এই সমাজে নিশাত বা ওয়াসফিয়ার এভারেস্টে উইঠ্যাও লাভ নাই । চান্দে গিয়াও লাভ নাইক্যা


একদিন একটি পিচ্ছি দৌড়াতে দৌড়াতে একটি ডিপার্টমেন্টার স্টোরে ঢুকলো। সেলসম্যান বললো বাবু কি চাই তোমার। পিচ্চিটা বললো ভাইয়া আমার একটি স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রয়োজন । সেলসম্যানরা পরস্পর চাওয়া চাওয়ি শুরু করলো। কিন্তু পিচ্চিটার কোনো বিকার নাই। সে যথারীতি দাঁড়িয়ে রইলো। তখন সেলসম্যানরা বললো বাবু তুমি এটা কি করবে ??

পিচ্চির নির্বিকার উত্তর কেনো আমার ছোট বোনকে পরাতে হবে। সেলসম্যানদের হা করা অবস্থায় পিচ্চিটা বলেই চলেছে কেনো এড দেখেননি। মেয়েরা এই বিশেষ ন্যাপকিন পরে কেমন দৌড়াদৌড়ি আর লাফালাফি করে। আমার বোনটার বয়স ছয়মাস হয়ে গেছে। হাটতে পারেনা। ওকে এটা পরিয়ে দেখতে চাই ও কেমন হাটতে পারে 😦

অনেকটাই অড থিমের এই জোকসটা অনেকে অন্যভাবে নিতে পারেন। আমি সেদিকে কেয়ার করছি না। আসলে বোঝাতে চাইলাম মিডিয়ার রেপ্রিজেন্টেশন এর কথা। ঐ পিচ্চির মনে তৈরি হওয়া ন্যারেটিভটির কথা। যা কিনা পিচ্চিটার সরল মনকে বেশ গরলে নাড়া দিয়েছে।

প্রখ্যাত তাত্ত্বিক রোলাঁ বার্থের রচয়িতা মৃত্যুকে বাদ দিয়ে সরাসরি রেপ্রিজেন্টেশন নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে চিন্তাকাঠামোতে চলে যাই। যেখানে বার্থ বলতে চেয়েছেন একটি আলোকচিত্রে তাই বাস্তব হয়ে ওঠে যা ওঠাতে চাওয়া হয়। গতকাল দৈনিক প্রথম আলোর ট্যাবলয়েডে ছাপানো কিছু ছবি থেকে এই কথাটাই ঘুরে ফিরে আসে। বলতে চাইছি আমাদের দেশের নারী পর্বতারোহী যিনি মিডিয়ার/প্রথম আলোর কল্যাণ্যে অপর জনকে ছাপিয়ে খবরে আসলেন। অন্যভাবে বলতে চাইছি পর্বতারোহন যাকে সেলিব্রেটি বানিয়ে তুললো। এখানে দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে রেপ্রিজেন্টেশনের পরিসরে তার প্রাতকৃত্যকেও ঝাঝালো বাক্যালংকার আর রসালো উপমায় উপস্থাপনার বাকি নেই। বলতে চাইছি পর্বতারোহী ওয়াসফিয়ার কথা। সাথে স্মরণ করছি তার পূর্বে এভারেস্টে উঠেও মিডিয়ার পাতা থেকে রেস্টে চলে যাওয়া নিশাত মজুমদারের কথা।

একজন নিচ্ছে রেস্ট, অপরজনের জন্য অবশ্যই তা অল দ্য বেস্ট।

মিডিয়া তাকে পাহাড়ের চুড়ায় তুলেছে ভালো,

এখন তার শাড়ি, বর্ণিল টি-শার্ট, জিন্স, কানের দুল, নাকের ফুল থেকে শুরু করে পারলে অন্তর্বাস পর্যন্ত নিলামে তুলতে বাকি রাখেনি। আর মার্কেটিং পরিসরে জ্ঞাতসারেই তাকে বানানো হয়েছে পণ্যে। কেউবা বাহবা দিচ্ছে। কাউকে দেখা যাবে ঐ ভাবে ওয়াসফিয়ার মতো পুরুষালি কাটিং চুল তৈরির প্রস্তুতি নিতে। কেউবা সকালে উঠে রোগা শরীরে ইয়োগা শুরু করবে, পেপে বা করল্লার জুস খেতে চেষ্টা করবে। হয়তো চ্রম ফ্যান্টাসিতে ভুগতে থাকা কোনো বালিকা একটা রশি ঝুলিয়ে বিশ তলা থেকে বেয়ে নামতে গিয়ে ঠ্যাং ভাংবে।

