হুমায়ুন আহমেদ, ঘেটুপুত্র কমলা আর কিছু অজানা আশংকা পর্ব ০১


Imageবর্তমানযুগে কোন চলচিত্র বা গানের নামের সাথে সাথে কয়েকটি শব্দ লাগাতার চলে আসে তা হচ্ছে হিট, ফ্লপ, সুপারহিট, সুপারফ্লপ, সুপার ডুপার হিট প্রভৃতি। আসলে এখনকার কর্পোরেট দুনিয়ার মারপ্যাচে একটি গান বা চলচিত্র নির্মাণে প্রাথমিকভাবে টপিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোকে প্রথম গুরুত্ব দেয়া হয়। একটি গানের কথা মিলিয়ে বলতে গেলে গেল কয়েকটি মাসের মিডিয়াজগতকে কোলাভেরী ডি এর মাস বলা যায়। রাস্তাঘাটে বেড়াতে বেরুলে, শপিংমলগুলোতে, বাজারের মধ্যে এমনকি ফ্লাটের বারান্দায় চেয়ারে একটু আয়েশি ভঙ্গিতে গা এলিয়ে দিয়ে একটু চোখ মুদলে কানে ভেসে আসতে থাকে ‘ইয়ো বয়েজ, আই অ্যাম সিং সং, সুপ সং, ফ্লপ সং, হোয়াই দিজ কোলাভেরি কোলাভেরি কোলাভেরি ডি। একটি ট্যাংলিশ(তামিল+ইংলিশ)গানের এই জয়যাত্রায় আমাদের কি আসে যায় ? আসলে বলতে চাইছি দেশের নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের নতুন সিনেমা ঘেটুপুত্র কমলা প্রসঙ্গে। মুভি রিভিউ বা এই জাতীয় লেখালেখি আমার অভ্যাসের মধ্যে নেই।হিন্দি সিনেমা থ্রি ইডিয়টস এর একটি রিভিও লেখার চেষ্টা করেছিলাম, অনেকটা মনের থেকে লেখা সেই রিভিউটি পত্রিকায় ছাপাও হয়ে যায়। আজকে আমার এই লেখার উদ্দেশ্য হুমায়ুন আহমেদের মতো নন্দিত কথা সাহিত্যিকের মুভির রিভিও করা না। সেই দু:সাহসও দেখানো আমার উচিত হবে না। শুধু কিছু বিষয় আমার কাছে মনে হয়েছে সমস্যায়িত যেগুলো তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করছি।
আবার কলাভেরি প্রসঙ্গ। লতা, আশা, রফি, মুকেশ, জগজিত সিং প্রমুখের কালজয়ী গানের পাশাপাশি কিছু ভুইফোড় হিন্দিগান সময়ের সাথে সাথে উপমহাদেশ কাঁপিয়ে তুলেছিল। কলেজে প্রথম বর্ষে থাকাকালীন বহুশ্রুত গান সেই হিমেশ রেশামিয়ার ‘আশিক বানায়া আপনের’ কথা মনে পড়ে, আজ সেই গান আর গানটির গায়ক দুজনেই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন। পর পর দেখা গেছে ধুম মা চলে, ডারদ ই ডিসকো, শীলা কি জওয়ানী, মুন্নী বদনাম হুয়ী, দম মারো দম, ছাম্মোক ছালো আরো কত কি ? আজ ইয়াং জেনারেশন ক্রেজি হয়ে উঠেছে ‘কলাভেরি ডি’ নিয়ে। দক্ষিণ ভারতীয় ‘কলিউডি বা তামিল ইন্ডাস্ট্রি’ থেকে নির্মিতব্য ‘থ্রি’ সিনেমার এই মিশ্রিত তামিল ইংরেজী যাকে আমি বলেছি টাংলিশ বা ট্যাংরেজী গানটির কিছু বৈশিষ্ট একে ইউটিউবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। কর্পোরেট দুনিয়া এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বানিজ্য করার সুযোগ নষ্ট করতে চায়নি। একের পর এক আত্মপ্রকাশ করেছে এই গানটিরই মেয়েকণ্ঠ, শিশু কণ্ঠ, প্যারোডিগান, একই সুরে অন্যগান কিংবা যন্ত্রসংগীত। ভারতের নন্দিত সংগীত শিল্পী সনু নিগমের শিশুপুত্র নিভানের গাওয়া এই গনাটির একটি রূপও জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে উঠে যায়। কিন্তু আমি বলতে চাইছি ভিন্ন কথা। যুব সমাজ সব সময় নতুনকে স্বাগত জানায়। তারা কোন কিছু ভাল কি মন্দ লাভ কি ক্ষতির এটা বোঝার আগে বিচার করে এটা নতুন না পুরাতন। এক্ষেত্রেও ঘটেছে ঠিক তাই।
আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখি গানটির শুরুতে বলা হয়েছে ‘ইয়ো বয়েজ, আই অ্যাম সিং সং’ এখানে প্রথমত বলা হয়েছে বালকদের কথা সেই সাথে যে ইংরেজী বলা হয়েছে সেটি ভুল। তারপর বেশ স্বার্থকতার সাথে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয় এটা ‘সুপ সং, ফ্লপ সং’। আমি বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বলতে চাই প্রারম্ভিকায় ভুল শব্দ চয়ন আর গানের গতি প্রকৃতির প্রতি দিক নির্দেশনা গানটির কন্টেন্ট বিচার না করেই এর শ্রবনের আবেদন বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে গানটিকে ‘সুপ সং’ বলাও তামিল ভাষা ব্যবহারকারী যুবকদের মাঝে এর আবেদন বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। কর্পরেট জগত আর মিডিয়ার রেপ্রিজেন্টেশনে আজকের দুনিয়ায় ছেলেমেয়েদের একের প্রতি অ্রনের আবেদন বাড়িয়েছে। অন্যদিকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত যুবকদের সংখ্যাও নেহায়েত মামুলি নয়। এই ‘সুপ সং’ শব্দটির ব্যবহার গানটিকে একান্তই প্রেমে প্রত্যাখ্যাত যুবকদের আপন করে নিতে চেয়েছে। ফেসবুকে পরিচিত একজন কর্ণাটকের বন্ধুর কাছ থেকে এই তামিল ‘সুপ’ শব্দটি সম্পর্কে যতদুর জেনেছি তার অর্থ কোন চিকেন বা কর্ণসুপ নয় এটির অর্থ প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া বা ছ্যাকা খাওয়া। অন্যদিকে এই ‘হোয়াই দিস কোলাভেরি ডি’ এর অর্থও করেছে ওই ছেলেটি তার প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ও মেয়ে কেন তোমার এই খুনে রূপ’। অনলাইনে বিভিন্নসোর্স ঘেঁটে এই মুভিটির কনটেন্ট বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি কমল হাসানের মেয়ে শ্রুতি হাসানের ফেসবুক পেজে দেয়া বিবরণ থেকে এই গানটির সম্পর্কে যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে এই গানটি সত্যিই বেদনাবিধুর। প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর একজন ধুঁকতে থাকা যুবকের হারানোর বেদনা মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে এই গানটিতে। এই বেদনা হৃদয় ছুঁয়ে গেছে প্রায় পনের কোটির কাছাকাছি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ভারতীয় যুবকের। যাদের ভালোলাগা থেকে গানটির এই মাত্রার প্রচার আর প্রচারেই প্রসার যা এই গানটিকে পথ করে দিয়েছে দেশের সীমারেখা ছেড়ে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে।
সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ‘নন্দিত নরকের’ নন্দিত পরিচালক জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশুনা করলেও নৃবিজ্ঞানে বিস্তর আগ্রহ ঐ পরিসরে পড়াশুনার গন্ডিটিও অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে। ইতিহাস ও জনশ্রুতি বিশ্লেষণ করে জানা যায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভাটিয়ালি, জারি, সারি, ভাওয়াইয়ার মতো একটি জনপ্রিয় সংগীতের ধারা জন্ম নেয় ‘ঘেটুগান’ নমে। আজ থেকে আনুমানিক দেড়শ বছরের কিছু পূর্বে বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জে এক বৈষ্ণব আখড়ায় ঘেটুগান প্রথম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। জাবির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ‘প্রত্নতত্ত্ব ও লোকাচারবিদ্যা’ কোর্সের শিক্ষক ও এই হবিগঞ্জ জেলার সন্তান জয়ন্ত সিংহ রায় এর সাথে কথা বলে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করেছি। তখনকার রক্ষণশীল সমাজে ছেলেমেয়ে একসাথে মেলামেশা করা, গান ও নৃত্য করা অনেকটাই অসম্ভব ছিল। এখনকার মুন্নি শিলার মতো খুল্লাম খুল্লা পোশাক দুরে থাক ছেলে মেয়েদের একসাথে কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণই তখনকার দিনে ছিল গর্হিত অপরাধ। তাই বলে সংস্কৃতির চর্চা থেকে থাকেনি। মেয়েদের অনুপস্থিতে তাদেরই পোশাক পরে, আলতা নুপুর সহযোগে, জবড়জং মেকাপ-পাউডার লাগিয়ে কিছু রূপবান কিশোর অভিনয় ও নৃত্যগীতিতে অংশ নিতো। এদেরকেই বলা হতো ঘেঁটু। যদিও তাদের গাওয়া নৃত্য ও গীতি ছিল অনেকটাই সাধারণ প্রচলিত ধারার। এখানে অনেকটা রাগ সঙ্গীত ও উচ্চাঙ্গ ধারার সুস্পষ্ট প্রভাব ছিল। নারীর আদলে একই পোশাক ও সাজসজ্জায় সুদর্শন কিশোরদের উপস্থিতি এই সংগীত ঘরানাকে কলুষিত করে। বিকৃত রুচির জমিদার ও বিত্তবান লোকজন বাইজীর পাশাপাশি এইসব কিশোরদের তাদের লালসা চরিতার্থ করা ও প্রমোদে ব্যবহার করার ঘৃণ্য মনোবৃত্তি প্রকাশ করে। একইসাথে এই কিশোরদের যৌনসঙ্গী হিসেবে বিছানায় দেখার জন্য অনেক বিকৃত রুচির বিত্তবানকে লালায়িত হতে দেখা যায়। সামাজিকভাবে বিষয়টা অনেক ধিক্কার ও ঘৃণার সাথে দেখা হলেও জোর যার মুল্লুক তার এই নীতির ভিত্তিতে বৃহত্তর হাওর অঞ্চলের বিত্তবান কুরুচিপূর্ণ মানুষ জলবন্দি সময়টায় কিছুদিনের জন্যে হলেও একজন ঘেটুপুত্র নিজের কাছে রাখবে এই বিষয়টা স্বাভাবিক মনে করতে থাকে। ইতিহাসের কলংকিত এই বিকৃত রুচির কাহিনী আবার নতুন করে ভাষা পেল হুমায়ুন আহমেদের হাত ধরে। রক্ষণশীল অনেকের মতো আমি কখনই বলতে চাইবো না এই মুভি আমাদের দেশের সংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলুষিত করবে। তারপরেও কিছু আশংকা রয়েছে সেগুলো বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি।

