7517dfd

এ লাশের মিছিল থামবে কবে?


মো. আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
সেদিন দৈনিক আমার দেশসহ দেশের প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় দেখলাম অভিশপ্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী কাজী লিয়াকত আলী যুবরাজের মৃত্যু সংবাদ, পর লিয়াকতের পথ অনুসরণ করেছেন আরও কয়েকজন। জানি না আত্মঘাতী এই লাশের মিছিল থামবে কবে! জীবন যখন কারও কাছে বোঝা হয়ে ওঠে, তখন সে ছুটি নিতে চায়। দৌড়ে পালিয়ে বাঁচতে চায়। প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘন করে এ দৌড় জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার দৌড়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে লোকসানের পর লোকসান পরিবার ও সমাজের কাছে লাঞ্ছনা আর হাহাকার সইতে না পেরে রাজধানীর গোপীবাগের আরকে মিশন রোডের ৬৪/৬-জে নম্বরে নিজগৃহে সিলিংফ্যানের সঙ্গে লটকে গেছেন লিয়াকত সাহেব।
৭০ লাখ টাকার পুঁজি হারানোর বেদনা জীবনটাকে অসহ্য করে তোলে লিয়াকতের জন্য। অসহায় স্ত্রী এবং চার বছরের একমাত্র আদরের শিশু মেয়েটির ভবিষ্যত্ অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে জীবন থেকে ছুটি নিলেন। হয়তো শিশু মেয়ের হতাশাভরা করুণ মুখটি আর সহ্য হয়নি, অন্ধকার ভবিষ্যেক অবশ্যম্ভাবী দেখতে পেয়ে, দেনায় দায় মেটানোর ভয় তার উপর চেপে বসে। ফলে নিতান্ত অসহায় লিয়াকতের সামনে এই আত্মঘাতী হওয়া ভিন্ন কোনো পথ ছিল না। এক লিয়াকতের খবর পত্রিকার কল্যাণে সবাই জানতে পেরেছেন। আরও কত লিয়াকত খবরের অগোচরে থেকে গেছেন কে জানে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) দেয়া তথ্যমতে, ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরে পুঁজিবাজারে সুবিধাভোগী গ্রাহক (বিও) হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৪৮টি, যা বাজার পতনের পর এক বছর ব্যবধানে ২৮ লাখ ৬ হাজার ৩৯৬টিতে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং হিসাব বলছে এই এক বছরে কমেছে ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৩৫২টি বিও হিসাব। নতুন করে সৃষ্ট দুর্বিষহ এসব দরপতনের ঘটনা এখন দেশের সব মানুষের কাছে শেয়ারবাজার এক আতঙ্কের নাম। গত বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক ৬.৪২ শতাংশ বা ২৬৬.৭৮ পয়েন্ট কমে ৩৮৮৭.১৮ পয়েন্টে নেমে যায় বলে আমার দেশসহ প্রতিটি জাতীয় দৈনিকের খবরে প্রকাশ। এটি বিগত বছর তিনেকের মধ্যে সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান। গত ১১ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসে ডিএসই’র সাধারণ সূচক কমেছে ১৩৩৫ পয়েন্ট, যা ১১ জানুয়ারিতে ডিএসইর মোট সূচকের ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা ২০১০ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ ধস। এটি শেয়ারবাজারকে ক্রমেই একটি মৃতপুরীতে পরিণত করলেও সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্যোগ না থাকায় এর অবস্থা ক্রমাগত ভয়াবহ থেকে ভয়াবহতম হচ্ছে। শেয়ারবাজারের এই দরপতন রোধে কোনো উদ্যোগ না থাকলেও একটি কাজ সরকারকে বেশ নিষ্ঠার সঙ্গেই করতে দেখা গেছে, সেটি হচ্ছে— বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ কিংবা মানববন্ধনকে কঠোরহস্তে দমন করা।
