আদিবাসী শব্দচয়ন ও বিতর্কের নেপথ্যের কথা । কিছু প্রসঙ্গ ,আলোচনার কয়েকটি পরিসর।


বাংলাদেশের আদিবাসী কারা
আমাদের মাননীয় মন্ত্রী দিপু মণির একটি উক্তির পর হটাৎ করেই আমাদের দেশের মিডিয়া কেমন যেন আদাজল খেয়ে লেগেছে। কেউ কেউ চাইছে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা আমাদের পাহাড়ী অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে আদিবাসী বানিয়েই ছাড়বে। আমাদের দেশের সু-পরিচিত কলাম লেখক জাফর ইকবাল স্যারতো অনেকটা মামাবাড়ির আবদার করেই বসলেন

‌‌‌”’কারো মনে দুখ দিয়ো না, তবে আমি যে কলাম লিখেছি সেদিন সেটাতে আর কেউ না হোক জাফর সাহেব ঠিকই দুখ পেয়েছেন। কিন্তু কি আর করা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন যেখানে, সেখানে আপনাদের মতো দুই একজন স্বঘোষিত পণ্তিতের মনে দুখ দিতে আমাদের যে অন্তরাত্মা কাপেঁ না। আমরা যে এই দিক থেকে পাষণ্ড।

শাব্দিক ও বুৎপত্তিগত অর্থ বিচার করতে গেলে আমরা আদিবাসী শব্দটিকে বিশ্লেষণ করে পাই । আদি অর্থ আসল যেটি প্রাচীনত্বের বিচারে প্রতিধানযোগ্য। ইংরেজি indigenous শব্দটির বাংলা হচ্ছে ‘আদিবাসী’। এখানে জাতিসংঘের স্পেশাল ড্যাপেটিয়ার হোসে মার্টিনেজ কোবোর যে সংজ্ঞা জাতিসংঘ ‘ওয়ার্কিং ডেফিনেশন’ হিসেবে ১৯৮৪ সালে গ্রহণ করেছে, সেই মোতাবেক বলা যায়

‘আদিবাসী সম্প্রদায়, জনগোষ্ঠী ও জাতি বলতে তাদের বোঝায়, যাদের ভূখণ্ডে প্রাক-আগ্রাসন এবং প্রাক-উপনিবেশকাল থেকে বিকশিত সামাজিক ধারাসহ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যারা নিজেদের ওই ভূখণ্ডে বা ভূখণ্ডের কিয়দংশে বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক জনগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র মনে করে। বর্তমানে তারা সমাজে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীভুক্ত এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইনব্যবস্থার ভিত্তিতে জাতি হিসেবে তাদের ধারাবাহিক বিদ্যমানতার আলোকে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের ভূখণ্ড ও নৃতাত্তি্বক পরিচয় ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

আমি প্রাক আগ্রাসন প্রাক উপনিবেশ সময়কালের তর্কে যাওয়ার আগে একটি বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই যেগুলো আমাদের দেশের দুই টাকার আজিজ সুপার মার্কেটের গাজার দমে হওয়া বুদ্ধিজীবি কিংবা জাফর সাহেবদের মতো চাটুকারদের থোতামুখ ভোতা করে দিতে যথেষ্ট হবে। যায় যায় দিনের এই বছরের প্রকাশিত ঈদ সংখ্যায় বিশাল এক নিবন্ধে আমি স্পষ্টভাবে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি আমাদের ভূখণ্ডে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। এখানে কিভাবে প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে আজ অবধি মানুষের সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। আর সেখানে ঐ তথাকথিত পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর কোন অস্তিত্ত্বই নেই। আমি দুই জাফর ইকবালের মতো দুই টাকার দেশদ্রোহীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো। আপনি গণিতের লোক গণিত নিয়েই থাকেন। নিজের লাভের গণিত মেটাতে গিয়ে আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাক্ষেত্র কিংবা নৃবৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে দুষণ ঘটাতে আপনাকে দাওয়াত দেয়া হয়নি। আপনি শুধু শুধু ওদের পক্ষে নোংরা দালালি করে যাচ্ছেন। এখানে আপনার চৌদ্দ গোষ্ঠী আসলেও আমাদের উয়ারী বটেশ্বর, মহাস্থানগড় আর চাকলাপুঞ্জী দূরে থাক মহাস্থানগড়েও আপনাদের ওই সন্তু লারমার জাতদের খুজে পাওয়ার কোন সুযোগ নাই। আপনি মহা পন্ডিত আপনি অনেক বুঝেন। আপনার এটা বোঝা উচিত আপনি যেটা করতে চাইছেন সেটা অন্যায়। আমাদের দেশের সংবিধান আর সার্বভৌমত্ব বিরোধী এক চক্রান্তে আপনি সায় দিচ্ছেন। এটা আর সবাই মানতে পারলেও আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা মেনে নিতে পারিনা।
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, জননিরাপত্তার অভাব, ভাংগচোরা রাস্তা এই সকল দিক নিয়ে আমরা যতোই সরকারের বিরুদ্ধে যাই এই একটি বিষয়ে অন্তত সরকারকে সমর্থন দিতে আমরা পিছপা হচ্ছি না। যেটা আপনাদের জন্য দু:সংবাদ।
১৯৮৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৬৯নং কনভেনশনে আদিবাসী বলতে বলা হয়েছে, ‘স্বাধীন দেশগুলোর জাতিসমূহ, যারা এই মর্মে আদিবাসী হিসেবে পরিগণিত যে তারা ওই দেশটিতে কিংবা দেশটি যে ভৌগোলিক ভূখণ্ডে অবস্থিত সেখানে রাজ্য বিজয়, কিংবা উপনিবেশ স্থাপন, কিংবা বর্তমান রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্ধারণকাল থেকে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর বংশধর, যারা তাদের আইনসংগত মর্যাদা নির্বিশেষে নিজেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অংশবিশেষ বা সম্পূর্ণ লালন করে চলেছে।’
দেখা যাচ্ছে, জাতিসংঘ যাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাদের ক্ষেত্রে কয়েকটি সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সহজ ভাষায় তারাই আদিবাসী, যারা

