কুষাণ মুদ্রা ও বাংলার ইতিহাসের একটি অজানা অধ্যায়


ভারতীয় উপমহাদেশে স্বর্ণমুদ্রা প্রথম চালু করেন কুষাণ সম্রাটগণ। কুষাণ সম্রাট বীম কদফিসেসই সম্ভবত সর্বপ্রথম স্বর্ণমুদ্রা জারি করেন। তাঁর মুদ্রার মুখ্য দিকে বেদিতে যজ্ঞরত রাজার যে প্রতিকৃতি দেখা যায় তা সম্ভবত পার্থীয় শাসক গোটার্জেসের স্বর্ণমুদ্রায় উৎকীর্ণ নকশা দ্বারা প্রভাবিত। কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক ও হুবিষ্ক তাদের স্বর্ণমুদ্রায় বিচিত্র নকশা ও প্রতীক ব্যবহার করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে প্রাচীন বাংলা সরাসরি কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও বাংলায় অনেক কুষাণ-মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। সম্ভবত এগুলো বাংলায় এসেছে বাণিজ্যিক কারণে। বাংলার বিভিন্ন প্রত্নস্থান থেকে কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক, হুবিষ্ক ছাড়াও মহানাদ কুষাণ, প্রথম বাসুদেব ও দ্বিতীয় বাসুদেবের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়েছে ।

বাংলায় কুষাণ স্বর্ণমুদ্রা ছাড়াও প্রচুর কুষাণ তাম্র-মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। বীম কদফিসেস, কনিষ্ক, হুবিষ্ক ও প্রথম বাসুদেবের তাম্র-মুদ্রাও পাওয়া যায় (১-৩ শতক)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে কুষাণ তাম্র-মুদ্রার অনুকরণে বাংলায় প্রচুর তাম্র-মুদ্রা নির্মিত হয়। এই ওজন কার্যত ৫৭.৬ গ্রেন বা উপমহাদেশের কার্ষাপণ তৌলরীতির সমান। কুষাণ তাম্র-মুদ্রাগুলি কিন্তু অ্যাটিক টেট্রাড্রাখম (২৬৮.৮ গ্রেন বা ১৭.৪১৭ গ্রাম) তৌলরীতির। বাংলার অনুকৃত তাম্রমুদ্রার এই স্বকীয় চরিত্র ও স্থানীয় বৈশিষ্ট্য অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনুকৃত তাম্র-মুদ্রার অধিকাংশই প্রাচীন রাঢ় ও বঙ্গ জনপদে আবিষ্কৃত হয়েছে। তাই অনেকে তাম্র-মুদ্রাগুলিকে ‘কুষাণ-বঙ্গ’ বা ‘কুষাণ-রাঢ়’ বলে অভিহিত করেন।
কুষাণদের পূর্ণাহত তাম্র-মুদ্রা ছাড়াও তাঁদের ছাঁচে-ঢালা তাম্র-মুদ্রা প্রাচীন বাংলায় প্রচলিত ছিল। এ ধরনের মুদ্রার মুখ্যদিকে দণ্ডায়মান কুষাণ সম্রাট ও গৌণদিকে দণ্ডায়মান দেবতা মাও-এর প্রতিকৃতি চোখে পড়ে। এই ছাঁচে-ঢালা কুষাণ তাম্র-মুদ্রার সঙ্গে কয়েকটি অনুকৃত ‘কুষাণ-বঙ্গ’ বা ‘কুষাণ-রাঢ়’ তাম্র-মুদ্রার ওজনগত সাদৃশ্য রয়েছে। এই জাতীয় একটি মুদ্রার ওজন ৩.৬৩ গ্রাম। এ থেকে অনেকে মনে করেন যে বাংলায় প্রচলিত ছাঁচে-ঢালা কুষাণ তাম্র-মুদ্রাগুলি উপমহাদেশের কার্ষাপণ তৌলরীতি (৫৭.৬ গ্রেন বা ৩.৬৫ গ্রাম) অনুসরণে তৈরি।
অনেকে অবশ্য ওজন ও আকারের বিবেচনায় সমসাময়িক ‘পুরী-কুষাণ’ (উড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশে প্রচলিত) তাম্র-মুদ্রা, ‘কুষাণ-বঙ্গ’ ও ‘কুষাণ-রাঢ়’ তাম্র-মুদ্রার মধ্যে মিল খুঁজে পান। অন্ধ্রের উত্তরভাগ, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণ বিহার জুড়ে (খ্রিস্টপূর্ব ১-খ্রিস্টীয় ৪ শতক, প্রায় ৫০০ বছর) এক জটিল মুদ্রা-ব্যবস্থা ছিল বলে অনেকে মনে করেন।

