শিল্পাচার্য জয়নুলের নবান্ন ক্রল পেইন্টিং


image_34664পেইন্টিং বিভিন্ন ধরণের হয়। এগুলোর নামকরণের ক্ষেত্রেও তাই ভিন্নতা লক্ষ  করা যায়। ক্রল পেইন্টিং নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা একজন প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থীর জন্য  বেশ কঠিন। তবুও জয়নুলের নাম শোনর পর থেকে অনেক আগ্রহ জন্মেছিলো এই বিষয়টি কি একটু জানবো। আর জানলে তা আগ্রহীদের জন্য শেয়ার করবো। আভিধানিকভাবে ক্রল পেইন্টিংকে সঙ্গায়িত করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো অভিধা লক্ষ করা যায়। এখানে প্রকারতাত্ত্বিক ও গাঠনিক দিককে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। বিশেষ করে কি ধরণের উপাদানের উপর স্ক্রল অংকন করা হবে। আর তা আঁকতে কি ধরণের রঞ্জক উপাদান ব্যবহৃত হবে তা অবস্থা বিশেষে অনেক বেশি গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে।  আমরা অভিধানের পাতায় দৃষ্টি দিয়ে পাই………
Scroll is….
1. A roll, as of parchment or papyrus, used especially for writing a document or An ancient book or volume written on such a roll.
2. A list or schedule of names.
3. An ornament or ornamental design that resembles a partially rolled scroll of paper, as the volute in Ionic and Corinthian capitals.
4. Music The curved head on an instrument of the violin family.
5. Heraldry A ribbon inscribed with a motto.
এই বিষয়গুলোকে নিয়ে জানার চেষ্টা করে কিছু তথ্য সূত্র পাই। পৃথিবীর নানা দেশে বিভিণ্ন ধরণের স্ক্রল অংকিত ও প্রদর্শিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই সংস্কৃতি চর্চার শুরুটা অনেক বিলম্বিত হয়েছিলো। বিশেষ করে স্বাধীন জাতিসত্তার হিসেবে আমাদের বয়স যেখানে মাত্র চারটি দশকের সেখানে এই ধরণের ধ্রুপদী শিল্পকলা চর্চার শুরু হতে সময় লেগে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ও স্বতসিদ্ধ।  ঐতিহাসিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি একটি বিষয় অন্য দেশকে আমাদের উন্নত ও স্বতন্ত্র করেছে তা হচ্ছে আমাদের ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যময় শোভা-সৌন্দর্য। এই অবস্থায় প্রকৃতি নানান রূপের সজ্জিত হয়ে বিশ্বকে জানান দেয় এদেশের প্রাকৃতিক মহিমাকে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এই বৈচিত্র্যই বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছিলেন তাঁর বিখ্যাত নবান্ন স্ক্রলচিত্রের মাধ্যমে।
আমারা জানি সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা অপরূপ প্রকৃতির দেশ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য হিসেবে যোগ হয়েছে ছয়টি ঋতু। তাই এখানে শীতের কনকনে ঠান্ডা, বর্ষার বন্যা-ভাঙনের বিশ্রি রূপ আর  কালবৈশাখীর আতঙ্ক থাকলেও রয়েছে অগ্রহায়ণ মাসে কৃষকের পাকা ধান ঘরে তোলার আনন্দ আর বর্ণিল উদযাপন। পুরো বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে ফসল ঘরে তোলার এ আনন্দের তাই তুলনা নেই।  তখন নতুন ধানের পিঠা, পায়েস খাওয়া, আনন্দ অনুষ্ঠান করা হয়ে ওঠে বাংলার সামগ্রিক চিত্র। লাঠিখেলা, কুস্তিলড়া, মোরগ লড়াই, গরুদৌড়, ছাগলের দৌড়, কবিগানের আসর,  হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্দা আর যাত্রাপালার আয়োজন ছাপিয়ে যায় মেলার আয়োজন।
