বন্ধু দিবস ও বন্ধুত্বের মাত্রা


আজকের সূর্য বন্ধুত্বের আলোয় আলোকিত করুক সবার প্রাণ,
বন্ধুত্বের বন্ধনে সবাই পাক যতো হতাশা থেকে পরিত্রাণ,
সবার হৃদয়ে বিস্তৃতি পাক বন্ধুত্বের ঘ্রাণ।
দুরের-কাছের, দেশ ও বিদেশের সবাইকে জানাচ্ছি বন্ধু দিবসের শুভেচ্ছা।
শুভ হোক বন্ধুদিবস। আমার ফেসবুক বন্ধুদের উদ্দেশ্যে এই কথাগুলো লিখেছিলাম আজ সারারাত জেগে সকালে যখন ঘুমুতে যাই ঠিক তখন। সত্যি বলতে কি বন্ধু শব্দটির মাধ্যমে একটি আস্থার গন্ধ পাওয়া যায়। এক এক সময় এই বন্ধুত্ব বিশেষ ভাবনার বহিঃপ্রকাশ করে। এই বন্ধুত্বের সমতা অসমতা আর প্রাপ্তিযোগ-অপ্রাপ্তির নানা খতিয়ান নিয়ে অনেকে বিশ্লেষণও করেছেন। সবথেকে সুন্দর মনে হয়েছিল কালজয়ী লেখক হেমিংওয়ের বন্ধুত্বের ধারণাটি। এখানে তিনি যুগের ধারণার বাইরে গিয়ে একটি কল্পিত জগৎ কে উপস্থাপনে চেষ্টা করেছন। কল্পনার সেই জগৎ কে অনেকটা অবাস্তব মনে হলেও সপ্নের খেয়ায় ঐ তটিনীতে ভেসে যেতে কারো হয়তো খারাপ লাগেনি। ঠিক তেমনি ভেবেছেন রোমান্টিক ধাঁচের কবিতার অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্ট উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ। তাদের ধারণা থেকে খুব একটা বিচ্ছিন্ন ছিলেন না আমাদের কবি নজরুল কিংবা বিশ্বকবি রবি ঠাকুর।

তবে সবথেকে বড় কথা এই বন্ধুত্বের মাঝে মানুষ আশায় রঙিন স্বপ্ন দেখে। কখনো মারাত্বক হতাশ হয়ে নিরাশার পাহাড় মাথায় নিয়ে উল্টে পড়তে বসে। পালিয়ে বাঁচতে চায় জীবন থেকে। তখন বন্ধুত্ব আর বন্ধু শব্দটাই কেনো যেনো অসহ্য মনে হতে থাকে।  তাই মনেহয় সবথেকে কঠিন হচ্ছে হচ্ছে বন্ধুত্বের বিষয় আর মাত্রাজ্ঞান।

