মধ্যযুগে বাংলার ধর্মচিন্তায় সুফিবাদ পর্ব -৩


মুসলিম আগমন-পূর্ব বাংলার ধর্মচিন্তার প্রতি দৃষ্টি দিলে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় বাংলা ও বাঙালির ধর্মচিন্তা মূলত আবর্তিত হতো হিন্দু-বৌদ্ধ একটি মিশ্র ধর্মীয় ভাবধারাকে ঘিরে। অবস্থানিক বিচার করতে গিয়ে আমরা দেখি বৌদ্ধধর্মের বজ্রযানী ও তান্ত্রিক দর্শন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের সাথে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য নির্দেশ করা বেশ কঠিন ছিল। অন্যদিকে বাংলার এই ধর্মীয় কাঠামোতে সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন আঙ্গিকের মুসলিম একেশ্বরবাদী ধর্মদর্শন প্রতিষ্ঠা পাওয়া অনেকাংশেই বেশ দুষ্কর ছিল। তবুও সুফিদর্শনের প্রভাবে বাংলার ধর্মচিন্তায় ইসলাম ধর্মীয় চিন্তাধারা এমন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা পায় যেখানে কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মীয় সমাজ কাঠামো অনেকাংশে হুমকির মুখে পড়ে। পরবর্তিকালে আমরা হিন্দু ধর্মের এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নিতে সুফি ভাবধারার আঙ্গিকেই গড়ে ওঠা চৈতণ্যদেবের ভক্তিআন্দোলন প্রতিষ্ঠা পেতে দেখি। তের শতকে বাংলার রাজদণ্ডে মুসলিম শক্তির আরোহনের বহুপূর্বে প্রায় প্রায় এগার শতকের দিক থেকে বাংলার জমিনে মুসলিম সমাজ কাঠামো বিকশিত হতে থাকে। কিন্তু সমসাময়িক তেমন কোনো ঐতিহাসিক সূত্র না মেলায় এই বিষয় বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ করাও দুষ্কর। ইতিহাসের পট পরিক্রমায় এই ধারাবাহিক রচনার বিগত পর্বে সেন শাসনের অরাজকতায় হিন্দু সমাজের মধ্যে যে শ্রেণী বিভাজন, স্বার্থন্বেষী ও দমনমূলক নীতি প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রসঙ্গটি উল্লিখিত হয়েছে। এই অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু সমাজের ঐক্য ধরে রাখতে যথেষ্ট ছিল না। বরং বুমেরাংই হয়েছিল। হিন্দু সমাজের সাধারণ মানুষ একদিকে যেমন ধর্মচর্চা থেকে বিতাড়িত হয়েছিল তেমনি তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক অধিকারের সকল ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়ে কোনঠাসা হয়ে পরেছিল। এই নড়বড়ে ধর্মীয় ও আর্থসামাজিক কাঠামোয় দাঁড়ানো বাংলায় আগমন ঘটতে থাকে মুসলিম সুফি সাধকদের। যাঁদের উৎসভূমি ভারতবর্ষের বাইরে হলেও ধর্মদর্শণ প্রচারের সুবিধায় তাঁরা অনেকটাই ভারতীয় অধিবাসীদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন।
সুফিদর্শন বিশ্লেষণের পূর্বে এই সুফি শব্দটির শাব্দিক বিশ্লেষণ জরুরী মনে করছি। ইতিহাসবিদদের ধারণা অনুযায়ী আরবি শব্দ ‘সাফা’ অর্থাৎ পবিত্রতা থেকে সুফি কথাটির উদ্ভব। কেউ কেউ মনে করেন ‘সুফ’ বা শ্রেণী হতেও সুফি শব্দ উৎপত্তি লাভ করে থাকতে পারে। তবে সবথেকে নির্ভরযোগ্য বিষয়টি আমরা পাই অধ্যাপক গিব ইবনে সিরিনের বিশ্লেষণ থেকে যে ব্যাখ্যাটি এসেছে সেখানে। অধ্যাপক গিব দেখিয়েছেন ইসলামের এই ধর্মীয় সাধকগণ একধরণের রঙিন পশমী কাপড় পরিধান করতেন যেমনটি খ্রিষ্টানধর্মীয় সাধকরাও একসময় ব্যবহার করেছেন। এই কাপড়ের নাম ‘সুফ’ বা সউফ। এর থেকেও সুফি শব্দটির উৎপত্তি হতে পারে। তবে ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানি রাসূল সা. এর জামানায় বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান