হতাশা, হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসে ভরা একটি বছর পেরিয়ে নববর্ষ আজ যে স্বপ্ন দেখায়


আশাজাগানিয়া গান আর নতুন দিনে রঙিন স্বপ্নঘেরা একটি ঝলমলে ভোর। এল নতুন বছর। স্বাগত জানাই ২০১২। ২০১১ তোমার কান্নাভেজা দিনগুলোকে স্মরণ করে আর কষ্ট পেতে চাইনা। তুমি চলে গেছো। এখন তোমায় ভুলতে চাই। বিদ্ধস্ত অট্টালিকার ঘুণে ধরা চৌকাঠ, জানালা থেকে শুরু করে প্রতিটি কড়িবর্গায় তুমি যে হিংস্র পদাঘাত করেছো তা আজো হৃৎপিণ্ডের ঢিবঢিব শব্দ স্তব্ধ করে দিতে যথেষ্ট। তুমি যা দিয়েছো তা কেবলি হারানো আর ধিক্কারের বিষে বিষাক্ত। নতুন দিনে এসব অসহ্য যন্ত্রনা কেন যেন বুক ফুটে বেরিয়ে আসে……………………।
এ দিনেও বলতে হয়।
সে অনেকদিন আগের কথা।
আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ …………………..।
রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিভাষায় এই দেশ নাকি স্বাধীন হয়েছিল।
তাও আজ থেকে চার দশক আগে।

একুশ শতকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব দেখেছে কত পূর্ণিমা রাতের ঝলমলে চাঁদ আর জ্যোৎস্নাশোভিত আকাশের রূপ। দেখেছে পড়ন্ত বিকেলে বেলকনি ছাপিয়ে যাওয়া সোনারঙা উজ্জল ঝলমলে রোদ্দুর। স্বৈরাচার পতনে আরব বসন্ত এসেছে। পুঁজিবাদ বিরোধী অকুপাই আন্দোলন টালমাটাল করে দিয়েছে পশ্চিমা আধিপত্যবাদীদের সিংহাসন। কিন্তু আমাদের অর্জন সেই চার দশক আগে স্বাধীনতার লাল সূর্যটিই। এই সূর্য আজ অবধি পূর্ণকিরণে বিকশিত হতে পারেনি। নানা অশুভ শক্তির কালো থাবায় স্বাধীনতাভোরের সূর্যের সেই লালিমাকেই অস্তগামীর লাল আর্তনাদ মনে করে বুকের মধ্যে আজ কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে ওঠে।

অবচেতন মনের দীর্ঘশ্বাসে একটি কথাই বার বার চাপা কান্নার সুরে ভাষা খুঁজে পায়। ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” যা স্বাধীনতার পর পরই বলেছিলেন বিপ্লবী মেজর জলিল। আমরা বিশ্ববাজারের কানাগলিতে বার বার ঘুরে ফিরে একটি অন্ধকার বাঁকে মাথা কুটে মরছি আর স্বাধীনতার হারিয়ে যাওয়া সূর্যটাকে খুঁজতে খুঁজতে হাঁপিয়ে উঠছি।

স্বাধীনতার আরো আগে সেই বায়ান্নে হয়েছিল ভাষা আন্দোলন। আজ বাংলা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা। কিন্তু আমরা ভাষা আন্দোলনকারীদের উত্তর পুরুষ হয়েও সেই ভাষাকে আজ ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলেছি।

কদিন আগে চলতো বাংলিশ বা হিংলা। এখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে হিবাংলিশের দিকে। একসময় বাসার কাজের বুয়াদের প্রথম পছন্দ হিন্দি সিরিয়াল গুলো আজ মাইনক্যার চিপায় পড়ে বাড়ীর বড় কর্তারও পছন্দের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। হলিউড বলিউডের ধামাকার দিনে ধুকে মরতে বসা ঢালিউডি সিনেমার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে আমদানি করা হয়েছে বন্ধু-বাড়ির বস্তাপচা সিনেমা।

আজ দেশের অক্ষমতার সুযোগ নিয়েই দেশের মাটিতে ভারতের জোর চরে। মাটির ময়নার বদলে মানুষ আশিক বানায়া আপনে দেখতে বাধ্য হয়। প্রয়াত তারেক মাসুদের রানওয়ে এদেশের সিনেমাহলে আর রান করবে না। সেখানে চলছে ভারতের রান সিনেমা।
একটি দেশ তার গর্বের প্রতীক লাল সবুজের পতাকাটি। কেন মনে হয় সেটিও আজ খামচে ধরেছে কোন এক কুৎসিৎ শকুনীর নোংরা নখ। শদীদদের আত্মত্যাগে উজ্জল এদেশের প্রতিটি মানুষ বিজয়ের মাসে এসেও কেমন যেন দিশেহারা। ফারাক্কার শোষনে পদ্মা শুকিয়ে রাজস্থানের থর মরুভূমির বর্ধিত অংশে পরিণত হলেও এদেশের ভারতীয়করণ থামেনি। সরকার ভাবছে পুরো দেশটি বন্ধুরাষ্ট্রের রাজস্থান হলে ক্ষতি কী? তাইতো টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের উন্মত্ততার সাথে এদেশীয় মানুষের নির্বুদ্ধিতায় সেই চার দশক আগের বন্ধুত্বের বলি হয়ে তিতাস আজ একটি খুন হয়ে যাওয়া নদীর নাম।

