সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী জীবন ও কর্ম


উনিশ শতকের শেষভাগে বাঙালি মুসলমান সমাজে নবজাগরণের যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল তাতে সমকালীন বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই যে সমকালীন আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ নবজাগরণের প্রয়োজন ছিল অপরিহার্য। এটাও অনস্বীকার্য যে, এ প্রচেষ্টায় সুফল ফলেছিল এবং বাঙালি মুসলমানের সার্বিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আমরা ১৮৫৭ সালের ‘সিপাহি বিপ্লব’ বা উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধের কথা স্মরণ করতে পারি।
এটা ঠিক যে, এতে মুসলমানদের ভূমিকা ছিল প্রধান ও অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক, কারণ তারাই ছিলেন শাসক জাতি এবং ক্ষমতা হারানোর জন্য তাদের ভেতরে বিরাজ করছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ। এর বহিঃপ্রকাশ এর আগে নানাভাবে ঘটেছে। কিন্তু এ বিদ্রোহের বারুদে যিনি সর্বপ্রথম অগ্নিসংযোগ করেছিলেন, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় হিন্দু সিপাহি—মঙ্গল পাণ্ডে।
এ যুদ্ধে হিন্দু সমাজের অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র একটি অংশও স্বাধীনতা চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে পরাধীনতার শিকল ছিঁড়তে জীবন পণ করেছিলেন। তাই এটি হয়ে উঠেছিল ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানের প্রথম সম্মিলিত স্বাধীনতার লড়াই। কিন্তু ইংরেজদের অদম্য সাহস, অপরিসীম ধৈর্য, অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তি ও অতুলনীয় কূটকৌশলের কারণে এটি সফল মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি। লক্ষণীয় যে, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশিতে তথাকথিত যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটলে বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের সূচনা ঘটে। শাসনক্ষমতার পরিবর্তনে একচেটিয়া ক্ষতির শিকার হয় গোটা মুসলমান সমাজই। উল্লেখ্য, ভারতে মুসলমান শাসনামলে বাঙালি মুসলমান দিল্লির দরবারে যেমন, তেমনি মুর্শিদাবাদ দরবারেও কখনও কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিল বলে জানা যায় না। বাঙালিরা যে অঞ্চলের অধিবাসী, সেই সুবে বাংলায়ও নবাব মুর্শিদ কুলি খান থেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পর্যন্ত সময়কালে তাদের স্বগোত্রীয়রাই সব প্রধান পদগুলোতে নিয়োজিত ছিলেন। তাই বলা যায়, বাঙালি মুসলমান সরাসরি শাসনক্ষমতার সঙ্গে তেমনভাবে কখনোই সম্পৃক্ত ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশে মুসলিম শাসনের কারণে তারাও প্রকারান্তরে ছিল সুফলভাগী। পলাশি যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে তাদের এ অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে।
নতুন শাসক ইংরেজ স্বাভাবিকভাবেই তাদের দীর্ঘকালের প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। একে শাসক জাতির মর্যাদা হারানো, তারপর নয়া শাসকের বিভিন্ন বৈরী পদক্ষেপ গোটা ভারতীয় মুসলিম সমাজের মতো বাঙালি মুসলমানকেও ইংরেজদের প্রতি প্রচণ্ডভাবে ক্ষুব্ধ, শত্রুভাবাপন্ন ও বিদ্বেষপরায়ণ করে তোলে। এ কারণেই ইংরেজদের ১৮ শতকে মজনু শাহ্, উনিশ শতকে তিতুমীর ও হাজী শরীয়তুল্লাহ্ প্রমুখ বিদ্রোহী নেতাদের মোকাবিলা করতে হয়। ১৮৫৭ সালের বিপ্লবে সেই সুপ্ত বেদনা ও অপমানের প্রতিবিধান করতে সব মুসলমান না হলেও একটি বিরাট অংশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল ও নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল। বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর এর পুরো দায় চাপে