সাহাবী ছিলেন যাঁদেরকে দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় বেহেশতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। নিজেদের সহায় সম্পত্তি সবকিছু আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দিয়ে মসজিদের সমতল ছাদের নিচে অবস্থান নেয়াতে তাদের বলা হতো ‘আসহাবে সুফফা’। তাঁদের নামের পরবর্তিত রূপ থেকে সুফি শব্দটির উৎপত্তি ঘটে থাকতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছেন। প্রকৃত অর্থে অধ্যাপক ম্যাসিগননের বিশ্লেষণ থেকে বলা যায় ইসলাম ধর্মের ধ্র“পদী কঠোর সংযমের রীতি যার উৎপত্তি মহাগ্রন্থ আল-কোরআন এবং রাসূল সা. এর জীবনাচরণ থেকে সেটাই দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়ে সুফিবাদী দর্শনের জন্ম দেয়। এই সকল ইসলাম ধর্মীয় সাধকগণ মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. কে প্রথম এবং হযরত আলীকে দ্বিতীয় আধ্যাত্মিক নেতা ও দিকনির্দেশনা প্রদানকারী হিসেবে শ্রদ্ধা করে থাকেন। সাংসারিক ধর্ম হিসেবে ইসলামকে কৃচ্ছ্বপরায়ণ নীতির বিপরীতে ভাবা হলেও এর আদিপুরুষদের মধ্যে অনেকে যেমন প্রধান চার খলিফা, বিশিষ্ট সাহাবী হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা., হয়রত সালমান ফারসী রা. সহ বেশ কয়েকজন বিখ্যাত মুসলিম শাসক ও নেতা এই রীতি বেশ কঠোরতার সাথে পালন করেছেন। তাঁদের নিকট ইসলাম ছিল আত্মার সংযম ও আধ্যাতিœকার সাধনা। কেবলমাত্র কয়েকটি ধর্ম নির্ভর আচার অনুষ্ঠান পালনের সমষ্টি নয়। এই সকল মহান সাধক সদা সচেষ্ট ছিলেন কিভাবে ধর্ম হিসেবে ইসলামকে মানুষের কল্যাণের কাজে লাগানো যায়। প্রাথমিকভাবে আরব থেকে উৎপত্তি লাভ করে হাসান বসরীর (র.) মাধ্যমে এই দর্শন পারস্যে বেশ ভালভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে সুফিবাদের মূলমন্ত্র হচ্ছে তীব্র ভালবাসা, ত্যাগ ও মানবতার কল্যাণের মাধ্যমে আত্মার নৈকট্য লাভ ও মহান আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা। এই ক্ষেত্রে শরীয়ত, তরিকত, মারিফত, হাকিকত, ফানা ফিল্লাহ এবং বাকি বিল্লাহ প্রভৃতি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমত সঠিক নির্দেশনা অনুযায়ী জীবনধারণ করতে হয় পরবর্তিকালে একজন ধর্মগুরুর সান্নিধ্যে থেকে আধ্যাতিœক শিক্ষালাভ করে জিকর আসকারের মাধ্যমে নিজের আধ্যাতিœক উন্নতি ঘটাতে হয়। পরবর্তি সময়ে একজন সুফির স্তর বা ফানাফিল্লাহ স্তরে উন্নীত হতে হয়। শেষ ধাপে আতœার উৎসর্গে আল্লাহর নৈকট্যলাভই বাকিবিল্লাহ স্তর। কেমলমাত্র জিকির আসকার ও ধর্মীয় ইবাদত করে নিজেদের আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন নয়, সুফিসাধকগণ সর্বত্র মানবতার কল্যাণে থাকেন নিবেদিতপ্রাণ। তাঁদের দর্শনের অন্যতম দিক মানবতার কল্যাণ সাধনের মাঝেই আত্মার পরিশুদ্ধি আসে। অবস্থান ও সমাজ সংস্কৃতিগত দায় মেটাতে পরবর্তিকালে সুফি দর্শন বেশ কয়েকটি সম্প্রদায় কারো কারো মতে ১৭৫ টি সুফিধারায় বিভক্ত হয়ে পড়লেও তাদের নীতিগত দিক ও অবস্থানিক মানদণ্ড বলতে গেলে ঐ একই অর্থাৎ আত্মার পরিশুদ্ধি আর মানবতার কল্যাণই মুখ্য ছিল। যে কয়েকটি সুফি সম্প্রদায় বা সুফিধারার প্রভাব ভারতীয় ধর্ম দর্শণকে তাড়িত করে তার মধ্যে খাজা মুইনুদ্দিন চিশতীর প্রবর্তিত চিশতীয়া তরিকা, বাহাউদ্দীন জাকারিয়ার সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা, আবদুল কাদের জিলানীর কাদিরিয়া তরিকা,খাজা বাহাউদ্দীন নক্সবন্দীর নকশবন্দীয়া তরিকা মুখ্য ছিল।
মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে বিভিন্ন সময়ে শত শত সুফি দরবেশ বাংলাদেশে আসতে থাকেন তাঁরা মূলত চিশতীয়া ও সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার ছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগমন ঘটতে থাকলেও সেন আমলের দু:শাসন ও জনমনে অস্বস্তির হেতু মানবতাবাদী সুফি দর্শন বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে সক্ষম হয়। কয়েকজন বিখ্যাত সুফির শিক্ষার ভিত্তিতে বিকশিত মরমী গোষ্ঠী থেকে বাঙলায় সুফিবাদ কেমন চূড়ান্তভাবে বিকশিত হয়েছিল তা অনুমান করা যায়। উত্তর ভারত ও পশ্চিম এশিয়া থেকে বাংলার অধিকাংশ অংশে সুফিদের আগমন ঘটে। সুফিগণ হিন্দু ও বৌদ্ধদের মরমী চিন্তাধারার আরও অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। ফলে তাঁদের মাঝে মৌলিক সুফি দর্শনের সাথে অবস্থানিক দায় মেটাতে গিয়ে একটি হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সংস্কৃতিক ভাবধারার মিশ্রিত রূপ লক্ষ করার যায়। তবে এর প্রভাবে বাংলার সুফিগণ এক অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হন। তাঁদের শিক্ষা বিশেষত কুসংস্কারপ্রবণ সমাাজ, হিন্দু ধর্মীয় নানা আচরণ, শাক্ত সমাজ ও জ্যোতিষ ভাবধারার উপর আস্থা স্থাপনকারী সমাজকে ব্যপক প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল। যার প্রমাণ হিসেবে পরবর্তিকালে আমরা দেখি হিন্দু ধর্মের ক্ষয়িষ্ণু দশায় চৈতণ্যদেবের ভক্তি আন্দোলনেও এই একই আদর্শ প্রভাব ফেলেছিল। আমরা বাস্তবতা যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টি একটি আঙ্গিক হতে বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছি। আমাদের কাছে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়েছে ‘সেন শাসন প্রভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মের কঠোরতা ও আচারসর্বস্বতার পাশাপাশি কেবল একটি শ্রেণির একচ্ছত্র আধিপত্য ও বাকিদের অস্পৃশ্যতার বদলে সুফিদের প্রচারিত ধর্মদর্শনে ছিল মানবিকতার আবেদন ও সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ। পাশাপাশি সুফিদের সমাজসেবা, মানুষের প্রতি ভালবাসা, ব্যক্তিত্ব, অলৌলিক ক্ষমতার পাশাপাশি নৃতাত্ত্বিকভাবে সুদর্শন ও দৈহিক গঠনে দাক্ষিণাত্যের ব্রাহ্মণ শাসকদের তুলনায় একটু এগিয়ে ছিলেন। প্রাসঙ্গিকতার কারণে অনুমেয় যে সাধারণ মানুষ অত্যাচারী ব্রাহ্মণদের বিপরীতে এই ভিনদেশী ভিন্নধর্মী সুফিদের অনেকটাই দেবতার আসনে বসিয়েছিল। ফলে ইসলামের সাম্যবাণী বয়ে আনা দুরদেশী সুফিদের প্রতি সাধারণ মানুষের এই শ্রদ্ধা ও অনুরক্তি একদিকে বাংলায় ইসলাম প্রসারের পথ যেমন প্রসারিত করে অন্যদিকে কঠোর সাম্প্রদায়িক, গোঁড়া, বর্ণবিদ্বেষী ও মৌলবাদী ব্রাহ্মণ্যধর্মের ভিত্তিমূলকেও আঘাত করে। ফলে এক সময় হিন্দু ধর্ম বাংলা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার যোগাড় হয়। পরবর্তিকালে হিন্দুধর্মের মহান সংস্কারক চৈতণ্যদেবের ভক্তিআন্দোলন চৈতন্যহীন হিন্দুধর্মের চেতনা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলে হিন্দু ধর্মের অবস্থান এযাত্রা রক্ষা পায় যা পরবর্তিপর্বে আলোচিত হবে। তবে এটা খুব ভালভাবে জানান দিয়ে যায় যে ধর্ম হোক , সামাজিক প্রথা হোক আর ক্ষমতাই হোক তাতে যদি জনগণের অংশগ্রহণ না থাকে, তা যদি জোর পূর্বক ঘোড়ার জীনের মতো মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় তা এক সময় মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবেই হবে। আর বিপরীতে মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার সুফল যে কতটা তা সুফিদের সাফল্য থেকেই অনুমান করা যায়।
