মহাস্থানগড়ের প্রত্ননিদর্শনের নির্বিচার ধ্বংসসাধন


হাইকোর্টের জারিকৃত বিধি অমান্য করে কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, কুচক্রী সরকারি আমলা ও প্রভাবশালী মহলের নির্লজ্জ ভূমিকায় ইতিহাস, ঐতিহ্য আর পর্যটনে সমান গুরুত্ববহ প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার নিদর্শন মহাস্থানগড় আজ ধ্বংসের পথে। এই নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন মানুষ বৈ কি, সমগ্র জাতিকে আজ করেছে বিস্মিত হতবাক। কিংবদন্তিকে আশ্রয় করা বলখি মাহি সওয়ারের মাজারকে কেন্দ্র করে যে নব্য লালসালু আখ্যান রচিত হয়েছে, তার মঞ্চায়নই আমাদের প্রাচীন সভ্যতার এই বিরল নিদর্শনের ধ্বংসযজ্ঞে বৈধতা দিচ্ছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিবর্গ আর সরকারি কতিপয় আমলার ভূমিকা।

আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে ফ্রান্স-বাংলাদেশ যৌথ খনন প্রতিবেদনের রেডিও কার্বন তারিখকে সূত্র ধরে এর সময়কাল জানতে পারি খ্রিস্টপূর্ব তিন থেকে চার শতক। অর্থাত্ বহুল পরিচিত ভ্রমণ কেন্দ্র ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ার মহাস্থানগড়কে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা বলাটা অযৌক্তিক হবে না। চারদিকে প্রাচীরবেষ্টিত এই সুপ্রাচীন আদি ঐতিহাসিক সময়কালের বিখ্যাত দুর্গনগরীটি বিকশিত হয়েছিল বগুড়া শহর থেকে উত্তরে প্রায় তেরো কিলোমিটার দূরে নদীমাতৃক বাংলা ভূখণ্ডের অন্যান্য সভ্যতার মতো করতোয়া নদীর কূল ধরে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে এর রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী দেয় মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোকের শিলালিপি। প্রাচীন ব্রাহ্মী হরফে উত্কীর্ণ এই লিপিতে পুডনগল বা পুণ্ড্রনগর তথা এই মহাস্থানগড়ের তত্কালীন শাসক দুমদিনকে দুর্ভিক্ষপীড়িত জনগণকে সাহায্য করার কথা বলা হয়, যা মৌর্য শাসনামলে মহাস্থানগড়ের গৌরবকে তুলে ধরতে যথেষ্ট হয়েছে।

ইতিহাসের পাতা থেকে এই উক্তিগুলো তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করলাম তাদের জন্য যারা একেবারে নবীন অর্থাত্ বিজ্ঞানের বা বাণিজ্যের ছাত্রছাত্রী বা সাধারণ মানুষ। তারা কিছুটা হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির মূল অবস্থা বোঝার পথ পাবেন। মৌর্য আমল থেকে শুরু করে এর ধারাবাহিক গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে ধারণ করেছিল গুপ্ত ও পাল রাজাদের আমলের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে, যা আজ নেই কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই সময়ের নির্বাক জড় পদার্থগুলো ইটের দেয়াল, দুর্গের নিদর্শন আর মূর্তি হয়ে। বিস্তৃত পরিসরে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, অনুসন্ধান ও কয়েক দফা উত্খননের ফলে মহাস্থানগড়ে উন্মোচিত প্রত্ননিদর্শনগুলোর মধ্যে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে পারি ভাসু বিহার, ভীমের জাঙ্গাল, বৈরাগীর ভিটা, গোবিন্দ ভিটা, কালিদহ সাগর, জিয়ত কুণ্ড, গোকুল মেধ বা কিংবদন্তির বেহুলা-লখীন্দরের বাসর ঘর, খোদার পাথর ভিটা, মানখালীর কুণ্ড, বন্দুকধারা, হাতিবান্ধা, ধোপাপক্রা বা ধোপার পুকুর, হাতিডোবা পুকুর, মনিরঘোন, শিলাদেবীর ঘাট, মথুরা চিঙ্গাসপুর, কাঞ্জিরহাট, ছেলীরধাপ, গোদার ধাপ, কানাইধাপ প্রভৃতি।