মৌর্য আমলের পর বাংলার ইতিহাসের শুঙ্গদের আগমণের কথা জানা অনুমান করা হয়। এর অনতিকাল পরেই কুষাণদের আগমণ ঘটে থাকতে পারে যাদের মুদ্রা বাংলা থেকে পাওয়া গেছে। শুঙ্গ যুগের আবিভার্বের সাথে সার্থে মৌর্য আমলের শাসনকাঠামো থেকে শুরু করে পূর্বতন রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির অবসান ঘটে। এর পর থেকে বেসরকারি মালিকানায় কারিগরি শিল্প কারখানা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। বিশেষ গিল্ড বা নিগম চালু হওয়ার পর থেকেই কারিগর বা বণিকগণ তাঁদের পণ্যে সিলমোহর যুক্ত করে বাজারজাত করা শুরু করেছিলেন। তবে তাদের ব্যবহৃত লিপিতে কিছুটা বৈচিত্র্য লক্ষ করা গেছে।
বিশেষ করে ঐ সময়ের খরোষ্ঠী, খরোষ্ঠী-ব্রাহ্মী বা ব্রাহ্মী-খরোষ্ঠী মিশ্রিত লিপিযুক্ত মৃৎপাত্র ও ফলক এবং সিল ও সিলমোহর বাংলা ও বাংলার নিকটবর্তী এলাকা থেকে আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষত উত্তর ২৪ পরগনা অঞ্চলে এই ধরণের নিদর্শনের দেখা মেলে। অন্যদিকে মেদিনীপুর জেলার তমলুক বা তাম্রলিপ্তির কাছাকাছি পার্বতীপুর এলাকা থেকে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলক, পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে প্রাপ্ত পাথর নির্মিত সিল, হাদিপুরে প্রাপ্ত মাটির কলসিসহ চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত একটি মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশে খরোষ্ঠী লিপি উৎকীর্ণ হতে দেখা যায়। এই লিপিগুলো মৌর্য ও গুপ্ত যুগের অন্তবর্তী যুগকে নির্দেশ করছে।
অন্যদিকে ব্রাহ্মী-খরোষ্ট্রী মিশ্রিত লিপিযুক্ত পোড়ামাটির সিল পাওয়া গেছে হাদিপুর, চন্দ্রকেতুগড় ও বানগড় বা প্রাচীন কোটিবর্ষ এলাকা থেকে। এগুলোর বেশিরভাগই সিলের উপরে উৎকীর্ণ লিপি। এগুলো ব্যক্তিগত, সরকারি, বাণিজ্যিক, ধর্মীয়, শৈল্পিক বা সাহিত্যিক ইত্যাদি বিচিত্র ধরনের তথ্য ধারণ করে। বিশেষ করে এর থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া না গেলেও ঐ সময়ের শাসনকাঠামো ও শাসনতন্ত্র সম্পর্কে একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রথম বা দ্বিতীয় শতকের একটি সিল থেকে তখনকার গণরাজ্যের তথ্য পাওয়া যায়।
একদিকে যেমন পূর্ব ভারতে ব্রাহ্মী লিপির বহুল ব্যবহার ছিল। তেমনি বাংলার সাগর তীরবর্তী নদী ও সমুদ্র বন্দরে বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গে প্রাপ্ত সিল ও অন্য দ্রব্য-সামগ্রীতে খরোষ্ঠী লিপি এবং খরোষ্ঠী-ব্রাহ্মী মিশ্রিত লিপির বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। প্রতœতাত্ত্বিকরা এই ধরণের লিপিকে কুষাণ আমলের লিপি হিসবে চিহ্নিত করেছেন। খ্রিস্টাব্দ ১-৫ শতকের দিকে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে বণিক ও পরিব্রাজকগণ নানা ব্রাহ্মী-খরোষ্ট্রী মিশ্রলিপি তৈরি করেছেন। তবে এই সময়ের মিশ্রিত ব্রাহ্মী-খরোস্ট্রী ভাষা পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় বহুল ব্যবহৃত লিপি হিসেবে পরিচিত ছিল না। অনেক প্রতœাত্ত্বিক ও প্রতœলিপিবিদের ধারণা এগুলোর ভাষা গান্ধারী বা উত্তর পশ্চিম ভারতের কাছাকাছি কোনো অঞ্চলের থেকে প্রচলিত হয়ে থাকতে পারে ।
সূত্রঃ

১.সুফি মোস্তাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য।

২.এ কে এম শাহনাওয়াজ, সবুজ দেশের গল্প, বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

৩.আদনান আরিফ সালিম, বাংলাদেশী জাতিসত্তার পরিচয়।

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s