একরোখা জ্ঞানে নারীবাদী চিন্তাধারায় যে মতিভ্রম দেখা দিচ্ছে ???


অধিকার বা অধিকারহরণের আগে আমি নারীবাদ বা এই জাতীয় জ্ঞানের উৎস সন্ধান করতে চাই। বাংলাদেশ বা ভারতীয় উপমহাদের জ্ঞানের সীমানায় যে ধারাটি প্রচলিত আছে সেখানে মৌলিকত্বের তুলনায় ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী আধিপত্য বেশ প্রকট আকারে লক্ষনীয়। এরা এটা হবেই না কেন ??
প্রখ্যাত তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাইদ বিষয়টিকে বেশ সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করে গেছেন। যেখানে সাইদ দেখিয়েছেন জ্ঞান কিভাবে পশ্চিমা আধিপত্যবাদকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। আমি সাইদের কথার সাথে নতুন করে যোগ করতে চাই উপস্থাপন, মনস্তাত্ত্বিকতা আর বানিজ্যের রাজনীতিকে।
আসলে পুরাতন বস্তাপচা এই বিতর্ককে আবার আলোচনায় আনার ইচ্ছে ছিলনা। তবুও শ্রদ্ধেয় শাহেরীন আরাফাত আপুর একটি লেখা দেখে এই বিষয়টি নিয়ে আমার উপলদ্ধি কী ?
সেটা পরিষ্কার করার ইচ্ছে লাগলো। লেখাটির ঘটনা বিন্যাস খুবই যৌক্তিক। কিন্তু শিরোনামটি আমার কাছে অনেক বেশি একরৈখিক ও সমস্যায়িত বলে মনে হয়েছে। উনি একজন বিজ্ঞ লেখক । কিন্তু তিনি সন্ত্রাষ এবং যৌন কেলেংকারীকে একই সীমারেখায় টেনে সরাসরি এ দুয়ের পেছনে পুরুষতান্ত্রিকতার যোগসূত্র খুজেছেন। যেটি কোনভাবেই বাস্তবতার সাথে যায় না।
নারী বাদ। একটি জনপ্রিয় শব্দ।
আমি বলবো জ্ঞানবানিজ্যের একটি শুশীল রূপ।
শূরু হয়েছিল ইউরোপে শ্রেণী সংগ্রামে কৃষিভিত্তিক সমাজে নারী আর পশুর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরতে। কথাটা খু্বই খারাপ দেখালেও বলতে হয় যারা এর উদ্ভাবক তাদের দেশে নারীর অবস্থান আজো রয়েগেছে একটি সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র কিংবা ভোগপণ্যের কাতারে। একটি আলোকচিত্র এখানে দেখতে পাবেন। যা সেন্সরের জন্য ব্লগে দেয়া যায়নি। কিন্তু পশ্চিমাদের পদলেহী এদেশীয় গায়ে মানেনা আপনি মোড়ল টাইপের কিছু বুদ্ধিজীবি মনে করেন পুরুষদের গালাগাল আর তিরষ্কার করার পাশাপাশি এদেশীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম সমাজ কাঠামোকে গালাগাল দিলেই মনে হয় বিশ্বসেরা নারীবাদী হয়ে ওঠা যাবে। কিন্তু অনেকটা স্বৈরাতান্ত্রিক সু্রেই বলতে বাধ্য হচ্ছি তাদের জ্ঞানের বহর বুড়িগঙ্গার পানির মতোই বেশ ভাল মানের বিশুদ্ধ।

https://i2.wp.com/upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/1/1a/WomanFactory1940s.jpg/778px-WomanFactory1940s.jpg
যারা নারী অধিকার নিয়ে এতো গালভরা বক্তৃতা দেন তাদের দেশের দেখুন নারী কিভাবে কারখানার কাজ করছে।
https://i0.wp.com/upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/e/e0/2004_Chery_Fulwin_at_Shanghai.jpg/800px-2004_Chery_Fulwin_at_Shanghai.jpg
আর এই অটোমোবাইল মেলায় কি বিক্রি হচ্ছে সেটা আমি আপনি সবাই জানি।

নারীবাদীরা প্রথমেই বলে ওঠেন নারী দুর্বল। তার অধিকার হরণ করা হয়। কিন্তু তাদের উক্তিতে প্রথমেই নারীদের দুর্বল করে দেয়া কি নারী অধিকার হরণের পর্যায়ে পড়ে না ?