সময় ও স্থানের ভিন্নতায় সুফি দরবেশ ও তাঁদের অনুগামী শিষ্যরা বাংলার মাটিতে নানা স্থানে তাদের অবস্থান সুসংহত করেন। তাঁদের অবস্থান প্রথানত সেন প্রশাসনিক এলাকা এড়িয়ে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা মূলত ধর্মীয় আদর্শের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও চরিত্র গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সুফিদের মানবিকতার আদর্শ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে যুক্ত হয়েছিল ইসলামের উদারতা ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ যা কার্যত সুফিরা সমাজের নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত, অধঃপতিত মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। এটাও সুফিদের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ। সুফিদের ভূমিকা মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বেই অগণিত অধিকার বঞ্চিত হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্তজ শ্রেণির মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করে নিজের জীবনের নতুন করে অর্থ খুঁজে পেতে সুযোগ করে দেয়। যা দেখে আরো বেশি সংখ্যক মানুষ সুফিদের মানবতাবাদী দর্শনে আকৃষ্ট হতে থাকে। বিভিন্ন সূত্র থেকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রখ্যাত সুফি শেখ জালাল উদ্দীন তাব্রিজি উত্তরবঙ্গের মালদহ ও দিনাজপুর জেলায় আগমন করলে বিপুল সংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। তকি উদ্দিন আল আরাবি,আখি সিরাজুদ্দীন, নুর কুতুব আলম, আলাউল হক প্রমুখ খ্যাতনামা সুফিদের নিকট উত্তর বাংলার বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম ক্ষমতা আরোহন পূর্বে একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। ড. মুর্তাজা আলীর বিবরণে হযরত শাহজালালের আগমনে হাজার হাজার হিন্দু কাতারে কাতারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বলে বলা হয়েছে। এমন ভাষ্যে আবেগীয় অতিরঞ্জন থাকতে পারে তবে তা বাস্তবতা বর্জিত নয়। এর সমর্থন পাওয়া যায় মরক্কোর প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার বিবরণীতে। বৃহত্তর ঝিনাইদহ-যশোর-খুলনা এলাকায় খান জাহান আলী এবং সোনারগাঁও অঞ্চলে প্রখ্যাত সুফি শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার বি¯তৃত কর্মকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়। ইসলাম প্রচার বাদেও বাংলায় মুসলিম রাজ্য বিস্তার ও সংহতি রক্ষার্থে সুফি-দরবেশদের ভূমিকা ছিল বেশ গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। কখনও হয়তো নিজেরা সরাসরি কিংবা কোন স্থানীয় শাসকের সহায়তায় রাজ্য জয়ও করেছেন এই সব সুফি দরবেশগণ। বিশেষ করে আমরা প্রখ্যত দুই বিজেতা হযরত শাহজালাল ও খান জাহান আলীর কথা জানি।
