নীলনদ মমি আর পিরামিডের দেশ


ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস ছিলেন গ্রিস দেশের অধিবাসী। প্রাচীন সভ্যতা দেখার আকর্ষণে একবার মিশরে আসেন। অবাক বিস্ময়ে মিশরীয় সভ্যতার নানা অবদান দেখে বুঝতে পেরেছিলেন এই সভ্যতা গড়ে তোলার পেছনে নীলনদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই তিনি মন্তব্য করেছেন ‘মিশর নীলনদের দান’। প্রকৃতপক্ষে নগর সভ্যতা গড়ে তুলতে মিশরকে প্রথম পথ দেখিয়েছে নীলনদ। নবোপলীয় যুগে মিশরের কৃষকরা কৃষিকাজ করতে গিয়ে নীলনদকে গভীরভাবে লক্ষ করেছে। তারা কখনো নীলনদকে দেখেছে জীবনের প্রতীক হিসেবে, কখনো বা ভয়ঙ্কর দৈত্য রূপে। নীলনদের জল সেচ করেই কৃষক ফসল ফলাতো। তখন নীলনদকে কৃষক দেখতো আশীর্বাদ হিসাবে। কিন্তু যখন বন্যার জল দু’কূল উপচে পড়তো তখন ভয়ার্ত কৃষক ভাবতোÑবুঝি নীলনদ কোন রাক্ষুসে দৈত্য। তীব্র স্রোতে কেমন গ্রাস করে নেয় লকলকে বেড়ে ওঠা ফসল।  

মানুষ সমস্যা-সঙ্কটের মুখে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি কখনো। সঙ্কটের মোকাবিলা করতে গিয়ে উদ্ভাবন করেছে নতুন নতুন পদ্ধতি। এবারও মিশরীয়রা এগিয়ে এলো। তারা বন্যা ঠেকানোর জন্য বাঁধ দেওয়ার পদ্ধতি উদ্ভাবন করলো। আর বন্যার পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করলো খাল কেটে। যাতে শুকনো মৌসুমে তা কৃষিজমিতে ব্যবহার করা যায়। এসবের মাধ্যমে প্রাচীন মিশরে গড়ে ওঠে চমৎকার সেচ ব্যবস্থা।

রাণী নেফরাতিতির মুখমণ্ডল

৫০০০ থেকে ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়ের মিসরকে প্রাক-রাজবংশীয় যুগ বলা হয়। এ সময় মিশর কতগুলো ছোট ছোট নগররাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। এগুলোকে বলা হতো ‘নোম’। প্রাচীন মিশরীয়রা ছিল সঙ্কর জাতি। আকারে বেঁটেখাটো, গায়ের বর্ণ কালো, লম্বাটে মাথা, কালো চুল, গভীর চোখ এবং নাক ছিল কিছুটা বাঁকা। আফ্রিকা ও আরব অঞ্চলের সেমেটিক রক্তের মিশ্রণ ছিল তাদের গায়ে। এছাড়া প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার জনগোষ্ঠীর মিশ্রণও দেখা গিয়েছে। ধীরে ধীরে সেমেটিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে এরা।

প্রাক-রাজবংশীয় যুগেই মিশরীয়রা খাল খনন ও সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেচ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় অনেক নতুন জমি চাষের আওতায় আসে। কৃষি উপকরণের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে কারিগর শ্রেণী এসেও বসতি স্থাপন করে। একে একে নানা পেশার মানুষ জড় হয়। ফলে নীলনদের কাছাকাছি সংগঠিত সমাজ কাঠামো গড়ে ওঠে। এভাবে নগররাষ্ট্র নোমগুলো একত্রিত হয়ে জন্ম দেয় রাষ্ট্রের। এ যুগে কৃষিব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে লিখনপদ্ধতিরও প্রাথমিক উন্মেষ ঘটে। লেখার মাধ্যম হিসাবে প্যাপিরাস নামের এক ধরনের গাছের কান্ড থেকে কাগজ ও কালি তৈরি হয়। কৃষির প্রয়োজনে বন্যার তারিখ ও অন্যান্য হিসাব ঠিক রাখার জন্য তৈরি হয় দিনপঞ্জী। এরই পথ ধরে ৪২৪১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরের মানুষ ক্যালেন্ডারের উদ্ভাবন করে। এটিই ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্যালেন্ডার।

