ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের ঋণ ও স্বাধীনতার চারদশকের প্রাপ্তি


আজ আমরা “বাঙলাদেশী” কারণ আমরা স্বাধীন, আমাদের আছে এক চিলতে স্বাধীন ভূখণ্ড যার নাম বাংলাদেশ। আছে লাল সবুজের স্বাধীন পতাকা যাকে নিয়ে আমাদের গর্ব।কিন্তু আমরা নিজেরাই জানিনা কেন বা কিসের জন্য আমাদের এই গর্ব। আজ চল্লিশ বছরে পা দিয়েও আমার কি অর্জন করেছি তা কি একবারের তরেও ভেবে দেখার অবকাশ পান আমাদের রাজনীতিবিদগণ? আসলে আমাদের দেশে চলছে ক্ষমতা বদলের একটা মিউজিক্যাল চেয়ারের গেম শো। যাতে সেই কুশীলব যার হাতে থাকবে ক্ষমতার ঝাণ্ডা। আর সে ইচ্ছাখুশি ডাণ্ডাপেটা করার বৈধতা পাবে বাকিদের। আসলে আমি বলতে চাচ্ছি আজ স্বাধীনতার চারটি দশক পার করার পরেও কি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সত্যিকার অবস্থান পরিস্কার করতে পেরেছে??

পেরেছে কি তাদের নিজেদের একটি শক্ত আদর্শিক কাঠামোতে দাঁড় করাতে। সহজ উত্তর আমি দেব না। বাঙলার ত্রিশ লক্ষ শহীদ তাদের তাজা রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানি তস্করদের হাত থেকে আমাদের বিজয় ছিনিয়ে পরিচিতি দিয়েছিলেন স্বাধীন দেশ হিসেবে। তাঁরা যে ভূখণ্ডের জন্য এই ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তার কি কোন মূল্য দিয়েছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। তার ঘুরে ফিরে একটা রজ্জু আবদ্ধ চতুষ্পদের মতোই কেবলই ঘুরপাক খেয়েছে এবং আজও খাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট দলীয় ফ্রেমওয়ার্ক বা গণ্ডির মধ্যে। আমরা স্বৈরাচারীদের কথা বাদ দেই। যারা নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবি করে স্বৈরাচারকে অবাধে খেউড় খিস্তি ঝাড়তে অভ্যস্ত তারা তো জণগণ কর্তৃক নির্বাচিত সরকার।

তারপরেও তার জনগনের চাওয়া পাওয়াকে কতটা মূল্যায়ন করেছেন এটা ভাবার দরকার নেই দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট। আজ বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গন হয়ে উঠেছে শুধু সাধু বয়ান আর প্রতিশ্রুতি কেন্দ্রিক। যেখানে কিনা প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয় মূলত পালন না করার মানসে। আর আমাদের গণতন্ত্র হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে মুখের ভাষণ আর শ্লোগানে ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি অনন্য টনিক হিসেবে। যার একমাত্র খদ্দের অসহায় জনগণ। এরা এমনই এক প্রাণি যাদের গলায় শক্ত রজ্জু আটকানো। এদের পশ্চাতে চাবকান বা ঝুড়ি ভর্তি ঘাস দিয়ে গলকম্বল নেড়ে আদর করেন এদের মুখে আর কোনদিন রা আসবে না।দেশের আপামর জনতা এক একটি সরকারের আমলের ঠিক শেষদিকে এসে এমন একটি পরিস্থিতিকে সামনে পায় তখন একটি নির্বাচন হয়ে দাড়ায় অনেক কিছু।

আর তাদের সামনে রেখে একটি দল গেমপ্লান রেডি করে আর ঠিক ঠিক অন্যদলকে টপকে দিয়ে ক্ষমতায় চলে আসে একটি ঝুড়ি ভর্তি প্রতিশ্রুতি মাথায় নিয়ে।এ যেন অনেকটা ক্রিকেট খেলার মতো। আজ আওয়ামী লীগ ব্যাটিং করছে ফিল্ডিং করে বি,এন,পি আর ইনিংস শেষ হলে তার আবার ব্যাটিং এ নামেন তারা। আর জনগণ তার শুধু হা করে বসে থাকে একটি চার বা ছক্কা দেখার আশায়। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতির ক্রিকেট এমনি ভয়ানক যে এটাতে হতভাগা দর্শক চার ছক্কা দূরে থাক একটা সিঙ্গেল রান নেওয়াও দেখতে পাননা।
যাহোক অনেকক্ষন তটস্থ থাকার পর দেশবাসী সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলোর রেখা হিসেবে দেখতে পায় আওয়ামীলীগের দিন বদলের শ্লোগানকে, হয়তো নতুনত্ব লাভের আশাতেই মানুষ আওয়ামী লীগকে বিপুল ব্যবধানে জয়ী করে। এই হতভাগ্য জনগণ আবারো প্রতারণার শিকার হলো তার হয়তো এই ভেবে ভোট দিয়েছিল জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে আসা আওয়ামী লীগ হয়তো জনগণের আস্থার মূল্য দেবে কিন্তু বিধি বাম। আমরা এই সরকারের দিনবদলের শুভ সূচনা কিভাবে ঘটল তা এই বছরের প্রথম দিকের পনেরটি দিনের দৈনিক পত্রিকার শিরোনামগুলো একটু দেখার চেষ্টা করি।