এটির প্রাচীর ও পরিখাবেষ্টিত দুর্গ নগরীর চারদিকে অনেক বিক্ষিপ্ত মানববসতির চিহ্নও ছিল। যেগুলো ইতিহাস-ঐতিহ্যের গৌরবকে তুলে ধরার পাশাপাশি মহাস্থানগড়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এছাড়া মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হিসেবেও মহাস্থানের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। কিংবদন্তি অনুযায়ী প্রখ্যাত কামেল হজরত শাহ সুলতান বলখী মাহী আছোয়ার বা মাহীসওয়ার (রহ.) এই স্থানের রাজা পরশুরামের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হন; যার ফলে পরবর্তীকালে মহাস্থানগড় পরিচিতি পায় মুসলমানদের বসতি এলাকা হিসেবে আর তা একে হাজার হাজার মুসলিম জনতার কাছে পবিত্র স্থানের মর্যাদা দিতে যথেষ্ট হয়। এরপর থেকেই মহাস্থানে সমাগম হতে থাকে হাজার হাজার মানুষের, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন অনেকটা তীর্থযাত্রীদের মতো। আর বলখী মাহীসওয়ারের মাজারকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা অনেকটা জমি তৈরি করে দেয় এই নব্য লালসালু নাটকের বৈধ মঞ্চায়নের।

নাটকটির কুশীলবরা ক্ষমতার যাচ্ছেতাই অপব্যবহার ও প্রচলিত আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের ঐতিহ্য বিনষ্ট করে হুমকির সামনে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের সোনালি অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নকে। মহাস্থানগড়ের সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেশ-বিদেশের পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়েছে। এটি ইতিহাস-ঐহিহ্যের লীলাভূমি হওয়ার পাশাপাশি আত্মপ্রকাশ করেছে অনেকটা বিনোদন পার্কের মতো দর্শনীয় স্থান হিসেবে। এর পাশাপাশি মহাস্থানগড় মাজার এলাকাতে প্রতি বছর বৈশাখ মাসে বিশাল মেলা বসে, যা দর্শক আকর্ষণের অন্যতম কারণ। হারিয়ে যাওয়া অতীত ইতিহাসের সেই সোনালি যুগের স্থাপত্যকে দু’চোখ ভরে দেখতে, একটু কাছে থেকে একান্ত নিজের করে অনুভব করতে, নিজের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করতে, চাই কি একটু নির্মল বিনোদন নিতে প্রতিদিন হাজারো শিশু, নারী ও পুরুষের সমাগম ঘটে মহাস্থানগড়ে।

প্রধানত ছুটির দিনগুলোতে ও হিন্দু-মুসলিম ধর্মানুষ্ঠানের সময় এই স্থানে আপামর জনতার উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। মহাস্থানগড়ের অতীত ঐতিহ্য ও পর্যটন ক্ষেত্রে এর গুরুত্বকে উপলব্ধি করে ১৯৬৭ সালের দিকে এখানে প্রত্নস্থানভিত্তিক জাদুঘর নির্মাণ করা হয়, যেটি বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর এখানে প্রদর্শিত হতে থাকে উত্খনন ও উপরিপৃষ্ঠ সংগ্রহে প্রাপ্ত অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষী নানা বস্তুগত নিদর্শন। পাশাপাশি নিকটস্থ নানা স্থান থেকে সংগ্রহকৃত প্রত্ননিদর্শনও এখানে স্থান পায়। যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন পাথর নির্মিত ও ধাতব মূর্তি, ধাতব পাত্র, মৃত্ পাত্র, পোড়ামাটির নিদর্শন, মুদ্রা, শিলালিপি, অস্ত্রশস্ত্রসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য নানা সামগ্রী। আর পর্যটকদের কথা বিবেচনা করে এখানে নির্মিত হয়েছে অত্যাধুনিক ইমারত। মহাস্থান জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা কাস্টডিয়ানের অনুমতি সাপেক্ষে এখানে পর্যটকরা থাকার সুবিধা লাভ করেন।

