সেকুলার ধারণার প্রসার ও বাংলার মধ্যযুগ।


বাংলাদেশের ইতিহাস প্রকৃত অর্থে বাস্তবতা বিকৃতির ইতিহাস । এটি বললে অনেকেই আতকে উঠতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা বুঝতে পারলে তিনি সহজেই বিষয়টি মেনে নিতে পারবেন। আমাদের দেশের ইতিহাস গবেষকদের মূল সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্র বা সমস্যা চিহ্নিত করার দুঃসাহস আমি দেখাবো না শুধু এটুকু বলতে পারি। আমাদের দেশের ইতিহাস চর্চা অনেকটাই থেমে থাকে মধ্যযুগের প্রারম্ভ অর্থাৎ সুলতানী যুগ পর্যন্ত গিয়ে। এই ক্ষেত্রে বাংলার সুলতানী যুগের ইতিহাস অনেকটাই অধরা থেকে যায়। আমরা সুলতানী যুগের ইতিহাস বিশেষত হোসেনশাহী যুগের ইতিহাস অনুসন্ধান প্রসংগে বিষয়টি সহজেই বিশ্লেষণ করতে পারি।
ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় আমরা দেখি তুর্কি বিজেতারা বারো শতকের শুরুতে ভারতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বিষয়ের সাথে হিসেব মেলাতে গেলে আরো বহুদিন পর প্রায় তের শতকের শুরুতে তাদের রাজনৈতিক সাফল্যের সূচনা ঘটে বাংলায়। বস্তুত বাংলার মধ্যযুগের যাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই যেটি আমাদের গবেষণা আর চর্চার অপারগতা হেতু অনেকটাই অন্ধকারে থেকে গেছে।
আমরা দেখি মধ্যযুগের কালপরিসরকে বড় দাগে দুটো পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বটি সুলতানি শাসন যুগ আর পরেরটি মোগল শাসন পর্ব। সার্বিকভাবে বলা যায় মধ্যযুগ ছিল মুসলমান শাসকদের শাসনকাল। প্রাচীন বাংলার হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থার ওপর নতুন একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অবস্থান বাংলার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
মুসলিম বিজেতাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক বোধের সঙ্গে ভারতীয় সাধারণ মানুষের দীর্ঘ দিনের আচরিত ধর্ম ও সামাজিক প্রথার সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল।
কিন্তু ভারতভূমিতে তুর্কি বিজেতাদের আগমন ও ক্ষমতা গ্রহণের প্রতিক্রিয়ায় সমাজ জীবনে তেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেনি। সমাজ জীবনের ভিত্তি এবং অর্থনৈতিক কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিতই থেকে যায়। কিন্তু তুর্কি বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে যে নতুন ভাবাদর্শের আগমন ঘটে তাতে ভারতীয় সংস্কৃতিতে আসে সংস্কারের ধারা। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পট পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের রূপান্তরটি স্পষ্ট হতে থাকে প্রধানত ধর্মীয় চিন্তা অনুসঙ্গ করে। সুলতানি বাংলায় বিষয়টি ক্রমে স্পষ্টতর হয়। মুসলিম আগমন-পূর্ব সেন শাসনযুগে বাংলার সমাজ জীবনের ভাঙ্গন স্পষ্ট হয়ে পরেছিল। তবে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে যে, নানা অভিঘাতে সাংস্কৃতিক জীবনে টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। গ্রহণ-বর্জনের উদারতায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন দৃশ্যপট উন্মোচিত হতে পারে। কিন্তু ধর্ম-সংস্কৃতি মানুষের মনোজগতকে যেভাবে অধিকার করে রাখে তাতে নানা প্রতিকূলতায়ও একে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা সহজ নয়। তাই সুলতানি যুগে নানা ভাঙ্গন প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে সনাতন ধর্ম চিন্তার উপস্থিতি বারবার লক্ষ করা যায়। কখনো কখনো নতুন ধারার ধর্মীয় চেতনাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট হতে থাকে। সুলতানি যুগে বাংলার ধর্মীয় অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল বলে বিষয়টি গভীরভাবে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন রয়েছে।