মুসলমানদের ওপরই। উপমহাদেশব্যাপী মুসলমানদের বিরুদ্ধে চলে ইংরেজদের কঠোর দমনাভিযান। এ সময় মুসলমানদের অস্তিত্বই প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়ে। তাদের এ দুর্দশা ও দুরবস্থা দেখে ইংরেজের সঙ্গে বিরোধিতা নয়, সহযোগিতার মাধ্যমে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি মুসলিম নবজাগরণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন উত্তর ভারতের দূরদর্শী মুসলিম নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-৯৮)। এ সময় মুসলিম সমাজের উন্নতির লক্ষ্যে আধুনিক শিক্ষা তথা ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম অনুধাবন করেন কলকাতার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩)। তিনি আদতে ছিলেন তত্কালীন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার অধিবাসী। অচিরেই কাজ শুরু করেন তিনি। ১৮৬৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি।’ মুসলিম সমাজের উন্নতি বিধান এবং তাদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা চালুর জন্য আরেকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ সময় এগিয়ে আসেন। তিনি হলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি স্যার সৈয়দ আমির আলী (১৮৪৯-১৯২৮)। তাঁর বাবা অযোধ্যার মানুষ, তবে বসতি স্থাপন করেন হুগলিতে। সৈয়দ আমির আলীর বেড়ে ওঠা ও কলেজজীবনের শিক্ষালাভ সেখানেই। পরে কলকাতায় উচ্চ শিক্ষাগ্রহণসহ জীবনে ব্যাপক প্রতিষ্ঠালাভ করেন তিনি। মুসলমানদের কল্যাণসাধনের উদ্দেশ্যে ১৮৭৮ সালে তিনি ‘ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
উল্লিখিত ব্যক্তিদের শিক্ষাকেন্দ্রিক জাগরণ প্রচেষ্টা শুরুর অব্যবহিত পর সাময়িকপত্র ও সাহিত্যের মাধ্যমে মুসলিম নবজাগরণ প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। উল্লেখ্য, সাময়িকপত্রের মতো সাহিত্যেও মুসলমানদের আত্মপ্রকাশ ঘটে হিন্দু সম্প্রদায়ের পর। বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, উনিশ শতকের প্রথম ভাগে শেখ আলীমুল্লাহ সম্পাদিত ‘সমাচার সভারাজেন্দ্র’ (১৮৩১) ও রজব আলী সম্পাদিত ‘জগদুদ্দীপক ভাস্কর’ (১৮৪৬) নামক দু’টি পত্রিকার মধ্য দিয়ে সাময়িকপত্রের জগতে মুসলমানদের আবির্ভাব ঘটে। এ দু’টি পত্রিকাই ছিল স্বল্পস্থায়ী। এগুলোর পর প্রায় তিন দশক মুসলিম সমাজ থেকে আর কোনো পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর ১৮৭৩ সালে তত্কালীন পূর্ববঙ্গের মাদারীপুরের গোপালপুর গ্রাম থেকে ‘বালারঞ্জিকা’ নামে একটি মুসলিম সম্পাদিত পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সম্পাদকের নাম সৈয়দ আবদুল রহিম। মুসলিম সাময়িক পত্র-পত্রিকা প্রকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্যোগে এটিই প্রথম পত্রিকা। অবশ্য অধিকাংশ গবেষক সুবিখ্যাত ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ও ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত ‘আজীজন নেহার’ পত্রিকাকেই এ মর্যাদাটি দিয়েছেন। যা হোক, এরপর থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত মুসলিম উদ্যোগে মোটামুটি ২৭টি সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা জানা যায়। এসব পত্র-পত্রিকায় বহু মুসলমান লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে। শুধু তাই নয়, এসব পত্র-পত্রিকাকে অবলম্বন করে বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, শিক্ষা, সাহিত্য, আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মপরিচয় সন্ধানের নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়।
হিন্দু সমাজে ব্যাপক সাহিত্যচর্চা ও তার পরিণতিতে অজস্র ধারায় কাব্য-নাটক-উপন্যাস রচনার বিপরীতে মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের আত্মপ্রকাশ ও সাহিত্য সৃষ্টি শুরু হয় অনেক বিলম্বে। গদ্যে মীর মশাররফ হোসেন ও কাব্যে কায়কোবাদ উনিশ শতকের শেষ ভাগে প্রথম ও প্রধান দুই মুসলিম ঔপন্যাসিক ও কবি। উল্লেখ্য, মীর বিশ শতকের প্রথম দশক ও কায়কোবাদ চল্লিশের দশক পর্যন্ত সাহিত্য ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন।
২.
