একজন প্রত্নতাত্ত্বিক আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়ার গল্প


270512_10151105087801510_24826410_nপ্রথম আলো পত্রিকাটা বাসার ড্রয়িংরুমের ডেস্কে পড়ে থাকলেও খুলে দেখা হয় কম। কিন্তু আজকে দেখেছি। দেখেছি বলা যাবেনা অনেকটা দেখতে হয়েছে। ঘুম থেকে ওঠার পর চাচার হুংকার, পত্রিকাটা দেখ গাধারাম তোর প্রিয় ব্যক্তিকে নিয়ে লিখেছে। পাতা উল্টে দেখি দেশবরেণ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক আবুল কালাম মো. জাকারিয়ার একটি সাক্ষাতকার ছেপেছে ওরা। ব্যাস দাত ব্রাশ করার আগেই অনেকটা দাড়িয়ে দাড়িয়ে পড়লাম পুরো সাক্ষাতকারটি। সত্যি অন্য এক জগতে চলে গেছিলাম। ভাবছিলাম এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিয়ে অপেক্ষমান থাকার ঐ সময়টার কথা। তারপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হওয়া। ইতিহাস আর প্রত্নতত্ত্বের সাগরে কিভাবে ডুব দিয়েছিলাম সে কথাও আস্তে আস্তে মনে পড়ছে। কিছুক্ষণের জন্য হয়ে গেছি অন্যমানুষ। আর হবেই না কেনো !! যাঁর কাছে আর্কিওলজির হাতেখড়ি। সেই মহান মানুষটাকে দেখে অনেক ভালো লাগছে। ভাবছিলাম মুনীর চৌধুরী কি ভূল বকেছিলেন। মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেচে থাকলে বদলায়, কারণে অকারণে বদলায়। কিন্তু কৈ প্রিয় জাকারিয়া স্যার তো এতটুকুও বদলে যাননি।

সেই চল্লিশ দশকের চিন্তায় নিখাদ আধুনিকত্ব আর রক্তে রন্ধে পুরোদস্তুর প্রত্নতাত্ত্বিক। এভাবেই পরিচয় করানো যেতে পারে উনার সাথে। বছর পাঁচ-ছয় আগের কথা,যখন জানতামই না প্রত্নতত্ত্ব কী তখন তাঁর সাথে পরিচয়। অনেক বৃদ্ধ, ফুফুর বাসার পাশে থাকতেন। দাদার মৃত্যুতে খুব কাছের এক বন্ধুকে হারিয়েছিলাম। তখনি পরিচয় হয়েছিলো জাকারিয়া স্যাারের সাথে। বিকেলে গ্রিল ধরে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম অনেকক্ষণ। বিকেলে দেখতাম একজন বুড়ো মানুষ ছাদের বাগানে টুকটাক কাজ করে। কিন্তু উনার সরলতা দেখে বুঝতে পারিনি উনার কর্মদক্ষতা আর অবস্থান কী। তবে এটুকু বুঝতাম আমার যেমন গাছগাছালি আর পশুপাখির প্রতি এক ধরণের ভালোলাগা আছে, উনার তার থেকেও বেশি।  একদিন মান-অভিমান ভেঙে হেঁড়ে গলায় সালাম দিলাম অনেক দুর থেকে। প্রথমে উনি বুঝতে পারেননি কি হয়েছে। অনেক দুর থেকে এভাবে উনাকে কেউ সালাম দেবে উনি আন্দাজ করেননি। পরে দেখি চশমা তুলে তাকালেন আমার দিকে। আমি আবার ইশারা করলাম। উনিও হাতের নিড়ানি বাগিয়ে ধরে কিছু বোঝার চেষ্টা করছেন। পরে বুঝতে পেরে সালামের উত্তর দিলেন হাসি মুখে। আমাকে ছাদে যেতে বললেন। বিনা বাক্যব্যায়ে নেমে গেলাম। দারোয়ানের নিষেধ, আর অন্যকোনো চিন্তা পরওয়া না করে সোজা ছাদে। প্রায় ঘন্টা খানেক ছিলাম। নিভৃতচারী মানুষটির বাসায় ছেলে সন্তানদের কাউকে প্রথম কয়েকদিন চোখে পড়েনি। উনার স্ত্রী সেখানে থাকতেন শুধু। আর সেখানে বন্ধু আর আপনজন বলতে উনার শুধুই ছিলো গাদা গাদা বইয়ের স্তুপ আর কিছু টমোটে, বেগুন আর গোলাপ, গাঁদা, বেলী ফুলের গাছ। এগুলোর বাইরে হটাৎ এন অনাহুত আমার উদ্ভবকে উনি সহজেই মেনে নিয়েছিলেন। আমিও অন্যসব মুরুব্বীর মতো তাঁকেও অনেক সম্মান করতাম।