https://i1.wp.com/2.bp.blogspot.com/-PcGjA5am4Ec/TWT8GfbzuTI/AAAAAAAAAWU/M5ZVvr4zuS0/s1600/Kantaji%252520Temple_jpg2215.jpg
কান্তজিউর মন্দির বা কান্তনগর মন্দির।
বাংলার সনাতন ধর্মচিন্তার পরিমণ্ডলে ইসলামের আবির্ভাব এবং মুসলমান সাধকশ্রেণী ও সুলতানদের সহযোগিতায় এর দ্রুত সম্প্রসারণ এই আলোড়ন সৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। বাংলায় মুসলমান সমাজ সম্প্রসারণের প্রধান কারণ ছিল বহুসংখ্যক হিন্দুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ। এর ফলে মুসলমান সমাজ গ্রামাঞ্চলে সম্প্রসারিত হয়। দৃঢ়মূলে প্রথিত হয় রাজশক্তি। বহিরাগত মুসলমানেরা সরকারি চাকুরি এবং ব্যবসা বাণিজ্য উপলক্ষ্যে সাধারণত শহরাঞ্চলে বাস করতো। ধর্মান্তরিত মুসলমানদের বড় অংশের বাস ছিল গ্রামাঞ্চলে। তাদের প্রধান পেশা ছিল কৃষিকাজ। প্রধানত নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুরাই ধর্মান্তরিত হতো। পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করলেও পৈত্রিক বাসভূমি এবং পৈত্রিক পেশার সঙ্গে তাদের বিচ্ছেদ ঘটতো না।
সুলতানি যুগের সূচনা থেকেই এক বৈচিত্রপূর্ণ ধর্মীয় আবহ রচিত হয়েছিল বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক জীবনে। আসলে দীর্ঘদিনের আচরণে সর্বভারতীয় ধর্ম সাধনার সঙ্গে বাঙালির ধর্ম সাধনা একীভূত হয়ে পড়েছিল। ইতিহাসের এই সত্যটি মনে রাখতে হবে যে, তের শতকে বাংলায় মুসলিম শক্তি প্রবেশের সময় স্থানীয় ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে স্পষ্টতই জটিলতা দেখা দিয়েছিল। সুতরাং রাজনৈতিক প্রাধান্য হারিয়ে বৌদ্ধ সমাজ ও সং¯কৃতি যখন দুর্দশাগ্রস্ত এবং সেন যুগে ব্রাহ্মণদের প্রভাবে সাধারণ হিন্দু সমাজ বিপর্যস্ত ঠিক সেই সময় মুসলিম সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেন শাসন যুগে রাজশক্তি গণশক্তির ওপর তেমন শ্রদ্ধাশীল ছিল না। সেন যুগে সাধারণ মানুষ এতটা সামাজিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিল যে, মুসলিম আগমনকে তারা মুক্তির ইঙ্গিত হিসাবে মনে করেছে। শূন্যপুরাণের ‘নিরঞ্জনের রুষ্মায়’ এর সমর্থন পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় মুসলমানদের আগমনে অত্যাচারিত বাঙালিরা উল্লসিত। অন্তত এ সময়ে মুসলমানদের আগমনে তারা অপেক্ষাকৃত ভাল আশ্রয়ের সন্ধান খুঁজে পেয়েছিল। হিন্দু আমলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নেতৃত্ব ছিল ব্রাহ্মণদের হাতে এবং সমাজ পরিচালনায়ও ছিল তাদের কর্তৃত্ব। সাধারণ মানুষের একদিকে ধর্মে অধিকার ছিল না অন্যদিকে সমাজে ছিল না স্বীকৃত মর্যাদা। সেই সঙ্গে সামন্তবাদের প্রভাবে অর্থনৈতিক অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছিল। এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। এই পটভূমিতেই আগমন ঘটেছিল মুসলমান সাধক শ্রেণীর।
রাজশক্তি হিসাবে মুসলমানদের প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে বাংলার কোন কোন অঞ্চলে সীমিতভাবে মুসলমান সুফি সাধকদের আগমন ঘটতে থাকে। সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিষ্পেষিত নিম্নশ্রেণীর অনেক হিন্দু অপেক্ষাকৃত ভালো আশ্রয়ের সন্ধানে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে যে, সুফিদের ধর্মীয় দর্শন যেরূপে বাংলায় প্রবেশ করেছিল তাতে সনাতন বাঙালির মনোযোগ সহজেই এই মরমী সাধকগণ আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন। বাংলায় সুফি