১. কোনো উপনিবেশ স্থাপনের আগে থেকেই ওই ভূখণ্ডে বাস করছিল
২. যারা ভূখণ্ডে নিজস্ব জাতিসত্তার সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে।
এই সংজ্ঞানুসারে আদিবাসীর উদাহরণ হতে পারে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা কিংবা নিউজিল্যান্ডের আদিবাসীরা। আর আমাদের দেশের পাহাড়ী জনগোষ্ঠী এই ধারার আওতায় কোনদিনই পড়ে না।

এই দেশগুলোর আদিবাসীরা প্রথম থেকেই সেখানে ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক দেশগুলো ভূখণ্ড অধিকার করে নিয়ে নিজেদের সংখ্যাগুরু করে ফেলে। নিজেদের ভূখণ্ডে নিজেরাই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া এই মানুষরাই পরবর্তী সময়ে ওইসব দেশের আদিবাসী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অন্যদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমান ও নৃতাত্ত্বিক সাক্ষ্য থেকে জানা যায় বাংলাদেশে মানব বসতির ঐতিহ্য হাজার বছরের যেখানে ঐ সব পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর চৌদ্দগোষ্ঠীর কোন অস্তিত্ত ছিল না।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.২ শতাংশ মানুষ কখনোই এই ভূখণ্ডের মূল মালিক হিসেবে দাবি করতে পারে না যেখানে তাদের অবস্থানিক প্রাচীনত্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তাদের এই অবস্থান আমাদের দেশ বিরোধী কিছু বরাহশাবক শুশীল আর মিডিয়ার সৃষ্টি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দাবি করেছেন, মোগল শাসনামলে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশ ও মোঙ্গলীয় জাতিগোষ্ঠী থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়ের জন্য অভিবাসী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠী আশ্রয় নেয়। এই হিসেবে পার্বত্য অঞ্চলে অবাঙালি এই জনগোষ্ঠীর অবস্থান মাত্র কয়েক শতকের। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিফিংকালে জানান, এই অঞ্চলে অন্তত চার হাজার বছর ধরে বাঙালিরা বাস করে আসছে যেটি উয়ারী বটেশ্বর অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে বস্তুনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়েছে। আর চাকলাপুঞ্জী বা লালমাই অঞ্জলের পাথরযুগের সংস্কৃতির কথা ধরলে এই সময়কাল আরো পিছিয়ে যেতে বাধ্য।
সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে তথাকথিত আদিবাসী স্বীকৃতির নামে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থির করে তুলছে একটি আন্তর্জাতিক চক্র পাশাপাশি মিডিয়াতে কলম চালিয়ে বা মুখে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে তাদের নির্লজ্জ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এদেশেরই কিচু চাটুকার । মানবসেবার নামে দেশও জাতির বিরুদ্ধে গভীর এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে তারা। আমরা ৭ আগস্ট (সকালের খবর) এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখেছি পার্বত্যাঞ্চলে পশ্চিমা কূটনৈতিকদের আনাগোনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এনজিওগুলোর প্রলোভনে পড়ে ধর্মান্তরিত লোকের সংখ্যাও বাড়ছে অধিক হারে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে হিন্দু মুসলমান ও বৌদ্ধদের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়ে খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারির সংখ্যা বেশি। প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থা তথা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে এসব তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। যে কোনো বিবেচনায় অভিযোগটি গুরুতর।
আমরা বারবার বলে আসছি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি চক্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। পাহাড়িদের একটা অংশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিভ্রান্তির ও মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করছে। এমনকি পাহাড়িরা কোথাও কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। চাঁদাবাজি এখন সেখানে স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পাহাড়িদের নেতা হিসেবে দাবিদার সন্তু লারমা তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন না। সরকারের আন্তরিকতাকে তিনি সমালোচনা করেছেন একাধিকবার। বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার দাবি তার অনেক পুরনো। আর পাহাড়ে অবস্থানকারী উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্থানয়ি বাংলাদেশী জনতাকে হত্যা , খুন জখম, ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা একের পর এক ঘটিয়ে চলেছে সন্তু লারমার মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা।
বাস্তবতা বিচার করতে গিয়ে আমরা দেখেছি সন্তু লারমার এ ধরনের বক্তব্য তাকে শুধু বিতর্কিতই করেনি, বরং তার উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