বাঙলার মধ্যযুগের আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রাজা গণেশের উত্থান। বাংলার সুলতানদের উদারনৈতিক শাসন বিশেষত যোগ্যতার ক্ষেত্রে ধর্ম, জাত স্থান কাল পাত্র বিচার না করার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখি সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহের শাসনকালের (১৩৮৯-১৪১০ খ্রি.) শেষ দিকে তাঁর হিন্দু এক অমাত্য রাজা গণেশ খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। পরবর্তিকালে দুর্বল হামজা শাহের সময় তিনি আরো বেশি ক্ষমতাধর হন। অনেকে মনে করেন পর্দার আড়ালে গণেশের প্ররোচণাতেই বায়েজিদ শাহ হামজা শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই প্রকৃত ক্ষমতা অনেকাংশে দখল করে নেন। পরবর্তিকালে মুজাফফর শাহের দুর্বলতার সুযোগ পুরোপুরি সদ্যবহার করে গণেশ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নানামুখী অনাচার চালাতে শুরু করেন। পরবর্তিকালে প্রখ্যাত সুফি নুর কুতুব আলম এর অনুরোধে গণেশকে শায়েস্তা করতে এগিয়ে আসেন জৌনপুরের শাসক ইবরাহীম শর্কী যে বিষয়ে এই নিবন্ধের প্রথমোক্ত লেখকের ‘মুদ্রায় ও শিলালিপিতে মধ্যযুগের বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি’ গ্রন্থে বি¯তৃত পরিসরে আলোচনার প্রয়াস রয়েছে। তবে বিজেতা বা ধর্ম প্রচারক কিংবা সমাজ সংস্কারক যাই বলা হোক না কেন এই ভূখণ্ডে সুফিদের আগমনের ধারাটি খুব একটা সুখকর ছিল না। সেনরা তাদের অত্যাচারী সিংহাসন সুসংহত করতে গিয়ে যেখানে স্বধর্মীদের নাকাল করে ফেলেছিল সেখানে এই ভিনদেশী মুসলিম সুফিদের শাসক কর্তৃক মেনে নেয়াটা কখনই তাদের বাস্তবতায় সম্ভব ছিল না । যার উদাহরণ হিসেবে করুণ পরিণতির শিকার হতে হয়েছিল বিক্রমপুরের রামপালে আগত সুফি বাবা আদমের শহীদ হওয়ার মধ্যদিয়ে। যদিও আমাদের দেশে প্রাথমিক দিকে সর্ব প্রথম আগত সুফি হিসেবে শাহ সুলতান রুমীর নাম পাওয়া যায়। নেত্রকোনার মদনপুরে তাঁর সমাধি রয়েছে। অঞ্চলটি তখন কোচ রাজাদের শাসন এলাকার ভেতরে ছিল। পাশাপাশি আমরা শাহ সুলতান বলখি মাহিসওয়ারের নাম ও পাই । যাঁর সমাধি রয়েছে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে।
সুফি সাধকদের কর্মকাণ্ড শুধু ধর্ম প্রচারের গণ্ডিতেই আবদ্ধ ছিল না। শিক্ষাবিস্তার ও একটি কল্যানমুখী সমাজ গঠনের পেছনে তাঁদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। যে সমাজ গড়ে উঠেছিল সেন শাসনের অত্যাচার নিষ্পেষণে জর্জরিত একটি সমাজের অচলায়তনের উপর। যেখানে মানবাত্মা গুমড়ে কাঁদছিল, হাহাকার করছিল আত্মপোলদ্ধির অনুশোচনায় ক্লান্ত সমাজের বিবেক, আর হতাশায় দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়েছিল মনুষ্যত্যের মৌলিক আবেদনগুলো। সেই সমাজের অধিকার বঞ্চিত মানুষের কাছে এই সুফিরা ভিনদেশী হলেও তাদের আগমন অনেকটা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপের পর বর্ষার প্রথম এক পশলা বৃষ্টির আশির্বাদের মতো। এই হিসেবে সুফিদের বিশেষ কৃতিত্ব দিতেই হয়। যদিও তাঁদের এই সমাজ গঠনের মূল আদর্শিক দিক ছিল ইসলাম প্রচার ও ইসলামী ও সমাজ গঠন। কিন্তু বাস্তবতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেছে তাঁদের এই প্রচেষ্টা কার্যত অনেক বেশি সেক্যুলার ও আধুনিক ছিল। ইতিহাস, প্রতœতাত্ত্বিক সূত্র, সহিত্যিক সূত্র, লোককাহিনী ও লোকগাথা থেকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করলে