পুরাতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ডের মহাপ্রয়াণে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি


মো. আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিজ্ঞাননির্ভর ধারণা প্রতিষ্ঠার প্রবাদপুরুষ প্রক্রিয়াবাদী প্রত্নতত্ত্বের জনক, প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক লুই রবার্টস বিনফোর্ড বিশ্বব্যাপী তাঁর অগণিত শিক্ষার্থী এবং গবেষককে শোক সাগরে ভাসিয়ে গত ১১ এপ্রিল ২০১১ জন্মস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী অঙ্গরাজ্যের কির্কসভিলে চিরবিদায় লাভ করেছেন। ১৯৩১ সালের ২১ নভেম্বর জন্ম নেয়া বিনফোর্ডের মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘ ৫০ বছরের কর্মজীবনে তিনি দেড় শতাধিক গ্রন্থ এবং গবেষণা প্রবন্ধ রচনা ও সম্পাদনা করে গেছেন। আলাস্কার নুমিয়ান্ট এস্কিমোদের ওপর দীর্ঘ গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রত্নতত্ত্বের গবেষণায় নতুন একটি ধারার উন্মোচনে পথ দেখায়। তাঁর সঙ্গে ভারতের পুনার ডেকান কলেজের গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটা ভালো যোগ ছিল।
ডেকান কলেজের প্রখ্যাত পুরাতাত্ত্বিক কে. পাদায়ার উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতের একটি ইংরেজি দৈনিক বলেছে,মৃত্যুকালে তিনি হৃদরোগে ভুগছিলেন। আধুনিক ইউরোপে সামাজিক বিজ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই তাত্ত্বিক ঘরানার নানা মারপ্যাচে উপনিবেশবাদের ভিত্তি মজবুত করতে সচেষ্ট ছিল। সমাজ গবেষণার অন্যতম বিষয় হিসেবে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বাইরে ছিল না বরঞ্চ এটি উপনিবেশবাদী শক্তির ভিত্তিমূলকেই ইস্পাতদৃঢ় করতে কাজ করেছে, যা থেকে তিনিই প্রথম বেরিয়ে আসার পথ দেখান। প্রত্নতত্ত্বের প্রাথমিক দিকে প্রচলিত নীতির কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে আবির্ভাব ঘটেছিল ক্ষণজন্মা গবেষক লুই বিনফোর্ডের। তিনি অতীত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পূর্বতন হঠকারী বস্তুগত উপাদানের উপস্থাপননির্ভর সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার মাধ্যমে অতীত গবেষণার প্রস্তাবনা আনেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক ধারার অতীত চর্চায় প্রকৃত অর্থে ঔপনিবেশিক শক্তি কোনো অঞ্চলে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করার পর উপনিবেশকে বৈধতা দেয়ার জন্য ওই স্থানের সঙ্গে তাদের অতীত সম্পর্ক প্রমাণের ঐতিহাসিক সত্তাকে আগে থেকেই নির্মাণ করে নিত। আর তাকে বাস্তবসম্মত করতে ব্যবহার করত প্রত্নতত্ত্ব বা নৃবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোকে। এখানে তারা ইউরোপীয় দর্শনের দুটি ধারা বিশেষত দৃষ্টবাদ ও প্রত্যক্ষণবাদকে গুরুত্ব দিয়ে অতীত মানুষের সংস্কৃতি সম্পর্কিত বস্তুগত উপাদানকে সরাসরি সাংস্কৃতিক নর্মের উপস্থাপন বলে প্রমাণে সচেষ্ট হলে তখনকার প্রত্নতত্ত্ব চর্চার সঙ্গে পুকুর খোঁড়া বা কবর খুঁড়ে মাটি তোলার বিশেষ পার্থক্য ছিল না। তখনই লুই বিনফোর্ড তার সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ধারণা নিয়ে অনেকটা ধূমকেতুর মতোই আবির্ভূত হন। তিনি পূর্বের এসব বিষয়কে নাকচ করে দিয়ে সংস্কৃতিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার কথা বলেন যেখানে পরিবেশের ভূমিকাও অনেক গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। ফলে মাটি খোঁড়া আর প্রয়োজনীয় বস্তুর আলোকে ইচ্ছামতো তৈরি করা ইতিহাস রচনার মাধ্যমে কোনো জনগোষ্ঠীর অতীতকে খেলো করার পথে অনেকটা কাঁটা বিছিয়ে দিয়ে ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের চক্ষুশূল হন বিনফোর্ড। তাঁরা বিনফোর্ডের প্রবর্তিত ঘরানাকে অনেকটা হাস্যকর প্রতিপন্ন করে নব্যধারার প্রত্নচর্চা বলে নামকরণ করে। কিন্তু বহুলাংশে বস্তুনিষ্ঠতা আর বাস্তবতার যোগ থাকাতে বিনফোর্ডের প্রবর্তিত অতীত গবেষণা পদ্ধতি ধীরে উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আর আজও তা আমেরিকার মতো দেশে অন্যতম দাপুটে একটি রীতি হিসেবে গবেষক মহলে সমাদৃত। নতুন প্রজন্মের ইতিহাস ঐতিহ্য ও নৃবিজ্ঞানের গবেষকদের কাছে বিনফোর্ড একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

Archaeology Of Humankind
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষাথী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাবি
aurnabmaas@gmail.com

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s