উনিশ শতকের শেষ দু’টি দশকে তত্কালীন মুসলিম পরিচালিত ও সম্পাদিত পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি ও গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে সেকালের বাঙালি মুসলিম লেখকরা আধুনিক বাংলা মুসলিম সাহিত্যের গোড়াপত্তন করেন। তারা একদিকে যেমন ইসলাম ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, আদর্শকে তাদের লেখায় উপস্থাপন করতে থাকেন, অন্যদিকে বিভিন্ন সংস্কারধর্মী, উদ্দীপনাময়, জাগরণমূলক লেখার মাধ্যমে সব দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া ও অনগ্রসর জাতিকে জাগিয়ে তুলতেও ব্রতী হন। এ কথা অনস্বীকার্য, বিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে জাতীয় জাগরণের যে প্রাথমিক প্রাণাবেগ দেখা যায়, তার কাজ শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের শেষার্ধের এ জাগরণকামী সাহিত্যকর্মীদের হাতে। বলতে হয়, সেদিনের জাতীয় জীবনের অন্ধকার সময়কালে তারা প্রজ্বলিত মশাল হাতে জাতিকে জেগে ওঠার পথনির্দেশনা দান করেছিলেন। আত্মস্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থই সেদিন তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। জাতি তাদের প্রদর্শিত সেই আলোর শিখা অনুসরণ করে সেদিন নবজাগরণের পথে অগ্রসর হতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। এ পথনির্দেশক ও মুসলিম বাংলা সাহিত্যের ভিত রচয়িতারা প্রকৃতপক্ষে সেদিন জাতির কাণ্ডারি হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই অবিস্মরণীয় কর্মী-পুরুষদের অন্যতম ছিলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী।
উনিশ শতকের প্রায় শেষভাগে ১৮৮০ সালের ১৩ জুলাই সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীর জন্ম হয় সিরাজগঞ্জে। পরাধীন দেশ, পরাধীন মানুষ, হতমান বাঙালি মুসলমান এবং অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলিম বাংলা—কৈশোরে নবজাগ্রত চেতনায় তার চোখের সামনে এ ছবিটাই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। বাঙালি মুসলমানের অসহায় অবস্থা তাকে বিচলিত করে তুলেছিল। এ জাতিকে বাঁচাতে হবে, জাগিয়ে তুলতে হবে—তখনই এ চিন্তা তার মনে বাসা বাঁধে। দেখা যায়, কৈশোরেই বাঙালি মুসলমানের যে কল্যাণ চেতনা তার হৃদয়ে জাগ্রত হয়েছিল, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে লক্ষ্যেই তার সব মেধা ও শ্রমসহ তিনি নিবেদিত ছিলেন। তার জীবনে এর বাইরে আর কিছু ছিল না। ফলে, শিরাজী ও বাঙালি মুসলিম নবজাগরণ হয়ে উঠেছিল সমার্থক। এ অকৃত্রিম ও নিখাদ বৈশিষ্ট্য সহযোগী অন্য সবার চেয়ে তাকে স্থাপন করেছিল এক পৃথক ও অনন্য মর্যাদার আসনে।