Advertisements

7 thoughts on “হুমায়ুন আহমেদ, ঘেটুপুত্র কমলা আর কিছু অজানা আশংকা পর্ব ০১”

  1. গাধা কোথাকার! লিখতে না জানলে অনন্যার লেখা নিয়ে বাকা উঠান বানানো ছাড়া আর কিছুই না এই লেখা।

  2. ওহে জ্ঞানপাপীর দল , তুমরা সত্য চাপিয়া রাখিতে চাও কেন ?
    দেশে চোর ডাকাত বসাইয়া রাখিয়া তুমরা হুমায়ুন এর সমালোচনা কর , কেন চোরদের সমালোচনা করিতে পার না ? রাতে পর্ণ দেখিবার সময় এইগুলা মনে থাকে না ? আর হিন্দি ছবিতে বিকিনি পরিহিত ললনার ছবি দেখিবার সময় মনে থাকে না ?

    1. একদম খাসা কথা বলিয়াছ তুমি বৎস । তখন আমি হুয়ায়ুনকে চিনতাম না। মরিবার পরে চিনিয়াছি। এখন ভাবি হুমায়ুন কেনো যদি হিউ হেফনার বাংলার মাটিতে পয়দা হইতো আর সে ভারতের থাবা থেকে চলচিত্র আর টিভি কে বাচাইতো ??
      তারপরেও ইহা অসহ্য। শুশীল হইতে গেলে কেনো গুহ্যদ্বারে উকিবুকি দিতে হইবে ??
      দৃষ্টিসীমা একটু প্রসারিত করিতে সমস্যা কোথায় ??

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s