তত্ত্বাবধায়ক সরকার, হরতাল ও সাম্প্রতিক বাংলাদেশ


অতি সম্প্রতি হরতাল দেখে অনেক প্রাচীন দুটি কৌতুক মনে পড়ল। প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে পুরনো বিষয়াবলী নিয়ে কারবার করা স্বাভাবিক হলেও এগুলোকে আমি কখনোই দেশের সঙ্গে মেলাতে চাইনি। তবু কেন যেন মিলে গেছে। প্রথমটা ছিল এমন—‘এক ভদ্রমহিলার স্বামী পরকীয়ায় পড়ার পর থেকে উনার সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার শুরু করেন। মহিলা প্রথম প্রথম একেবারেই নীরব থাকতেন। কিন্তু হঠাত্ তার আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। উনি স্বামীর বাজে আচরণের সঙ্গে সঙ্গেই কোনো প্রতিবাদ না করে দ্রুত বাথরুমে ঢুকে যেতেন। বেশ কিছুক্ষণ থাকার পর অনেকটাই খুশি মনে বেরিয়ে আসতেন। একদিন ভদ্রলোক তার ভুল বুঝতে পেরে পরকীয়া থেকে সরে আসেন। তখন স্ত্রীকে ডেকে পূর্বের ঘটনা জানতে চাইলে ভদ্রমহিলা জানান, ‘আমি প্রতিদিন বাথরুমে ঢুকে তোমার টুথব্রাশ দিয়ে কমোড পরিষ্কার করতাম।’ ভদ্রলোক বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ড্রয়ার থেকে একটা টুথব্রাশ বের করে স্ত্রীকে দেখিয়ে বললেন, ‘আমিও ভয় পেতাম। তাই কোনোদিনই ওই টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজার চেষ্টা করিনি।’
বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোর মধ্যে আমার সবথেকে স্বাচ্ছন্দ্যের ‘আমার বর্ণমালা’ ব্লগে গত শুক্রবার রাতে একটি পোস্টে পরিসংখ্যানসহ বহুল আলোচিত-সমালোচিত এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ও পাশাপাশি প্রায় সবাই কী পরিমাণ কাঠখড় পুড়িয়েছিলেন তার একটি খতিয়ান তুলে ধরেছিলাম। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন গংদের মাত্র দুই বছরের অরাজকতায় ভীত হয়ে এই সরকার পদ্ধতিই বাতিল হবে এমনটা কেউ ভাবতে পারেননি। গোটা জাতি অনেকটা চাতক পাখির মতোই চেয়ে ছিলেন দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্য থেকে যিনিই ক্ষমতায় আসুন অন্তত এই অরাজকতা সৃষ্টিকারীরা রেহাই পাবে না। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের গণগ্রেফতার, প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনের মাধ্যমে দেশের চলমান গণতন্ত্রকে চিরতরে নস্যাত্ করার অপচেষ্টা, দ্রব্যমূল্যকে এভারেস্টের চূড়ায় নিয়ে যাওয়া, জিডিপির মান পাতালে নামানো, দেশের অমূল্য প্রত্ননিদর্শন বিদেশে পাচার—এহেন কাজ নেই তারা করেনি। তবুও জাতিকে অবাক হয়ে দেখতে হয় এই কুচক্রীদের প্রায় সবাই আজ বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পৃথিবীর হাওয়া-বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে অনেকটা সুকুমার রায়ের পাগলা দাশু স্টাইলে পায়ের নখ প্রতিদিন ফেটে রক্ত বেরোয় বলে পায়ের আঙুলটাই নরুনের প্যাঁচে ফেলে দেয়া হচ্ছে।
আসলে বিগত নির্বাচনের আগে যখন দেশের গণতন্ত্র হত্যাকারী স্বৈরাচারী লুল সম্রাট এরশাদকে নিয়ে অনেকটা জামাই আদরের সঙ্গে যেভাবে টানাহেঁচড়া চলছিল তখনই জাতি অবাক হয়েছিল। কিন্তু কী আর করা, অনেকটা ওই ভদ্রমহিলার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতি পাঁচ বছর পর পর ভোটাররা ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তন আনেন। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের নিজের ব্রাশ সুরক্ষার বিষয়টি বেশ ভালোই জানে। আগের সরকারি দলের প্রতি অতিমাত্রায় বিরক্ত জনগণের ক্ষোভ আর হতাশার বিনিময়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর পরবর্তী দল সময় নষ্ট না করে দ্রুত চেষ্টা করে পাঁচ বছরের এই মুসাফিরখানায় কীভাবে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়া যায় আর কতদ্রুত জনগণকে বিরক্তির শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়া যায়। নিত্যদিনের যানজট, বিদ্যুত্ বিভ্রাট, পানির সঙ্কট, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খুন, ধর্ষণ, যৌন কেলেঙ্কারি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দ্রব্যমূল্যের বাজারে আগুন, বিঘ্নিত জননিরাপত্তা, জ্বালানি সঙ্কট, আবাসন সঙ্কট, শেয়ারবাজারে ধস আর মুদ্রাস্ফীতিতে টালমাটাল অবস্থায় আমাদের দেশের সরকার ও বিরোধী দল প্রত্যেকেরই একটু সততার সঙ্গে দৃষ্টি দেয়া উচিত ছিল এসব জাতীয় সমস্যার দিকে। সরকারের উচিত ছিল বিরোধী দলের প্রতি দমননীতি পরিহার করে তাদের মতামতকে মূল্য দেয়া, যেখানে বিরোধী দল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয় বরং সরকারের ভুল-ত্রুটিগুলো তুলে ধরিয়ে দিয়ে দেশের কাজে সহায়ক হতে পারতেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন স্বপ্ন দেখাও একটি অপরাধ হওয়াতে ক্ষমতালাভের পর থেকে সরকার ও বিরোধী দল দুই মেরুর বাসিন্দা। সবক্ষেত্রে সরকারি দলের আধিপত্য আর বিরোধী দলের লাগাতার বিরোধিতা এ এক পরিচিত দৃশ্য। আর জনগণ বরাবরের মতো যাতনা আর দুর্ভোগে হতাশ হয়ে আবার ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রাখতেই পাঁচ বছর পর প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতি শুরু করে। তবে এবার নাটকের দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে যেতে বসেছে। জনগণ যেন পাঁচ বছর পরেও কিছু না বলতে পারে তার সুব্যবস্থা করতেই যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কবর দেয়া হলো। বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বাধীনতালাভের এই চার দশকে প্রতিটি ক্ষমতাসীন দলের অধীনে যে কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, পৌর নির্বাচন, মেয়র নির্বাচন কিংবা উপনির্বাচন হয়েছিল তার প্রতিটিই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। জালভোট দেয়া, কেন্দ্র দখল, মারপিট আর সংঘর্ষ ছিল নিত্যদিনের চিত্র। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমস্যার থেকেও অনেক গুরুতর সমস্যা আছে যেগুলো সমাধানে সরকার ও বিরোধী দল প্রত্যেকের সহযোগিতামূলক মনোভাবের ভিত্তিতে এগিয়ে আসতে হবে।
সরকার বা বিরোধী দলের কিছুতেই ভুলে গেলে চলবে না, কেউই এই জনগণ যারা কেবল প্রতিশ্রুতি আর রাজনৈতিক বক্তৃতা বাদে সবক্ষেত্রেই উপেক্ষিত তাদের রায়ের ঊর্ধ্বে নন। সরকার যখন কোনো বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত নেয় তখন বিরোধী দল তার দাঁতভাঙা জবাব দিতে মুখস্থ আর বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেকটা ফসিলকৃত বুলি আওড়াতে অভ্যস্ত ‘আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই অপকর্মের সমুচিত জবাব দেব।’ বিপরীতে সরকারি দল বলে থাকে, ‘জনগণ বিরোধী দলের এই অন্যায় আচরণ মেনে নেবে না।’ আসলে দুই ক্ষেত্রেই জনগণের নাম বেশ জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হতে দেখলেও অধিকার আর সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নে এই জনগণই বরাবর উপেক্ষিত। আজ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কট দেখা গেছে বৈকি, এই হরতাল কারোই কাম্য ছিল না। অন্যদিকে গ্যাস আর জ্বালানি তেলের মূল্য যেদিন অনেকটাই অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হলো, সেদিন জনগণ বিরোধী দলের কাছ থেকে এর তুমুল প্রতিবাদ আশা করেও হতাশ হয়েছে। যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশে শুধু ট্রামের ভাড়া এক টাকা বাড়ানোয় পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনকে আমরা সরগরম হতে দেখি। সেখানে আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের অন্যায় মূল্যবৃদ্ধিতে যানবাহনের ভাড়া আকস্মিক বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সৃষ্ট জনদুর্ভোগে বিরোধী দল গুনগুন করে যে প্রতিবাদ করেছে তা সরকারের কান অবধি পৌঁছেনি।
আমি শেষ করব নাসির উদ্দীন হোজ্জার একটা মজার গল্প দিয়ে—‘একদিন হোজ্জার ঘরে বেশ জোরে ধুপ করে শব্দ শুনে তার স্ত্রী হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে প্রশ্ন করলেন, ‘কিসের শব্দ হলো?’ হোজ্জার সাবলীল উত্তর, ‘আমার আলখাল্লাটা পড়ে গিয়েছিল।’ কিন্তু এত জোরে শব্দ হলো কেন!! হোজ্জা কথা না বাড়িয়ে বললেন, আলখাল্লার ভেতরে আমিও যে ছিলাম।’ আসলে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করুন আর বিরোধী দল হরতাল ডাকুন—এখানে আলখাল্লার ভেতরে দেহের মতো দেশের জনগণের দুর্ভোগ জড়িত। যেহেতু প্রতি পাঁচ বছর পর পর এই জনগণের মুখের দিকে অনেকটা বুভুক্ষের মতোই আপনাদের চেয়ে থাকতে হয়, তাদের ভোগান্তির কথা আপনাদের উভয়েরই ভেবে দেখা উচিত। কিছুতেই ভুলে গেলে চলবে না, ফারাক্কার কারণে পদ্মা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেলেও মেঘনা, যমুনা আর কর্ণফুলীর স্রোতের সঙ্গে আজও একাত্তরের সেই বীর শহীদদের রক্তের ধারা বহমান। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, বেনাপোল থেকে তামাবিল—এই ছোট্ট সুন্দর ভূখণ্ডে একটু শান্তির সুবাতাস আর সচ্ছল জীবনের প্রত্যাশায় ওই বীর সেনানীরা তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। তাদের স্বপ্নকে সার্থক করতে এগিয়ে আসা প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক : ব্লগার ও কলামিস্ট
aurnabmaas@gmail.com
দৈনিক আমার দেশ
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s