দেখা যাবে সুফিদের খানকাগুলোতে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের প্রবেশ অধিকার ছিল সমান। যা নিচু বর্ণের নিষ্পেশিত হিন্দুদের জন্য ছিল স্বপ্নাতীত। পাশাপাশি সেন আমলে সামন্তবাদ প্রসারের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর আরোপ, অনাকাঙ্খিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঘনঘটায় এমন অনেক হিন্দু ছিলেন যাদের গৃহে তিন বেলা চুলোয় আগুনই হয়তো জ্বলতো না। তারা নিজেদের উদর পুর্তির সহজ সুযোগ খুঁজে নেন সুফিদের লঙ্গরখানাতে। যা ধীরে ধীরে একদিন তাদের সুফিদের প্রতি একান্ত অনুগত করে তুলেছিল। কারণ সুফিদের লঙ্গলখানায় প্রবেশ ও খাদ্যলাভ করতে হলে শুধু একটি পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল। তাকে মানুষ হতে হবে। সে কে, তার জাত কি, ধর্ম কি, এগুলোর কোন বিচার করার হতো না। তবে আমাদের প্রচলিত অনুজ্ঞায় সেকুলারকরণের ইতিহাস ও নির্মিত ইতিহাসের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত ও বর্ণনায় দৃশ্যায়নের যে অভিন্ন ভেদরেখা কল্পিত হয় তার বিচারে একে, বিশেষত আমাদের উক্তিকে অনেকটা অলীক বলে উড়িয়ে দিতেই পথ খুঁজবেন এক শ্রেণির ইতিহাস বিদ। কিন্তু ইতিহাস এগিয়ে চলে আঁকর সূত্র নিয়ে। গবেষকের কাজ সেগুলোর মৌলিক দিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে মূল ইতিহাসের কাছাকাছি যাওয়া। কিন্তু এগুলো বাদ দিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিতণ্ডার ফাঁদ পেতে প্রচলিত ইতিহাসের সত্যের বিরোধিতা করলে তা প্রকৃত ইতিহাস চর্চায় গৃহীত হবে না। তথ্যসূত্রের আলোকে আলোচনা করতে গিয়ে দেখা যায় বাংলার সমাজ কাঠামোতে সুফিদের ভূমিকাকে আলাদা করে না দেখার কোন সুযোগ নেই।
শরফউদ্দীন আবু তাওয়ামা ছিলেন তেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধের খ্যাতনামা পণ্ডিতদের মধ্যে অন্যতম। ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাতে তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। তিনি সোনারগাঁওতে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করে বাংলার ও উত্তর ভারতের ছাত্রদের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করেন। এই মাদ্রাসার প্রখ্যাত শিক্ষক কাজী রুকন উদ্দিন আল সমরখন্দি অমৃতকুণ্ড নামের হিন্দু যোগশাস্ত্রের একটি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ— মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। সুফিদের সেক্যুলারনীতি প্রমাণ করতে গেলে এর থেকে আর কত বড় প্রমাণ দরকার। বাংলার ধর্মাচারের দিক নির্দেশনামূলক বেশ কিছু বই আমরা সুফিদের রচনা থেকে পাই। যেমন মরমীবাদের উপর রচিত আজিবা, সর্বেশ্বরবাদের উপর লিখিত ইরাশাদুল সালেকিন, সত্য সন্ধানীদের জন্য ইরশাদুল তালেবিন প্রভৃতি।
আবু তাওয়ামার পাশাপাশি আখি সিরাজুদ্দীন, শেখ আলী সিরাজ, শেখ আলাউল হক এবং হযরত নুর কুতুব আলম বাংলার মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বেশ সচেষ্ট ছিলেন বলেই দেখা যায়। তাঁরা কেবল মাত্র ইসলামী ও আধ্যত্মিক জ্ঞান প্রদান করেছেন এমনটি নয়। দর্শন, জীবনব্যবস্থা, সাধারণ জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাধারণ শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রেও তাদের আগ্রহী হতে দেখা যায়। আমরা রাজশাহীর বাঘায় প্রখ্যাত সুফি