনের খবরে পুরো জাতি আজ বিস্মিত হতবাক। এতে ক্ষান্ত না হয়ে নরপিশাচ হাসান সাইদ তাঁকে গুলি করে হত্যা করার নতুন গায়ে এসিড নিক্ষেপের হুমকি দিয়েছে। এই পাশবিকতা শিকার রুমানা এখন তার প্রাণ শংকায় ভুগছেন । তিনি আতংকিত হয়ে একমাত্র কন্যা আনুশাসহ পরিবারের অন্যন্যা সদস্যের নিরাপত্তার দাবি করেন মিডিয়ার কাছে।
২০০১ সালে হাসান সাইদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ রুমানার একমাত্র সাড়ে পাঁচ বছর বয়সের আনুশাকে নিয়ে মোটেও সুখকর জীবন যাপন করতে পারেননি। বিয়ের পর থেকেই পিশাচ সাইদের নানামুখী নির্যাতন তিনি আত্নসম্মান আর লোক লজ্জার ভয়ে নীরবে সহ্য করে আসছিলেন। হয়তো সন্তানের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সয়ে গেছেন। সর্বশেষ উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা যাওয়া নিয়ে মনোমালিন্য শুরু হয়। তারপর এই চরম নির্যাতন।
তাঁর বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মনজুর হোসেন কান্নায় ভেঙে পড়ে মিডিয়াকে জানান ‘আমার মেয়েটা খুব নম্র স্বভাবের। ১০ বছর ধরে সংসার করছে, আমাদের কখনো স্বামীর নির্যাতনের বিষয়ে কিছু বলেনি।’ তিনি আরো বলেন ‘সাইদ আমার মেয়ের দুই চোখ উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল। ডাক্তার বলেছেন, মেয়ের বাঁ চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ডান চোখে দেখতে পারবে কি না, তা-ও অনিশ্চিত।’

ঘটনার পর থেকে পলাতক পাষণ্ড নরাধম সাইদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করা প্রকৌশলী হলেও একজন পিশাচ সদৃশ ব্যাক্তি । প্রকৌশলে তেমন না হলেও একজন নিপীড়ক হিসেবে বেশ পাকা হাতের খেলোয়াড় ছিলো। ঘরজামাই থেকে শ্বশুরের অন্ন ধ্বংশকারী এই সাইদ একসময় ব্যবসা করলেও এখন বেকার হয়ে শ্বশুরালয়ে স্থান নিয়ে সেখানেই স্ত্রীর ওপর চালাতো নির্মম নির্যাতন। অনেক খবর চাউর হয়েছে এই নরাধম নাকি আমাদেরই এক প্রতিমন্ত্রীর ভাইপো। তাই নাকি আমাদের শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী তার তেলতেলে লেজটি নাগালের মধ্যে পাচ্ছেনা পেলেও বুঝি অতিরিক্ত তেল থাকাতে বার বার পিছলে গেছে । হয়তো দেখা যাবে কোনদিন পাবেও না। আর সে নাকি শেয়ার বাজারে নানাবিধ কেলেংকারির সাথেও জড়িত। এই নরপিচাশ কেবল একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকাকে নির্যাতন করেনি সে একজন মাকে নির্যাতিত আর রক্তাক্ত করেছে । তার এই জঘন্য কর্মকান্ডে সেই সাথে পদলুণণ্ঠিত হয়েছে জাতির বিবেক। ধুলিস্যাৎ হয়েছে মানবতার আর্তি । জাতির বিবেককে আঘাত আঘাতকারী যেই হোক সে আইনের উর্ধ্বে নয়। ভাবতে গিয়ে নিজের বিবেক বার বার দংশিত হয় যখন দেখি এই পিশাচ দেশের শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠকে একদিন ক্লেদাক্ত করেছিল। পাষণ্ড সাইদের এই বর্ববতা আমাদের সেই ব্রিটিশ আধিপত্যবাদীদের আমলে আমেরিকার বরে ইন্ডিয়ান বসতিতে গিয়ে নারীদের নির্যাতন, খুন জখম, ধর্ষণ ,তাদের জবাই করে রক্তে গোসল করার মতো বর্বর কাহিনী গুলোকে মনে করিয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশের তথাকথিত শুশীল যারা বাংলাদেশের মধ্যযুগকে অনেকটা কুয়োর ব্যাঙের মতো ইউরোপের দৃষ্টিতে দেখে আসতে বরাবর অভ্যস্ত তাদের মতো একচোখা হয়ে আমি আমার পোস্টে প্রত্যয় হিসেব ক্রুসেডীয় বর্বরতা শব্দটি ব্যবহার করেছি।

