মনমোহন সিং এর ঢাকা সফর, আমাদের প্রত্যাশা প্রাপ্তির খতিয়ান ও বাংলাদেশের অশনিসংকেত


রাস্তার দুরাবস্থা দেখে প্রথমত ভাবছিলাম ঈদে আর বাড়িতে যেতে পারবো না । ভাগ্যে শহীন মিনারেই ঈদ করা লেখা হয়ে গেছে। রুট পাল্টে উল্টো পথে গ্রামের বাড়ি যাই। কিন্তু ফিরতি পথে আমাদের শ্রদ্ধেয় যোগাযোগ মন্ত্রির সাধের রাস্তা দিয়ে ফিরতে গিয়ে শরীরের প্রায় প্রতিটি জয়েন্ট নড়বড়ে হয়ে গেছে। আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রি যে টাকাগুলো উনাকে ঈদের আগে যাকাত ফিতরা হিসেবে দিয়েছেন না রাস্তা মেরামতের জন্য দিয়েছেন তা একটা গবেষণার টপিক বলে মনে হচ্ছিল আমার কাছে। রাতে আমার দীর্ঘদিনের নেশা ব্লগে বসা। কিন্তু প্রচন্ড ব্যাথায় তা আর হয়ে ওঠেনি। যাহোক বলতে চাচ্ছিলাম মনমোহন সিং এর ঢাকা সফর প্রসঙ্গে। আমি যখন গাজিপুর এর চৌরাস্তা পর হয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করি। বিশেষ করে আরো বেশ কিছুটা এগিয়ে আসার পর মনে হচ্ছিল আমি ভারতের ভেতর দিয়ে চলছি। আর এখন ভারতের কোন নির্বাচনের মৌসুম চলছে যেখানে প্রার্থী হয়েছেন মনমোহন সিং। যাহোক এই সকল কাজে আর কারো না হোক বাঙালির আগ্রহ বরাবরই একটু বেশি। প্রবাদ প্রবচন বলে বেল পাকলে কাকের কি?? বেল পাকলে কাকের কিছু হোক না হোক মনমোহন দেশে আসলে বাঙালির অনেক কিছুই হওয়ার ছিল। কিন্তু দেশবাসী যদি সচেতন হতেন তাতেই তাদের মঙ্গল ছিল। কিন্তু এই অশীতিপর বৃদ্ধকে নিয়ে এতো মাতামাতি করার কিছু ছিল না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জানি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অনেক মানুষকে হত্যা করার পূর্বে তাদের কবর খুড়িয়ে নিতো। আজ এই বুড়োটা আমাদের দেশে এসেছে আমাদের উপকার কর্তে নয় । বরঞ্চ আমাদের দেশের ভবিষ্যতের কবর রচনা করতে এই বিষয়গুলো আমরা কেন যে বুঝিনা । না বুঝেও না বোঝার ভান করি তা আল্লাহ মালুম।

মনমোহন সিং এর ঢাকা সফরের আগে অনেক বিশেষজ্ঞের মতো বিশিষ্ট কলামিস্ট প্রফেসর ড. তারেক শামসুর রেহমান দৈনিক যুগান্তরের একটি উপসম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন “মনমোহনের ঢাকা সফর কতটা ফলপ্রসূ হবে‌”। স্যারের লেখাটি পড়ার পর একটা আশংকা আমাদের মাঝে কাজ করছিল। কিন্তু একটা আশায় বুক বেধেছিলাম এই সরকার আর যাই করুক একটি নির্বাচিত সরকার এরা তো আর ফখরুদ্দীন-মইনের মতো অনির্বাচিত অগণতান্ত্রিক সরকার নয়।তবে আমার বোধায় বুঝতে ভুল ছিল প্রদীপের আলোর নিচে যেমন অন্ধকার থাকে। এই ঢাকঢোল পিটানো সরকার তো প্রকৃত অর্থে চালাচ্ছেন কিছু অগণতান্ত্রিক আমলা। যাদের অনেকের বিগত চল্লিশ বছর দেশের সাথে রাখা সম্পর্কই প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা যে কতটুকু ভুল আর আমাদের ভাগ্যে কতবড় অশ্বডিম্ব তা মনমোহন সিং এর সফর শেষেই বোঝা গেল।

আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি। আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকা বরাবরের মতো নির্লজ্জের চরম সাক্ষ্য দিয়ে যে মমতাকে কলকাতার দিদির বদলে নিজেদের দিদিই বানিয়ে ফেলতে চেষ্টা করতে ব্যকুল ছিল। নিতান্ত চশমখোরের মতো সেই দিদি তার বিবেক বিসর্জন দিয়ে আমাদের দেশের মানুষকে শুকিয়ে মারার দৃঢ় সংকল্পে আবদ্ধ। তিনি মাত্র ২৫ ভাগ পানি আমাদের দিতে চান বাকিটুকু দেবেন না। তাই তিনি দাদা মনমোহনের সাথে আমার প্রয়োজন বোধ করেননি। পাশাপাশি আরো এমন কিছু হটকারী চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে যা নিয়ে জাতি আজও অন্ধকারে। আর ট্রানজিটের নামে ফ্রি করিডোর প্রদান এতো অনেকটাই নিশ্চিত করেছে ভারত। আমরা যদি লেজুড় বৃত্তি এবং জি হুজুর মার্কা রাজনৈতিক নীতিতে বিশ্বাস না করতাম তবে মনমোহন সিং এর সফরের আলোচনার প্রথমেই আসার কথা ছিল তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নটি।

১৯৮৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত তিস্তা নদীই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। কিন্তু পানিবণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, ঢিলেমি ও হটকারিতার ফলে তিস্তা এখন রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তিস্তার বুকজুড়ে এখন শুষ্ক মৌসুমে কেবল বালু আর বালু। অন্যদিকে বর্ষাকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে ভিখেরি হয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারেজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি এখন একরকম অকার্যকর। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। তিস্তার শাখা নদীগুলো এখন পানিশূন্য। ৬৫ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে এরই মধ্যে।

তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে অতীতে বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিলÑ তিস্তা নদীর ৮০ ভাগ পানি সমানভাবে ভাগ হবে আর ২০ ভাগ রেখে দেয়া হবে নদীর জন্য। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি, এ রকম দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। ভারত তিস্তা ব্যারেজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ এই সফর থেকে আমরা পাইনি।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ক্ষমতাবান উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফর শেষ করে আমাদের জানিয়েছিলেন, তিস্তা নদীর ওপর ‘নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে’ নদীর পানির ভাগাভাগি হবে। এর ব্যাখ্যা কী? আমরা কি তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের জমি ও জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান ভারতীয় পক্ষকে দিয়েছি? নাকি ভারত যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেই পরিসংখ্যান আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি? আমি অত্যন্ত আশংকার সাথে বলবো আমরা হয়তো পরেরটিকেই সত্য বলে ধরে নিতে বাধ্য।

দেশের মানুষের কাছে বক্তৃতার ফুলঝুড়ি উঠিয়ে ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি আমরা করেছিলাম। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাচ্ছি না। আজ পদ্মার তীর শুকিয়ে ধু ধু বালিচর। আর দেশের উত্তরাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের পথে। আমার দেশের বাড়ি উত্তরাঞ্চল হওয়াতে এই বিষয়গুলো ক্রমশ স্পষ্ট হতে দেখেছি। এই সফরে ফারাক্কার পানি বন্টন দিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে দেশবাসীকে একটা প্রত্যাশার বানী শুনানো হয়েছিল । কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্চে তাও হয়নি। জাতীয় স্বার্থে টিপাইমুখ নিয়ে আদৌ আলোচনার কোন সুযোগ থাকার কথা না ।সবাইকে হাসির খোরাক জুটিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছিলেন, ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ হয়। সম্প্রতি

নর্থইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান প্রেমচান্দ পংকজ তাঁর বিবরণে বুঝিয়ে দিয়েছেন আমাদের মাননীয় অতিথি মনমোহনদা আমাদের স্বার্থ কতটা দেখেছেন। পংকজ টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। বাঁধটি নির্মিত হলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে। এই বিষয়টি যৌথ ইশতেহারে থাকলো না কেন?