১ জানুয়ারি, রাজশাহীতে তিন দোকানে সন্ত্রাসী হামলা : লুটপাট,
২ জানুয়ারি, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন-বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সমর্থন জোগাচ্ছে সরকার, রমনা থানা জামে মসজিদের ইমামকে অপহরণের পর হত্যা, সাভারে ডাকাতদলের ছুরিকাঘাতে নিহত ১, আহত ৪, মিরপুরে জাতীয় অন্ধ সংস্থার মহাসচিব খুন,
৩ জানুয়ারি, রাজধানীতে দুই খুন-চার অস্বাভাবিক মৃত্যু,
৪ জানুয়ারি, ফরিদপুরে শ্লীলতাহানির অপমানে স্কুলছাত্রীর আÍহত্যা, এমপি মনির বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজির অভিযোগ : প্রকৌশলী লাঞ্ছিত,
৫ জানুয়ারি, কবরীর গাড়িবহরে শ্রমিক লীগ নেতার সমর্থকদের হামলা,
৬ জানুয়ারি, অব্যাহত দরপতনে উত্তাল শেয়ারবাজার : আগুন,
৭ জানুয়ারি, বখাটেদের অত্যাচারে-রংপুরে মেধাবী ছাত্রীর আত্নহনন,
৮ জানুয়ারি, পটিয়ায় মসজিদের কর্তৃত্ব নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ : আগুন, সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগের দু’গ্র“পের সংঘর্ষে আহত ৩০, মুন্সীগঞ্জে চোখ তুলে ও শ্বাসরোধ করে ছয় বছরের শিশু হত্যা,
৯ জানুয়ারি, গেণ্ডারিয়ায় হাত-পা বেঁধে শিশুকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা-ব্যবসায়ী বাবাকে জবাই করে হত্যার চেষ্টা, কামরাঙ্গীর চরে ব্যবসায়ী খুন-প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, নাটোরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা,
১০ জানুয়ারি, রাজধানীতে এমপি দীপ্তির বাসাসহ এক রাতে তিন বাসগৃহে ডাকাতি, রাজধানীতে মা-ছেলেসহ এক দিনে ২ জোড়া খুন, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দুঃসাহসিক চুরি, মিরপুরে গণপিটুনিতে সন্ত্রাসী নিহত,
১১ জানুয়ারি, কোম্পানিগঞ্জে বড় ভাইকে কুপিয়ে হত্যা : ঘাতক বোন গ্রেফতার,
১২ জানুয়ারি, পল্লবীতে ‘ক্রসফায়ারে’ কলেজছাত্র নিহত,
১৩ জানুয়ারি, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন, মালিবাগে আ’লীগ নেতার বাড়িতে ডাকাতি-৭০ লাখ টাকার মালামাল লুট, মতিঝিলে র্যাব-সন্ত্রাসী বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতা বিপ্লব নিহত,
১৪ জানুয়ারি, বেগুনবাড়ীতে বাবা ও ভাইয়ের পিটুনিতে যুবকের মৃত্যু, সোনারগাঁওয়ে পুলিশের সঙ্গে ডাকাতদের বন্দুকযুদ্ধ : ওসিসহ আহত ২৫, পুরান ঢাকায় ক্রসফায়ারে ডাকাত শহীদের সহযোগী অপু নিহত,
১৫ জানুয়ারি, রাজধানীতে দিনেদুপুরে আওয়ামী লীগ নেতা খুন।

এগুলো একটি ছোট পরিসংখ্যানগত তথ্য দেওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র। ধারাবাহিকভাবে পত্রিকা পাতা ঘেটে বের করলে আরও কত বেড়ালে বেরিয়ে আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

আমি ডিজিটাল বাংলাদেশের কথায় আসতে চাই। আসলে ডিজিটাল কথা বলতে জনগণের প্রত্যাশা ছিল তারা একটু দুবেলা দুমুঠো খেয়ে পরে বাঁচবে সাথে পাবে বর্তমান বিজ্ঞান প্রযুক্তির সকল সুবিধা। কিন্তু আজ ভাবা হচ্ছে ডিজিটাল দেশের সব মানুষ রোবট। এদের কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নাই। এদের হয়তো খাওয়া বা ঘুমানোর ও প্রয়োজন নেই। তাইতো দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি, বিদ্যুত, তেল , গ্যাস, পানি প্রভৃতিও দিনের পর দিন অমাবস্যার চাঁদ হয়ে যাচ্ছে।