আমি জানি ঐ স্বঘোষিত মহাজ্ঞানী পণ্ডিতরা প্রথমেই দাবি করে বসবেন। মিস্টার অর্ণব আর্ক আপনি রেডিক্যাল নারীবাদ বা নারীবাদের অন্তবর্তিকালীন ধাপকে ধামাচাপা দিয়ে গেছেন। তাই এখানে আমি আপনাদের বলছি রেডিক্যাল নারীবাদীরা চায় স্বাধীনতা। কিন্তু এই স্বাধীনতার নিরীখে যে স্বেচ্ছাচারীতা করা হয় সেখানে সবকাজে এমনকি যৌনকর্মেও পুরুষকে বিচ্ছিন্নরাখার চেষ্টা হয়। আরো ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হয় যখন কিনা নারীদের সংঘবদ্ধ চক্রে পুরুষ আক্রমণের শিকার হয়। ব্যতিক্রম হিসেব আমি যদি আপনাদের সামনে মেল সডোমী বা লেসবিয়ান ডোমিনেশনের কথা বলি। তখনও আপনাদের সামনে এই প্রশ্নের কোন উত্তর না থাকায় আপনারা আবার ধ্যানে বসবেন।
আসলে বলুন সস্তা জনপ্রিয়তা কে না চায় ?? এখন বিশ্বে যা চলছে তার সাথে তাল মেলালে একদিকে ক্ষ্যাতির চূড়ায় ওঠা তো যায়ই । সেই সাথে ঝুড়িভর্তি কলাটা মূলোটা জুটে গেলে মন্দ কী ?

অধিকার প্রশ্নে নানা কথা বলা হলেও আজকের সমাজে পুজিঁবাদী আগ্রাসন আর জ্ঞাণের আধিপত্য হাজারো নারীর করুণ আর্তনাদ, হাজারো কুমারী মায়ের যন্ত্রণা ভরা জীবনের ইতিবৃত্ত। হতাশা থেকে জীবনের দিশা হারিয়ে নেশায় চুর হওয়া কিংবা আত্মহননের পথ বেছে নেয়া হাজারো নারীর করুণ কাহিনীর পৃষ্ঠা হয়তো কোনদিনই উল্টানোর সুযোগ তাদের হয়নি হয়তোবা হবেও না। আর কুমারী মায়ের সন্তান হওয়ার সুবাদে একটি নিরীহ শিশু যে পৃথিবীর আলো দেখার পর থেকেই কতটা নিগ্রহের শিকার হতে থাকে তার কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইভানজেলিকেলইজমে নারীর গৃহী সত্তার জাতীয়করণ করা হলেও সেটি আজ আলোচনার বাইরে। বেশ দক্ষতার সাথে সমালোচনার আংগুল তোলা হয় হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ মিশ্রিত সংস্কৃতির ভারত বর্ষের দিকে। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগীতা, বিকিনী প্রতিযোগীতা,সেলিব্রেটি গেম শো,মডেলিং, ফ্যাশন ম্যাগাজিন কিংবা বিজ্ঞাপনের সাহায্যে আজ নারী আর পণ্যের মধ্যে কোন পার্থক্য খুজে নেয়া দুষ্কর। পেন্টহাউস ম্যাগাজিন, বাটম্যান,প্লে বয়, ম্যাক্সিম, দ্য ম্যান, ইরোটিকা সহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন গুলো তাদের মডেল খুজতে কি ধরণের পাশবিক পথ অবলম্বন করছে তা যে ভাষায় বলা যাবে তা হয়তো একটি সভ্য সমাজের ভাষাতে সেন্সর পাওয়ার মতো না। অন্যদিকে পর্ণো মুভি তৈরী করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দরিদ্র দেশ থেকে নারীদের পাচার করে পশ্চিমে নিয়ে তাদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালানো। হয় তাদের নিজের সত্তাকে হরন করে একটি অমাননিক সত্তায় পরিণত করতে তাদের উপর না রকম জুলুম অত্যাচারের পরীক্ষা চালানো হয়। তাদের অনেকে অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে মারা যায়, অনেকে জীবনের থেকে সবকিছু হারিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয় আর অনেককে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়।
