পৈশাচিক নেক্রোফিলিয়া বা শবাসক্তি (পর্ব-৩)


necrophilia 01aনেক্রোফিলিয়ার মতো জঘন্য একটি বিষয় কিভাবে বিস্তার লাভ করলো এর প্রকৃতি ও ধরণ নিযে প্রথম দুটি পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে আমরা দেখি নেক্রোফিলিয়া শব্দটির তুলনায় এই ঘটনাটি অনেক বেশি পুরাতন। আমরা ইতিহাসের জনক খ্যাত হেরোডোটাসের বিবরনীতে গ্রেকোরোমান রাজাদরে মৃতদেহের সাথে যৌন সঙ্গমের ইঙ্গিত পাই পাই। এছাড়া আমরা এরিস্টেফেনাস এবং জেনোফেনের রচনাতেও এই কুটিল অনুশীলনের উল্লেখ পাই। প্রকৃত অর্থে অত্যাচারী শাষকরা তাদের বিভীষীকাময় কর্মকাণ্ডের সাথে নতুন কিছু যোগ করতেও এই ভয়ানক অনুশীলন করে থাকতে পারে। বাইজেন্টাইন সম্রাটদের মধ্যে অনেক পিশাচ ছিলো যারা একটি এলাকা দখল করার পর সেই অঞ্চলের রাজার হেরেমের দখল নিতো। কিন্তু সেখানকার নারীদের হত্যা করে তাদের রক্ত একটি চৌবাচ্চায়ায় ভর্তি করে হোলি খেলতো পিশাচ রাজাদের অনেকে। অতিকথনে প্রচলিত হয়ে আসা এই কথ্য ইতিহাস নিশ্চয়ই কোনো বাস্তবতার উপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছিল যা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি ভয়াবহ এবং নির্মম ছিলো একথা বলা যেতেই পারে।
555040_365108006931770_1390038223_nপ্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ফারাওদের স্ত্রী, অনন্যা রুপসী কোন রমনী, কিংবা প্রখ্যাত মহিলা যখন মারা যেতেন তাঁদের মৃতদেহকে সংরক্ষণের জন্যও  মমি করা হতো। কিন্তু এর পূর্বে তিন থেকে চার দিন রেখে দিয়ে পচন ধরে একটু বিকৃত হওয়ার অপেক্ষা করা হতো। এর পেছনে প্রাচীন মিশরীয়দের একটা খারাপ স্বভাবের কথা উল্লেখ করে গবেষকগণ মতামত প্রদান করেছেন। প্রাচীন মিশরের পাপাচারী পুরোহিত, রাজপরিবারের সদস্য এমনকি অনেক সাধারণ মানুষ সুযোগ বুঝে মৃতদেহের সাথে মিলিত হতো। সেই ক্ষেত্রে যদি কোন সম্ভ্রান্ত কিংবা অনন্যা রুপসী কোনো নারী মারা যেতেন তবে পরিস্থিতি হতো আরও বেশি জঘন্য। তাই এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই মৃতদেহকে একটু পচিয়ে নেয়া হতো। উদ্দেশ্য একটাই যেনো উক্ত মৃতদেহ যৌন সঙ্গমের উদ্দেশ্যে কেউ ব্যবহার করতে না পারে। সেই জন্যই বেশির ভাগ মিশরীয় নারীর মমিকে অনেকটা বীভৎস, বিকৃত, ক্ষতিগ্রস্ত ও গলিত অবস্থার পরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত একটি নারীর বিকৃত মমি

সাম্প্রতিক কালে আমেরিকার মায়া ও ইনকা সভ্যতা বেশ দাপটের সাথে ইতিহাস ও প্রতœতত্ত্বের গবেষণায় স্থান করে নিয়েছে। আমরা বিভিন্ন প্রতœতাত্বিক আলামত ও নথিপত্রের সাহায্যে অনেক অবাক করা কাহিনী, নরবলি, জীবন্ত দাহ করা সহ কুয়েৎজাল কোতলের নামে কৃত নানা অনাচার এর কথা জেনেছি। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হচেছ আমেরিকার সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান পেরুতে এই অপকর্মের প্রচলন ছিলো। সেখানকার নেক্রোফিলিকরা আবার একটু বেশি আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী। তারা মনে করতো এর মাধ্যমে মৃতদেহের সাথে জীবিতের যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

