উপলদ্ধি পর্ব এক


বিরক্তিকর ক্লাসগুলো শেষ করে সবে হাঁটতে শুরু করেছি জাবির মেইন গেইটের দিকে। তৃতীয় পর্ব সমাপনী দ্রুত শুরু হবে তাই নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে। বছরের প্রতিটি সময় শিক্ষকদের নানা কাজে ব্যস্ত থাকার হেতু এই সময়ে প্রতিদিন সকাল সাড়ে নয়টায় শুরু হয়ে বিকেল পাঁচটা অবধি যেন ক্লাসের কোন বিরাম নেই।
কিছু ক্লাস আমাদের প্রত্যেকের কাছেই অনেকটা কুইনিন সমতূল্য।:(( খাওয়ার কোন ইচ্ছে নাই তব্ওু যেন কষ্ট করে গিলতেই হবে । নাহলে আর যাই হোক পরীক্ষার দশ নম্বরের এটেন্ডেন্স ম্যালেরিয়া থেকে মুক্তি নাই। সিনিয়র শিক্ষকদের দেখি একটা পাহাড় সমতুল্য জটিল বিষয়কে যতটা সহজ আর আমাদের বোঝার উপযোগী করে উপস্থাপন করা যায় তার চেষ্টা করেন।
বিপরীতে কয়েক জনকে দেখি তাদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নাভিশ্বাস উপস্থিত করে ছাড়েন যেখান থেকে ক্লাসে বিরক্তির সুত্রপাত। র‌্যাগনার নার্কসের দারিদ্রের দুষ্টচক্র অর্থনীতির মতো ক্লাসের শিক্ষার্থীদের উপরেও বেশ যুতসই ভাবেই খাটে আর দুর্বল শিক্ষার্থীরা ক্লাসে হা করে আকাশের দিকে চেয়ে থেকে ক্রমাগত দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে।
আজকের এই পড়ন্ত বিকেলে যেন অনেকটাই হাঁফিয়ে উঠেছি সবাই। সেই সকাল থেকেই কোন দানাপানি পড়েনি বললেই চলে। অনেকটা মোহাচ্ছন্ন রোবটের মতো পা টেনে টেনে কয়েকটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে চলেছি সামনে। রাতে ঢাকার মিরপুরে ফিরবো এটা জানি তবে আপাতত আমার গন্তব্য গন্তব্য অনিশ্চিত, বাকিরা সবাই হলে থাকবে আমি সেই যোগ্যতা হারিয়েছি অনেক পূর্বে।
রেজাল্টের দিক থেকে ক্লাসে প্রথম হওয়ার পরেও হলের কুলাঙ্গার প্রোভষ্টের সাথে বেয়াদপি করেছিলাম তাই আমি আর হলে থাকার যোগ্য নই। তৃতীয় শ্রেণীর রেজাল্ট নিয়ে নিয়োগ প্রাপ্ত এই শিক্ষক পরে নারী কেলেঙ্কারি, গুণী শিক্ষকদের সাথে বেয়াদপি, ক্যাম্পাসের গাছপালা বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ সহ অগণিত অপরাধ ধিকৃত হয়েছেন তব্ওু ক্যাম্পাসে তার আধিপত্য থেকে কেউ তাকে টলাতে পারেনি। তব্ওু এই ধরণের শিক্ষক নামের কলঙ্কের কাছে ক্ষমা চেয়ে ওই চৌদ্দ ফুট বাই বার ফুটের নরকপুরীতে থাকার মতো উন্নত রুচি কেন যেন আমার হয়ে ওঠেনি।
গভীর রাত অবধি পড়াশুনা করে কাকডাকা ভোরে উঠে বাসের হাতল ধরে ঝুলতে ঝুলতে মিরপুর টু সাভার করাটা কেমন যেন সয়ে গেছে। ঠিক তেমনি আমরা কেউই মনে হয় জানি না এই বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করার পর আমাদের চাকুরী জীবনে কি অপেক্ষা করছে। যে দেশের সরকারী চাকুরীর শতকরা পঞ্চান্ন ভাগ দখল করে বসে অযোগ্য, অদক্ষ আর মূর্খরা সেদেশে যোগ্যতা আর সৎ পরিশ্রম করে একটা উজ্জল ভবিষ্যত আশা করাটা নিতান্তই দুরাশা। আমরা কয়েকজন বন্ধু পা চালাতে থাকি এক অজানা গন্তব্যের দিকে।
মেয়েদের দু-চার জন মুখস্থ বুলি ছুড়তে থাকে তোরা তো ভাই সারাদিনে পনের ঘন্টা পড়িস। আমি এবার ইয়াবড় একটা লাড্ডু পাব:D। বলছিলাম এই বাজে প্রিপারেশান নিয়ে পরীক্ষায় যাওয়াটা ঠিক হবে না। আমার অমুক আমার তমুক বলেছে আমার এবারের জন্মদিনে হাতি মারবে ঘোড়ায় চড়াবে, বাঘের লেজ কেটে মালা বানাবে এই সেই আরো কত কি!! ;)। সারাদিন ক্লাস করে অনেকটাই বিরক্ত। বন্ধু মহলে এই ধরণের গল্পের আসর ভাঙতে আমার জুড়ি ছিল না তাই বেরসিক হিসেবে অনেকটা কুখ্যাত হয়েছি এতদিনে। হুট করে বলেই ফেললাম চুপ কর বাবা । পরীক্ষায় লাড্ডু পাইলে ওটা মুড়ি দিয়ে খাইস । না পারলে আমাদের বলিস।:P:P
পাশ থেকে একজন হটাৎ ফোড়ন কেটে বলে চুপ কর !! তুই তো একটা আস্ত আঁতেল। ক্লাস করা । একটু পর বাসায় গিয়ে গভীর রাত অবধি খটখট করে কম্পিউটার টিপে ব্লগিং আর লেখালেখি করা, ফেসবুকে চ্যাট করা নয়তো ইন্টারনেট ব্রাউজিং!!! ধুর!!!!। তুই আছিস তোর তালে এই কি কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জীবন। X(