সাধনায় যে মরমী চেতনার উপস্থিতি ছিল তার সঙ্গে বৌদ্ধ হিন্দু বাঙালির যোগতান্ত্রিক দর্শনের তেমন অমিল ছিল না। এভাবে বাংলায় ধর্মীয় সমন্বয়ের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়। বৃহত্তর দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে হিন্দু ও মুসলমানের সংমিশ্রিত সংস্কৃতিই ভারতীয় সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে নানা জাতির বাস। ধীরে ধীরে তারা হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে নিজস্ব অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ভারতে হিন্দু ধর্মের দ্বারা ইসলামকে আত্মস্থ করা সম্ভব হয়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে হিন্দু ধর্মের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ইসলামের বড় রকমের পার্থক্য। ইসলাম ধর্মে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেক বেশি স্পষ্ট। তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন পাশাপাশি অবস্থান করতে গিয়ে সংঘাত ও সম্প্রীতির পথ ধরে ভারতবর্ষে এক নতুন সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, যা ‘হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতি’ নামে বিশেষ পরিচিত। সুলতানি বাংলায় ইসলাম ধর্ম বিকাশের মধ্যদিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক রূপান্তর লক্ষ করা গিয়েছিল। ধ্র“পদী ইসলাম নয়Ñসুফিদের লালিত ধর্মীয় দর্শনই এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিল বেশি। রাজশক্তি হিসাবে মুসলমানদের আগমনের পূর্ব থেকে বাংলায় সুফি তৎপরতা চলতে থাকলেও সুলতানি যুগের অনুকূল পরিবেশে সুফিগণ সমাজ জীবনের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। এ সময়কালে সাধারণ মানুষ সুফিদের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। অবশ্য এরও কারণ ছিল। মসজিদ. মাদ্রাসা, খানকাহ্ রাজধানী ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো নির্মাণে সুলতান বা রাজ কর্মচারীগণ সহায়তা করলেও মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং খানকাহ-র সুফি সাধকগণ ধর্মচর্চা ও ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। মুসলমানদের রাজক্ষমতা প্রসারের সঙ্গে মুসলিম সমাজ বিস্তৃতির সম্পর্ক থাকলেও এতে মুখ্য ছিল সুফি সাধকদের ভূমিকা। সুফিগণ তাঁদের খানকাহ স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে লঙ্গরখানা, মক্তব, মাদ্রাসা, চিকিৎসাকেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপন করতেন। অর্থাৎ এককথায় বলতে গেলে মুসলিম সমাজ বিস্তৃতির উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতেন।
সুফি দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল প্রেমবাণী প্রচার। তবে বাংলায় প্রেমবাণী প্রচারক সুফিদের পাশাপাশি যোদ্ধা সুফিদেরও অস্তিত্ব ছিল। সংখ্যা বিচারে খুব কম হলেও এঁরা ধর্ম প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। অমুসলিম রাজা ও ভূস্বামীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ করতে গিয়ে অনেক সুফি শহীদ হয়েছেন। কেউ কেউ গাজীও হয়েছেন। যেমন ঢাকার রামপালে বাবা আদম শহীদ, পাবনার শাহজাদপুরে মখদুম শাহ দৌলা শহীদ, রাজশাহীর তুর্কানা শহীদ, মহাস্থানগড়ের শাহ সুলতান মাহী সওয়ার ও রাজশাহীর মখদুম শাহ রূপোশের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোন কোন সুফি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ বা যুদ্ধে সুলতান বা মুসলমান সেনাপতিদের সহায়তা করলেও অধিকাংশ সুফি সাধকের ধর্ম প্রচারের পদ্ধতি ছিল শান্তিপূর্ণ। বস্তুত ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্মের প্রথম প্রচার বল প্রদর্শন বা রক্তপাতের মধ্যদিয়ে হয়নি; শান্তিপূর্ণভাবে তা মুসলমান সুফি সাধকগণই করেছিলেন। এই শান্তিপূর্ণ প্রবেশের ফলে বাংলায় ইসলাম প্রসারের সঙ্গে উত্তর ভারতের প্রসারের প্রকৃতিগত পার্থক্য লক্ষণীয়। মূলত উত্তর ভারতে শহরাঞ্চল ও প্রশাসন কেন্দ্রগুলোতে ইসলাম প্রচার সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বাংলায় ইসলাম প্রচারিত হয় প্রধানত গ্রামাঞ্চলে। সুফি সাধকদের তত্ত্বাবধানে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা ও ধর্মচর্চার কতগুলো কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। এর মধ্যে পাণ্ডুয়া, সোনারগাঁও ও সিলেটের নাম উল্লেখযোগ্য। এসব অঞ্চল ছিল সুফি সাধকদের মূল অবস্থান কেন্দ্র। সুফি সাধকদের এই ব্যাপক অবস্থান সমকালীন বাংলার সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে যে সত্যটি প্রকাশ করে তা হচ্ছে কট্টর ধর্মীয় দর্শন নয়, বরঞ্চ রক্ষণশীলতার উপর নৈতিকতার বিজয়। এই বিজয়ের মিছিলে সামিল হয়েছিল ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ। এভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল সুলতানি বাংলায়। তাই এ যুগের বাংলার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের হাতে গড়ে ওঠা দুই সংস্কৃতির মধ্যে যেমন দ্বন্দ্ব ছিল তেমনি পারস্পরিক সহাবস্থান ও ভাবের মিশ্রণের উদাহরণও ছিল উল্লেখযোগ্য। বহিরাগত মুসলমানদের অনেককে ধর্মান্তরকরণের সূত্রে ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা যায়। ধারণা করা যায় শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান হিন্দুরাই তাদের প্রতিবেশী মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলেন। এসব প্রেক্ষাপটের কারণে মধ্যযুগে ধর্মীয় মৌলবাদ মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়নি।
সেন শাসনযুগে ব্রাহ্মণরা যে শুধু সামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল তাই নয়, মুসলিম আগমনের পূর্বে শাস্ত্রজ্ঞান চর্চায়ও তাদের একাধিপত্য ছিল। আর সে কারণে যে কোন প্রকার জ্ঞানের ক্ষেত্রে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের প্রবেশাধিকার ছিল নিষিদ্ধ। পরবর্তীকালে বিকশিত মুসলিম সমাজের পাশাপাশি যে হিন্দু সমাজের অস্তিত্ব ছিল, সেখানেও এই রক্ষণশীলতার প্রভাব স্পষ্ট লক্ষ করা যায়। এ জন্যই ষোল শতকে শ্রীচৈতন্য যখন শাস্ত্রচর্চায় সাধারণ শ্রেণীর অধিকারকে শিকার করে নেন, তখন তার মতবাদ প্রচারে ব্রাহ্মণদের ক্ষুব্ধ হতে দেখা যায়। এর বাস্তব চিত্র সমকালীন সাহিত্যে বিস্তর রয়েছে।
সুলতানি বাংলায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা তেমন লক্ষণীয় অবয়ব নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মুসলমান রাজশক্তি আর সুফি তৎপরতায় সহনশীল মনোভঙ্গী কার্যকর থাকায় হিন্দু সমাজের মধ্যে তেমন হতাশা নেমে আসেনি। বরঞ্চ নতুন আশাবাদের ক্ষেত্রই যেন প্রস্তুত হয়েছিল। সুবিধাভোগী রক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের পীড়নে হিন্দু সমাজের ভেতর যে অন্তঃক্ষরণ চলছিল তাঁর প্রতিক্রিয়াতেই শ্রী চৈতন্যের উত্থান ঘটে।
সুলতানি বাংলায় সাংস্কৃতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব আন্দোলনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। চৈতন্যের আবির্ভাবের পূর্বে হিন্দু সমাজে তন্ত্রধর্ম বিকৃতি লাভ করে বহু অনাচারমূলক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। ব্রাহ্মণ আরোপিত কঠোরতাও চরম রূপ নিয়েছিল। এই ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক প্রেক্ষাপট সামনে রেখে ইসলামের বিস্তার অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। ইসলামের এই অনায়াস গতিকে রোধ করার জন্য একটি প্রতিরক্ষা আন্দোলন নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন চৈতন্যদেব।