হামিদ দানিশমন্দের শিক্ষাকেন্দ্র থাকার প্রমাণ পাই। এটিকে তৎকালীন সময়ের কলেজ বা মহাবিদ্যালয়ের সমপর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। যেটা দীর্ঘদিন টিকে ছিল এবং মুঘল আমলে একজন পর্যটক আবদুল লতিফ এটিকে দেখেছেন বলে তার বিবরণে উল্লেখ করেছেন। এই সব সুফি দরবেশদের খানকাহ ও সংশ্লিষ্ট খানকাহগুলোকে তৎকালীন বাঙলার মানুষের আধ্যত্মিক ও বুদ্ধিভিত্তিক জগতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা যাচ্ছে। জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হাতে এই সকল শিক্ষাকেন্দ্র কেবল বাংলাদেশকেই আলোকিত করেনি আলোকিত করেছে পুরো ভারতবর্ষকেও।
সুফি দরবেশদের এই খানকাহগুলো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি পরিচিতি পায় জনহিতকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে। শিক্ষাকেন্দ্র ও ধর্মীয়কেন্দ্র হিসেবে অবস্থানের পাশাপাশি এই সকল খানকাহগুলোকে একটি অসহায়দের আশ্রয়স্থল হিসেবেও ধরা যেতে পারে। অনেক ধনী শিষ্যরা এই সকল খানকায় আশ্রয় গ্রহণকারী মানুষকে সাহায্য করা তাদের জন্য পূণ্য হিসেবে বিবেচনা করতেন। এখানকার চিকিৎসালয়ে একাধারে দেয়া হত চিকিৎসা অন্যদিকে লঙ্গরখানা হতে গরীব ও অভুক্তকে দলমতের বিবেচনায় না এনে সরাসরি খাবার দেয়া হতো। এ সবের ব্যয় সংকুলানের জন্য অভিজাত শ্রেণীর অনেকে বিষয় সম্পত্তি বা গ্রাম দান করতেন। এই সকল কারণে সুফি দরবেশদের খানকাহগুলো জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মতের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়ে যায়। এর ফলাফল হিসেবে ‘শেক শুভোদয়ার’ রচয়িতা হলায়ুধ মিশ্র সুফি জালালউদ্দীন তাব্রিজির প্রতি হিন্দুদের গভীর অনুরক্তির কথা উল্লেখ করেছেন । প্রতœতত্ত্বের আঙ্গিকে বা আধুনিক ইতিহাসের প্রত্যয়নে কোন বর্ণিত বিষয়কে ইতিহাসে ফ্যাক্ট হিসেবে স্বীকার করতে গেলে তাকে বস্তুপ্রমাণসিদ্ধ হতে হয় নয়তো বর্তমান সমাজের কোনো বিষয়কে তুলনা করে বুঝিয়ে দিতে হয়। সিলেটের শাহজালালেল দরগায় এখনো অনেক হিন্দু দম্পতি সন্তান লাভের পর এসে পায়রার উদ্দেশ্যে ধান ছিটাতে দেখা যায়, আর ভারতের আজমীর শরীফ প্রায় সকল জাতি ধর্মের মানুষ কর্তৃক পবিত্র স্থানের মর্যাদা লাভ সুফিদের ধর্ম সম্পর্কে উদার দৃষ্টিকেই সমর্থন করে। ফলে অন্য কয়েকটি বিষয়ের মতো ‘সুফি’ বিষয়টিতে হিন্দু-মুসলিম বিপরীতে দা-কুমড়া সম্পর্কের যে ইতিহাস রচনার অপচেষ্টা ভারতের সাবঅল্টার্ন গ্র“প করে যাচ্ছে তার সুযোগ থাকছে না। বরঞ্চ তারা ইতিহাসকে ফিরে দেখার নামে যে ফ্যাসিবাদী আচরণের চারাগাছ সবে রোপন করতে যাচ্ছেন তার বেঁচে থাকাটাই কঠিন করে দিচ্ছে। হলায়ুধ মিশ্র যে বিবরণ দিয়েছেন তা অনেকটাই পূর্ণতা পায় ক্ষেমানন্দ আর বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্যে। এই দুই হিন্দু ধর্মীয় কবিও সুফি সাধকদের মানবতাবাদী দর্শনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