আমি এই রকম একটা প্রচ্ছন্ন হুমকিতে আপাতত চুপ হয়ে গিয়ে উনার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ব্লগে একটা পোস্ট দেব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যেতে থাকি। সবাই গালগল্পে মশগুল। আমার তেমন ভাল লাগছেনা। এরা সবাই আমার ক্লাসমেট, একসাথে আরো দুই আড়াই বছর কাটাতে হবে, বাড়ি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর এদের মাঝে চলতে চলতে খুজে ফিরি নিজের দু ভাইকে, বোনাস হিসেবে আমার কোন বোন ছিলনা এখানে এদের পেয়েছি । যাহোক আর উনাদের না চটানোই মঙ্গল এই মনে করে আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে সামনে এগিয়ে যেতে থাকি।
চারপাশে দৃষ্টি দিই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জুটি গুলো সন্ধা বাড়ার সাথে সাথে কিভাবে তাদের প্রেমের গভীরতাও ধীরে ধীরে বাড়িতে তুলতে সোচ্চার হয়েছে তা দেখে আমি কেমন করে যেন অন্য এক ভাবনার জগতে চলে যাই। মনে মনে তখন ভাবছিলাম । কাউকে বলিনি। কিংবা বলা হয়নি। কিংবা আমার মন কাউকে বলার ক্ষেত্রে সাড়া দেয়নি। সেদিন রাতে ব্লগে দেয়া জ্বালাময়ী পোস্টেও উল্লেখ করতে পারিনি আমি এদের দেখে কি ভাবছিলাম। এখন বলছি আমি তখন ভাবছিলাম এরা এখন এতটা ঘনিষ্ঠ কিন্তু তা মাত্র চার বছরের জন্য। কিন্তু বাকি জীবন তো আর পড়ে থাকবে না । 