জাতির নবজাগরণ প্রচেষ্টায় শিরাজীর প্রধান মাধ্যম ছিল সাহিত্য। উনিশ শতকের একেবারে প্রান্তপর্বে কবি হিসেবে তরুণ শিরাজীর আবির্ভাব ঘটেছিল। বাঙালি মুসলমানের পরাধীনতা, দুরবস্থা, অবর্ণনীয় দুর্দশা তার ভেতরে যে দুঃসহ জ্বালার সৃষ্টি করেছিল, তাই কবিতার ছন্দকে আশ্রয় করে ‘অনল প্রবাহ’ (১৯০০) কাব্য হিসেবে রূপলাভ করে। এ কাব্যের রচনা ও প্রকাশ শিরাজীর উনিশ বছর বয়সে। তাই প্রথম তারুণ্যের বেপরোয়া ও উচ্ছ্বসিত আবেগ তার নিরাপস স্বাধীনতা চেতনা ও জাতীয় জাগরণের ঐকান্তিক ইচ্ছার সঙ্গে মিলে অগ্নিপ্রবাহে রূপ নেয়। লক্ষণীয় বিষয় যে, নিজে তরুণ শিরাজী তাঁর প্রথম কাব্যই উত্সর্গ করেছিলেন—তাঁর ভাষায় : ‘ইসলামের গৌরবের বিজয় কেতন / হে মোর আশার দীপ নব্য যুবগণ…’-কে অর্থাত্ তরুণদের। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল, আবার উত্থান লক্ষ্যে তারাই জগত্ বক্ষে খরপ্রবাহ প্লাবন বহাবে।
বস্তুত ‘অনল প্রবাহ’ কাব্যটি হচ্ছে শিরাজীর জীবনদর্পণ। তাঁর মানসচিন্তা, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য সবকিছুই এ কাব্যের কবিতাগুলোতে প্রতিবিম্বিত হয়েছে।
শিরাজী আরও কয়েকটি কাব্য রচনা করেন। এগুলো হলো : ‘উচ্ছ্বাস’ (১৯০৭), ‘নব উদ্দীপনা’ (১৯০৭), ‘উদ্বোধন’ (১৯০৮), ‘স্পেনবিজয় কাব্য’ (১৯১৪), ‘মহাশিক্ষা কাব্য’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড-১৯৬৯ ও ১৯৭১) ইত্যাদি।
কাব্যের পাশাপাশি শিরাজী গদ্যকেও তাঁর চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম করেন। এর ফলে রচিত হয় অসংখ্য প্রবন্ধ। এসব প্রবন্ধে তাঁর পরিণত ও পরিশীলিত চিন্তার পাশাপাশি বিপুল ভাব-গাম্ভীর্যের পরিচয় মূর্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থের সংখ্যা ৫টি। এগুলো হলো : ‘স্ত্রী শিক্ষা’ (১৯০৭), ‘স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা’ (১৯০৭), ‘ তুর্কী নারীজীবন’ (১৯১৩), ‘আদব-কায়দা শিক্ষা’ (১৯১৪) ও ‘সুচিন্তা’ (১৯১৪)। উল্লেখ্য, শিরাজী সারা জীবনে অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। সেগুলোর সব তাঁর জীবদ্দশায় বা পরেও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। সেকালের পত্র-পত্রিকার পাতায় সেগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
শিরাজী কবিতা ও প্রবন্ধ ছাড়াও উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী ও সঙ্গীতও রচনা করেন। তাঁর উপন্যাসগুলো হলো : ‘রায়নন্দিনী’ (১৯১৫), ‘তারাবাঈ’ (১৯১৬), ‘ফিরোজা বেগম’ (১৯১৮) ও ‘নূরউদ্দীন’ (১৯১৯)। ‘রায়নন্দিনী’ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। এটি বাংলার শ্রেষ্ঠ বারো ভূঁইয়া ঈসা খাঁর সঙ্গে আরেক বারো ভূঁইয়া কেদার রায়ের কন্যা স্বর্ণময়ীর প্রেম এবং তার ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়াসহ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কাহিনী। এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে ধর্ম হিসেবে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, মুসলমানদের শৌর্য-বীর্য-মহত্ত্ব-উদারতার নানা দিক। এ উপন্যাসটি সেকালে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তাঁর সঙ্গীত গ্রন্থ দু’টি হলো : ‘ সঙ্গীত সঞ্জীবনী’ (১৯১৬) ও ‘প্রেমাঞ্জলি’ (১৯১৬)।
বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্দীপ্ত শিরাজী বলকান যুদ্ধের সময় তুরস্কের সাহায্যার্থে গঠিত ভারতীয় মেডিকেল মিশনের সদস্য হিসেবে ১৯১২ সালের ডিসেম্বরে তুরস্ক যাত্রা করেন। ১৯১৩ সালের জুলাইয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। সেখানে থাকাকালে তিনি রণাঙ্গনে অবস্থান করেন। ‘তুরস্ক ভ্রমণ’ (১৯১৩) নামক গ্রন্থে তিনি এ যুদ্ধের জীবন্ত চিত্র এঁকেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রত্যক্ষদর্শীর যুদ্ধদৃশ্য বর্ণনা এই প্রথম। এ হিসেবে তিনিই বাংলা যুদ্ধ সাহিত্যের স্রষ্টা। বলা প্রয়োজন, তাঁর অপ্রকাশিত বেশ কয়েকটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে।
জাতির মঙ্গল ও কল্যাণের প্রচেষ্টায় সাহিত্যের বাইরেও নিজেকে প্রসারিত করেছিলেন শিরাজী। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ বাগ্মী। তাঁর অনলবর্ষী বক্তৃতা শোনার জন্য বিভিন্ন সভা-সমিতিতে লোকে তাঁকে দাওয়াত করে নিয়ে যেত। সেসব সভায় তিনি যেমন ধর্মের কথা শোনাতেন, তেমনি অনগ্রসর মুসলমান সমাজকে জেগে ওঠার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাতেন। বজ্রগম্ভীর কণ্ঠ, বলিষ্ঠ যুক্তি ও কথার চমত্কারিত্বের কারণে লোকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর বক্তৃতা শুনত। তিনি যেসব স্থানে সভা করতে যেতেন, সাধারণত সব স্থানেই সভার পর বালক বা বালিকাদের স্কুল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন।
শিরাজী বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত ছিলেন। বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা আবার ইসলামের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করুক, হারানো ক্ষমতা ও মর্যাদা ফিরে পাক, সাম্য-মৈত্রী-মানবতা-ভ্রাতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক—এই ছিল তাঁর জীবনের ঐকান্তিক কামনা। বাঙালি মুসলমানকে অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। স্বাধীনতার একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে নিজে যেমন কোনো চাকরি করার কথা কখনও ভাবেননি, তেমনি স্ব-সমাজের লোকদের জন্যও তা কামনা করেননি। তিনি চেয়েছেন, মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষালাভ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করুক, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন দিক, তারা মনের দিক দিয়ে ও বিত্তের দিক দিয়ে ঐশ্বর্যশালী হোক। তারা এক হাতে কোরআন আরেক হাতে বিজ্ঞান নিয়ে জীবনের চলার পথে অগ্রসর হোক।
শিরাজী তাঁর জীবনাদর্শে সব ধরনের নীচতা-হীনতা থেকে মুক্ত ছিলেন। আকাশের মতো উদার ও সাগরের মত প্রশস্ত মন নিয়ে এ পৃথিবীতে তাঁর আগমন ঘটেছিল। একান্ন বছরের জীবনকালে তিনি ছিলেন সর্বদা আলিফের মতো খাড়া। অতি বড় বিপদেও তিনি কখনও নুয়ে পড়েননি। নিজের শেষ সম্বলটুকু বিকিয়ে দিয়ে তিনি অন্যের উপকার করেছেন। দরিদ্রদের কাছে তিনি ছিলেন সেকালের দাতা হাতেম তাঈ, নির্যাতিত-অত্যাচারিতদের কাছে ছিলেন পরম আশ্রয়। বাঙালি মুসলমানকে আত্মনির্ভরশীল করা, আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি নিজ জীবনের সব সময় ও প্রচেষ্টা উত্সর্গ করেছিলেন। সমকালীন আর কোনো নেতা-সমাজসেবী-সাহিত্যিক জাতির মঙ্গল ও কল্যাণে এভাবে নিজেকে নিঃশেষে উজাড় করে দিয়েছেন বলে জানা যায় না। এক্ষেত্রে তিনি নিঃসন্দেহে তুলনাহীন।