আজ তেলের দাম এমন একটি দুরুহ অবস্থায় গিয়ে পৌছে গেছে যেখানে মনে হয় জ্বালানি তেল আর নেড়া মাথায় পড়া বেল ভিন্ন কিছু নয়। এখন ব্যাগ ভরে টাকা নিয়ে বাজারে গেলে যদি আপনার এক পকেট ভর্তি বাজার আসে তাতেও আপনি খুশি হন। আশার বানী এই যে বিদ্যুৎ এখন আর যায় না। এটা মাঝে মাঝে আসে। মানুষের নিরাপত্তা আজ তাসের ঘরের দেয়ালের মতো দুর্ভেদ্য হয়ে গেছে। মুখে নারীর অধিকার নিয়ে শত সেমিনার সিম্পোজিয়াম হলেও তা এই অধিকার কিছু জীপগাড়ি আর কারে চাকার নিচে চাপা পড়েছে। নারী নীতি প্রকাশিত হলেও ভিকারুননিসার মতো বিদ্যায়তনে শিক্ষক নামক বরাহশাবকের তাণ্ডবে দেশের মান ইজ্জত ভূলুন্ঠিত হয়েছে।

নারী নীতিতে অনেক এভারেস্ট প্রমাণ কথা থাকলেও তার বাস্তবায়ন না হওয়ার সুযোগ নিয়ে এদেশের মডেল, অভিনেতা, অভিনেত্রীরা যেন দিশেহারা হয়ে একের পর এক অপকর্মের ভিডিও বের করে গেছেন। তাদের ভাষ্য মনে হয় এমন। আমার শরীর আমি দেখাবো। যতটুকু খুশি ততটুকু দেখাবো। তাতে জনগণের বাপের কী? আর সরকারেরই বা কি ? :P। এপরেও মরতে হয়েছে মডেলে তাহিয়া আদৃতাকে এবং বরাবরের মতোই কোন বিচার হয়নি। প্রায় প্রতিটিদিনের মিলিত সংখ্যায় অন্তত হাজারো নির্যাতন নিপীড়নের ঘটনা ঘটলেও এমন একটি ঘটনাতে কারো বিচার হয়েছে বা শাস্তি মিলেছে এমন খবর ছাপানোর দুঃসাহস কোন পত্রিকার ছিলো না। :-T

দেশের মানচিত্র, অখণ্ডতা, আর সার্বভৌমত্বকে বুকে ধরে জীবন দিয়েছিলেন ত্রিশ লক্ষ মানুষ। শুকিয়ে যাওয়া পদ্মা কিছুটা ম্লান করে দিলেও তাদের রক্ত আজও যমুনা, মেঘনা, করতোয়া, ধলেশ্বরী, কর্ণফুলি আর বঙ্গপসাগরের নোনা পানিতে মিশে আছে।
হায় !!
মাত্র চারটি দশকের ব্যবধান। এই সকল শহীদের পূণ্য স্মৃতির প্রতি কাঁচকলা দেখিয়েই দেশের বুক চিরে দেয়া হলো প্রশস্ত করিডোর। হত্যা করা হলো তিতাসের মতো একটি নদীকে। নিদারুণ উন্মত্ত্বতায় খানা খন্দকে পরিণত করা হলো দেশের প্রতিটি রাস্তাঘাট। চুরি, দুর্নিতি আর কালোবাজারীর পাশাপাশি বিদেশী বেনিয়াদের আগ্রাসনে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে স্বপ্ন হারানো মানুষের কান্নায় বার বার কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশের এ জমিন। বন্ধুত্বের বহিপ্রকাশ স্বশব্দে বার বার জেগে উঠেছে। আমরা পেয়েছি এক একট ফেলানি, মিরাজ হোসেন, নাজমুল হাসান, কবির, সোলেমন, তরিকুলদের নিথর দেহ। :a3

চারদিক ঘিরে বন্ধুত্বের প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়া কাঁটাতারের বেড়া আমাদের বাধ্য করেছে একটি বিস্তৃত মানব খাঁচার বাসিন্দা হতে। তবুও আমরা আজ স্বপ্ন দেখি। কারন আমরা মানুষ । আমরা বাঁচতে চাই। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দু:সাহস দেখিয়ে ডিজিটাল স্বপ্নতঙ্কে মাথা ঠুকে মরতে চাই না। আমরা বাঁচতে চাই সেই পুরোনো দিনের মতো। যখন দেশের মানুষের চুলোয় আগুণ ছিল, গোয়ালে অন্তত একটা গরু ছিল, আর দুবেলা দু মুঠো খাবার জন্য ভাতের যোগান ছিল পর্যাপ্ত। আমরা ট্রাজজিট করিডোরে বিদ্ধস্ত সিংগাপুর মালয়েশিয়া চাইনা। আমরা ফিরে চাই সেই সোনার বাংলাদেশ যার স্বপ্নে বিভোর হয়ে জীবন দিয়েছিলেন এদেশের মুক্তিকামী মানুষ।

এদেশের মানুষের মুক্তি না হলে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের সেই আত্মত্যাগের পূর্ণতা পাবেনা।
এলো নতুন বছর। পুরাতন সেই নোংরা বালিশে মুখ গুঁজে গুমরে কাঁদা আজ হোক কেবলি ইতিহাস।
আমরা স্বপ্ন দেখি ।
নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখি।
মুক্ত বিহঙ্গে আকাশ ভ্রমণের মতো না হলেও অন্তত স্বাভাবিক মানুষের জীবন চাই।
আমরা গোলমালে বিদ্ধস্ত একটি নরক চাই না।
আমরা চাই শান্তির সুবাতাস।
আমরা বাদলা দিনের ঘনঘটা দেখতে চাই না।
আমরা চাই বসন্তের সেই মৃদুমন্দ হাওয়া।
সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।
শুভ হোক অনাগত দিনগুলি ।
এই প্রত্যাশায়।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s