চিত্র মায়া শিল্প কলার আধ্যাত্মিকতা
রাজা হেরড (৭৩-৪ বি.সি)

ইতিহাস হতে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৪-৪এর দশকের দিকে দৃষ্টি দিলে কুখ্যাত রোমান ইহুদী রাজা হেরড এর কথা জানা যায়। স্থাপত্যকলার শিক্ষার্থীরা কিংবা প্রতœতত্ত্বে শিল্প-ইতিহাস গবেষকগণ হেরডিয়ান স্থাপত্যের নানা শৈলী নিয়ে গবেষণা করে থাকেন। কিন্তু তাদের অনেকেই জানেন না অত্যাচারী হেরড তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য প্রচুর হত্যাযজ্ঞ চালায়। হাসমোনিয়ান রাজ্য জয়ের সেখানে একপ্রস্থ নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলো হেরড। এরপর পরমা সুন্দরী হ্যাসমোনিয়ান রাজকুমারী মারিআন্নিকে জোরপূর্বক বিয়ে করে কিং হেরড। কিন্তু অসম্ভব রকমের জিদ্দি টাইপের মারিআন্নি কিছুতেই পিশাচ হেরডকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি তাঁর মাতৃভূমির স্বাধীনতাহরণকারী হেরডকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন। তাই জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে নরপিশাচ হেরড তার নিষ্পাপ স্ত্রীকে হত্যা করে। পিশাচ হেরড তার মারিআন্নিকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং হত্যার পর বিশেষ রাষায়নিক ব্যবহার করে মারিআন্নির মৃতদেহ সংরক্ষণ করেছিলো। এরপর হেরড দীর্ঘ সাত বছর ধরে পৈশাচিক উদ্ধতার সাথে ঐ শবদেহের সাথে যৌনক্রিয়া চালিয়ে যেতে থাকে।
কুখ্যাত অপর এক নেক্রোফিলিয়া রোগীর নাম স্যার প্রাইস। প্রাইস তার ১ম স্ত্রীর মৃত্যুর পর খুব দ্রুতই দ্বিতীয় বিয়ে করে। কিন্তু পিশাচ প্রাইস তার ১ম স্ত্রীকে মমি করে দ্বিতীয় স্ত্রীকে সাথে নিয়ে একই বিছনায় ঘুমাতো। অদ্ভুদ ব্যাপার হলেও সত্য একই ভাবে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু হলে তাকে একইভাবে মমি করে বিছনায় রেখে দেয় প্রাইস। তৃতীয় স্ত্রী দুটো মৃতদেহ নিয়ে একই বিছনায় ঘুমাতে অস্বীকার করলে এ নিয়ে  বিরোধ বাঁধে। কিন্তু দুই কানে তুলা দিয়ে  মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রাইস তার এই জঘন্য কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে হেনরি বোল্ট নামে এক গোর খুঁড়েকে গ্রেপ্তার করা হয় অসংখ্য মৃতদেহের সাথে সহবাস করার কারনে। গ্রেপ্তারের পর তার সহজ স্বীকারোক্তি – “তার পক্ষে জীবিত কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্ক করা সম্ভব নয়, তাই সে মৃতদেহের সাথে সহবাস করেছে যাতে কারো কোন ক্ষতি হয়নি  কিন্তু সে পুলকিত হয়েছে”।

