চৈত্রের খর রোদ্দুর তপ্ত বিকেল আর আকাঙ্খার নীপবন


রুক্ষ চৈত্রের খর রোদ্দুরে যেন মাথার ঘিলূ টগবগ করে ফুটে বেরিয়ে আসতে চায়। ধুলির ঝড় যেন আমাদের এখনই মহাকালের গোরস্তানে দাফন করে দেয়। সেইতো সেদিন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিতে এসেছিল শীত । আর আজ ঘরে বাইরে কোথাও শান্তি নেই। যদিও আমাদের আশে পাশে কোন ফূল থাকুক আর নাই থাকুক এখন বসন্ত চলছে।  আমাদের প্রকৃতিতে নামে বসন্ত কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ঠিক আমাদের দেশের মতো ।  নামে আমাদের দেশ ডিজিটাল । যেখানে সবচেয়ে জরুরী ডিজিট পানি বিদ্যুত,গ্যাস আর জনগণের নিরাপত্তা এই ডিজিটগুলো ভোজবাজির খেলায় কখন গায়েব কেউ খেয়াল করেনি। পথে উঠেছে যেখানে ধুলির ঝড় সেখানেই হয়তো সবাই খুজে ফিরে নতুন কোন স্বস্তির বারিশ ঝরার আকুতি। গাছের মরা ডাল যেখানে আজ খটখটে শুকনো আর প্রাণহীন নিস্পন্দ সেখানেই হয়তো একদিন আসবে সবুজের সমারোহ এই স্বপনে আজ বিভোর সবার মন । পুরোনো জীর্ণ পাতার পাশেই নবপল্লবের উন্মেষ। আর ঝরা পাতার মাঝে আমরা জীবনের সেই মহন্দ্রে ক্ষনের ছায়া পাই।
চুল দাড়িতে সবে পাক ধরেছে কারও যেন জীবন তার শেষ ব্যাটিং পাওয়ার প্লে নিতে বাধ্য করেছে কাউকে। আর সেই পাওয়ার প্লেতে হয়তো তার একান্ত জরুরী উইকেট তার সন্তানগুলোই তার থেকে দূরে বহুদূরে। জীবনের কাছে হার মেন মৃত্যুর প্রহর গুনে যায় অবিরত কোন এক বৃদ্ধশ্রমের বারান্দায় বসে। আর এই ক্লান্তিকর সময়ে ভেবে একটুকু জীবনের আস্বাদন যেন মেলানো যায় না শতকষ্ট করেও।

সারাবেলা আকাশজোড়া খর দাবদাহ যেন সবকিছু পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিতে চায়। দিন পার করে আসে বিকেল তাপ কমতে থাকে কিন্তু এ যেন নিঃশেষ হওয়ার নয়। এ যেন চিরকালের এক মহা পরিতাপ মহা এক জ্বলজ্বলে অগ্নিকুণ্ড । বেলা ডোবার পরও বেশ খানিকক্ষণ তাপ বিকিরিত হতে থাকে মাটি থেকে, আর আশেপাশের প্রকৃতি থেকে। এই প্রকৃতিতে হাটলে মনে হয় হেটে চলেছি কোন এক উনুনের উপর রাখা এক উত্তপ্ত রুটি সেঁকার তাওয়াতে । গরম কড়াই বা তাওয়াতে যেমন একফোটা পানি ফেললে তা গুলি পাকিয়ে ছ্যাঁত করে অদৃশ্য হয়ে যায় ঠিক তেমনি এক ঝলক হাওয়া যদিও বয় তার সুখাচ্ছানের কোন ফল মাণুষ পায় না। বরং গাছপালা ক্রান্তিকালের স্বাক্ষী হয়ে একের পর এক ঝরতে থাকে মৃত পাতার দল।

ক্লান্ত পথিকের পদভারে চূর্ণ হয়ে পথে পথে মর্মর ধ্বনি তুলে উড়ে উড়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে মহাকালের দিগন্তের পথে।ভাল আর খারাপ স্বস্তিকর বা অস্বস্তিকর যাই হোক আমাদের মেনে নিতে হবেই বিধাতার বেধে দেওয়া নিয়তির এই খেলা। বাসন্ত বিষুবে নিয়ত বহমান এই হাওয়াতে মিশে থাকে জীবনের কত না বলা গানের সুর, প্রাপ্তির আনন্দ, না পাওয়ার বেদনা আর হয়তবা কারও জীবনের প্রথম ভালবাসার সুরমূর্ছনায় মুখরিত ,সুলকল্লোলে বিমোহিত একান্ত ভাললাগা।আর বিপরীতের নিতান্ত বেরসিকের মতোই বয়ে আসে হারানোর বেদনা।ফাগুনের প্রথম দিনে জীবনের প্রথম প্রেমের মতো যে উন্মাতাল হাওয়ার মৃদু পরশ মনটাকে আনচান করিয়েছিল তা যেন আজ অমাবশ্যার চাঁদের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আজ আমাদের এই যান্ত্রিক জীবনে হয়তো মিলিয়ে গেছে কত আনন্দের আশ্বাদন আর প্রকৃতির সাথে একাত্বতার গল্প।
আজ আমরা মানুষ থেকে সত্যি যেন কোন এক ডিজিটাল রোবট হতে বসেছি ।
অজ পাড়া গাঁয়ে জন্ম অনেক ক্ষ্যাত বা গেয়ো বলে আমায় অপমান করতে পারে কিন্তু এই পরিচয় যে আমার একান্ত গৌরবের । কারন আমি যে মাটিকে আমার মা মনে করি। আর মাটি আর মা এ দুইই ছিল আমাদের একান্ত আপন। আজ পট পরিবর্তনে মাটির বদলে আমাদের পায়ের নিচে নিষ্ঠুর কংক্রিটের মেঝে । তেমনি সারাদিন পর সন্ধায় আমাদরে মা বাবা যখন আমাদের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকেন তখন আমরা কেবল তাদের আকাঙ্খাকেই দীর্ঘায়িত করে হাত বাড়িয়ে জাপটে ধরেছি কোন মেয়েবন্ধুর হাত ।

