ভারতীয় পানি আগ্রাসন, বি এস এফ এর রক্তক্ষুধা ও একটি মানব খাঁচার গল্প


ঢাকা রে দুই ভাগ কইরা তারা খুবই খারাপ এবং বে শরিয়তী কাজ করছে ।
জবেহ করার পর ভাগ হইতে হইব ৩ টা। এক ভাগ ফকির মিসকিন অর্থাৎ পাকিস্তানরে। এক ভাগ আত্মীয় স্বজন অর্থাৎ ভারতরে আর এক ভাগ নিজেরা ভাগ বাটোয়ারা কইরা নেয়া যাইতে পারে।এটা আমার কথা না। এটি দেখলাম এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামানের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে। কিছুক্ষণ হাসতে থাকি। তারপর একটা বিষয় ভাবতে গিয়েই মনটা খারাপ হয়ে গেল। আগে নতুন বছর শুরু হইতো ভাল কিছু প্রত্যাশা করে আর শেষ হইতো আনন্দ ফূর্তির সাথে। এখন দেখি নতুন বছর শুরু হয় এইডস দিবস দিয়ে যার যন্ত্রণা বইতে হয় সারা বছর আর হতাশার চরম অভিব্যক্তির পরিসমাপ্তি হয় ৩১ ডিসেম্বর রাতে গ্যালন গ্যালন মদ গেলার মধ্য দিয়ে।

আর আমরা তো হতভাগ্য বাংলাদেশী। কেউ কেউ বুক চাপড়ে দাবি করি আমরা বাংলাদেশী আর বাকিরা তো সেই সাহসটুকুও দেখায় না। নিজেদের শুশীল প্রমাণ করতে দেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেই বেশ চতুরতার সাথে আজও তাদের বাঙালিই বলে ধন্য হয়।

এতদিন ফারাক্কার শোষনে তৃষ্ণার্ত বাংলাদেশীদের অনেকে হয়তো ঘুমের মধ্যেও পানি পানি বলে আর্তচিৎকার করে ওঠেন যার সাথে বন্ধুত্বের উপহার হিসেবে যোগ হতে যাচ্ছে টিপাইমুখ। সেই সাথে কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা সীমান্তে বন্ধুত্বের নিনাদ হিসেবেই যেন বারংবার গর্জে ওঠে বন্দুক ,অনেকটা নিয়তির অলিখিত নিয়মে ফেলানীর মতো অভাগা কিশোরী কিংবা মিরাজ হোসেনের মতো নির্যাতিত অসহায় বাংলাদেশীর বলিদান থেকে রক্তক্ষুধা মেটায় বি এস এফ। তাই বলি কি ভারত বাঙলাদেশ সম্পর্ক ঐ কাঁটাতারে বেড়ার মতোই প্রশ্নবিদ্ধ।

গেল বছরের ঠিক গোড়ার দিকে লাশ হয়ে কাঁটাতারে নির্মমভাবে ঝুলতে দেখেছিলাম ১৪ বছরের বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানিকে, চাঁপাতলা সীমান্তে মিরাজ হোসেনের নির্মম হত্যকাণ্ড সহ আরো কত খবর চাউর হয়েছে পুরো বছর। আমরা ছিলাম নিশ্চুপ। কারণ মুখ আমাদের বন্ধ আইনের বেড়াজালে। আমাদের দুই হাত বাধা একটি সংবিধান নামক শক্ত রজ্জুতে।
ঢাকা নগরীর বিভাজন নিয়ে একটি পোস্ট করে অনেক আতংকে ছিলাম না জানি আমার কোন জেরার মুখে পড়তে হয়। নাকি কাউকে মুচলেকা দিয়ে ব্লগিং জীবনের ইতি টানতে হয়। যদিও আমি চতুর্থ পর্ব ফাইনাল পরীক্ষার জন্য ব্লগ থেকে দুরে ছিলাম শেষ বেলায় একটি ধন্যবাদ দিতে হয় ব্লগের মডারেটরদের।
বিশ্বব্যাপী আমরা আজ যে সকল আন্দোলন দেখছি তার মধ্যে আরব বস্তন্তের উত্থান আর ওয়ালস্ট্রিট এর অকুপাই মুভমেন্ট এর কথা বলা যায়। যা সরাসরি বিপ্লবের সনাতনী সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছে। একুশ শতকের সাইবার আন্দোলন আর ‘অকুপাই মুভমেন্ট’কে কেন্দ্র করে কী একটি ‘বিপ্লব’ সংঘটিত হতে দেখেছি। এই বিপ্লব ভিত নড়িতে দিতে সক্ষম হয়েছে স্বৈরাচারের। মংগার প্রতিবাদে ‘অকুপাই ওয়ালস্ট্রিটে’ আন্দোলন নিউইয়র্ক ছেড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আটলান্টিকের ওপারের দেশগুলোতে। একই সঙ্গে অকুপাই পোর্টল্যান্ড ক্যালিফোর্নিয়ার পোর্টল্যান্ড পোর্টে অনুষ্ঠিত হলেও তা ছড়িয়ে গেছে প্রশান্ত মহাসাগরের অপর পাড়ের দেশগুলোতে।