টিপাইমুখ বাঁধ আমাদের জাতির ভবিষ্যত অস্তিত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত হলেও এই বিষয়টিও মনমোহনের সফরে অস্পষ্টই থেকে গেছে। একদিকে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারেই আমরা যখন শুকিয়ে মরতে বসেছি সেইসাথে সংবাদপত্রগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়েও কথা আছে। ভারত ত্রিপুরার সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এখন শোনা যাচ্ছে ভারত সেচকাজের জন্যও ফেনী নদীর পানি ব্যবহার করতে চায়। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরি সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে পড়েছে। আমাদের সরকার যদি দেশের মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাদের দায় মেটানোর কথা ভাবতেন তবে তাদের উচিত ছিল এই বিষয়ে কিছুটা হলেও আলোকপাত করার চেষ্টা করা। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে বরাবরের মতো একটি প্রত্যাশার মুলো ঝুলানো হয় যেটি মহমোহন সিং এর সফর শেষে সরিয়ে নিলে দেখেছি একটি অশ্বডিম্ব বাদে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
দেশের গ্যাস বিদ্যুত বিদেশী শক্তির হাতে তুলে দিয়ে আমরা আজ পথের ভিখিরি। কয়েকজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক যখন এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন দেশপ্রেমিক কিছু ছাত্র জনতার সাহায্যে সেটিকে অবজ্ঞাভরে বলা হয়েছিল এটা টোকাইদের আন্দোলন। যাহোক টোকাইদের প্রসঙ্গ বাদ দেই আমি বলতে চাইছি ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়সংক্রান্ত একটি চুক্তির কথা ছিল এই সফরে। কিন্তু এতে কি বাংলাদেশ খুব বেশি লাভবান হওয়ার কথা নয়। ভারতের মতো একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ জোন অফ প্রিভিলিজড ইন্টারেস্ট ভেবে এমন কোন চুক্তি কখনই করতে পারেনা যেখানে আমাদের স্বার্থ সংরক্ষিত হতে পারে। আমরা পত্রিকার খবর থেকে জেনেছি বিদ্যুৎ কিনতে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানিকে কমিশন বাবদ ইউনিটপ্রতি ৪ পয়সা করে বছরে ৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এটা মূলত দালালি ‘ফি’। শুধু তাই নয়, ভারত সীমান্তের যত দূর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বাংলাদেশকে তত বেশি সঞ্চালন ফি (হুইলিং চার্জ) দিতে হবে। ভারতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ২ রুপি। বাংলাদেশ এখন কত টাকায় বিদ্যুৎ কিনবে (প্রতি ইউনিট), তা স্পষ্ট নয়। কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসবে, তাও আমরা জানি না। বিদ্যুৎ আমদানিতে কোন জটিলতা হলে, তা কোন আইনে হবে, কোথায় মীমাংসা হবে, তাও স্পষ্ট নয়। উপরন্তু ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের যে বিনিয়োগ, ওই বিনিয়োগ দিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতাম। খুলনা এবং চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্যও একটি চুক্তি হবে। এই কয়লা আসবে ভারত থেকে, যা অত্যন্ত নিকৃষ্টমানের। এখানে যে প্রশ্নটি করা যায়, তা হচ্ছে যেখানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং তা উত্তোলিতও হচ্ছে, সেখানে কয়লানীতি প্রণয়ন না করে কেন আমরা ভারতীয় কয়লার ওপর নির্ভরশীল হলাম? এই নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না ।  প্রতিবছর আমরা দেখেছি

বি এস এফ সীমান্তের পার্শ্ববর্তী মানুষকে পাখির মতো হত্যা করে চলেছে। কখনো বা তাদের পিটিয়ে লাশ বানিয়ে এদেশে পাঠিয়ে দেয়। কখনও বা তাদের গুলিতে প্রাণ দিয়ে হয় নিরীহ বাংলাদেশীদের। এই বি এস এফ এর তৈরী করা কাটাতারের বেড়ার মতোই ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন নিরাপত্তা ও আনুসাঙ্গিকতার বিচারে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। আজ সীমান্তের কাটাতারে ঝুলন্ত কিশোরী ফেলানির লাশের সেই করুণ ছবি বাংলাদেশে ভারত তথাকথিত সুসম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। আর পদলেহী মিডিয়া বিষয়গুলোকে গোপন করে শুধু একটি কল্পিত অবাস্তব বন্ধুত্বের স্বপ্নলোকের ছবি ছেপে দেশবাসীর চোখের সামনে একটি ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে।

আর এই সফরে বেশ ধুরন্ধরতার সাথে বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
আমাদের দেশের প্রচুর টিভি চ্যানেল বর্তমানে বিশ্বমানের হওয়া সত্তেও সেগুলো ভারতে প্রচার স্বত্ত্ব পায়ণি। অন্যদিকে কলকাতার গাধামার্কা চ্যানেলগুলো দেখে এদেশের মানুষের বাংলা বলার ধরণই প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে চলেছে। আমাদের দেশের অনেক বাসায় বাবা মা চাকুরীজীবি হওয়াতে তাদের বাচ্চাকাচ্চা মানুষ হয় কাজের বুয়ার কাছে। আর এই সব কাজের বুয়াদের প্রথম পছ্ন্দ ভারতে হিন্দি সিরিয়াল গুলো। আর নিরীহ অসহায় বাচ্চাগুলো এই কাজের বুয়াদের কাছে থেকে বাংলা ইংরেজী না শিখে শিখছে হিন্দি ভাষা। আর তাদের মেধা ও মননের বিকাশ এমন হচ্ছে যা তাদের গড়ে তুলছে একটি ভারতীয় বাংলাদেশী সংকর মনস্তাত্ত্বিকতার অধিকারী হিসেবে। আর আমাদের সরকার ও প্রশাসণ তাদের চ্যানেল আমাদের দেশের প্রচারের সুযোগ করে দিয়ে এই সুযোগ আরো বর্ধিত করছে। এই সফরে ভারতে আমাদের দেশের চ্যানেল সম্প্রচার বিষয়ক আলোচনা ছিল সময়ের দাবি কিন্ত তা হয়ণি।