জাতিবর্ণহীন বৈষ্ণব আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী পরিবেশ থেকে নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা মুক্তি পেলেন। পরস্পরের প্রতি প্রেম স্থাপন করাই ছিল চৈতন্য প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের মূল ভিত্তি। এই ধর্মে জাতির প্রতি জাতির বিদ্বেষ ও অবিচার এবং এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের বিভেদের স্থান মোটেই ছিল না। বর্ণবাদী সমাজের সংস্কৃতির চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই একটি উদার সংস্কৃতি রূপান্তরিত প্রক্রিয়ায় অনিবার্যতার মধ্য দিয়েই এ সমাজ বিকশিত হয়।
পনের শতকে বাংলায় স্বাধীন সুলতানদের রাজত্বকালে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল। এ সময় সুলতানদের পাশাপাশি হিন্দু জায়গীরদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে আবার কাব্যচর্চার সূত্রপাত হয়। সেন যুগে অস্পৃশ্য করে রাখা নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুরাও এ সময় ফিরে পায় শিক্ষা ও কাব্যচর্চার অধিকার। এর বিস্তর উদাহরণও আছে। ‘মানিকচন্দ্র রাজার গান’ নামের কাব্যে এক হিন্দু কবি উল্লেখ করেছেন হিন্দু সমাজের নিচু শ্রেণীর মানুষেরাও দলিলপত্র পড়া ও লেখার মত যথেষ্ট শিক্ষিত ছিল। ‘কড়চা’র লেখক গোবিন্দ দাস একজন স্বর্ণকার ছিলেন। গোয়ালা রাম নারায়ণ গোপ ‘দেবায়ন উপখ্যান’ রচনা করেন। ‘নলদময়ন্তির’ লেখক মধুসূদন নাপিত জাতিতে একজন ক্ষৌরকার ছিলেন এবং একজন ধোপা ভাগ্যমন্ত ধূপি ‘হরিবংশ’ লিখে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।
সামাজিক এই উদার পরিবেশ মোগল যুগেও অব্যাহত ছিল। বাংলার সুবাদারগণ সমাজের সকল শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের প্রতি সমানভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতেন। সমসাময়িক হিন্দু কবিদের বর্ণনায় জানা যায় এসময় হিন্দুরা নিজেদের ধর্মীয় এবং সামাজিক বিষয়েও মুসলমান শাসকদের অভিভাবক হিসাবে বিবেচনা করতো। সুলতানি ও মোগল উভয় পর্বেই মুসলিম শাসকগণ সরকারি চাকুরি, কৃষি, ব্যবসা ও শিল্প প্রতি ক্ষেত্রেই সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে সমান সুযোগ দিতেন। সুতরাংমধ্যযুগের রাজাদর্শ ও সামাজিক পরিবেশে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায় বা শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধাবাদী চিন্তার প্রকাশ না থাকায় ধর্মীয় ক্ষেত্রে একটি উদার পরিবেশ বিরাজ করে। অনেক পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য বর্তমানে আমরা গবেষণা আর অধ্যয়ন না করে ইতিহাস বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। তাই ইতিহাসের প্রকৃত সত্য আমাদের কাছে অধরাই থেকে গেছে। একুশ শতকের অঙ্গীকার আজ বাস্তবতা বুঝতে হবে। অনুসন্ধান করতে হবে সত্য ইতিহাস আর হৃদয়ে ধারণ করতে হবে ঐতিহ্যকে। তবেই সম্ভব হবে একটি চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে দীপ্ত পদ্ধক্ষেপে উন্নয়নের স্বপ্নযাত্রায় অংশগ্রহণ করা।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব।
ব্লগার ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক।
aurnabmaas@gmail.com ।
ওয়েব পেজ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s