মহাস্থান জাদুঘরের খতিয়ান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকেই এটির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার তথ্য মেলে। যার সাক্ষী মহাস্থান সংলগ্ন জাদুঘরের রেকর্ড বইতে সংরক্ষিত ক্রমবর্ধমান দর্শকের সংখ্যা। ১৯৯৫-৯৬ সালের দিক থেকে এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯৮-৯৯ সালে এখানে দর্শনার্থী ছিল দুই লাখের মতো। আর ২০০০-০১ সালের দিকে তা প্রায় সাড়ে তিন লাখে গিয়ে দাঁড়ায়। ২০০২-০৪ সালের দিকে এটি বেড়ে হয় প্রায় আট লাখের মতো, আর তা ২০০৪-০৬ সালে এসে দশ লাখ ছাড়িয়ে যায় এবং আজ অবধি বেড়েই চলেছে। বাকি সবকিছু বাদ দিলে কেবল টিকিট বিক্রি থেকেই বার্ষিক আয় পাঁচ কোটি টাকার ওপর।। পুরাবস্তুতেই আমরা প্রত্নতাত্ত্বিকেরা খুঁজে ফিরি অতীতের প্রতিবিম্ব। এই মূক-বধির ইটগুলো, এই পাথরের নির্বাক মূর্তিগুলোই আমাদের সোনালি অতীতের একমাত্র তথ্যপ্রমাণ যা আজ ধ্বংসের পথে।
মহাস্থানগড়ের অতি সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞটি শুরু করা হয় গত বছরের ২৭ নভেম্বর, যার বিরুদ্ধে দেশের ঐতিহ্য সচেতন ব্যক্তিবর্গ তত্ক্ষণাত্ তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করলেও তা সাড়ম্বরে চলতে থাকে। মহাস্থানের প্রত্নস্থানভিত্তিক জাদুঘরের কাস্টডিয়ান নাহিদ সুলতানা স্থানীয় সুধীজন ও সাংবাদিকদের সহায়তায় এর বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নেন এবং প্রতিরোধের চেষ্টা করেও প্রভাবশালী মহলের কারণে বার বার ব্যর্থ হন। একটি কথা প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, অতীত নিদর্শনে ভরপুর মহাস্থানগড়ের যে কোনো স্থানে একটু খনন করলেই সেখানে মূল্যবান প্রত্নসামগ্রীর দেখা মেলে। আর তাতেই উত্সাহিত হয়ে এখানকার অতীত নিদর্শনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানো কোনো নতুন ঘটনা নয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের মাঝামাঝি স্থানীয় শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতায় একটি রাস্তা নির্মাণে বড় টেঙরা ধাপের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করা হয়।

২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর এই মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদে হিউম্যান রাইটস ফর পিস ইন বাংলাদেশ এই ধ্বংসযজ্ঞের দ্বারা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দাখিল করে। বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয় ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণে এর অন্তর্ভুক্ত অংশে পুরাকীর্তির ক্ষতিসাধন করে যে কোনো স্থাপত্য নির্মাণ আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এই নির্মাণের নামে ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে দ্রুত রুল জারি করেন। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা, বিভাগীয় কমিশনার আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মদতে হাইকোর্টের রুল ভঙ্গ করে এই এলাকাতে অবৈধভাবে খনন পরিচালনা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি মহাস্থানগড় সংযুক্ত একটি ঢিবি নিতাই ধোপানীর পাটের মাটি সরিয়ে সেখান দিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্দেশ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক অপর একটি কর্মসৃজন প্রকল্প হাতে নেয়া হলে তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা দ্রুত এর প্রতিবাদ জানান।