ইতিহাস থেকে দেখা যায় বাংলায় মুসলিম অধিকারপূর্বে ও প্রাথমিক সুলতানী যুগের বাংলায় ইসলাম বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন সুফি সাধকরা। মুসলমান শাসকরা বাংলার রাজ-ক্ষমতায় বসার অনেক আগে থেকেই সুফিরা ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন যেখানে জোর জবরদস্তি ছিল না। সুফিরা বাংলায় প্রবেশকালে সেন রাজারা এদেশের সাধারণ মানুষকে নানাভাবে অত্যাচার করতো, অর্থনৈতিক দুরাবস্থার সাথে সমাজে ছিল না তাদের স্বীকৃতি। আধপেটা খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকাটাই ছিল বাস্তবতা। অসুখ হলেও ভালো কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। এই সাধারণ হিন্দুকে বলা হতো শূদ্র যাদের কিনা জন্মই ছিল যেন এক আজন্ম পাপ। সেন শাসকরা শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার তাকিদে নিজেদের ব্রাহ্মণ দাবি করে শূদ্রদের ঘৃণা করতো। এমনকি শূদ্রের ছোঁয়া লাগলে অপবিত্র হবে ব্রাহ্মণ এই রীতিও চালু ছিল। এই সব শূদ্র তথা সাধারণ মানুষ সেনদের খপ্পরে পড়ে তাদের যে আজন্ম পাপের প্রায়শ্চিত্য করছিল সুফিদের আগমনে তা থেকে তারা অনেকটাই রেহাই পায়।
বিশেষত আরব ও পার্শ্ববর্তী তুর্কিস্তান, ইরাক, ইরান প্রভৃতি দেশ থেকে সুফিরা আসেন বাংলায়। যারা স্বভাবতই কর্ণাটকের সেনদের থেকে সুন্দর দৈহিক গঠনের অধিকারী ছিলেন। তাঁদের আচরণ ছিল অনেক বেশি মানবিক। একারণে সুফিরা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করেন। খানকাহয় সুফিদের থাকার জায়গা আর ইবাদতখানার পাশেই বানানো হতো লঙ্গরখানা। খাবার রান্না করে বিনা পয়সায় গরীব মানুষকে খাওয়ানো হতো। খানকাহর ভেতরে হাসপাতাল স্থাপন করা হতো। চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়া সাধারণ মানুষকে বিনা পয়সায় এখানে চিকিৎসা দেয়া হতো। মক্তব মাদ্রাসা স্থাপন করে সেখানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়া হতো সবাইকে। নিজ ধর্মের শাসকদের কাছ থেকে এসব সুযোগ পাওয়া কল্পনাও করেনি শূদ্ররা। তাই সহজেই তারা সুফিদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরে। সুফিরা বলেন, সকল মানুষ ভাই ভাই, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। এসব কারণে সাধারণ মানুষ সুফিদের পছন্দ করতে থাকে। বেঁচে থাকার নতুন আশ্বাসে অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ফলে সুফিদের সাফল্যের পারদটাও আরো উচ্চে ঊঠে যায়।
১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুফি শাহ সুলতান রুমী নেত্রকোনা জেলার মদনপুরে খানকাহ স্থাপন করে যে ধারার সূচণা করেন এরপর থেকে একে একে সুফিরা প্রবেশ করতে থাকেন বাংলায় । বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে অনেক বেশি সংখ্যক সুফি আসতে থাকেন। তাদের মাধ্যমে দ্রুত সারাদেশে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটতে থাকে। মসজিদ, মাদ্রাসা খানকাহ গড়ে ওঠে। সুফিদের খানকায় যে কোনো ধর্মের মানুষের প্রবেশ করায় কোনো বাধা না থাকায় তা সর্বজনীন হয়ে ওঠে। একদিকে একটি নতুন ধাঁচের সমাজ কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে অন্যদিকে অনেক সহজসাধ্য হয়ে যায় সুফিদের ইসলাম প্রচারের কাজ। আর তার চূড়ান্ত পর্বে হিন্দু সমাজে ভাঙ্গন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরে শ্রীচৈতণ্যদেব স্বধর্ম ও সমাজ রক্ষার্থে সুফিদের কর্মভূমিকার আদলে হিন্দু ধর্মের নবরূপায়ন ঘটান। যা নব্যবৈষ্ণববাদ নামে হিন্দু ধর্মের একটি শাখা হিসেবে বাংলার প্রতিষ্ঠিত হয় ।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থী-গবেষক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
সাভার ঢাকা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s