আমরা জেনেছি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের (এপিজি) চাপে পড়ে আয়কর আইন সংশোধনীর পাশাপাশি শেয়ারবাজারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিনিয়োগের বিষয়ে জানুয়ারির শুরুর দিকে বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। এটি অনেকাংশে নতুন বছরের শুরুতে ধস নামার গতিকে ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে সাম্প্রতিককালে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ-উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শেয়ারবাজারের বাইরে রাখার নীতিতে নানাবিধ শর্ত জুড়ে দেয়। পাশাপাশি মানি লন্ডারিং ও অর্থের অসাধু ব্যবহার রোধকল্পে আয়কর আইন ও মানি লন্ডারিং আইনের সংশোধনী আনার ব্যাপারেও জোর তাগিদ লাগাতে দেখা গেছে তাদের। এটিকে আরও জোরদার করে তুলতে এক বিলিয়ন ডলার বর্ধিত ঋণ সুবিধা (ইসিএফ) আটকে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়, যেটি আটকে গেলে বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে নানাক্ষেত্রে তোপের মুখে পড়তে হবে। অনন্যোপায় সরকার অবশেষে হঠকারী এসব শর্তও মেনে নিয়ে শুধু আইএমএফের ঋণ সুবিধা ধরে রাখতে আয়কর আইনে সংশোধনী আনতে বাধ্য হয়। পক্ষান্তরে এটি আরও কয়েক হাজার শেয়ার বিনিয়োগকারীকে রাস্তায় বসানোর পথ প্রশস্ত করে। আইএমএফের এহেন অবস্থানে এপিজির হর্তাকর্তারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেননি। তারাও বেশ ঘটা করে শুনিয়ে দেন বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং বা মুদ্রা পাচার রোধে প্রচলিত আইনটির সংশোধন করার নির্দেশনাটি। অন্যথায় বাংলাদেশকে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। এটির বাস্তবায়ন পক্ষান্তরে শেয়ারবাজারে অপ্রদর্শিত আয়ের অর্থ বিনিয়োগের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করে।
এসব ঘটনার নেপথ্যের ঘটনা মানুষ জানতে চায় না। তাদের জেনে কোনো লাভও নেই। ওয়ান-ইলেভেনের পর এদেশের মানুষ একটি আকাশচুম্বী দাবি নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে নির্বাচিত করে ক্ষমতায় বসিয়েছে। দাবির ভারে মনে হয় সরকার এখন নুয়ে পড়েছে। শুধু দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের সংস্থানেই চারদিকে যে হাহাকার রব উঠেছে, সেটি থামানোর দায়িত্ব সরকারের। কারণ মানুষ তাদের নির্বাচিত করে ক্ষমতায় বসিয়েছে। পক্ষান্তরে শেয়ারবাজারের এই ধস লিয়াকতের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে লাশের মিছিল বা শবযাত্রার সূচনা করেছে সেটির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আখেরে ফল ভালো হবে না—এটা সহজেই বোঝা যায়।
বিশ্ব এখন আরব বসন্তের জ্বরে পুড়ছে। স্বৈরাচারের প্রতিবাদে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ার ‘সিদি বওজিদ’ শহরের ফল বিক্রেতা ২৬ বছরের তরুণ মুহাম্মদ বওকুজিজি প্রথম রুখে দাঁড়ান। পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদে নিজ শরীরে আগুন লাগিয়ে মৃত্যু আলিঙ্গন করে হয়েছেন ইতিহাসের মহানায়ক। এই মৃত্যু উপলক্ষ করে আরব বিশ্বে আসে পরিবর্তনের ঢেউ, পতন ঘটে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকদের। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ১৯৬৮ সালে সাবেক চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগ সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সূচনা করে ‘প্রাগ বসন্ত’। এর সঙ্গে মিল রেখে সমাজবিজ্ঞানীরা আরব বিশ্বের পরিবর্তনের নাম দেন ‘আরব বসন্ত’। পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই নিউইয়র্কে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন গড়ে তোলে অধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষ, যা আজ প্রায় তিন মাসের বেশি সময় পার করতে চলেছে। সেই সঙ্গে ওয়াশিংটনের ফ্রিডম প্লাজায় সমবেত হওয়া বিক্ষোভকারীরা পার করতে চলেছে প্রায় আড়াই মাস। রক্তচোষা পুঁজিবাদ যেমন ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর জন্ম দিয়ে বিশ্ব তোলপাড় করছে, তেমনি আরব বিশ্বে ক্ষমতাসীন সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব অনেকাংশে কাজ করেছে ‘আরব বসন্তের’ সূচনায়। পাশাপাশি বেকারত্ব, কর্মক্ষেত্রে অসমতা, অর্থনৈতিক মন্দা প্রভৃতিও এর হালে পানি দেয়, যার প্রতিটিই মানুষের অধিকার সংশ্লিষ্ট। শেয়ারবাজারের এ ধস যে লাশের মিছিল সূচনা করেছে এটি অব্যাহতভাবে এগিয়ে গেলে কত ভয়াবহ হবে সেটি সচেতন মানুষ মাত্রই অনুমান করেন। যারা নিজের জীবনের কাছে পরাজিত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতে শুরু করেছেন, তাদের দ্বারা সব সম্ভব। তিউনিসিয়ার একজন বওকুজিজির শরীরের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে গ্রাস করেছিল পুরো আরব বিশ্বকে, যার আঁচ থেকে রেহাই পায়নি বহির্বিশ্বও। এই উত্তাপ এখন বাংলাদেশে ছড়ানোর আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন সরকারের।
পুঁজিবাজারের ধসের প্রতিবাদে নিউইয়র্কের জুকোটি পার্কে তাঁবু বিছিয়ে কিংবা খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ অবস্থান করে প্রতিবাদী মানুষ একসঙ্গে হাড় কাঁপানো শীতে ঠকঠক করে কেঁপেছেন, অন্যদিকে কাঁপাতে সক্ষম হয়েছেন পুরো বিশ্বকে, তথা স্বৈরতান্ত্রিকতার মসনদকে। তবে এখানে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন প্রতিহত করার কোনো চেষ্টা না করে বরঞ্চ মানুষের দাবি-দাওয়া যতদূর পারা গেছে মেটানোর চেষ্টা করাতে পরিস্থিতি আরব বসন্তের মতো অতটা ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি। অবহেলা, নির্যাতন আর সীমাহীন অবিচার অধিকারবঞ্চিত অসহায় মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটালে যে কী হয় আরব বসন্ত আজ তার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এখন ক্রান্তিকাল উপস্থিত হওয়ার আগেই সরকারের উচিত এই লাশের মিছিলের লাগাম টেনে ধরা। এখানে একমাত্র পথ শেয়ারবাজারে ধসের পেছনে বিদ্যমান কারণগুলো চিহ্নিত করে আশু পদক্ষেপ নেয়া। শেয়ারবাজারে সর্বস্বান্ত মানুষগুলোর মনের আগুন দাবানলে পরিণত হওয়ার আগেই তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদানের একটি ব্যবস্থা নেয়া হোক। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাংলাদেশের মানুষ কোনো অরাজকতাকে মেনে নেয়নি, এখনও নেবে না। আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেশের গণতন্ত্র সমুন্নত রাখুক। অবশ্যই এ প্রক্রিয়া হোক একমাত্র গণতান্ত্রিক পথেই, এখানে কোনো ফ্যাসিস্ট আচরণ কাম্য নয়। শেয়ারবাজারের এই নিঃস্ব মানুষগুলোকে ফটকাবাজ বলাতে কোনো সমাধান নেই। প্রয়োজন তাদের এ অবস্থার সৃষ্টির পেছনে যেসব কুশীলব রয়েছে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা। নয়তো লিয়াকতের মাধ্যমে যে লাশের মিছিল শুরু হয়েছে তা সহজে থামবে না।
দৈনিক আমার দেশ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২
লেখক : ব্লগার ও কলামিস্ট
aurnabmaas@gmail.com

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s