হাইকোর্টের ওই একই বেঞ্চ দশ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তাদের অধিকাংশই সরকারি আমলা, পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাদের ধারণাও সুস্পষ্ট নয়। পাশাপাশি এলাকার প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদতে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর এড়াতে এখন রাতের আঁধারে খনন কাজ চলছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে শ্রমিক লাগিয়ে মাজার উন্নয়ন কমিটির পক্ষে মহাস্থানগড়ের মূল মাজার এলাকায় উঁচু স্থানের ওপর প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ পুণ্ড্র গেট বা ‘পুণ্ড্র নগরীর প্রবেশদ্বার’ এলাকায় ব্যাপক খোঁড়াখুঁড়ির মাধ্যমে এই স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা হয়।

খননের সময় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমৃদ্ধ মহাস্থানগড়ের মাটির নিচ থেকে প্রচুর প্রত্ননিদর্শন বের হয়ে এলে সেগুলো গুম করতে নিকটবর্তী একটি স্থানে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়, যেগুলো গত বুধবার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেন। প্রত্যক্ষদর্শী, এলাকবাসী ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, রাত ১২টার পর লোকচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে শ্রমিক লাগিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। তারা সবাই গভীর রাতে শ্রমিকদের কাজ করার প্রমাণ হিসেবে সকালে পুণ্ড্র গেট সংলগ্ন স্থানে বালি বিছানো দেখতে পান। পরে আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে জানা গেছে, সেখানে রাতে শ্রমিকরা খনন কাজ করেছে।

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই স্থানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান নাহিদ সুলতানার অভিমত—‘অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যারা খনন কাজ করেছে তারা প্রথমে চিন্তাই করেনি সেখানে প্রাচীন নিদর্শনাবলি থাকতে পারে। পরে নিদর্শনগুলো বের হয়ে এলে সেগুলো গুম করতে রাতেই সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। প্রচেষ্টা হিসেবে আগেই খুঁড়ে রাখা একটি গর্তের মধ্যে নিদর্শনগুলো ফেলে মাটিচাপা দেয় তারা। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত বুধবার সকালে আলগা নতুন মাটি দেখে সন্দেহ হলে মাটি সরাতে শুরু করেন। তারা মাটি সরিয়ে ব্ল্যাক স্টোন, প্রাচীন স্থাপত্যের অংশ হিসেবে ইট, অমূল্য কিছু টেরাকোটা নিদর্শন ও মূর্তির ভগ্নাংশ উদ্ধার করতে সক্ষম হন।

এ ঘটনার পর থেকে অপকর্মের নায়কসহ প্রায় সব কুশীলব এবং মহাস্থান মাজার উন্নয়ন কমিটির নেতারা গা-ঢাকা দিয়েছেন। পাশাপাশি এই ঘটনাটি প্রকাশ না করার জন্য তাদের মাঠকর্মীদেরও বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, বারবার খননের জন্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঠিক করা স্থানটির নিচেই লুকিয়ে থাকতে পারে ইতিহাস-ঐতিহ্যের পুণ্ড্র নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভবন। কারণ মূল মাজার ও মসজিদ সংলগ্ন টিলার মতো উঁচু জমিটি মূল পুণ্ড্র নগরীর অংশ, যেখানে বসবাস করতেন রাজা ও তার অমাত্যবর্গ। ফলে পুণ্ড্র রাজার রাজপ্রাসাদ ও প্রশাসনিক ভবন এখানেই থাকার কথা। জমিটি মাজার কমিটির বলে দাবি করা হলেও সংবিধান অনুযায়ী এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় পড়ে।

এখানে ইচ্ছে করলেই কেউ খোঁড়াখুঁড়ি কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবে না। কিন্তু তাদের লোকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে রাতের আঁধারে খোঁড়াখুঁড়িতে প্রাপ্ত অমূল্য প্রত্নসামগ্রী অবলীলায় হাপিস করা হচ্ছে। নাহিদ সুলতানা জানান, তিনি ঘটনাটি দেখার পর এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেও তেমন কোনো ফল পাননি। গত বুধবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, পুণ্ড্র নগরীর নিদর্শনগুলোর একেবারে কেন্দ্রস্থলে হজরত শাহ সুলতান বলখি মাহী সওয়ারের (র-.) মাজারের পশ্চিম পাশে প্রায় ২০০ বর্গফুট এলাকায় খনন কাজ করা হয়। ফরিদপুর জেলার অধিবাসী সোলেমান আলী রাতে খনন কাজ প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি জানান, রাতে যখন খনন করা হয় তখন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

