হতভাগ্য বাঙালিদের শিরোচ্ছেদকে ধর্মীয় রঙে রাঙানোর অপচেষ্টা বন্ধ হোক।


হয়তো কোন মা তার সন্তানের জন্য একবুক আশা নিয়ে আকাশ পানে চেয়ে শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে লুকিয়ে চোখ মুছেন প্রতিটিদিন । হয়তো কারো সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী তার কথা ভেবে প্রতিদিন আকাশ পানে চেয়ে আকাশের তারা গুনতে গুনতে চোখের পানি ফেলে। চোখের পানি শুকিয়ে গেলে ক্লান্ত দুচোখ আনমনে মুদে আসে তারপর নিকষ কালো রাত। হয়তো কোন সন্তান পথের দিকে মুখ করে চেয়ে আছে। তার আব্বা কবে ফিরবে। এ সবই প্রবাসী বাংলাদেশীদের চিত্র।

এই ভাগ্যটা আরো খারাপ আর করুন হতে দেখলাম যখন মায়ের ওই অপেক্ষার প্রহর আর কখনও শেষ হবে না। স্ত্রী তার স্বামীকে ফিরে পাবে না। আর হতভাগ্য সন্তানরাও আর পিতাকে আব্বা বলে ডাকার সুযোগ পাবেনা। আমি বলতে চাইছি দেশের হতভাগ্য কয়েক আদম সন্তানের শিরোচ্ছেদ এর ঘটনা। যাদের শাস্তি হয়েছে একটা খুনের দায়ে। কিন্তু তার থেকেও অবাক হলাম সেই ঘটনাকে ধর্মীয় রঙে ঢঙে রাঙানোর অপচেষ্টা দেখে। আমরা অবাক হয়েছি তাদের কথা শুনে যারা পরিমলের সাংসার(পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করার কথা বলেননি। কিন্তু সহজেই কিসাসের বিধানের প্রতি সমর্থন দিলেন। নাকি কোন কায়েমি স্বার্থকে উদ্ধার করতে সৌদির প্রতি নগ্ন সমর্থন দিলেন। এ প্রশ্নের উত্তর নেই। :-O

কেউ কেউ দাবি করলেন এটা আল্লাহর বিধান।:-W আমি মানছি কিসাস আল্লাহর বিধান। কিন্তু প্রতিতুলনামূলক বিচার করতে গিয়ে দেখি সৌদিরা কোন কোন ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলছে ? না সেটা গভীরভাবে ভাববার বিষয়। ভেবে দেখা গেল এই দণ্ড কেবল হতভাগাদের ভাগ্যেই হয়। এটা সবার জন্য নয়। আর কেন এই বিচার কেবল বাংলাদেশীদের ভাগ্যে জুটবে। আমরা দেখেছি সৌদি আরবের ভেতরে আমেরিকান কলোনীতে প্রতিদিন ককটেল পার্টি হয়। সেখানে ফ্রি সেক্স পার্টিও হয়। শুনেছি লস এন্জেলসের জুয়ার আড্ডাতেও সৌদি শেখদের আনাগোনা অনেক বেশি। তার পরেও এই খড়গ শুধু হতভাগ্য বাঙালির উপর পড়বে কেন ???
এই কেন এর কোন উত্তর নেই :-W

ধর্মীয় শিকল ছিড়ে বিষয়ানুগ বিশ্লেষণ করে আমি এর পেছনে আমাদের ভঙ্গুর পররাষ্ট্রনীতিকেই দায়ী করবো। এখানে ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি টেনে এনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কোন অবকাশ নাই। এখানে আমরা দেশের পররাষ্ট্রনীতির দিকে দৃষ্টি দিলে দেখি বাংলাদেশ বাদে যেকোনো রাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনে এবং আকাঙ্ক্ষা পূরণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা, জাতীয় নীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সেই সঙ্গে নিজের অর্থনীতি বিকাশের প্রয়োজনে তার বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করে থাকে। এক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জাতীয় স্বার্থই প্রাধান্য পায় বেশি।