দেশের বিস্মিত হতবাক জনগণ এই নির্মমতার বিচার চায়। তারা দেখতে চায় শুধু একটি আইনকে জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়ে না রেখে তার প্রায়োগিক দিককে শক্তিশালী করা হোক। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র যখন জনগণ নির্যাতনে হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় আর আর নারীর একমাত্র আশ্রয়স্থল সংসার যখন তার জন্য নিরাপদ থাকেনা। তখন মানবাত্মা গুমরে কাঁদতে থাকলেও নিয়তি নীরব থাকে। আমরা এই বর্বরতার আশু প্রতিকার চাই। আমরা আর কখনো কাউকে রুমান ম্যাডামের মতো করুণ পরিণতির শিকার হওয়া দেখতে চাইনা । একবার ভেবে দেখুন এই রুমানা ম্যাডাম যদি আপনার বোন হতেন আপনি কি পারতেন নীরব থাকতে। কোনদিনই পারতেন না। তাই আসুন তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলুন এই নৃশংস আচরনের বিরুদ্ধে।

আমাদের এই প্রতিবাদ যেন ব্লগ ফেসবুকে আর পত্রিকা পাতায় ক্ষনিকে ঝড় তুলেই থেমে না যায়। প্রিন্ট আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ঘটনা ঘটার পর সপ্তাহ খানেক নীরব থেকে হটাৎ এই খবর হটকেকের মতো পাবলিক খাচ্ছে দেখে সরব হয়েছেন তারাও যেন এই কলংকিত পঙ্কিল অধ্যায়ের শেষ না দেখে কাজে ক্ষান্ত না দেন। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার খবরটি অন্য সব গরম খবরের মতই একটি পণ্যমাত্র এমন যেন মনে করা না হয়। দুর্ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরে তার গ্রেফতার না হওয়াটাও এমনই আশংকা থেকেই যায়। বিশিষ্ট ব্লগার তায়েফ আহমাদ তাঁর পোস্টে খুব সুন্দরভাবে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
” ক্ষমতাসীন মহলের সাথে আত্মীয়তার বর্মের আড়ালে হয়তো সে বেঁচে যাবে। কে জানে, ইতিমধ্যেই এই ‘কীর্তিমান’ সুপুত্র দেশ ছেড়ে মার্কিন মুলুকে তার ‘গর্বিত’ বাপ-মায়ের কোলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে কিনা”’

এই অপকর্মের এমন গুরুতর শাস্তি দরকার যেন আর কেউ এই ধরণের ঘটনা ঘটানো দূরে থাক। এই ধরণের বিষয় নিয়ে দুঃস্বপ্নও না দেখে। দেশের নারীবাদের নামে মুখে ফেনাসৃষ্টিকারীরা কেন যে এখন অবধি নীরব আছেন তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। না তারা এখনো ক্যালকুলেটর টিপে যাচ্ছেন এই বিষয়ে আন্দোলন করা হলে তাদের লাভের অংক কতটুকু থাকছে। নীরব নির্বিকার প্রশাসনের বরফ গলাতে প্রথম আন্দোলনে সো্চ্চার হওয়া উচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক শিক্ষিকাদের। তাদের এই আন্দোলনের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সব কটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সরগরম হলে এই নরাধমের বিচার এই বাংলাদেশের মাটিতে হবেই হবে। 

Archaeology Of Humankind

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব 
শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
aurnabmaas@gmail.com 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s