আমরা দেখেছি ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফের নামে অতিরিক্ত শুল্ক কমানের কোন উদ্যোগ ভারত কখনও নেয়নি। বাণিজ্য ঘাটতি একটি বড় বাধা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির যে পরিমাণ, তার প্রায় অর্ধেক ভারতের সঙ্গে। ২০১০-১১ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা এর আগের বছরে ছিল ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ দিনে দিনে বাড়লেও, ঘাটতি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই।

ভারত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যেমন বাংলাদেশের মেলামাইনের চাহিদা ভারতে থাকলেও বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের প্রায় ৩২ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। ভারত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কোটা ৮০ লাখ পিছ থেকে বাড়িয়ে ১ কোটিতে উন্নীত করলেও অশুল্কের কারণে বাংলাদেশী পোশাক রফতানিকারকরা উৎসাহী হচ্ছেন না। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ভারত আগামী ৩ বছরের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশাধিকারের অনুমতি চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই অনুমতি দেয়া হয়নি। দক্ষিণ এশীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এজন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনোই দেয়নি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মনমোহনের সফরের সময় এই শুল্ক বাধা নিয়ে আদৌ কোন আলোচনাই হয়নি। যা এই সফরে বাংলাদেশের অর্জনকে একমাত্র অশ্বডিম্ব প্রদানের মধ্যেই মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে।
ট্রানজিট নিয়ে কোন চুক্তি হয়নি ট্রানজিটের কাঠামোর ব্যাপারে সমঝোতার কথা বলা হলেও বিষয়টি নিয়ে জাতি এখনো অন্ধকারে । সেদিন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে পড়েছিলাম জওহরলাল নেহেরু কিভাবে কলকাতা বন্দুর ব্যবহারকে অযৌক্তিক বলেছিলেন। কিন্তু পণ্ডিত জওলাল নেহেরুর উত্তরসূরী দাদা মনমোহন লজ্জার মাথা খেয়ে আমাদের দেশের ১৫টি রুটে (নদীপথ, সড়কপথ ও রেলযোগাযোগ) ট্রানজিট চাচ্ছেন। আর নির্লজ্জের মতো ভারত থেকে ঋণ নিয়ে ভারতের জন্যই আমরা অবকাঠামো তৈরি করে দেব এমনটাই কথা আছে। ওই ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার যা কিনা সুদমুক্তও নয়। আমাদের অবকাঠামো ভারত ব্যবহার করবে। আমাদের স্বার্থ এখানে নেই। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী চল্লিশ বছর দেশের বাইরে থাকার পর হটাত করেই কেন যেন তাঁর দেশপ্রেম উথলে পড়ছে তিনি নয়াদিল্লি সফর করে এসে আমাদের জানিয়ে দিলেন নতুন করে ট্রানজিট চুক্তি করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে ভারত এই ট্রানজিট সুবিধা পেতে পারে।আসলে গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এই উক্তি কতটা মূর্খের মতো তা হয়তো ড. রিজভী জানেন না যেটির স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদি ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ট্রানজিট প্রাপ্তির সুযোগ থাকত, তাহলে ভারত অনেক আগেই এই সুযোগ গ্রহণ করত। অন্তত গওহর রিজভীর মতো একজন অগণতান্ত্রিক উপদেষ্টার বক্তব্যের জন্য আর যাই হোক ভারত অপেক্ষা করত না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় আসার কথা ছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর ৫ জন মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে (মমতা ব্যানার্জি-পশ্চিমবঙ্গ, তরুণ গগৈ-আসাম, মানিক সরকার-ত্রিপুরা, মুকুল সাংমা-মেঘালয়, পু লালথান ওয়ালা-মিজোরাম)। এতে সফরের পূর্বেই বোঝা গেছে ভারতের স্বার্থ কোথায়। ভারত বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চেয়েছিল যা অনেকাংশেই পণ্ড হয়েছে মমতা ব্যানার্জি সফরে না আসায় কিন্ত তিনি যে কারণে আসেন নি সেটা আরো চিন্তার বিষয় ।

এমতাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি ডকট্রিন অফ নেসেসিটি হিসেবে আমাদের সরকারকে বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে মনমোহন সিং এর সাথে ভারতের স্বার্থরক্ষাকারী একপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করতে দেখে থাকি সেগুলো জাতি অসহায় তাকিয়ে দেখলেও অন্তত সমর্থন না দিয়ে ঘৃণা করবে এটা বেশ জোরের সাথে বলা যায়।
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
ব্লগার, কলামিস্ট
aurnabmaas@gmail.com

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s