আমরা দেখেছি এই সকল আন্দোলনের প্রতিটির পেছনেই কাজ করছে ক্ষমতার অসমতা, বৈষম্য, যোগ্য ব্যক্তির উপযুক্ত পাওনা না মেলা আর অর্থনৈতিক ক্ষমতা নির্দিষ্ট শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত হওয়া। এই বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ কেন্দ্রীভূত হতে হতে এক সময় মোড় নিয়েছে একটি সরব প্রতিবাদে। আমরা দেখেছি আমেরিকার বিক্ষোভকারীরা দিনের পর দিন নিউইয়র্কের ওয়ালস্ট্রিটের পাশে জুকোটি পার্কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আসছিল। প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাতের মধ্যেও শত শত বিক্ষোভকারী তাঁবু টানিয়ে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিল। প্রচণ্ড শীত তাদের আন্দোলনকে হিমাগারে পাঠাতে পারেনি।

প্রকৃত অর্থে অন্যায়ের প্রতিবাদে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের সমর্থন তারা পেয়েছিল। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি তাদের আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেয় পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে।

এর পরপর আমরা দেখি আন্দোলনকারীরা ওয়াশিংটনের ফ্রিডম প্লাজা দখল করে নিয়েছে যার নামকরণ করা হয়েছে October 2011 Movement. ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত এই আন্দোলন পার করেছে ৪৫ দিন। October 2011 Movement -এর উদ্দেশ্য একটাই, যুদ্ধ ব্যয় কমানো (৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার) ও সামাজিক খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো। বলা ভালো, জুকোটি পার্ক কিংবা ফ্রিডম প্লাজা বেছে নেওয়ার কারণ কিন্তু একটাই, জুকোটি পার্কের পাশেই রয়েছে ওয়ালস্ট্রিট, এখানে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজার, রয়েছে বড় বড় করপোরেট হাউসের সদর দফতর। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসার মূল কেন্দ্র এখানে যাকে আমেরিকার মতিঝিল বললে আপনাদের বুঝতে সুবিধে হবে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের নানা সমস্যার সাথে বিশেষ করে নতুন দুটি সমস্যা যোগ হয়েছে একটি হচ্ছে টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণ অপরটি রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যকে বুড়ো আঙূল দেখিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাকে দুভাগ করা যেটি নাকি চার ভাগ করার প্রত্যাশা করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
দেশের চলমান সমস্যাগুলো এতো বেশি যে সরকার হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন এতোগুলো সমস্যার বিরুদ্ধে মানুষ কোনটি নিয়ে আন্দোলন করতে পারবে। মানুষের চিন্তারয় মাথা ঘুরাতে থাকবে ততক্ষণে স্বার্থসিদ্ধি হয়ে যাবে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে আমরা অনেক শান্তিতে আছি। একাত্তরের পর আমাদের দেশের মানুষ আর কোনদিন এতো শান্তিতে থাকেনি।
কারণ আমরা সেই সময়ে বাস করছি যখন।
১। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ব্যাগ ভরে টাকা নিয়ে অনেকটা পকেটে করে বাজার করে ফিরতে হয়।
২। বিদ্যুত এখন আর যায়না মাঝে মাঝে আসে।
৩। রাস্তাঘাটগুলোতে অসাধারণ সুন্দর গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। যেগুলোতে মাছ চাষ করে আমাদের প্রচুর আয় করার সুযোগ রয়েছে।
৪। স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিমলদের দৌরাত্বে মেয়েরা স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দেয়াতে নারী নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির ঘটনা কমে যাওয়ার সমূহ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
৫। একটা খাসির দামে এখন খুব সুন্দর সাইজের একটা মুরগী কিনতে পারা যায়।
৬।শেয়ার বাজারে ভরাডুবিতে পাব্লিক আর সেখানে বিনিয়োগ করবে না। ফলে দেশের মানুষের আর সর্বশান্ত হওয়ার ভয় থাকছে না।
৭। ফারাক্কার পাশাপাশি টিপাইমুখ ড্যাম আমাদের দেশকে মরুভূমি বানিয়ে দেবে সেখানে আর বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
৮। আইন শৃঙ্খলার উন্নতিতে মানুষ আর ভয়ে রাস্তায় বেরই হয়না। ফলে চুরি ছিনতাই এর সম্ভাবনা কমেছে।

