উপলদ্ধি পর্ব দুই


আজ শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। ক্লাসের বালাই নেই । অনেকটাই ফ্রি। শুক্রবার অনেকটা বাঁধা ধরা রুটিন হয়ে গেছে ঢাকা ভার্সিটির টি এস সিতে যাই । কলেজ লাইফ আর ব্লগের মাধ্যমে পরিচিত অগণিত বন্ধু-বান্ধবী আর ছোট ভাইদের সাথে আড্ডা দেই। :a
এই আড্ডাবাজি শেষ করে কাছেই কলাবাগানে আমার ফুফুর বাসাতে যাওয়াটা দীর্ঘদিন আর হয়ে ওঠেনা। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে কেন যেন ওই যায়গাটা আমাকে আর টানেনা।
ছোট চাচার সাথে রিলেশান অনেকটা বন্ধুর মতো। তাঁকে অনেক মিস করি তবুও ওখানে গেলে ফুফুর রকমারি দার্শনিক তত্ত্ব আর কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করা নীতিবাক্য অনেকটা মশার ভোঁ ভোঁ শব্দের মতো বিরক্তিকর মনে হয়। বেচারীর পর্বত প্রমাণ ভুড়ি দেখে বেশ কয়েকবার আমার মনে হয়েছে হিমালয় পর্বত বুঝি আমাদের বাঙলাদেশেই ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হতে যাচ্ছে। একদিন হটাৎ মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলাম ‘ফুফু আমাদের দেশে একটা জীবন্ত হিমালয় গড়ে ওঠার অমৃত সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি’। পাশে বসা সবাই হাহাহাহা করে হেসে দিল।:P
কিন্তু ভাইটি আমার বেশ ভাবের সাথেই বললো ‘সারদিন পুরাতন জিনিস নিয়ে ভাবতে ভাবতে অর্ণব তোর মাথাটাই গেছে, গাঁজায় দম দিস না তো’। কষ্ট করে অনেকটা শুশীল ভাব এনে বললাম ফুফু তুমি আর ভাইয়া দুজনের পেট দুটোকে ধরো দুইটা টেকটোনিক প্লেট এতে জোরদার ঘষা লাগলেই দেখো কবে একদিন হিমালয়ের থেকেও বড় একটা পর্বত গড়ে উঠবে। থাক সে কথা। আজ আর ওদিকে যাইনি।
সারারাত কম্পিউটারে বসে ঘাড়ে ব্যাথা করছে চরম সাথে মাথার যন্ত্রণাটাও বরাবরের মতো আছে। :((অনেকটা মাতালদের হ্যাঙওভারের মতো অবস্থা।:P মোবাইল বন্ধ রেখে দুনিয়া থেকে একটু বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নিজেকে বোঝার চেষ্টা করছি।

আমাদের বাসাটা একটা ছয়তলা ভবন। কিন্তু অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাসার ছাদে উঠার রুচি নেই আমার। উপরে কয়েকটা মেয়ে আছে যারা বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশের রাষ্টীয় ক্ষমতার মতো বাসার ছাদ দখল নিয়ে সেখানে হল্লা করে:P। একদিন ছাদে গিয়ে তাদের উল্লাস আর হল্লা করা দেখে আমার মনে হয়েছে সামনে আলিফ লায়লার হাজার ডাইনি উল্লাস করছেX(
বিদ্যুত গেলেই তারা ছাদে যায়, গালগল্প, চিৎকার চেচামিচি জুড়ে দেয়, সাথে চলে যেমন পারো তেমন গাও স্টাইলে নাকি সুরে হাবিব ফিচারিং ন্যান্সি ‘একবার বলি, বার বার বলি, বলি যে লক্ষ বার; তুমি আমার প্রিয়তম তুমি যে আমার। হৃদয়েরই পাতায় পাতায় তোমারি নাম লিখা,তুমি ছাড়া পৃথিবীটা ভীষণ একলা একা। তোমায় ছাড়া জীবন আমার জীবন সেতো নয়, তোমায় নিয়ে হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে হয় ’:X এই গানটা গায়। ওই দিকে আমি আর রনি বসে ভাবছিলাম এদের পাল্লায় যারা পড়বে । বেচারীরা হাজার বছর দুরে থাক তিন বছর পর মারা পড়লে সুখী হবে। X(