অন্যদিকে একই দেহে দুই সত্তার উপস্থিতি বা শি-মেল তৈরীতে কিংবা টি এস সিডাকশনের ক্ষেত্রে মারাত্মক ধরণের অস্ত্রোপচার করা হয় যা কেবল বিকৃত রুচির মাণুষের পক্ষেই সম্ভব। এতক্ষণ বলতে চেষ্টা করেছি পর্দার পেছনের কাহিনী। আর যখন আমরা পশ্চিমকে একটি পর্দায় সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত ও দৃশ্যায়িত হতে দেখি স্বাধীন সমাজে তাদের ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, স্বাধীন পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে কিংবা স্বাধীন পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে নারী আর পুরুষ সমান অধিকারই ভোগ করে যার সাথে বাস্তবতার দুরত্ব আসমান জমিনের।
বাস্তবতা হলো, তাদের শরীরের ওজন, প্রতিটি অঙ্গের মাপ, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সাজসজ্জা পর্যন্ত সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ফ্যাশন, ডায়েট কিংবা কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রীর দ্বারা। সমাজের নির্দেশ মানতে গিয়ে তারা নিজেকে পরিণত করে সস্তা বিনোদনের পাত্রে। আর, মুক্ত-স্বাধীন হবার জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে কাঁধে তুলে নেয় দেহ কে ভিত্তি জীবিকা উপার্জনের মতো নোংরা ও কঠিন দায়িত্ব। আর প্রগতির কথা বলতে গিয়ে একটু আনন্দ করতে গিয়ে তারা দিনের পর দিন আনন্দের ফসল হিসেবে আনছে তাদের আনন্দের ফসল কুমারী মায়ের সন্তানদের। কিন্তু এর সাথে ভারত বা বাংলাদেশী সমাজ বা পুরুষতান্ত্রিকতার যোগ কোথায়। আসলে আপনাদের অভিব্যক্তি হচ্ছে যেটি আপনাদের দৃষ্টিতে পছন্দসই হয় তখন সেটি নারীবাদ। আর বাকিটা জঘণ্য রকমের পুরুষতান্ত্রিকতা।
[১.] আপনারাই নারীদের প্রোডাক্ট বানাচ্ছেন আর সেখানে খুঁজছেন পুরুষতান্ত্রিকতার যোগসুত্র।
[২.] নারী অধিকার প্রশ্নে প্রথমেই নারী অবলা, দুর্বল, বঞ্চিত বলে তার অধিকার হরণ করছেন।
[৩.] আপনাদের এই প্রশ্নের ডামাডোলে নারীর পুরুষালি চরিত্র ছাপিয়ে যাচ্ছে।
[৪.] আপনারা ভুলতে বসেছেন নারীর দ্বারাও নারী নির্যাতিতহয়।
[৫.]মনে হয় কয়দিন পরে আপনার জঘণ্য সমকামী লালসার সাথেও পুরুষতান্ত্রিকতার যোগ খুজতে চেষ্টা করবেন।
[৬.] নারী অধিকার আর ধর্ম এই দুটিকে বিপরীতজোড় বা বাইনারী অপোজিশন হিসেবে মনে করে আপনারা একধরণের আধিপত্যবাদ জন্ম দিয়েছেন এটা বেমালুম ভুলে যান।
[৭.] ইউরোপ যেখানে বিশেষ অঙ্গ প্রকাশিত নারী মূর্তির উপস্থাপনে ব্যস্ত ঠিক সেখানেই ভারতের শাক্ত সমাজে প্রচলিত ছিলনারী দেবীর আরাধনা।
[৮.] আপনার হয়তো মাতৃকাদেবীর বিশেষ অবয়বের সাথে পুরুষতান্ত্রিকতার সম্পর্ক খুঁজতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু আপনাদের অবগতির জন্য বলছি এই উর্বরাশক্তি বা উচ্চ ফলনের আকাঙ্খা নারী পুরুষ সবার হাতে ছিল।