হাল আমলে বন্ধুত্বের মাপকাঠি নিচে নামতে নামতে এতোটাই সংকীর্ণ এক কানাগলিতে এসে ঘুরপাক খাচ্ছে যেখানে বন্ধুত্ব বলতে বোঝায় কেবলি বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ। একটি ছেয়ে একটি মেয়ে। চাইনিজের লাল নীল আলো। কিছুক্ষণ গুজুর-গুজুর ফুসুর ফাসুর। তারপর বের হওয়া। ওয়েটার একটি ৩০০০+ বিলের খতিয়ান ধরিয়ে দেয়। তারপর বান্ধবীর হাত ধরে ভেংচি কেটে বাসায় ফেরা।
বাসায় ফেরার পর কম্পিউটারের সামনে বসা। বন্ধুত্বের সীমারেখাটা আরেকটু লম্বা করতে ফেসবুকে কিছুক্ষণ গুতাগুতি করে। নয়তো টুইটারে ক্ষুদে বার্তা চালাচালি। যাদের একটু লেখার হাত আছে তারা হয়তো কিছুটা সময় ব্যায় করে ব্লগিং এ আর এভাবেই শেষ।
কিন্তু এর বাইরেও বন্ধুত্বের আরেকটি জগৎ রয়েছে। সেই জগৎটা এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে অনেকটা অমাবশ্যার চাঁদের মতো হতে বসেছে। অর্থাৎ এই বন্ধুত্ব গুলো হবে কোনো বিনিময় বাদে। যেখানে বিনিময়ের নির্মমতা থাকে না সেখানে বন্ধুত্ব হয় অনাবিল প্রশান্তির। একেবারেই নির্মল সে বিষয়ে পরে আসছি।
ক্লাসেও অনেক বন্ধু থাকে। এই বন্ধুত্বের মাত্রা আবার বিভিন্ন ধরণের। ক্লাস নোটস আদান প্রদান। রাজনৈতিক বন্ধুত্ব ইত্যোকার নানা সম্পর্কের বাইরে থাকে নিছক আচার আচরণগত ভালোলাগা। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় লেনদেনের জটিলতায় যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সেখানে আস্থায় জায়গাটা নষ্ট হতে সময় লাগে না। একদিন সে বন্ধুত্ব তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। কিন্তু ঠিকই টিকে থাকে সেই বন্ধুত্ব যেখানে আস্থার জায়গাটা কোনো বিনিময় দ্বারা নির্ধারিত হয়না।
হয়তো শুনতে অবাক লাগবে ছেলেবেলায় আমার সবথেকে কাছের বন্ধু ছিলেন আমার দাদা, ছোট চাচা আর বাবা। সেই দিক থেকে বিচার করতে তাঁরা তিনজন ছিলেন আমার সবথেকে কাছের বন্ধু যাদের কাছে সবকিছু শেয়ার করেই আস্থা পাওয়া যেতো। তেমনি সবকিছু শেয়ার করতে গিয়ে যেমন ক্লাস ফোরে পড়া অবস্থায় ছোট চাচার প্রাপ্ত বয়স্কদের উপন্যাস পড়ার চেষ্টা করে কিছু শব্দ বুঝতে না পেরে সোজা দাদার কাছে হাজির হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবুও সেখানে বন্ধুত্ব ছিল এতোটাই নির্মল যেখানে কোনো অপ্রাপ্তির বেদনা নেই।


স্কুল জীবনে ধীরে ধীরে এই বন্ধুত্বের মাত্রা পরিবর্তন হতে শুরু করে। কিন্তু খুব অবাক হয়ে লক্ষ করেছি এক সময় সবাই বন্ধুত্ব করতে চেষ্টা করেছে ক্লাসের প্রয়োজনে। ঠিক কিছুদিন পর স্কুল জীবনের শেষে ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর আবার সেই স্কুলের মতো প্রয়োজনেই। কিন্তু সত্যি বলতে সেই বন্ধুত্ব বেশিদিন টিকেনি।
আর বন্ধুত্বের লিঙ্গ বৈষম্যের ক্ষেত্রে জটিলতাটা একটু মনে হয় বেশি। একটি ছেলে ও একটি মেয়ের বন্ধুত্ব খুব সুন্দরভাবে ততোদিন ঠিকই এগিয়ে যায় যতোদিন তারা একে অপরের উপর আস্থাশীল না হয়। বিষয়টি অবাক হওয়ার মতো হলেও সত্য। বিশেষ করে এখনকার সমাজে একটি ছেলে ও মেয়ে বন্ধু হতে পারে। কিছুদিন পর এই বন্ধুত্ব যখন আরো ঘনিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে একসময় তা বর্ষকালের পরিপক্ক দোপাটি ফুলের মতো ফেটে ছিটে যেতে সময় নেয় না।
বয়সের অসমতা বন্ধুত্বে জটিলতা সৃষ্টি করে বলে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি এটাই বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে অনেক মজার একটি ক্ষেত্র। এখানে বন্ধুত্বে আদান প্রদান জরুরী হয় না। বিষয়টি পুরোটাই হয়ে থাকে বোঝাপড়ার। যেমন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার সবথেকে কাছের বন্ধু যারা তারা কমপক্ষে আমার দুই বছরের সিনিয়র। অবাক করার মতো বিষয় হলেও আমার চাচার বয়সী অনেকে আছেন আমার বন্ধু। জেনারেশন এন টি সি নামে একটি যুব উন্নয়নমুখী সংগঠনের সাথে কাজ করতে গিয়ে অনেক মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
এখানে বিশিষ্ট একজন চিকিৎসক আমাদের সবার গড় বয়স থেকে কমপক্ষে বছর দশেক সিনিয়র একজন আমাদের প্রত্যেকেরই আলাদাভাবে খুব কাছের বন্ধু। এখানে হাসি ঠাট্টা, ফাজলামি, কিংবা কৌতুকের ক্ষেত্রে কারো বয়স বিচার করতে হয়না। সবথেকে মজার বিষয় এখানে বন্ধুত্বের প্রাপ্তিযোগটা নিয়েও কাউকে ভাবতে হয় না। সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকা। হোক বা না হোক সৃষ্টিশীল কিছু করার স্বপ্ন দেখা তারপর ঐ স্বপ্ন কে আরো একধাপ এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টায় অনেক সুন্দরভাবেই এগিয়ে যায় এই বন্ধুত্ব।
সবথেকে মজার বিষয় হচ্ছে এখানে যেমন আছে আমাদের মতো সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী, তেমনি সাহিত্যের শিক্ষক থেকে শুরু করে আছেন ডাক্তার। আছেন বাণিজ্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। আছেন দেশবরেণ্য কলামিস্ট থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী। আড্ডার বিষয়বস্তু বেশিরভাগ সময় থাকে একে অপরের বিষয়কে কটাক্ষ করা। কিন্তু প্রত্যেকেই যখন আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেন। তখন জ্ঞানের ভাণ্ডার আর সীমারেখা অনেক অনেক দূর বিস্তৃত হয়। তাই এখানে একজন চিকিৎসকও সময়ের বিচারের যেমন সাহিত্যিকের ভাব নিতে পারেন তেমনি একজন সাহিত্যিকও সময়ের দাবি মেটাতে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারেন।