সবক্ষেত্রে অনেক জানাশোনা এই মানুষটাকে অনেক ভালো লাগতো যদিও প্রথম দিকে প্রত্নতত্ত্ব কি এটা নিয়ে উনি কোনো কথাই বলেননি। একদিন মিশর প্রসঙ্গে অনেক কথা হলো, নতুন অনেক বিষয় জেনেছিলাম। সেদিনও আমি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র নই। মনে পড়ে আধাঘন্টার মতো সময় তন্ময় হয়ে শুনেছিলাম। সেগুলোর সারমর্ম আজো লেখা আছে আমার ডায়েরীর পাতায় যা এখন আর লিখি না। দাদার কথা মনে করে প্রথম দিকে অনেকটা উপযাজক হয়েই হাজির হতাম দেখা করতে, অনেক আগ্রহ পেতাম আলোচনা করতে। পরের দিকে আমি ভুললেও উনি দারোয়ানকে পাঠাতেন যেনো ভুলে না যাই। যাই হোক যেদিন উনাকে বললাম আমি জাবিতে ভর্তি হয়েছি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে। অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন। হয়তো তার সিকিভাগ পালন করতে পেরেছি বাকিটুকু চেষ্টা করবো। তারপর মিরপুর বড় চাচার বাসায় চলে আসি। একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি লেখালেখি শুরু করে পুরোদমে।

থিসিস উৎসর্গ করার পর স্বাধীন সেন ও শিক্ষার্থীদের কয়েকজন

শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ব্যস্ততার থেকে আমার কাজ থাকতো আরো অনেক বেশি। তবুও মাঝে মধ্যে সাক্ষাত করতাম। উনার সাথে পরের দিকে অনেকটাই কমে যায় যাতায়াত। তবুও এখনো চেষ্টা করি উনার খোজ নিতে। অধ্যাপক একেএম শাহনাওয়াজ স্যারের সহলেখক হিসেবে আমার একটি বই উনাকেই উৎসর্গ করার জন্য স্যারকে অনুরোধ করেছি। স্যার সম্মানিত মানুষটির উপযুক্ত সম্মান দিতে দেরি করেননি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারের দিন উনাকে বইটি স্যার নিজে হাতে গিফট করেন। এরপর একদিন বেড়াতে গিয়েছিলাম উনার কাছে। বইটি নিয়ে কথা প্রসঙ্গে উনি অনেক কিছু বললেন। এক সময় তুললেন বিভাগের শিক্ষক স্বাধীন স্যারের কথা। বললেন এই ছেলেটি থিসিসে অনেক পরিশ্রম করেছে। কাজ করলে এখন থেকে মন-প্রাণ এক করে কাজ করে কাজ করতে হবে। বাংলার ইতিহাসের অনেক তথ্য এখনো অজানা। নতুন প্রজম্নের দায়িত্ব সেগুলো উদ্ধার করা। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি, আকও করছি। পরে জেনেছিলাম স্বাধীন স্যার থিসিস উনাকেই উৎসর্গ করেছেন। অনেক খুশি হয়েছিলাম একথা শুনে। আসলে আমরা যারা বাংলাদেশের ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে অল্পবিস্তর হলেও কিছু ভাবি, পড়তে চেষ্টা করি কিংবা দু-কলম লিখি প্রত্যেকের উচিত উনার নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা। অন্তত যে যাই বলুক তিনি একজন পথিকৃত।  শাহনাওয়াজ স্যার আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস বইটির উৎসর্গপত্রে উনার প্রতি সম্মান জানিয়ে লিখেছেন।

উৎসর্গ

আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া

যাঁর লেখার মধ্য দিয়ে এ দেশে প্রত্ন ঐতিহ্য সম্পর্কে

কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে অনেকের।  

উৎসর্গ করা সেই বইটির প্রচ্ছদ-

উৎসর্গ করা বইটির প্রচ্ছদ

আজকে প্রথম আলোতে উনার যে সাক্ষাতকারটি ছাপা হয় সেটি আমার সাইটে সংরক্ষণ করলাম। পুরোপুরি কপিপেস্ট করা হলো আরেকটি পোস্টে।..

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s