[৯.] আসলে আপনাদের প্রচলিত জ্ঞানে পশ্চিমের একান্ত নিজের প্রয়োজনে নিজেদের মতো করে তৈরী স্বার্থসিদ্ধিভিত্তিক উপস্থাপনের বিপরীতে কোন জিগ্গাসা জন্মায়নি। কিংবা জন্মালেও বিশেষ স্বার্থে মুখে কুলুপ এটেঁ আছেন।
[১০.] আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে এই সব তাত্ত্বিক ধারণা আমাদের স্বল্প জ্ঞানের ঝুড়িটিকে কানায় কানায় ভরে দিয়েছে। তাই অনেক সময় আমরা আয়নায় নিজেদের মুখ দেখেও ভেংচি কাটি। কিন্তু আলোকপর্বের ইউরোপের সমাজের ক্রমপরিবর্তনের কথা বিচার করতে গেলে সহজেই এই ধারণাটি সহজেই বোঝা যায়।
[১১.] পরিবেশকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে সাইবেরিয়ার ঠাণ্ডায় যেমন পহেলা বৈশাখের মতো লুঙ্গি কাছা দিয়ে লাঠি খেলা যায় না তেমনি আমদের দেশেও ওদের সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। তবে কেউ যদি ওদের অনুকরণ করে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে চেষ্টা করেন তবে সেটা ভিন্ন কথা।
[১২.] জোর চেষ্টায় হাতি, ঘোড়া,বাঘকে ট্রেনিং দেয়া যায় তাকে ট্রেইন্ড বললেও আর যাই হোক কখনই শিক্ষিত বলা যাবে না। তেমনি আপনার জোর করে নারীদের দুর্বলবলে তাদের অধিকারহীনতার কথা বলে বুকফাটা চিতকার-ম্যাতকার করতে থাকুন না । আমি শুধু আপনাদের এই প্রশ্নের উত্তরে একটা কথাই বলবো আপনি বাস করেন বাংলাদেশে। আপনার যতো মোটাতাজাই হন। আপনাকে যদি মারিয়া সারাপোভা বা সেরেনা উইলিয়ামসের মুখোমুখি দাড় করানো হয়। তখন দেইখেন কার কব্জিতে জোর বেশি। এই সব তাত্ত্বিকতা না ফলাইয়া যদি বাস্তবতা বুঝতেন তবে দেশ জাতি ও আপনার সবারই মঙ্গল হইতো।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন —
[১.] Smith, Barbara. ed. Home Girls: A Black Feminist Anthology. New York: Kitchen Table: Women of Color Press, 1983.
[২.] Cutler, Bert (2003). Partner selection, power dynamics, and sexual bargaining in self-defined BDSM couples. San Francisco: The Institute for Advanced Study of Human Sexuality
[৩.] Ernulf KE, Innala SM. “Sexual bondage: a review and unobtrusive investigation.” Arch Sex Behav. 1995 Dec;24(6):631-54.
[৪.] Goodman, Robin Truth. Feminist Theory in Pursuit of the Public: Women and the “Re-Privatization” of Labor. New York: Palgrave Macmillan, 2010.
তবে সবকিছুর আগে যদি সাইদের লেখা অরিয়েন্টালিজমটা পড়ে নেন ইংরেজী পড়লে ভাল আর আজিজ মার্কেটে এর বাংলা অনুবাদ ও পাওয়া যায় । আশাকরি নিজের বোধশক্তিই আপনাকে প্রেরণা যোগাবে। এখানে আর এতো টেক্টট নিয়ে মাথা ঘুরাতে হবে না। আর জানার আগ্রহ থাকলে আর তর্কথাকলে আসুন। যুক্তির লড়াইয়ে আপনাকে স্বাগতম। ধন্যবাদ সবাইকে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s