যাহোক গাঁয়ের কথা বলতে গিয়েছিলাম আবার বলি। জাবিতে যখন প্রথম বর্ষে ভর্তি হই তখন আমি সবচেয়ে বেশি টেনেছিল এর সবুজ প্রকৃতি। মনে হয় আমি যেন আমার বাড়িতেই ফিরে এলাম।এখানের প্রকৃতি আমাকে আমার গ্রামের মাটির আস্বাদ যেমন দেবে তেমনি মোবাইল তো আছেই মাকে কাছে পাব সারাক্ষন ঠিক যখন আবি চাইবো তখনই।কিন্তু প্রকৃতির চেয়েও বেরসিক আমাদের প্রশাসন কি ভাবনাকে লালন করে নিষ্ঠুর পিশাচের দানবীয় রূপ ধারণ করে একের পর এক কেটে ফেললো আমার প্রাণ প্রিয় গাছ গুলো। চোখে পানি আসে কিন্তু তা অনেক কষ্টে ধরে রাখি যদি এই সব হিংসুকের আগুনে আমার চোখের পানি পড়ে আর তা তাদের আগুনকে নিভিয়ে দেয় না জানি কি শাস্তিটাই পেতে হবে ।

আজ আমাদের গাছ নেই পাখি নেই , রুক্ষ প্রকৃতিতে সোনার বাংলার সেই জাতীয় সংগীত আপন তালে বেজে ওঠে, আমরা গাই, হাত ও তুলি লাল সবুজের পতাকাকে সম্মান জানাতে। ঠিক যেন মৃত বাবার শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর সবার উদ্দেশ্যে দেওয়া ঘোষণার মতো । আমরা ঠিকই গান গাই ‍‍‍‍‍‍ ”‌‌ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” কিন্তু এই ভালবাসাকে কাজে পরিণত করার মতো মানুষ মেলা ভার। আমি কবি নই, নই সাহিত্যিক, প্রকৃতির সহজ ভাললাগাটা কাব্য ভাষায় কিভাবে অলস দুপুরে কাগজের বুকে ফুটিয়ে তুলতে হয় আমি এতে পারদর্শি নই তবুও একান্ত ভাললাগা আর কিছু হারানোর বেদনাকে ফূটিয়ে তুলতে প্রয়াস নেই রুক্ষ ক্যানভাসে। এ যেন জীবনেরই এক বিমূর্ত ছাপ।

বলছিলাম বসন্তের কথা । এইতো সেদিন বাতাসে মিশে আছে শীতের মিঠে রোদ, বুনো ফুলের সৌরভে চারদিক সুবাসিত আর গাছে গাচে পাখির কলকাকলি , আধা শুকনো নদীতে কিছুটা প্রাণের ছাপ। আজ তার কিচ্ছুটি নেই কেবল দেখি ধুলিঝড় আর চৈত্রের দাবদাহ।
আজকের শহুরে যান্ত্রিকতায় হারিয়ে গেছে সেই ধানের ক্ষেত, পুকুর কিংবা পথের বাঁকের সেই ভূত পেত্নীর গল্পের আধার বাঁশঝাড়টি। মনে পড়ে সেই ছেলেবেলার দিনগুলো এমন দিনে বাঁশঝাড়ের তলা ছেয়ে থাকা পাতার সাগর পাড়ি দিতাম দাদুর হাত ধরে আর ভাবতাম এই বুঝি কোন ভূত পেত্নী ঘাড় মটকে দিল আমার । আর তার আশপাশজুড়ে ছিল দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ, বুনো উচ্ছ্বাসে বেড়ে ওঠা লতাগুল্মের সমারোহ। আর তার পাশাপাশি শিমুল, পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার ডালে প্রকৃতির এক ছান্দিক অবতারণা যা নিতান্ত অবুঝকেউ প্রকৃতির প্রতি মায়া কি তা বুঝাতে সক্ষম ছিল। গাছের শাখায় ফুলের মাঝে মাঝে শালিক-চড়ুই, সাত ভাই চম্পা কিংবা নাম জানা নানা পাখির বিরামহীন কিচিরমিচির। আমার প্রিয় লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর একটি লেখা হতে প্রথম আলোর সাংবাদিক আশীষ ভাই সুন্দর একটা বিবরণ দিয়েছেন,