বাংলাদেশের গত চার দশকের বৈদেশিক নীতি পর্যালোচনা করলে সবসময় যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে তা বলা যাবে না। ভারতের সাথে লাগাতার একপক্ষীয় স্বার্থের বাস্তবায়নমূলক চুক্তির পাশাপাশি সীমান্তে হায়েনা বি এস এফ এর হাতে পর পর নিরীহ বাঙালিদের হত্যা। আসলে এর কোনটির বিচার হয়নি। আমরা দেখেছি বাংলাদেশ ভারতকে যেভাবে ছাড় দিয়ে আসছে সেখানে সৌদি সুযোগ নিয়ে থাকতে পারে। এখানে তরা ভেবেছে এক কাজে দুই কাজ হলো । পুরো মুসলিম উম্মাহ দেখলো সৌদিতে শরীআহ আইন চালূ আছে। আর তথাকথিত শুশীলদের কথা বলার একটা সুযোগ দেয়া হলো। সেই ফাকে আরবের বাদশাহ আর তার পরিবারে লোকজন মিশরের বিচে কয়েকটা দিন পার করে আসার সুন্দর একটা সুযোগ ও পেয়ে যাবেন। আসলে আমাদের দেশের দুর্বল পররাষ্টনীতির প্রভাবে এই সব হতভাগ্য বাঙালির শিরোচ্ছেদ হয়েছে বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশের গত চার দশকের বৈদেশিক নীতি যদি বিশ্লেষণ করলে আমরা মোট তিনটি ধারা আমরা দেখতে পাই। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত একটি ধারা। দ্বিতীয় ধারার সূচনা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের আগস্টের পর, যা অব্যাহত থাকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। তৃতীয় ধারার সূচনা হয়েছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। বৈদেশিক সম্পর্কের বর্তমান ধারায় কিছু কিছু পরিবর্তন আমরা লক্ষ করি।
স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যাকে কোনো কোনো বিশ্লেষক ‘ভারতীয় মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও সেখানকার বৈদেশিক নীতি বিগত কয়েক বছরের মতো নড়বড়ে ছিল না। ভয়াবহ সেই ১৫ ই আগষ্ট ১৯৭৫ শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতেও পরিবর্তন আসে। সৌদি আরব ও চীন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এসব স্বীকৃতির ব্যাপারে নতুন সরকারের (খন্দকার মোশতাক) আগ্রহ দেখে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশ ‘ভারত-সোভিয়েত অক্ষ’ থেকে বের হয়ে আসছে। ১৯৭৫ সালের আগস্ট-পরবর্তী ঘটনার পর পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উঠতে সক্ষম হওয়ায় জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি জনমানুষের প্রিয় নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনি প্রথমে নিজেকে প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে উন্নীত করেন (২৯ নভেম্বর ১৯৭৬) ও পরে বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়া রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হন (২১ এপ্রিল ১৯৭৭)। একজন সামরিক শাসক হয়েও তিনি দেশের মাঝে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করে মানুষের অধিকার যেমন ফিরিয়ে দেন। তেমনি তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বৈদেশিক নীতিতে বিশেষত মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা নজির সৃষ্টি হয়। সেই সময়ে ইসলাম গ্রুপের জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কি যেন একট হুলিয়া জারি করে তার হাত কাটার কথা উঠলেও বরাবরের মতো দুর্দান্ত দক্ষতায় মেজর জেনারেল জিয়া দেশের সম্মান রক্ষা করতে সক্ষম হন। জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনি সমস্যা সমাধানে গঠিত আল কুদ্স কমিটি কিংবা ১৯৮১ সালে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী কমিটিরও অন্যতম সদস্য ছিল বাংলাদেশ। জিয়ার আমলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদের একটিতে নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণ সম্পর্কিত এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। জেনারেল জিয়া ভারতের ভূমিকার ব্যাপারে কঠোর হয়েছিলেন।

গঙ্গার পানি বণ্টনে ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী ভারত ১১ থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের পানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪ হাজার থেকে ৪৯ হাজার কিউসেক। কিন্তু মুজিবের মৃত্যুর পর ভারত গঙ্গা নদী থেকে একতরফাভাবে ৪০ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নেয়। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে ও একই বছরে ৪২-জাতি ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে ফারাক্কা প্রশ্ন উত্থাপন করে। পরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনে প্রশ্নটি উত্থাপনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু কয়েকটি বন্ধুরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত উত্থাপিত হয়নি এবং ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতার শর্তে বাংলাদেশ ফারাক্কা প্রশ্নটি জাতিসংঘে আর তোলেনি।

জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনেও (অক্টোবর ’৯৫) সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া ফারাক্কা প্রশ্নটি আবার উত্থাপন করেন। ১৯৭৭ সালে ভারতে জনতা সরকারের আমলে একটি চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ ৩৪ হাজার ৭০০ কিউসেক পানি পেয়েছিল। এই চুক্তির মেয়াদ ছিল পাঁচ বছরের। এরপর দীর্ঘদিন আর কোনো চুক্তি হয়নি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানির ভাগাভাগির প্রশ্নে নতুন আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে কাগজে-কলমে বাংলাদেশের পানির পরিমাণ বাড়লেও বাস্তব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরের পর অনেক কম পানি পাচ্ছে।

সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে জেনারেল জিয়ার অপছন্দ ছিল। তিনি যেভাবে ‘মস্কো টাইপ সমাজতন্ত্র’, ‘বিদেশতন্ত্র’ কিংবা ‘বাকশালতন্ত্রে’র কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাতে করে পরোক্ষভাবে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি তার অপছন্দের কথা তিনি বলতে চেয়েছিলন। অপরদিকে চীনে বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে তিনি চীনের সঙ্গে শুধু সম্পর্কই বৃদ্ধি করেননি; বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে চীনের উপস্থিতিকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছিলেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগান আগ্রাসনের (১৯৭৮) ব্যাপারেও বাংলাদেশ অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা নিয়েছিল।
জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি সাত্তার রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রথম সৌদি আরব সফরে গিয়েছিলেন। এটা ছিল জেনারেল জিয়ার বৈদেশিক নীতিরই ধারাবাহিকতা। এই সকল ঘটনা আর কিছু না সহজেই প্রমাণ করে শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামো দেশের বৈদেশিক নীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। কিন্তু এরশাদের আমল থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার যে ঘৃণ্য চর্চার ধারাবাহিকতা চালূ হয় তার পূর্ণতা আমাদের বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনিয়মতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর মাধ্যমে। আমরা দেখেছি দেশের স্বার্থের বদলে প্রকাশ করেছে একটি বৈদেশিক স্বার্থ রক্ষাকারী জি হুজুর মার্কা বৈদেশিক নীতি। আর অনেক চেষ্টা করলেও যোগ্য মানুষের নিয়োগ না করা আর অভিজ্ঞতার ঘাটতির হেতু বর্তমান সরকার সেই প্রভাব বলয় থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
বিশেষত ভারতের সাথে সম্পর্কে সাত খুন মাফ নীতি বৈদেশিক নীতিতে আমাদের পুরোপুরি খেলো করেছে। এই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যদি সৌদি সরকার এই কাজে কোন বাধা দিয়ে থাকে তবে এটা অনৈতিক ও নজিরবিহীন।

আমরা যারা ধর্মীয় বিধানের দোহাই দিচ্ছি তারা আমার বর্ণমালাতে করা অনেক পোস্টে দেয়া পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট ধারণা লাভ করেছন এই ধরণের শিরোচ্ছেদ কোন আমেরিকানের করা হয়নি। কোন জার্মান ব্রিটিশ বা ভারতীয় নাগরিকের করা হয়েছে বলেও তেমন প্রমাণ মেলেনি। তাহলে কি আরেরিকার ক্ষমতা বেশি বলে তাদের ক্ষেত্রে সাত খুন মাফ। ঠিক যেমনটি হয় ভারতের ক্ষেত্রে।

এই ধরণের ঘটনা ন্যাক্কারজনক এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এটি বর্বর, অমানবিক, বিধি বহির্ভূত ও নজির বিহীন।
আমরা দেশের আইনের উপর আস্থা রেখে তারা কোন অন্যায় করলে তাদের বিচার আমাদের দেশে প্রত্যাশা করি। এই ক্ষেত্রে তাদের মুণ্ডচ্ছেদ করে পুরো লাশটাই গায়েব করে দেয়ার স্বপক্ষে সাফাই গাওয়ার মতো ধৃষ্টতা বোধ করি কোন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্বে বিশ্বাসকারী মানুষের মানায় না। কেউ করে থাকলে এটা চরম ধৃষ্টতার বহিঃপ্রকাশমাত্র। দেশের স্বার্থে আর মানবিকতার খাতিরে বাস্তবতা বোঝাটা সবার নাগরিক দায়িত্ব । এখানে গোঁড়ামির আশ্রয় নিয়ে কোন কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীকে উষ্কে দেয়ার মানে হয়না।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
লেখক ও কলামিস্ট

aurnabmaas@gmail.com
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s