এই হাত ধরে পথ চলা,:X ঝুম বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় দিয়ে বকের মতো দাঁড়িয়ে থাকা,:X রাত জেগে সবার দৃস্টি এড়িয়ে মোবাইলে কান পেতে থাকা :X, ক্লাসে বেশিরভাগ সময় পাশাপাশি বসে অন্য একটা ঘোরের মধ্যে থাকা, আর সময় অসময়ে মৃদু খুনসুটি :X,আমাদের মতো আতেল বন্ধু কিংবা বড় ভাইয়ের কাছে বান্ধবীর জন্য নোট সংগ্রহ করতে গিয়ে মাত্রাহীন ঝাড়ি খেয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক চুলোয় দেয়া থেকে দৈহিক সম্পর্ক এত কিছুর ইতিহাসকে মাটির নিচে দাফন করে হয়তো এরা দুজনেই আমার নতুন করে বিয়ে করবে=((। নতুন করে জীবন শুরু করবে X(
আমি ভাবছি এই সময়ের কথা। আমার অচেতন মন আর কমবুদ্ধির মগজ কিছুতেই এই সময়ের কোন একটা সারমর্ম দাঁড় করাতে পারেনা। আমি তখন একাগ্র চিত্রে ভাবছি এরা এখন প্রেম করছে পরে যখন আলাদা কাউকে বিয়ে করবে কি করে তাদের স্বামী কিংবা স্ত্রীর সামনে মুখ দেখাবে ? এই প্রশ্নের কোন উত্তর আমি শত চেষ্টা করেও খুঁজে পাইনি। :a
আনমনে চলতে চলতে হটাৎ রাস্তায় উঁচু হয়ে বেরিয়ে থাকা একটা ইটের সাথে পায়ে ভাল রকম হোচট খাই। আঙুলের মাথা ছড়ে গিয়ে দরদর করে রক্ত বেরিয়ে আসে:a। বন্ধু বান্ধব সবাই এটা দেখে কেমন বিচলিত হয়ে ওঠে। বরাবর অসম্ভব রকমের শক্ত নার্ভের আমি এই হালকা ব্যাথা পেয়ে তেমন গুরুত্বই দিইনি।: পায়ে ব্যাথা পেয়ে যতটা না যন্ত্রণা করছিল বন্ধু-বান্ধবীদের সহযোগী সেই আচরণে অনেক ভালও লাগছিল ।

এখনকার এই মঙ্গার বাজারেও এমন মানুষ আছে যারা কিনা মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে। মানুষের জন্য ভাবার মানসিকতা দুর্বল হয়ে পড়লেও মানবাত্মার পুরোপুরি মৃত্যু ঘটেনি। বন্ধু নয়ন কার কাছ থেকে যেন একটা টিস্যু নিয়ে রুমাল ছিড়ে অনেকটা আমার ইচ্ছার বিপরীতে ক্ষতস্থান শক্ত করে বেঁধে দিল। সবাই বলছিল দোস্ত যা মেডিকেল থেকে ব্যাণ্ডেজ করে আয়।:-W
আমরা এখানে ওয়েট করছি। কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি হলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারকে আমি দেখি কসাইখানা কিংবা টয়লেট:-* হিসেবে যার কোন উন্নতি এই তিন বছরের ছাত্রজীবনে দেখিনি। শুধু হলের মারামারিতে ক্যাডারদের হাতে পিটুনি খেয়ে আহত হয়ে মারাত্বক হতভাগ্য ছাত্ররা এখানে আসে।:-O
শত শত প্যাচাল পাড়ার পর আমাদের ডাক্তার মহোদয়রা শেষ পর্যন্ত তাদের ব্যবস্থাপত্র অনেকটা চারটি ওষুধে গিয়ে শেষ করেন। ব্যাথার জন্য ডাইক্লোফেন, গ্যাসের জন্য নিুমানের এন্টাসিড, যতো বড় সর্দিকাশি হোক হিস্টাসিন আর জ্বরের জন্য নাপা বা প্যারাসিটামল।:k যাহোক এই আঘাতে আমার চিন্তা থেকে সাময়িক মুক্তি পাই।
অনেকটা খুঁড়িয়ে আর কিছুটা গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সন্ধার পর পর মিরপুরের বাস ধরি।
………………… অজানা গন্তব্যের পথে জীবনতরীর এই যাত্রা চলবে >>>>>>>>>>>>
আরও তিনটি পর্বের অপেক্ষায়………………………

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s