দজলা-ফোরাতের দেশ পর্ব এক (সুমেরীয় সভ্যতা)


নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা পিরামিড আর মমির দেশ মিশরের পশ্চিমে লোহিত সাগর। লোহিত সাগরের উত্তর দিকে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম ঘেঁষে একটি চমৎকার ভূখণ্ড এগিয়ে গিয়েছে আরও উত্তরে। এশিয়া মাইনরকে উত্তরে রেখে দ্বিতীয়া পাওয়া চাঁদের মতো বাঁক নিয়েছে। দক্ষিণে নেমে এসেছে পারস্য উপসাগরের সীমানায়। চাঁদ-আকৃতি আর উর্বর মাটির জন্য অনেকের কাছে ভূখণ্ডটির নাম ফার্টাইল ক্রিসেন্ট বা অর্ধচন্দ্রাকৃতির উর্বর ভূমি। এই অঞ্চলেই গড়ে উঠেছে প্রাচীন পৃথিবীর বিখ্যাত মেসোপটেমীয় সভ্যতা। গ্রিক শব্দ ‘মেসোপটেমিয়ার’ অর্থ হচ্ছে ‘দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি।’ মেসোপটেমিয়ার পূর্ব দিকে বয়ে গিয়েছে টাইগ্রিস নদী, যাকে দজলা নদীও বল হয়। আর পশ্চিমে বয়ে গিয়েছে ইউফ্রেটিস নদী। একে অনেকে বলে ফোরাত নদী। 
দজলা-ফোরাত নদীর তীরের উর্বর অর্ধচন্দ্রাকৃতির ভূখণ্ডে এক সময় গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ সভ্যতা। এই সভ্যতার চারিত্রিক ধরণ অনেকটাই ভিন্ন ছিল মিশরীয় সভ্যতা থেকে। এই অঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে তেমন সুরক্ষিতও ছিল না। ফলে এখানে বার বার বহিঃশত্র“র আক্রমণ ঘটতে থাকে। এখানে সময় স্থানের ভিত্তিতে কয়েকটি ভিন্ন ধাঁচের সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে মনে করা হয়। তাই এই ইতিহাসের পাতায় এই সভ্যতাকে সরাসরি একটি সভ্যতা না বলে চারটি শিরোনামে বর্ণনা করা হয়। আমরা এই চারটি সভ্যতাকে সুমেরীয়, ব্যবিলনীয়, এশেরীয় ও ক্যালডীয় সভ্যতা হিসেবে জানি।কিউনিফর্ম লিপি

সুমেরীয় সভ্যতা
মেসোপটেমিয়া ঘিরে গড়ে ওঠা চারটি সভ্যতার কথা আমরা জানি। সুমেরীয় সভ্যতা ছিল এদের মধ্যে প্রাচীনতম। সুমেরীয়দের আদিবাস ছিল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এলামের পাহাড়ী অঞ্চলে। ক্রমে জনসংখ্যা বাড়লে খ্রিস্টপূর্বে ৪০০০ অব্দে এদের একটি শাখা মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণে বসতি গড়ে তোলে। এই অঞ্চলটির নাম ছিল সুমের। সুমেরবাসীর গড়ে তোলা সভ্যতা তাই সুমেরীয় সভ্যতা বলে পরিচিত হয়। সুমেরীয়রা খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দের পূর্বেই সুমেরে নগর গড়ে তোলে।