কার্ল ভ্যান ক্যাসল ও মারিয়া

ডা. কার্ল ভ্যান ক্যাসল নেক্রোফিলিয়ায় আক্রান্ত আর একজন কুখ্যাত ব্যাক্তির নাম। ১৯৩০ সালে ফ্লোরিডায় তিনি ডাক্তারী পেশায় থাকাবস্থায় মারিয়া এলেনা উজ নামক কলেরা আক্রান্ত  সুন্দরী মহিলার চিকিৎসাকালীন তার প্রেমে পড়েন। মেয়েটিকে বাচাঁনোর জন্য তিনি তার সর্বস্ব দিয়ে চেস্টা করেও ব্যর্থ হন। অবশেষে ইহলোক ছেড়ে চলে যান মারিয়া। ডা. ক্যাসল  মারিয়ার মৃত্যুর পর তাকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে সমাহিত করার পর তার দেহের পচন রোধ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ফরম্যালডিহাইড রেজিনের প্রলেপ দিয়ে তারপর পুরো শরীর মোম দিয়ে মুড়ে সমগ্র অঙ্গে পারফিউম ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ক্যাসল। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন লোকচক্ষুর আড়ালে ডা. ক্যাসল মারিয়ার সমাধিতে যেতেন এবং সমাধির উপরের অংশ সরিয়ে মৃত মারিয়ার সাথে মিলিত হতেন। এভাবে দিনের পর দিন ডা. ক্যাসলের মারিয়ার সমাধি আশে-পাশে আনাগোনা নিয়ে প্রতিবেশীরা সমালোচনা শুরু করে।
necrophiliaক্যাসল একদিন সবার অলক্ষে মারিয়াকে নিজ গৃহে নিয়ে আসেন। মারিয়ার দেহে আরো অতিরিক্ত মোম ও পারফিউম দিয়ে নববধুর গাউন পরিয়ে মৃত মারিয়ার সাথে নিয়মিত মিলিত হতে থাকেন ডা. ক্যাসল। মারিয়ার দীর্ঘদিন পূর্বের শবদেহে কেবলমাত্র কিছু মারাত্বক দুর্গন্ধ আর হাড্ডি বাদে তেমন কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ডা. ক্যাসল এই সময় মারিয়ার সাথে মিলিত হতে একটি টিউব ব্যবহার করতে থাকেন। প্রতিদিন মোম ও পারফিউম  দেয়ার পরও ক্যাসল মারিয়ার পচন এবং দুর্গন্ধকে আটকাতে পারেননি। এই পরিস্থিতি তার প্রতিবেশীদের নজরে যায়। প্রতিবেশীরা বোঝার পর এ নিয়ে মারাত্ত্বক আপত্তি জানায় এবং পুলিশকে অবহিত করে। পুলিশ এসে ডা. ক্যাসলের রুম থেকে মারিয়ার মৃতদেহ উদ্ধার করে এবং মারিয়ার পরিবারের আবেদন মেনে পুনরায় সমাধিস্থ করে। ঐদিকে মানসিক বিকারগ্রস্ত ডা. ক্যাসল পরবর্তীকালে একটি পুতুলকে মারিয়ার মুখোশ পরিয়ে তার সাথে মিলিত হতেন। এর দ্বারাই তিনি আমৃত্যু মারিয়ার প্রতি তার বিকৃত ভালবাসা অব্যাহত রেখেছিলেন।

ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব হচ্ছে উপযুক্ত সূত্র কিংবা পুরাবস্তুতে ফুটে ওঠা অতীতের প্রতিবিম্ব। এই প্রতিবিম্ব দেখার ক্ষেত্রে আরশির কাজ করে গবেষকের উদ্যম পরিশ্রমে সমৃদ্ধ হওয়া ইতিহাসের খেরোখাতা। একের পর এক রাজ্যজয়ে নরহত্যায় পাষণ্ড হয়ে উঠতেন অনেক রাজা। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি প্রদর্শনের একটি আমেজ কাজ করতো। ফলে এদের অনেককে দেখা গেছে জঘন্য ধরণের কিছু বিকৃত আচরনে অভ্যস্থ। ক্ষমতার লড়াই মাকে যেখানে সন্তানের শত্র“ করে দেয়। সিংহাসনের লোভে সন্তান যখন জন্মদাতা পিতাকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনা সেখানে এই ধরণের বিকৃত রুচির অনুশীলন তাদের দ্বারা করা সম্ভব ছিলো।

সময় নিয়ে বিকৃত রুচির এই পোস্ট পড়ার জন্য ধন্যবাদ সবাইকে। তবে সাথে এর প্রথম দুটি পর্ব পড়তে ভুলবেন না কিন্তু। শুধু আপনাদের জন্যই পোস্ট দুটির লিংক নিচে দেওয়া হলো।

  1.  পৈশাচিক নেক্রোফিলিয়া বা শবাসক্তি (পর্ব-১)

  2. পৈশাচিক নেক্রোফিলিয়া বা শবাসক্তি (পর্ব-২)

3 thoughts on “পৈশাচিক নেক্রোফিলিয়া বা শবাসক্তি (পর্ব-৩)”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s