প্রথমত, সন্তু লারমা এ ধরনের বক্তব্য রাখার কোনো অধিকার রাখেন কি-না? কেননা তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাকে ভোট দিয় নির্বাচিত করেনি। তিনি চাকমাদেরও এককভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন না। ইউপিডিএফও পাহাড়ি তথা চাকমাদের প্রতিনিধিত্ব করে।
দ্বিতীয়ত, চাকমাদের মতো বাঙালিরাও সেখানকার ‘সেটলার’। বিরান পাহাড়ি ভূমিতে প্রথমে চাকমা তথা অন্য পাহাড়িরা বসবাস করতে শুরু করে। প্রায় একই সময় বাঙালিরাও সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। তবে নিঃসন্দেহে তারা সংখ্যায় কম ছিল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা লুসাই জনগোষ্ঠী ‘আদিবাসী’ নয়। বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী হচ্ছে সাঁওতাল, মান্দি ও ভাওয়াল গড়ের সমতল ভূমিতে বসবাসকারী কিছু জনগোষ্ঠী যাদের কেউই মঙ্গোলয়েড শ্রেনীভুক্ত নয়।

সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি উপজাতির মাত্র ৬ লাখ মানুষ ‘আদিবাসী’ দাবি করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিতে পারে না।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশ কয়বার আমরা দেখেছি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সরিয়ে সেখানে সন্তু লারমার সন্ত্রাসী বাহিনীকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে সহায়তা করাও হয়েছে। তবুও তাতে ক্ষমতালোভী সন্তু লারমা সন্তুষ্ট হননি। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক দিয়ে যাচ্ছেন অশালীন বক্তব্য ।
আমরা জানি বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছে। তাদের কর্মযোগ্যতা, শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অথচ সেই সেনাবাহিনীকে বারবার বিতর্কিত করছেন সন্তু লারমার মতো একজন সন্ত্রাসী যেখানে আমাদের সরকার বরাবরই নীরব ছিল । বাংলাদেশের সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে জন্ম হয়েছে যাদের ইতিহাস স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার । পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি প্রতিকূল পরিবেশে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতাকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে এই সব পাহাড়ী এলাকা থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করার ফলে। ওইসব অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। গত ২১ মের বরকলের ঘটনা এর বড় প্রমাণ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বরকলের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র আছে এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা অস্ত্র সংগ্রহ করছে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময় অভিযোগ করা হয়েছিল জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র ক্যাডাররা সব অস্ত্র জমা দেয়নি। এখন মনে হচ্ছে ওই অভিযোগের পেছনে সত্যতা ছিল।

শান্তিচুক্তি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও এর একটা ভালো দিক হচ্ছে ভারতে আশ্রিত চাকমারা তাদের নিজ বাসভূমে ফিরে এসেছেন। সরকার তাদের এককালীন টাকা দিয়ে পুনর্বাসনও করেছে; কিন্তু আমরা কখনো চাইবো না পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। পূর্ব তিমুর ছিল একসময় ইন্দোনেশিয়ার একটি অংশ, একটি প্রদেশ; কিন্তু খ্রিস্টান অধ্যুষিত পূর্ব তিমুরকে পশ্চিমা বিশ্ব স্বাধীন করেছিল তাদের স্বার্থে। পূর্ব তিমুর স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৯৯ সালে। আর দক্ষিণ সুদান, যেখানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বেশি, সেখানে অতিসম্প্রতি গণভোটের মাধ্যমে দেশটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