গতকাল ওদের নাকি সুরের গান শুনে ফাহাদ নিচ থেকে ব্যাক সাউণ্ড দিতে রেডি ‘আসছে হারপিক ওয়ান কনটেস্টে আপনাদের সবাইকে মনোনীত করা হয়েছে’ মন্তব্য করার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে অনেকটা গলাটিপে ধরে ওকে থামিয়ে দিয়েছি।:lসাথে পই পই করে মনে করিয়ে দিই আমাদের দেশে আর আগের সে দিন নেই । এখন ইভ টিজিং আইন আছে। এটা নারী অধিকার দিতে পারুক আর নাই পারুক আমাদের দেশের মডেলদের ভিডিও ক্লিপ বের করার অবারিত সুযোগ করে দিয়েছে=((। এদের এভাবে হল্লা করার দিন এখনই, তুই মাঝখানে বাগড়া দিস না:-*
অনেকটা খেই হারিয়ে আমাকে গালি দিতে দিতে চলে গেছে ফাহাদ। নাহহ্ কি এসব ভাবছি। কেমন যেনো অগোছালো আর খাপছাড়া চিন্তাভাবনা আমাকে মাঝে মাঝেই কুরে খায়। নিজেও বুঝিনা কি ভাবছি কেন ভাবছি। পিছনে ফিরে ঘড়ি দেখি। প্রায় একঘন্টা এভাবে জানালার গ্রিল ধরে বিছারনার উপরে নীল ডাউন হয়ে আছি:a। হাত ঝিমঝিম করার পাশাপাশি হাঁটুটাও বেশ ধরেছে:|। ঝটকা দিয়ে নিচে নামি।
তারপর সিঁড়ি ভেঙে সোজা নিচে। হটাৎ খেয়াল করলাম পাশের বাসার পিচ্চি রাতুল আমাকে দেখেই দৌড় দিয়েছে মামা আমি যাবো । এই সব পিচ্চি কাচ্চারা প্রত্যেকেই আবার আমার খুব কাছের বন্ধুর মতো:। ওদের কোন আব্দার সচরাচর না করতে পারিনা। পাশাপাশি এখনকার যুগের ছেলেদের মতো অতটা স্মার্ট হয়ে উঠতে পারিনি বলে আমার ভরসা এই পিচ্চিরা কিংবা এলাকার মুরুব্বী ব্যক্তিরা:X। রাতুল বেশ হালকা হওয়াতে ওকে নিয়ে কোথাও যেতে অসুবিধা নেই। তাছাড়া আর দশটা পিচ্চির মতো ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদেও না:P
পাশাপাশি নাদুস নুদুস গুলো যদি কোলে ওঠে দীর্ঘসময় হাতে আর ঘাড়ে ব্যাথা থাকে। তাই রাতুলকে নিয়ে রওনা দিলাম মিরপুর-১ এর দিকে। ওর ইচ্ছা ছিল হাতের আঙুল ধরে হাঁটবে কিন্তু আমার সে ধৈর্য্য নাই। আমি ওকে রিক্সায় উঠালাম। পাজিটা রিক্সাতে শান্তিতে বসে থাকলে হয় , তা না করে আমাকে নানাভাবে বিরক্ত করছে। পাশাপাশি ওর পাণ্ডিত্যপূর্ণ নানা উক্তি শুনে মুখ টিপে টিপে হাসছি।:P
প্রিন্স হোটেলের সামনে গিয়ে থামলাম। ভিতলে ঢুকে নিজের জন্য একটা কফির অর্ডার দিলাম। ওকে বললাম মামা তোমার কি? । রাতুল এক নি:শ্বাসে আইসক্রিমের কথা বলাতে আমি বেশ আনন্দিত হলাম। যাক বাবা তেমন গুরুতর কিছু বলেনি যা খুজে পেতে কষ্ট হবে। ওয়েটারের অপেক্ষায় টেবিলে বসে আছি।
হটাৎ নাতাশা আর ফাহিমকে দেখি হুট করে আমার টেবিলেই বসে পড়েছে। কিন্তু আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। ইয়ে মানে ভাইয়া, আমি আ আ, আমি। আমরা স্যারের কাছ থেকে পড়ে ফিরছিলাম তো। যাই হোক আমার আর বুঝতে বাকি নাই ওরা কোথা থেকে ফিরছিল। তবুও কিছু বললাম না।