আমরা সবাই চাই আমাদের দেশ বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে উন্নতি করুক। একুশ শতকের চ্যালেঞ্চ কে সামনে রেখে দীপ্ত পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে যাক। কিন্তু তার মানে এই নয় অনাহারক্লিষ্ট মানুষের হতাশ মুখচ্ছবি কিংবা সব কিছু হারনোর বেদনাতে নীল হওয়া কোন জীবনের ভারে ক্লান্ত মাণুষের করুণ অভিব্যক্তি।

ত্রিশ লক্ষ শহীদ তাদের প্রান দিয়েছেন এই দেশকে নিয়ে ছেলেখেলা করার জন্য নয়। এদেশের গৌরবকে সমুজ্জল করতে। এই দেশের মানুষের মনে একটু প্রশান্তি এনে দিতে।

কিন্তু এসব বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে আমাদের দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল জনগনের নাম ভাঙ্গিয়েই চলতে চায়। আমরা অবাক চেয়ে দেখেছি এক এগারোর আগে যখন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলে ছিলেন তার বর্তমানের বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন তারা জনগণকে সাথে নিয়ে দাবি আদায় করবেন। কিন্তু কারা এই হতভাগা জনণগ। কি এদের ভবিষ্যত, তা কি কেউ একবারের তরেও ভেবে দেখেছেন। তাই দেশের সংবিধান যখন বলে গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার তখন আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক ক্ষমতা এই জনগণকেই পরিণত করেছে পুতুল নাচের বিগ্রহে বা ঘুড়ি হিসাবে যার সুতো আছে আমাদের দুটি দলের হাতে।

তারা যেভাবে সুতা টান দেবে হতভাগা জনগণ চলবে ঠিক সেভাবেই। কিছুই তাদের করার নেই। তাদের বক্তৃতার মঞ্চে সহজ ব্যবহার উপযোগী গণতন্ত্র শব্দটি জনগণের আস্থা হারিয়েছে অনেক আগেই এক কথায় তা লাঞ্ছিত করেছে জনগণের বিবেককে, বিদ্যমান বাস্তবতাকে। প্রকৃত অর্থে গনতন্ত্র শব্দটি আজ স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদদের ব্যবহারের একটি অস্ত্র। সুস্থ চিন্তার প্রগতিশীল মানুষ মাত্রই বিগত নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির বিপরীতে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পেছনে আওয়ামী লীগের অর্জনের তুলনায় বি এন পি জোট সরকারের অন্যায়ের প্রতি আঙুল তুলবেন আগে।

আসলে এই ক্ষমতার মিউজিক্যার চেয়ারের আবাসন পাচটি বছরের মাত্র। এখানে একের পর এক আবর্তে পরিবর্তন ঘটে দুটি প্রধান দলে রাজনীতিবিদদের পকেট ভরানোর সুযোগের আর নাম পরিবর্তনের কিছু ব্যপক মহড়ার সুয়োগ করার মাধ্যমে । কিন্তু কাজে পরিণত হয় কতটুকু তা সাধারণ দৃষ্টিতেই বিচার্য বলে আজ কারও অজানা নয়।

আজ একুশ শতক ডাক দিচ্ছে আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শোধরানোর সময় এসেছে। এখন তাদের উচিত নিজেদের নেতা নেতৃদের মন ভরানোর তুলনায় দেশের আপামর জনতার মন ভরাতে চেস্টা করা। কারণ এ্ররাই ভোট দেয় বলে আপনার আসেন। কু-সন্তান কে বাবা মা যেভাবে যে দৃষ্টিতে দেখেন দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতি জনতার দৃষ্টি যদি তেমনি হয়ে পড়ে তখন আপনার কেউই নিস্তার পাবেন না। তার উদাহরণ আমরা দেখেছি এক এগারো পরবর্তি সময়ে তিন উদ্দীদের স্বৈর শাসনে জাতি কতটা নাকাল হয়েছিল তখন।

আসুন এটা স্বাধীনতার মাস। আমাদের গৌরবোজ্জল অর্জনকে স্মরণ করার মাস।আমরা আর কিছু না হোক অন্তত লাখো শহীদের আত্নত্যাগের কথা স্মরণ করে হলেও নিজেদের পাল্টাই বা পাল্টাতে চেষ্টা করি। কারণ আজ স্বাধীনতার চারটি দশক পার হলেও জনগণ যে আশায় যুদ্ধ করে আমাদের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল তা কতটুকু মিলেছে বলা বেশ কঠিন। আর ত্রিশ লক্ষ শহীদ তাধের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে আমাদের যেভাবে ঋণী করেছেন তার কতটুকু আমরা শোধ করতে পারলাম । এটাও ভেবে দেখতে হবে। আমরা সবাই বক্তৃতারর মঞ্চে কথার ডামাডোল পিটানো নয় কিংবা প্রতিপক্ষকে খিস্তি খেউড় নয় কথার বদলে কাজে বিশ্বাসী হই । সবাই মিলে চেস্টা করি সোনার বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রার পথে একজন স্বপ্নসারথি হতে। তবেই হয়তো পথ পাওয়া যাবে একাত্তরের বীর শহীদদের রক্তের ঋণ শোধরানোর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s