নববর্ষে ‘বাংলা বসন্তে’র আশঙ্কা


এখন বহির্বিশ্বের রাজনীতি দুটো আন্দোলন ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। একটি ‘আরব বসন্ত’ আর দ্বিতীয়টি ‘অকুপাই মুভমেন্ট’। মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরতন্ত্রের মসনদ কাঁপানো আরব বসন্তের কথা কারও অজানা নয়। অন্যদিকে ‘অকুপাই মুভমেন্ট’ শুরু হয়েছিল নিউইয়র্কে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ থেকে, যা ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক শহর থেকে অন্য শহরে আর ইউরোপ থেকে অস্ট্রেলিয়ায়। প্রাথমিক অবস্থায় ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। তবে এটি এখন পরিণত হয়েছে পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনে, যার বিস্তৃতি বিশ্বব্যাপী।
অনলাইনে তোলপাড়, অবশেষে রাজপথ, তারপর স্বৈরাচার উত্খাত আর তারুণ্যের জয়ধ্বনি। সংক্ষেপে এটাই আরব বসন্তের কথা। ‘অকুপাই’ আন্দোলনের সঙ্গে ‘আরব বসন্ত’-এর কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে আমরা এ দুয়ের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল পাই এক জায়গায়, আর তা হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ, যেখানে শামিল হয়েছেন অধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষ। নির্যাতিতের চোখের পানি আর নিপীড়কের অট্টহাসি যেখানে ইতিহাসের ধ্রুব সত্য বলে মানুষ বালিতে মুখ গুঁজে হা-হুতাশ করত সেখানে দেখা গেছে এক ভিন্ন সুর। সৃষ্টি হয়েছে নতুন ইতিহাস। পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে আর স্বাগত জানিয়েছে এই নতুনত্বকে।
আমরা টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে ২০১১ সালের সেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হতে দেখছি পৃথিবীর নানা স্থানের প্রতিবাদকারীদের। কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকার প্রতিবাদকারীদের চিহ্নিত করেনি টাইম ম্যাগাজিন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেই তিউনিসিয়া থেকে শুরু করে ‘অকুপাই আন্দোলন’-এর সব বিক্ষোভকারী টাইমের দৃষ্টিতে সেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। স্বৈরাচারের প্রতিবাদে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ার ‘সিদি বওজিদ’ শহরের ফল বিক্রেতা মুহাম্মদ বওকুজিজি প্রথম রুখে দাঁড়ান। পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদে নিজ শরীরে আগুন লাগিয়ে মৃত্যু আলিঙ্গন করে হয়েছেন ইতিহাসের মহানায়ক। এই মৃত্যু উপলক্ষ করে আরব বিশ্বে আসে পরিবর্তনের ঢেউ, পতন ঘটে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকদের। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ১৯৬৮ সালে সাবেক চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগ সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সূচনা করে ‘প্রাগ বসন্ত’। এর সঙ্গে মিল রেখে সমাজবিজ্ঞানীরা আরব বিশ্বের পরিবর্তনের নাম দেন ‘আরব বসন্ত’। পাশাপাশি নিউইয়র্কে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন গড়ে তোলে অধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষ, যা আজ তিন মাস পার করতে চলেছে। সেই সঙ্গে ওয়াশিংটনের ফ্রিডম প্লাজায় সমবেত হওয়া বিক্ষোভকারীরা পার করতে চলেছে প্রায় আড়াই মাস।