আসলে ফ্যান্টাসি আর  লেখার ভাষায় চিৎকার চেচামিচি আর ম্যাৎকারে পুরো দুনিয়া সরগরম থাকবে। আমরা যারা দু’কলম লিখতে চেষ্টা করি বা সময় নস্ট কারী ব্লগার তারাও লিখে যাবো কোনো লাভ নেই। এটা হয়ে গেছে সাংস্কৃতিক অনুশীলন আর বাণিজ্যিকীকরণের সবথেকে বড় মাধ্যম।

ফ্রাদের্নো দ্য সসসিউঘ এর বর্ণনায় বিষয়টির হালকা দৃষ্টিপাত থাকলেও আজো সুস্পষ্ট পরিসরে  বিষয়টির ব্যাপ্তি ঘটেনি। মানুষ চিৎকার আর আন্দোলনের কানাগলিতে মাথা ঠুকে মরলেও তার পূর্ণতা পায়নি বাস্তবতায়। শুরু একের পর এক কুমীরের রচনা লেখা হয়েছে। তার নাম দেয়া হয়েছে নারীবাদ। আর কিছু নারীসুলভ মানসিকতার দুর্বলচিত্তের পুরুষ, পুরুষসদৃশ মানসিকতার স্বামী খেদানো নারী পুরুষ জাতিকে গালি দিয়ে নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে চেষ্টা করেছে। মিডিয়ার বাজার থেকে আদায় করেছে নারীবাদী নামক সার্টিফিকেট। অন্যদিকে দুর্বলচিত্তের পুরুষরাও তাদের সাথে সুর মিলিয়ে গান ধরেছে নারী অধিকারের। ওদিকে দিনের পর দিন প্রচার মাধ্যম আর পুজিবাদ নারীকে চুপিসারে কান ধরে টানতে টানতে প্রতিবাদের নামে রাস্তার নামানোর নামান্তরে তৈরি করেছে ভোগপণ্যে। তাদের পণ্যের পাশাপাশি তাদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেখানে শনাক্ত করার সত্যি কঠিন হয় কোনটি আগে। নারী না পণ্য।

ফ্যাশন শো থেকে শুরু করে বক্তৃতার মঞ্চ, বিমান বালা থেকে শুরু করে আলকাত্রার মডেল, কৃষিক্ষেত্র থেকে শুরু করে সেই যুদ্ধজাহাজ প্রতিক্ষেত্রেই নারী বলতেই এক কুমীরের রচনা। কিন্তু কেনো ??? এর সরলীকৃত উত্তর হবে বাণিজ্য আর পুজিবাদ। কিন্তু বিষয়টি অতো সরলীকৃত নয়। এখানে পাব্লিক পরিসরে উপস্থাপিত প্যাটাসিস্টিক ইমেজও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাড়িয়েছে।

হ্যা তাই। অর্জনকে কাজে লাগিয়ে কারো কারো মধ্যে কাজ করে সেলিব্রেটি বনে যওয়ার আকুল কামনা। এই কামনা তারা চরিতার্থ করে নানাভাবে। কখনো নিজেদের খোলামেলা উপস্থাপনায়। হয়তো পত্রিকায় পাতায় কিংবা ক্যামেরার সামনে………

এই কেনোর উত্তর খুজতে গেলে দেখা যায় নানাবিধ আলোচনা। কেউবা এখানেও সুন্দরভাবে গরুর রচনার সদৃশ বয়ান তুলে ধরেন। কেউব নারীবাদী ডিসকোর্সকে অন্য দিকে থেকে কিছু উপমার মাধ্যমে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটি ধোয়াশার সৃষ্টি করেন। এখানে তাদের বর্ণনা আর বাচন ভংগিতে নারী আর তার অর্জন হয় সাধারণীকৃত। বিস্তৃতভাবে বললে নারী হিসেবে অবস্থান করার নারীত্বের বদলে তার অর্জনকে নাই করে দেয়া হয়। এই একই ঘটনা ঘটেছে ওয়াসফিয়ার ক্ষেত্রে।

আজ ওয়াসফিয়া নাজরীন এভারেস্ট জয় করেছে। নিশাতও করেছে। একজন আগে একজন পরে এই যা। তবুও মিডিয়ার কল্যানে একজন এগিয়ে গেছে। অন্যজন হয়ে পড়েছে অবহেলিত ও প্রান্তিক। কিন্তু একটা বিষয় বিশ্লেষণ করাটা জরুরী। তাঁরা দুজনই নারী। আর দু’জন এভারেস্টেই উঠেছেন। এখানে রেপ্রিজেন্টেশন বৈকল্য কেনো ??
এই কেনোর ডিসকোর্সকে বোঝার ক্ষেত্রে কিছু এজেন্সী মূখ্য হয়ে ওঠে যার বিশ্লেষণ অনেক অনেক বেশি জরুরী।