আগে দক্ষিণ সুদান ছিল সুদানের একটি অংশ। পূর্ব তিমুরের মতো দক্ষিণ সুদানে তেল পাওয়া গেছে। পশ্চিমাদের স্বার্থ এখানে অনেক। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের শঙ্কাটা তাই অনেক বেশি। আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সপ্তম সভায়ও এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে (আমার দেশ, ১০ এপ্রিল, ২০১১)। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ঘন ঘন সফর, ইউএনডিপির কর্মকাণ্ড , ইত্যাদি এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যারা দেশ, জাতি, স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব নিয়ে ভাবেন তাদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এক ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

পার্বত্য সাধারণ উপজাতীয়রা গভীর জঙ্গলে বসবাস করে। তারা ছোটখাটো দোকান, কিংবা জুম চাষ করে, কৃষি পণ্য বিক্রি করে অতি কষ্টে দিনযাপন করে। মিশনারিরা অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এদের ধর্মান্তরিত করছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কী হারে উপজাতীয়রা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে, তা একটা পরিসংখ্যান নিয়েই জানা যাবে। উপজাতীয়দের দরিদ্রতা পুঁজি করে খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে। শুধু তাই নয়। ইউএনডিপির বিভিন্ন প্রজেক্টে পাহাড়ি ধর্মান্তরিত লোকদের চাকরি দেয়া হচ্ছে। অথচ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা সেখানে চাকরি পাচ্ছে না।

বাঙালিদের সঙ্গে সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে। পাহাড়ি অঞ্চলে একজন উপজাতীয় ড্রাইভার যে বেতন পান, অনেক বাঙালি কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও সেই বেতন পান না। পাহাড়ে স্পষ্টতই একটি বিভাজন তৈরি করা হয়েছে, যা সংবিধানের ১৯নং (সুযোগের সমতা), ২৭ নং (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ২৮ নং (ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি; কিন্তু দুঃখ লাগে তথাকথিত সুশীল সমাজ কোনোদিনও এ প্রশ্নে মুখ খোলেননি কারণ ওই বরাহ শাবকরা স্বার্থের জন্য নিজের মা বা স্ত্রীকেও বন্ধক রাখতে পারে সেখানে দেশ তো কোন ছার।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতীয়দের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে তারা মানববন্ধন করলেও, ওখানে বসবাসকারী বাঙালিরা যে ষড়যন্ত্র ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, সে ব্যাপারে একবারও তারা কথা বলেননি। বিদেশিরা পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানকে মূল রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন করেছিল। স্থানীয় লোকদের ব্যাপক ধর্মান্তরিত করে তারা তাদের উদ্দেশ্য সাধন করেছিল। আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়েও ওই একই ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এ ব্যাপারে সোচ্চার ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

গত ২১ মের বরকলের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসী কর্মকা- পাহাড়ে স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে। পাহাড়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য সেনাবাহিনীর কর্মকা- সেখানে বাড়ানো উচিত। প্রয়োজনে প্রত্যাহারকৃত ক্যাম্পগুলোতে পুনরায় সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা দরকার।

যদি আসামের উলফা নিষিদ্ধ হয় আমাদের দেশের উচ্ছৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ইউপিডিএফ এর মতো সন্ত্রাসী সংগঠনকে যতো দ্রুত সম্ভব নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ এখান দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যদিও সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংগঠনটি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচালনা করার অধিকার রাখে তবুও দেশের অভ্যন্তরে কারো অধিকার নেই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা বা বিদেশী মদদে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হওয়াও জরুরি। নির্বাচন না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা সুযোগ পাচ্ছে। আরো একটা কথা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো ধরনের নির্বাচন কিংবা দায়বদ্ধতা ছাড়াই সন্তু লারমা ১৯৯৯ সালের ১২ মে থেকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এটা অবৈধ ও অশোভন। একটানা দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর এ দেশের রাষ্ট্রপতিও ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। আর তার অযৌক্তিক দাবির মুণ্ডুপাত করতে এখনই জরুরী ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। নতুবা জাতি যে এক গভীর সংকটে নিপতিত হতে যাচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিস্তৃত তথ্য পেতে এই লেখাটিও পড়ে দেখতে পারেন।

আদিবাসী প্রসঙ্গে চলমান বিতর্ক ও সংকট : বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে সৃষ্ট জটিলতা
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
ব্লগার ও কলামিস্ট।
aurnabmass@gmail.com

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s