মিশরীয় চিত্রকলা

৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ‘মেনেস’ নামের এক রাজা সমগ্র মিশরকে একত্রিত করে একটি একক রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। দক্ষিণ মিশরের ‘ মেম্ফিস’ হয় এই রাষ্ট্রের রাজধানী। এভাবে মিশরে রাজবংশীয় যুগের সূচনা ঘটে।
মিশরের রাজারা ছিলেন খুব ক্ষমতাশালী। তাঁদের উপাধি ছিল ‘ফারাও’। তাঁরা নিজেদের সূর্যদেবতার বংশধর মনে করতেন। মিশরীয় ‘পের-অ’ শব্দ থেকে ফারাও শব্দটি এসেছে। ‘পের-অ’ শব্দের অর্থ ‘বড় বাড়ি’ বা ‘রাজকীয় বাড়ি’। অর্থাৎ রাজা বড় বড় প্রাসাদে বাস করতেন বা অগাধ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বলেই তাঁকে ‘ফারাও’ বলা হতো। ফারাও পদটি ছিল বংশানুক্রমিক। ফারাওয়ের পুত্রই হতেন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী।

প্রাচীন মিশরে পেশার দিক থেকে কয়েক শ্রেণীর মানুষ ছিল ক. রাজপরিবার, খ. পুরোহিত, গ. অভিজাত, ঘ. লিপিকর, ঙ. ব্যবসায়ী, চ. শিল্পী এবং ছ. কৃষক ও ভূমিদাস। তবে ধনী এবং দরিদ্র এই দুই শ্রেণী প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। প্রাচীন মিশরের ধনীরা সুরম্য প্রাসাদে বসবাস করতো। তাদের খাদ্য তালিকায় ছিল বিলাসী দ্রব্য। তারা বহুমূল্যবান পোশাক ও অলঙ্কার পরতো। আর দরিদ্রের অবস্থা এখনকার মতোই জরাজীর্ণ ছিল। শ্রমিকরা ঘনবসতিপূর্ণ কাদামাটির ঘরে বসবাস করতো। কৃষকদের আর্থিক অবস্থা ছিল অপেক্ষাকৃত ভালো।

মিশরীয় স্ফিংস

কৃষির উপর নির্ভর করেই মিশরের অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল। মিসরের উর্বর ভূমিতে প্রচুর ফসল জন্মাতো। ৪৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরীয়রা লাঙলের ব্যবহার শুরু করে। ফলে কৃষির ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়। এ সময়ে প্রচুর তুলা, গম, যব, পীচ এবং পেঁয়াজ উৎপন্ন হতো। উৎপন্ন ফসলের ১০ থেকে ২০ ভাগ ফারাওকে কর হিসাবে দিতে হতো। জমির মূল মালিক ছিল অভিজাতগণ।  বাণিজ্য ছিল মিশরীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধারা। ক্রীট দ্বীপ, ফিনিশিয়া, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার সঙ্গে মিসরীয়দের বাণিজ্য বিনিময় হতো। সাধারণত এ সমস্ত দেশে তারা গম, লিনেন কাপড় ও মাটির পাত্র রফতানি করতো। মিশরীয়রা বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতো স্বর্ণ, রৌপ্য, হাতির দাঁত এবং কাঠ।
নগর পত্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল মিশরে। প্রাচীন মিশরের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পসমূহ হচ্ছে পাথর শিল্প, নৌযান তৈরি, মাটির পাত্র, কাঁচ ও বয়ন শিল্প।শেষদিকের ফারাও ইখনাটনের সময় পুরোহিতরা দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়ে। ক্ষমতা ও লুণ্ঠিত দ্রব্যের জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে থাকতো। যোদ্ধা এবং যারা লুটের মাল নিয়ে আসতো ফারাওগণ তাদের পুরস্কৃত করতেন। পুরোহিতরা দেশের শিল্প কারখানার উপর কর্তৃত্ব আরোপ করতে থাকেন এবং ধনসম্পদ জমানোতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এভাবে দিনে দিনে মিশরীয় অর্থনৈতিক কাঠামো ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।

পরবর্তি কয়েকপর্বে শেষ হবে। ………………………………………….

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা : অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ স্যার।

Advertisements

5 thoughts on “নীলনদ মমি আর পিরামিডের দেশ”

    1. বর্ণণার কৃতিত্ব আমার শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ স্যারের পাওয়ার কথা। তথ্যগুলো সব ওখানথেকেই সংগৃহীত।

    1. ধন্যবাদ নিয়াজ মাওলা ভাই। আমি সময় পাচ্ছি না। আমার বইটা লেখা শেষ হলে সামনে আমার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে। তখন ফ্রি হবো। ব্লগে নিয়মিত সময় দিতে পারবো। পরীক্ষায় সময় সবথেকে রিলাক্সে ব্লগিং করা যায়। লেখাপড়া বাদে অন্য ঝামেলা থাকেনা তখন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s