‘পাড়া পার হয়ে একটা বাঁশ-বাগান পড়ল। তার মধ্যে দিয়ে রাস্তা। মচ মচ করে শুকনো বাঁশ পাতার রাশ ও বাঁশের খোলা জুতোর নীচে ভেঙে যেতে লাগল। পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় বুনো গাছপালার-লতা-ঝোপের ঘন সমাবেশ, কি বিরাট প্রাচুর্য্য! সমস্ত ঝোপটার মাথা জুড়ে সাদা সাদা তুলোর মতো রাধালতার ফুল ফুটে রয়েছে। সমস্ত ঝোপটির কি সম্মিলিত সুগন্ধ, কি স্নিগ্ধ স্পর্শ!…সরু পথ বেয়ে আবার গ্রামের পিছনের মাঠে এসে পড়লুম (দিবাবসন)।’

ঝরা পাতা, ও ঝরা পাতা এই শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরের কোনো গ্রামে, তোমাকে কুড়িয়ে নিচ্ছে মলিন মুখ, তেল না দেওয়া রুক্ষ চুলের কিশোরী। বস্তায় ভরে নিয়ে যাবে বাড়িতে। তার মা বাঁশের চোঙ ফুঁকে ফুঁকে ধোঁয়ায় লালচে হয়ে ওঠা চোখে মুঠি মুঠি করে সেই পাতা ঠেলে দেবেন মেটে চুলোর মুখে। রান্না হবে ক্ষুধার অন্ন। তাদের নিত্য অনটনের সংসারে তুমি নিখরচার জ্বালানি শক্তি। শহুরে মানুষের কাছে তোমার কানাকড়িও মূল্য নেই। আবর্জনা জঞ্জাল মনে করে তারা তোমাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করলে বাঁচে। তোমার এই মূল্য বুঝবে কেবল সেই পাতাকুড়োনি মেয়েটি, বুঝবেন তার মা। যত্ন করে তিনি বস্তায় ভরে রেখে দেবেন মাচানের ওপর, আসন্ন বর্ষার সামান্য সম্বল হিসেবে।

পাতাকুড়োনো মেয়েটিকে হয়তো কিছুটা বুঝেছিলেন কবি আবুল হাসান। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, পরম মমতায় পাতাকুড়োনির মেয়ে তুমি কি কুড়োচ্ছ? সেই ঝরা পাতা। রবীন্দ্রনাথও যাঁর পক্ষে থাকতে চেয়েছিলেন, ‘ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে।/ অনেক হাসি অনেক অশ্রুজলে…’। ঝরা পাতা দুঃখের মতো। বেদনার মতো। স্মৃতি ছাড়া আর কি কোনো সম্বল থাকে তার? হয়তো তাও থাকে না। শুকনো পাতা তো মৃত। মৃতের কোনো স্মৃতি থাকে কি না, সে কথা কেউ জানে না নিশ্চিত করে। ওপরে শাখায় সবুজ সজীবতা, নিচে তরুতলে শুকনো পাতার মর্মর। চৈত্রের নিসর্গে উদ্ভাসিত হয়ে আছে জীবন-মৃত্যুর নিত্য লীলাময় প্রপঞ্চের ধ্রুব সত্য।

আসলে কালের পরিক্রমায় অতিকায় হস্তি সদৃশ প্রকৃতি ধীরে তার সমস্ত লীলা সাঙ্গ করে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে বহুদূরে। আর আমার তেলাপোকা বা আরশোলার মতো ঠিকই টিকে আছি। আমাদের কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নাই। আমার মাটিকে ছেড়ে যেমন কংক্রিটকে আকড়ে ধরেছি তেমনি মানবতা বিসর্জন দিয়ে হয়েছি পাশবিক আর অমানবীয় গুনাবলীর অধিকারী। এ নিছক হতাশা আর বিরক্তির এক করুণ অভিব্যাক্তি ফু্টে ওঠে আমাদের চাল চলন আর আচরণে। আমরা একটু চেষ্টা করি না কেন নিজেকে আমাদের চারপাশটাকে একটু বদলাতে। আমার মনে হয় এটা সম্ভব। আর প্রকৃতির এই নির্মমতা এই রুক্ষতা থেকে আমরা শিক্ষা নেই জীবনের কঠিন মূহুর্তগুলো কিভাবে পার করে একদিন ফিরে আসবে বসন্ত দিন, পরম আনন্দের সুবাতাসে বিমোহিত সেই সুরলহরী। আমরা সবকিছু হারানোর পরেও বসে আছি আর অপেক্ষা করি সেই সুদিনের । আমরা বিশ্বাস করি আমরা যদি দৃঢ় বিশ্বাস কে বুকে ধরি আর কাজ করি তবে আমাদের বসন্ত আসা কষ্টদায়ক হলেও অসম্ভব নয়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s