রক্তচোষা পুঁজিবাদ যেমন ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর জন্ম দিয়ে বিশ্ব তোলপাড় করছে, তেমনি আরব বিশ্বে ক্ষমতাসীন সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব অনেকাংশে কাজ করেছে ‘আরব বসন্তের’ সূচনায়। পাশাপাশি বেকারত্ব, কর্মক্ষেত্রে অসমতা, অর্থনৈতিক মন্দা প্রভৃতিও এর হালে পানি দেয়, যার প্রতিটিই মানুষের অধিকার সংশ্লিষ্ট। নিউইয়র্কের জুকোটি পার্কে তাঁবু বিছিয়ে কিংবা খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ অবস্থান করে প্রতিবাদী মানুষ একসঙ্গে হাড় কাঁপানো শীতে ঠকঠক করে কেঁপেছেন, অন্যদিকে কাঁপাতে সক্ষম হয়েছেন পুরো বিশ্বকে, তথা স্বৈরতান্ত্রিকতার মসনদকে। অবহেলা, নির্যাতন আর সীমাহীন অবিচার অধিকারবঞ্চিত অসহায় মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটায়, যা আজ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘আরব বসন্ত’ পরিবর্তন এনেছে ও আনছে আরব ভূখণ্ড ও পুরো বিশ্বে, যা ছিল অনেকটাই সময়ের দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তনের ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বেলাভূমিতে। যার অশনি সঙ্কেতকে আমি নাম দিতে চাই ‘বাংলা বসন্ত’ হিসেবে।
আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের সঙ্গে আরব বিশ্বের রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভেবে দেখার বিষয় তা কার্যত কতটুকু? আরব বিশ্ব কিংবা আমেরিকায় যে পটভূমিতে আন্দোলন ঘটেছে অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও আজ তাই ঘটে চলেছে বাংলাদেশে। প্রাথমিকভাবে সেই এরশাদের স্বৈরাচারী রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা দেখতে বাধ্য করেছিল দেশবাসীকে। এই প্রবণতা আজও অব্যাহতভাবে চলছে। আমরা দেখেছি, শুধু ক্ষমতা নিয়ে অতি আগ্রহ বিগত এক এগারোর জন্ম দেয়। ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার মধ্য দিয়ে আজ ধীরে ধীরে দেশ আবার এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। যার সঙ্গে আমরা মিল পাই আরব বিশ্বের, যেখানে নেতারা কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার বদলে ক্ষমতা আগলে রাখতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। তারা ক্ষমতা ধরে রেখেছেন, অনেকটা পারিবারিকভাবে কিংবা বংশানুক্রমে, তাও আবার যুগের পর যুগ।
একটু ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও বাংলাদেশে এই একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ১৯৯১ সালের পর থেকে গণতান্ত্রিকভাবে সরকার পরিবর্তন হলেও ক্ষমতাসীন সরকারের একদলীয় মনোভাব সংসদকে অকার্যকর করে অনেকটা একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে গেছে দেশকে। বস্তুত প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকার সংলাপের ব্যাপারে আদৌ উত্সাহী না হয়ে বরং দলীয়ভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টায় গলদঘর্ম হয়েছে। ফখরুদ্দীন-মইনের অরাজকতার অবসানে একটি রাজনৈতিক সরকার সময়ের দাবি মেটাতে ক্ষমতায় এলেও আজ তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, যা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
উন্নয়নের খতিয়ানের দিকে দৃষ্টি দিলে আমাদের দেশ একটি ক্ষেত্রেই অনেক অগ্রগামী তা হচ্ছে সীমাহীন দুর্নীতি, যেটি শুধু দেশ নয় আজ আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচিত। জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। বিদেশি প্রভুদের স্বার্থে দেশের বিরুদ্ধে এককভাবে সার্বভৌমত্ববিনাশী প্রশস্ত করিডোর প্রদান বা দেশ মরুকরণের প্রতীক গণধিকৃত টিপাইমুখ বাঁধও সরকারের নীরব সম্মতি পেয়েছে। সীমান্তে পাখির মতো মানুষ হত্যার প্রতীক হিসেবে কাঁটাতারে ঝুলন্ত কিশোরী ফেলানীর লাশ আজ জাতীয় হতাশার চরম অভিব্যক্তি।
অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা আজকে যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে তা থেকে কোনো বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থানের আশঙ্কা অমূলক নয়।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রফতানিতে ৩৯ ভাগ আয় কমার বিপরীতে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৩ শতাংশ, জুলাই-সেপ্টেম্বরে যার পরিমাণ ১৮১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সরকারের পরিচালনা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক থেকে নিতে হচ্ছে প্রচুর ঋণ। ১ নভেম্বর পর্যন্ত এ ঋণের পরিমাণ ১৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা দেখানো হলেও তার সমাধানে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে বরং মন্ত্রিসভার কলেবর আরও বৃদ্ধি করে এই খরচকে বাড়ানো হয়েছে হাস্যকরভাবে। জাতির পিতার গৌরব সমুন্নত করার নামে নতুন নোট ছেপে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার ফলে দিনকে দিন মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, যা বছরের শেষে ৩০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৩ হাজার তৈরি পোশাক কারখানা। বেকার হয়েছে অনেক নারী, যাদের কি না একুশ শতকের উন্নয়ন আর বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার পথে মূল চালিকাশক্তি উল্লেখ করে গালভরা বক্তৃতা দিতে বেশ পটু আমাদের নেতানেত্রী আর অর্থলোভী বুদ্ধিপসারিনীরা। একমাত্র উপার্জনের রাস্তা খোয়ানো এই মেয়েরা আর যদি গ্রামে ফিরে না যায় তাদের হাত ধরে গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি হওয়াটা বিচিত্র নয়। বস্তুত অসমতা, বৈষম্য, পুঁজিবাদী আগ্রাসন আর দারিদ্র্য ‘অকুপাই মুভমেন্টের’ জন্ম দিয়েছিল। স্বৈরতান্ত্রিকতার পতনে সৃষ্ট ‘আরব বসন্ত’ এটিকে অনেকাংশে প্রভাবিত করেছে। মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬ ভাগ এখন বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, যা এই আন্দোলনকে আরও উসকে দিতে পারে। আমরা দেখেছি, অর্থসম্পদ একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ায় মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া ‘আরব বসন্ত’ সৃষ্টির বড় কারণ যা থেকে বাংলাদেশে খুব একটা পিছিয়ে নেই। শতকরা ১১ দশমিক ৭৩ ভাগ খাদ্য মূল্যস্ফীতির সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা যাচ্ছে না, যা সাধারণ মানুষকে মাঠে নামতে বাধ্য করেছে।
কেতাবি ভাষা আর সংবিধান গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে একটা সমঝোতার কথা বলে। স্বৈরতান্ত্রিকতার প্রভাবে আরব বিশ্বে কোথাও এ সমঝোতা ছিল না। ফলে বিরোধী পক্ষ ‘আরব বসন্ত’ সৃষ্টিপর্বে জনতার রোষানল উস্কে দিয়েছে। আন্দোলনের গোড়ার দিকে বেন আলী (তিউনিসিয়া), হোসনি মোবারক (মিসর), আলী আবদুল্লাহ সালেহ (ইয়েমেন), গাদ্দাফি (লিবিয়া) কিংবা বাশার আল আসাদ (সিরিয়া) কেউই বিরোধী দলকে আমলে নেয়নি। বিরোধী দলের সঙ্গে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলাটাকে তারা ভেবেছিল যুগোপযোগী, যা আজ অলিক ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রমাণিত। বিরোধী দলের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা বাংলাদেশেও এরকম একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করলে তাকে দৈবাত্ বলে মনে করার কোনো অবকাশ নেই।
এমনি এক পরিস্থিতিতে ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের আদলে ধীরে ধীরে ‘বাংলা বসন্ত’ আন্দোলনের বিষ ছড়াচ্ছে চারদিকে, যা সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়ে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে সরকারের। নতুবা এই বাংলাবসন্তের অশনি সঙ্কেত থেকে জাতি রক্ষা পাবে না।
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
ব্লগার, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ও কলামিস্ট.
aurnabmaas@gmail.com
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s