বন্ধুত্বের এই করুণ পরিণতি  প্রত্যাশিত নয়। 

গতকাল রাত থেকে ফেসবুকের স্ট্যাটাস দেখে বুঝলাম আবার বছর ঘিরে এসেছে বন্ধু দিবস। বন্ধুত্ব নিয়ে এলোমেলো ভাবনাগুলোকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছি। সবশেষে মনে হয়েছে বন্ধুত্ব আর আড্ডা কেবল সময় নষ্ট আর বখাটেপনা নয়। এই বন্ধুত্ব হতে পারে নির্মল বিনোদনের উৎস। এই বন্ধুত্ব হতে পারে সৃষ্টিশীলতার সুতিকাগার। আর উন্নয়নের শপথ নিয়ে একুশ শতকের বিশ্বে এগিয়ে যেতে গেলে এ ধরণের বন্ধুত্বটা অনেক জরুরী। এখানে বয়স আর লিঙ্গগত সমতা আর চাহিদা থেকে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য যদি থাকে সৎ আর চিন্তাধারা যদি হয় সৃষ্টিশীল তবে এই ধরণের বন্ধুত্ব নিজের দেশ ও দশের জন্য হবে মঙ্গলজনক। কিন্তু বিপরীত ধারায় চলতে গিয়ে সমাজের প্রচলিত রীতি ভাঙার কৃৎ কৌশলে যদি কারও মূল চিন্তা হয়ে থাকে তবে তা ভিন্ন কথা। বয়ে আনুক এবারের বন্ধু দিবস। সবাই হানাহানি আর বৈরীতা ভুলে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করুক এই হোক একুশ শতকের অঙ্গীকার।

Advertisements

4 thoughts on “বন্ধু দিবস ও বন্ধুত্বের মাত্রা”

  1. amar darkar nae ae fajlamer attahotta maha pap,ke baler bando je nijeke bisarjon dite hobe?asol bando halo bipoder samoy nijeke sangjam rakha sabor kara@ora fasite jakhon jole jae takhon afsos kare keno ae kaj korlam?kinto ke lab hobe nijer pae koralto maera dilo tae ae papkaj thake amra birato thake allah pak ae jagonno aporad thake sakolke hifajot karon amin

    1. অনেক ধন্যবাদ কষ্ট করে এতোবড় মন্তব্য করার জন্য।
      দীর্ঘদিন হলো সাইটে বসিই না 😥
      সত্যি ক্ষমাপ্রার্থী হে সুহৃদ ।

  2. বন্ধু দিবসের শুভেচ্ছা রইলো অর্ণব ভাই।

    আমার জীবনে ৪ জন বন্ধু পেয়েছি সেই ছোট বেলা থেকে, যাদের সাথে এখনো আমার চমৎকার সম্পর্ক বিরাজমান। একজন সমস্যায় পড়লে বাকীরা সবাই ছুটে আসা, একজনের কাজে আরেকজন সহায়তা করা। এছাড়া প্রত্যেক বন্ধুর বাবা-মা প্রত্যেককে নিজের সন্তানের মতো মনে করা, ইত্যাদি খুব ভালো লাগা বয়ে আনে শুধু কয়েকজন বন্ধুর কল্যাণে।

    ভালো থাকুন। শুভ কামনা নিরন্তর।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s