ঠিক সে আজ বাংলাদেশের পাশাপাশি এদেশের নারীকূলের গর্ব। কিন্তু যদি সত্যি সাম্যবাদী দৃষ্টিতে বলতে হয় প্রথম বাক্যে আমার থেমে যাওয়া উচিত।

তবুও থামি নাই গরুর রচনা লিখতে অভ্যস্ত  নারীবাদীরা আমার লেখাকে চ্রম পুরুষালি বলে ধিক্কার দিবেন। পক্ষান্তরে বস্তুবাদী বাণিজ্যের সত্তার আড়ালে বাস্তবতা নাই করে দিতে সচেষ্ট হবেন। তাই বলছি ওয়াসফিয়া নারী জাতির ও গৌরব। কিন্তু এখানে তার অর্জনকে ফুটিয়ে তুলতে গেলে নতুন করে তার নারী সত্তার নির্মান কেনো। এখানে ওয়াসফিয়া যদি একটি স্ক্রিণ টি-শার্ট পরে পিঠ বাকিয়ে ছবি নাও তুলতো তবুও সে আমাদের দেশের একজন পর্বতারোহী হিসেবে সম্মানের দাবিদার ছিল। তাকে ইয়োগার ভংগিতে না বসলেও সবাই চিনতো জানতো। সে মাটির দুল না পরলেও এভারেস্ট উঠার ক্ষেত্রে তা কোনো বাধা হতো না। তবুও তার করা হয়েছে। এখানে নারী চরিত্রের দৃশ্যায়নে সুকৌশলে নাই করা হয়েছে অর্জনকে।

একমাত্র ধিক্কার বাদে এই বাণিজ্যিক চিন্তার কোনো সুরাহা নেই। তাইতো বলতে হয়  এই সমাজের অচলায়তন ভাংগার তীব্র বাসনায় যারা নারীদের স্বাধীনতার কর্ণধার হিসেবে দাবি করতে লাগে তখনি বোঝা উচিত ছিল এর ভিতরের উদ্দেশ্য। আমি বলছি সেটা আর কিছু নয় নারীর নারীসত্তার নির্মাণ আর ভোগ্যপন্য হিসেবে উপস্থাপন করা পক্ষান্তরে ভোগের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা। কিছু না হলে অন্তত চোখের ক্ষুধা নিবৃত করা। তাইতো অভিনেতা-অভিনেত্রী,  টিভি সংবাদ পাঠিকা, কবিতা আবৃতিকার, শিক্ষিকা, ডাক্তার, প্রকৌশলী আর এভারেস্ট বিজয়ী যাই হোক তাকে নারী করে তুলতে হবে। আর একমাত্র মাধ্যম শারীরিক উপস্থান। তাইতো এভাবে ওয়াসফিয়ারা পিঠ বাঁকা করে ক্যামেরার সামনে দাড়িয়ে ভেংচি দেয়। আর তাতে লেংচি খেয়ে নিশাতরা ঝরে পড়ে।

তাই এই সমাজে নিশাত বা ওয়াসফিয়ার এভারেস্টে উইঠ্যাও লাভ নাইক্যা। চান্দে গিয়াও লাভ নাই ওগো নিয়া খবর তৈরির জন্য উপযুক্ত গরুর রচনা তো এই সমাজেরই মুখস্থ্। আর ল্যাদাইয়া ব্লগ ফেসবুক অস্থির করার মানুষের অভাব নাই।

কোনো লম্পট পত্রিকার ছবি দিয়ে পোস্ট করবে। তার পোস্টে হিট বাড়বে। কেউবা মন্তব্য করবে ওহ.. কি কিউট. ও হোয়াট আ ড্যাশিং পোজ। কেউবা বলবে আস্ত ফকিন্নির মতো লাগছে ব্লা ব্লা ব্লা……….

এখানে খুজে দেখেন এভারেস্টের কথা কেউ ভুলেও উচ্চারণ করেনি।…….

এটাই মিডিয়ার রেপ্রিজেন্টেশনের নির্মমতা।

Advertisements

4 thoughts on “এই সমাজে নিশাত বা ওয়াসফিয়ার এভারেস্টে উইঠ্যাও লাভ নাই । চান্দে গিয়াও লাভ নাইক্যা”

  1. মানুষের কর্ম যদি স্বসার্থে ব্যয় হয় তবে এর থেকে আর কি আশা করা যায়। শুধু নারী কেন, মানুষ যাকে মধ্যমণি করতে চাই সেই হয়ে যায় পণ্য…

  2. পোস্টের ধারণা আর অভিমতের সাথে একমত না হবার তেমন কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। উপস্থাপনা অতি চমৎকার!! ভালো লেগেছে খুব।
    শুভেচ্ছা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s