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী দীর্ঘায়ু ছিলেন না। সাহিত্য সাধনাসহ তাঁর সক্রিয় কর্মজীবনের ব্যাপ্তি ছিল মাত্র বত্রিশ বছর (মৃত্যু : ১৭ জুলাই, ১৯৩১)। মুসলিম নবজাগরণের যে আকাঙ্ক্ষা কৈশোরেই তাঁর রক্তকণায় আলোড়ন তুলেছিল, পরবর্তীকালে তা পরিণত হয় অগ্নিস্রোতা নদীতে। সে নদীর প্রতিটি তরঙ্গে ধ্বনিত হতো জ্বালাময়ী সুর। তাই তিনি যেখানেই যেতেন, সেখানেই আগুনের স্রোত বয়ে যেত। ফলে ক্ষমতাদর্পী ইংরেজ শাসকের সঙ্গে তিনি অচিরেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে সংঘাত অব্যাহত ছিল। এ সংঘাতে তিনি বিপন্ন হয়েছেন, তবে আপস করেননি, লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। ইংরেজদের তিনি আজীবন বিদেশি দখলদার হিসেবেই দেখেছেন, আর ইংরেজরাও তাঁকে তাদের শাসন-শোষণের প্রতি বরাবরই এক হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করেছে।
৩.
জীবন ও কর্মের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, শিরাজী ছিলেন বাঙালি মুসলিম জাগরণের অবিসংবাদিত অগ্রদূত, স্বাধীনতার আহ্বানকারী প্রথম বাঙালি মুসলিম কবি, মীর মশাররফ হোসেনের পর প্রধান ঔপন্যাসিক, বিশ শতকের প্রথম দু’টি দশকের সর্বপ্রধান লেখক, সমকালের শ্রেষ্ঠ মুসলিম বাগ্মী, মুসলমানদের আত্মমর্যাদার প্রতীক, সমাজ নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি যুগস্রষ্টা না হলেও যুগের অন্যতম এক নায়ক ছিলেন। সমকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাঙালি মুসলমানের উন্নতি ও কল্যাণের প্রশ্নে তিনি ছিলেন নিরাপস, সোচ্চার ও প্রত্যয়ী। সব ধরনের ভয়ভীতি ও প্রলোভনকে তিনি অবলীলায় জয় করেছিলেন। নিজের মাথা উঁচু রাখার পাশাপাশি মুসলমানদেরও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর বলিষ্ঠ প্রেরণা দিয়েছিলেন। সব হীনমন্যতাবোধ ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর নাম স্মরণ করে মুসলমানরা জেগে উঠুক এবং তাদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতিগুলোর কাতারে নিজেদের আবার স্থাপন করুক, সারা বিশ্ব আবার মুসলমানদের গৌরবগানে মুখর হোক—শিরাজী জীবনভর এটাই চেয়েছেন। তাঁর এ চাওয়ার মধ্যে কোনো খাদ ছিল না। বলাবাহুল্য, আত্মমর্যাদহীন, মনোবলহারা মুসলমানদের মধ্যে শিরাজীর প্রচেষ্টা ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল। অচিরকাল মধ্যেই তারা শামিল হয়েছিল উন্নতি ও অগ্রগতির অভিযাত্রায়। এখানেই শিরাজীর জীবনসাধনার সাফল্য।
লেখাটি আমার দেশ পত্রিকায় প্রচারিত হো সে ন মা হ মু দ  এর একটি লেখার সরাসরি কপি পেস্ট।
:
সহায়ক গ্রন্থ : ১. উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা : ড. ওয়াকিল আহমদ, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৩; ২. মুসলিম সাহিত্য ও সাহিত্যিক : ড. গোলাম সাকলায়েন, আদিল ব্রাদার্স, ১৯৭৬; ৩. মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য : ড. আনিসুজ্জামান, মুক্তধারা; ৪. সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী : হোসেন মাহমুদ সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০৩

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s