সুমের থেকে প্রাপ্ত অলংকৃত বাটি

বেশ কয়েকটি শহর নিয়ে সুমেরীয় সভ্যতার বিকাশ। এগুলোর মধ্যে উর, ইউরুক, লারসা, ইরুদু এবং কিশ ছিল উল্লেখযোগ্য। সুমেরীয়রা বিচ্ছিন্নভাবে শহরে বসবাস করতো। শুধু যুদ্ধের প্রয়োজন হলেই এরা একত্রিত হতো। সুমেরে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের পদবি ছিল ‘পাতেজী’। তাঁদের ছিল অনেক ক্ষমতা। পাতেজী ছিলেন ধর্মযাজক, সমর নেতা এবং সেচ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। কৃষি ছিল সুমেরীয়দের আয়ের মূল উৎস। কৃষক হিসাবে প্রাচীন বিশ্বে সুমেরীয়দের সুনাম রয়েছে। তাদের ছিল উন্নত সেচ ব্যবস্থা। আয়ের দ্বিতীয় উৎস ছিল বাণিজ্য। চারপাশের অনেক অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সুমেরীয়দের।

তারা বাণিজ্য করতো ফিলিস্তিন, ফিনিশিয়া, ক্রীট, ইজিয়ান দ্বীপমালা, এশিয়া মাইনর ও মিশরের সঙ্গে। উত্তর ভারতে পাওয়া গিয়েছে সুমেরীয়দের সীল। তা থেকে ধারণা করা হয় প্রাচীনকালে ভারতের সঙ্গে সুমেরীয়দের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।
সুমেরীয় সমাজের মানুষ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। পুরোহিত, অভিজাত, বণিক, শিল্পপতি এবং উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তাগণ ছিলেন উচ্চ শ্রেণীভুক্ত। মধ্য শ্রেণীভুক্তরা হলেন চিকিৎসক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আর নিম্ন শ্রেণীতে অবস্থান ছিল দাস, ভূমিদাস ও সাধারণ শ্রমিকদের। যুদ্ধবন্দিদের দাস বলে বিবেচনা করা হতো। সুমেরীয় সমাজে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়েদের বিশেষ অধিকার থাকার কথা জানা যায়। এ সময় মেয়েরা শিল্প ও ব্যবসায় পরিচালনা করতে পারতো।

নিবেদন ভাস্কর্য

মেসোপটেমিয়াতে একটি লিখন পদ্ধতির উদ্ভাব হয়েছিল। আর তার সূচনা হয়েছিল সুমেরে। মিশরের মতো প্রথম দিকে (৩৫০০ খ্রি. পূ.) সুমেরীয় লিখন ধারা ছিল চিত্রভিত্তিক। চিত্রলিপির অসুবিধা হচ্ছে এতে সহজে ভাব প্রকাশ করা যায় না। একটি ভাব প্রকাশ করতে অনেক ছবি আঁকতে হয়। ধীরে ধীরে সুমেরীয়রা লেখাকে গতিশীল করতে নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করে। তারা কাদামাটির নরম শ্লেটে খাগের কলম দিয়ে কৌণিক কিছু রেখা ফুটিয়ে তুলেছিল। খাঁজ কাটা চিহ্নগুলো দেখতে অনেকটা তীরের মতো। কখনো কখনো ওগুলো মনে হতো যেন ইংরেজি ‘ঠ’ অক্ষর। প্রাচীন সুমেরের এই লিখন পদ্ধতির নাম দেয়া হয়েছে কিউনিফর্ম । কিউনিফর্মকে বলা যায় অক্ষরভিত্তিক বর্ণলিপি। এর লিখনশৈলী ও ব্যবহৃত উপাদানে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক থেকে। বিশেষ করে কাদামাটির ফলকে কাটি বা ঐ জাতীয় উপাদান দিয়ে লিখতে গিয়েই এর কৌনিক ভাব যা থেকে কিউনিফর্ম নামকরণ করা হয়েছে।
সুমেরের বিখ্যাত শহরের নাম ছিল নিপ্পুর। এখানে পাওয়া গিয়েছিল এক পুরোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। ধারণা করা হয় ধর্মমন্দিরের ভিতর একটি লাইব্রেরি ছিল। কারণ এখানে কিউনিফর্ম পদ্ধতির প্রায় চার হাজার মাটির চাকতি পাওয়া গিয়েছে। ১৮ ইঞ্চি লম্বা কিউনিফর্ম লিপিগুলো কাদামাটির শেলফে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল।
সুমেরীয়রা বহু দেবতার পূজা করতো। দেবতাদের চমৎকার চমৎকার সব নাম ছিল। যেমন : সূর্যদেবতা শামাস, বৃষ্টি, বাতাস ও বন্যার দেবতা এনলিল, পানির দেবতা এনকি; প্রেম ও উর্বরতার দেবী ইনাননা, প্লেগ রোগের দেবতা নারগল ইত্যাদি। দেবতাদের উদ্দেশ্যে সুমেরীয়রা তেল, মাখন, শাকসব্জি, ফল-ফুল, খাদ্য প্রভৃতি উৎসর্গ করতো।