কারণ আমি নাকি জুনিয়দের খালি ঝাড়ি দিইX(। এই কারণে সবাই আমাকে ভয় পায়X(। এটা আর ভাল লাগে না। ওদের বললাম তোমরা কি খাবে? কিন্তু বলেই বুঝলাম আমাকে দেখার পর ওদের সব ক্ষুধা উধাও=((। হটাৎ করে দুজনেই দাঁড়িয়ে বললো ভাইয়া আজ উঠি। আমরা কিন্তু সত্যি প্রাইভেট পড়েই ফিরছিলাম। আমি হালকা হাঁসি দিয়ে বললাম ঠিক আছে:P। তবে ওদের মাঝে ঠিক হওয়ার কোন লক্ষণ পেলাম না, দ্রুত পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল ওরা।
এই টুকু বাচ্চা ছেলে-মেয়ে তারাও এতটা এডভান্স হয়ে গেছে সেকেলে চিন্তাধারার নিজেকে তাই অনেকটাই অপরাধীই মনে হয়েছিল। ভাবলাম ওরা শুধু শুধু আমাকে ভয় পায়।
এরপর ওয়েটার মহোদয় দীর্ঘ সময় পার করার পর তার চেহারা মুবারক দেখিয়ে আমাদের ধন্য করলেন:D। আমি রাতুলকে তার আইসক্রিম পছন্দ করতে বললাম। দেখি সে শুধু আইসক্রিম এর ডিব্বা খুলে ওয়েটারকে এটা ওটা হাতাতে বাধ্য করছে। তার পছন্দের আইসক্রিম আর পাওয়া যাচ্ছে না।
আমি কফির কাপ হাতে নিয়েই এগিয়ে যাই। বলি মামা কোন আইসক্রিম নিতে চাও!!! নিচ্ছ না কেন ? কিছুর বলার আগে ওয়েটার বেচারাই বলে ওঠে ‘স্যার এমুন আইসক্রিম এর নাম আমার চৌদ্দ পুরুষের জিন্দেগীতে এই দুনিয়াতে শুনি নাই। আপনার ভাইগ্ন্যায় ইভ টিজিং আইসক্রিম চায়’। একথা শুনে আমি হাসতে হাসতে শেষ। এটা কেমনে সম্ভব। আমি বলি দুর গাধা এই রকম কোন আইসক্রিম নাই। রাতুল নাছোড়বান্দা সে ইভ টিজিং আইসক্রিমই খাবে।
সে ইগলুর ইভ টিজিং আইসক্রিমই খাবে যেটার বিজ্ঞাপন আজ পেপারে দেখেছে। আমি ওকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে একটা সিঙ্গেল স্যান্ডি কিনে দিয়ে রফা করলাম ও আমাকে বাসায় গিয়ে বিজ্ঞাপন দেখাতে পারলে আগামী কাল ওকে ইভ টিজিং আইসক্রিম খাওয়াবো।
বাসায় ফিরে দেখি সে আসলে কোন বাজে কথা বলেনি। আজকের সংবাদপত্রে একটা ইভটিজিং বিষয়ক নিউজের ঠিক পাশে একটা আইসক্রিমের বিজ্ঞাপন। সদ্য স্কুলে পা দেয়া রাতুল সবে দুই এক লাইন বাঙলা পড়তে শুরু করেছে। সে ইভ টিজিং সংক্রান্ত খবর আর আইসক্রিমের বিজ্ঞাপন একসাথে পড়ে অনেকটা গুলিয়ে ফেলেছে। আসলে প্রচার প্রপাগন্ডা এই সব শিশুদের জীবনকে কিভাবে প্রভাবিত করছে তা দেখে অনেকটাই হতাশ হতে হয়।
সেদিন রাতুলের চোখে দেখা ইভ টিজিং আইসক্রিম সবার কাছে হাস্যকর মনে হলেও কেন যেন আমি হাসতে পারিনি। আমি সেদিনও কেমন যেন বেরসিকের মতো ভেবেছি, রাতুলের এই একটা কথাকে ছোট করে ধরতে ধরতে আমাদের জাতি কতটা পেছনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সন্ধার পর পড়ার টেবিলে বসে যতবার রাতুলের ওই কথা মনে পড়ছিল আমি বার বার হাসছিলাম পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে গেছি।
তৃতীয় পর্ব দ্রুতই আসছে >>>>>>>>>>>>>>>>>
প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s