তখন তিনি বেশকিছু পাথর ও ভাঙা ইটের অংশ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলতেও দেখেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক বলেন, আমরা সব দেখি-শুনি, তারপরও মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না কারণ প্রাণের মায়া প্রত্যেকেরই আছে। গর্ত খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাছে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা আড়াই হাজার বছর আগের নিদর্শনের কোনো দাম নেই, পাশাপাশি অতিরিক্ত মজুরির লোভে তারা মহামূল্যবান এই অতীত নিদর্শনগুলো অবলীলায় ধ্বংস করার কাজে মত্ত হতে পারছে। মহাস্থান মাজার উন্নয়ন কমিটির সদস্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ এই কাজের দায়িত্ব নিজেদের ঘাড়ে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার পর সেখানে খোঁড়াখুঁড়ির কোনো অর্থ হয় না। তবে বাইরের কেউ এই কাজ করতে পারে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে তিনি মুখ খোলেননি। মহাস্থান মাজার কমিটির সভাপতি বগুড়ার জেলা প্রশাসক ইফতেখারুল ইসলামের কাছে স্থানীয় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না। তিনি এটি শনাক্ত করতে শিবগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।
আমরা দেখেছি, ভারতের মৌলবাদী গোষ্ঠী বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির নির্মাণ করেছে। আফগানিস্তানের তালেবান আমলে ধ্বংস করা হয়েছে বামিয়ানের বিশাল বৌদ্ধ প্রতিকৃতিগুলো। আর ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর বাগদাদ জাদুঘরে চালানো হয়েছে লুণ্ঠন। কিন্তু আজ বাগদাদ-বামিয়ান নয়, ভারতের বাবরি মসজিদ নয়—আমাদের বাংলাদেশে এটা কী হচ্ছে? এই প্রশ্ন আমার আপনার সবার। আমাদের প্রশ্ন জাতির বিবেকের কাছে। খোদ সরকারি নির্দেশকেই অমান্য করে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ধৃষ্টতা যারা দেখাচ্ছে, সরকারের উচিত একটিবারের জন্য হলেও প্রমাণ করা—কোনো অন্যায়কারীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আসলে ষণ্ডাতন্ত্র ঐতিহ্যের কথা দূরে থাক, নিজের মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই অপারগ, আপাতত সেখানে বলার কিছু থাকে না। তারপরও এসব প্রভাবশালী মহলের মদতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের ছা-পোষা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি আর হয়রানি করার যে প্রক্রিয়া চলছে; আমরা চাই প্রশাসন এর বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।

যার মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যের পাশাপাশি কয়েকজন কর্তব্যনিষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে। আর এই একুশ শতকে বাস করেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লার লালসালু উপন্যাসের বাস্তব রূপায়ণের এই নীল নকশা রুখে দেয়া সম্ভব হবে। এই অপকর্ম রোধে বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা মিললে মহাস্থানগড় হয়তো একটি বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করবে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলাকালীন ভারতের নানা স্থানে প্রদর্শিত বিলবোর্ডগুলোর অধিকাংশই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও প্রত্নকীর্তি সম্পর্কিত। আর এটাকে উদাহরণ হিসেবে নিলে বাংলাদেশের জন্য অন্যতম হবে এই মহাস্থানগড়। তাই দেশে পর্যটন শিল্পের প্রসার, সুস্থধারার নির্মল বিনোদনলাভের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের রাজস্বে সমৃদ্ধি আর পর্যটনকেন্দ্রিক বাণিজ্যের বিকাশে অনেকেই হয়তো মুক্তিলাভের সুযোগ পাবে দারিদ্র্য আর বেকারত্বের অভিশাপ থেকে। আর আমরাও এগিয়ে যেতে পারব এক সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দিকে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s