তবে আমাদের দেশের মানুষ এই সব সুবিধায় ক্লান্ত বিরক্ত। তারা হয়তো পথ খুঝে পাচ্ছে না কোনটির বদলে কোনটির প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু যুগ পাল্টেছে এখনকার মানুষ জানে কিভাবে প্রতিবাদ করতে হয়। আর আমরা বাঙলাদেশীরা আর যাই হোক এদিকে এক কাঠি সরেস।

আমরা ব্রিটিশদের তাড়িয়েছি। আমরা বায়ান্ত, উনসত্তর, একাত্তর এর পর এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনকেও লাথি মেরে অবসান ঘটিয়ে নিজেদের সামর্থের প্রমাণ দিয়েছি। আরব বসন্ত আর অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট স্বাক্ষী দিচ্ছে মানুষের ক্ষোভকে বেশিদিন ছাইচাপা দেয়া যায়না। বিরুদ্ধ প্রকৃতি আর অবিরাম তুষারপাতও মানুষের ক্ষোভের আগুনকে চাপা দিতে পারেনি অকুপাই হয়েছে ওয়ালস্ট্রিট। স্বৈরাচারের চোখরাঙানি আরব বসন্তের আগমনে বাঁধ সাধতে পারেনি। তাই এই সময়ে বড় আশংকা হয় বাংলা বসন্তের।

আমরা এমন কিছু চাইনা যাতে আবার দেশে অশান্তি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বিবাদ সৃষ্টি হোক। আমরা শান্তি চাই। একাত্তরের পর নব্বইতে একটি বিবাদ শেষ হয়েছে আর একটি বিবাদ কারো কাম্য নয়। সরকার ও বিরোধী দলের কাছে আমাদের আকুল আবেদন দেশটাকে একটু রেহাই দিন। জনগণকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন। আপনারাই পারেন এই বাংলা বসন্তের আশংকা থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। কি লাভ এসব নাম পরিবর্তন আর ভাঙচুরের রাজনীতিতে। আপনারাই তো বলেন রাজনীতি নাকি গণমানুষের জন্য। মুখে তো ফাও প্যাচাল পাড়তে প্রচুর দেখেছি। একবার বাস্তবে পালন করে দেখান। দেশের মানুষ আপনাদের মাথায় তুলে রাখবে। আর আপনারাও রেহাইপাবেন বাংলা বসন্তের উন্মত্ততা থেকে।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থী, কলামিস্ট ও লেখক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট
aurnabmaas@gmail.com

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s