সুমেরের জিগুরাত

সুমেরের প্রধান ধর্মমন্দির জিগুরাত নামে পরিচিত ছিল। এখানে পুরোহিত রাজা (পাতেজী) ধর্ম পরিচালনা করতেন। তবে মিসরীয়দের মতো পরজীবন সম্পর্কে কোন ধারণা সুমেরীয়দের ছিল না। তাই সুমেরে কোন মমী বা স্মৃতিস্তম্ভ খুঁজে পাওয়া যায়নি। কফিন ছাড়াই মৃতদেহ মাটিচাপা দেওয়া হতো। সুন্দর জীবন পরিচালনার জন্য সুমেরীয়রা একটি আইনের কাঠামো গড়ে তুলেছিল। প্রাচীনকালের সুমেরীয় সম্রাট ডুঙ্গি এই আইন তৈরি করেছিলেন। তাদের আইন ছিল খুব কঠোর। শুধু আইন নয়, সুমেরে পুরোকাহিনী নির্ভর কিছু সাহিত্যও সৃষ্টি হয়েছিল। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সুমেরীয়রা ভূমিকা রেখেছিল। তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের উদ্ভাবন করে। জল ঘড়ি ও চন্দ্র পঞ্জিকার উদ্ভাবন সুমেরীয়দের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। রোদে শুকানো ইটে তারা কিছু ইমারত তৈরি করেছিল। ধাতব দ্রব্য, ক্ষোদাই মূর্তি এবং ভাস্কর্যে সুমেরীয় চিত্রকলার বিকাশ ঘটে।

এভাবে চলবে ……… (চারপর্বে সমাপ্য)

Advertisements

7 thoughts on “দজলা-ফোরাতের দেশ পর্ব এক (সুমেরীয় সভ্যতা)”

  1. পড়লাম।
    কিন্তু এই সিরিজ কী শেষ হবে।
    নাকি বরাবরের মতো ভাগবেন … এক আধ পর্ব করেই। 🙂

      1. ধুর মিয়া। আপনারা জাবির পোলাপাইনই ফাপরবাজ।
        ব্লগে পোস্ট করে লাভ কি । এর থেকে আড্ডা দিবেন।
        মুভি দেখবেন। মন্দ কী।
        আরেকটা কাজের কথা তো কৈলাম না।

        1. দূরে গিয়া মরেন। ত্রিশ বছর পর লগ ইন কইরা মাতাব্বরি ফলাইয়েন না।
          আপনারে আবার কিছু কৈতেও গা গুলায়।
          কখন যে গালাগালি শুরু করেন।
          কে জানে।

          1. হ ফেসবুক ব্লগতো আপনার দাদার বাড়ি।
            সারাদিন বৈয়া উট দুম্বা হাতিঘোড়া মারেন।
            দিনশেষে গুইন্যা আমারে জানাইয়েন।
            গভীর রাতে যা শুরু করছেন মিয়া আমার মনে হয় আপনার স্ক্রুতে ঢিলা পড়ছে।
            এটা বাড়ির সবাই জানে তো ?

  2. সুমেরীয়দের নিয়ে সামান্য পড়াশুনা করেছিলাম। কিন্তু আপনি এই সাবজেক্টের বস। পোস্ট ভালো পেয়েছি। এই সিরিজ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবো আশা করি।

    শুভ কামনা অর্ণব ভাই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s