ঋতুবৈচিত্র্র্যে অগ্রহায়ণ মাসে কৃষকের ধান ঘরে তোলাকে কেন্দ্র করে যে আনন্দ উত্সব  তা পারিচিতি পেয়েছে নবান্ন।  নবান্ন নামে। কিন্তু নবান্ন স্ক্রল চিত্রটি সময়ের আবর্তে হয়ে উঠেছে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণকারী একটি বিষয়। তখন সময়টা ১৯৭০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হবে । শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ১০/১২ জন তরুণ চিত্রশিল্পী, কবি ও সাংবাদিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন দেশের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে হবে। তারপর শিল্পকলা একাডেমীতে বিশাল আকারে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী সেই নবান্ন চিত্রকলার প্রদর্শনী। এই নবান্ন প্রদর্শনী উপলক্ষ্যেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এঁকেছিলেন বিখ্যাত স্ক্রল ছবি নবান্ন। বিষয়বস্তু আর কলেবলে বিস্তৃত এই অনন্য সাধারণ চিত্রকর্মের দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট ও প্রস্থ ছিলো ৬ ফুট। যেটি বাংলাদেশী জাতিসত্তার ইতিহাসে গৌরবের সাথে স্থান করে নিয়েছে।শিল্প ইতিহাসের দিক থেকে বিবেচনা করা হলে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ঐ নবান্ন চিত্র প্রদর্শনী ছিল বিশাল ও বিপ্লবী এক পদক্ষেপ। যারা এই প্রদর্শনীর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন অনেক বাধা ও ভয়ভীতি অতিক্রম করতে হয়েছিলো তাদের। সেই সময়ের পাকিস্তানী সামরিক সরকার এ ধরনের উদ্যোগকে মনে করত পাকিস্তানের আদর্শ বিরোধী অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশী চেতনাকে উস্কে দেয়ার নামান্তর মাত্র।  কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি  এই প্রদর্শনীর পেছনে শিল্পাচার্য জয়নুল ও উদ্যোক্তা শিল্পীদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে প্রচার করে। ফলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু শিল্পীরা অশেষ চেষ্টায় সব শিল্পীকে দিয়ে ছবি আঁকিয়ে এমন একটা প্রদর্শনী করলেন যা দেখে তখনকার মানুষ হয়েছিলো বিস্মিত ও বিমোহিত। সময়ের কষাঘাতে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা নবান্ন উত্সবের আনন্দকে শহরের মানুষদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিতে পেরেছিলেন তাঁরা।
শিল্পাচার্যা আর তাঁর সহযোগি প্রায় সব শিল্পীর তুলিতেই তখন ছিলো বাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে আছে মহাজনের শোষণ ও নানাভাবে বঞ্চিত হওয়ার ছবিও সেখানে স্থানলাভ  করে দিয়েছিলো ভিন্নার্থক সুরব্যাঞ্জনা। বাংলাদেশের নদী-নালা, মাঠ-ঘাট ও বিভিন্ন ঋতুতে প্রকৃতির রূপ-বৈচিত্র্যের ছবি একে নতুন মাত্রা দান করে। তবে নবান্ন চিত্র প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল শিল্পাচার্যের ৬০ ফুট লম্বা ঐ স্ক্রল ছবিটি। যেটিকে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। স্বাধীনতা ও
জাতীয়তাবাদের তখন যে আন্দোলন চলছিলো সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে ভেবে তা চিত্রায়িত করা ছিলো সময়ের দাবি। কারণ আমাদের দেশটা কৃষিপ্রধান যেখানে দেশের কৃষকদের জীবন কীভাবে চলছে তা জানাটা অনেক জরুরী ছিলো। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও তারা দিনের পর দিন শোষিত ও বঞ্চিত হচ্ছে।  কিছু লোক যারা শহরে বাস করে সকল সুবিধা তাদেরই নাগালের মধ্যে যা  গ্রামের লোকদের জন্য হয়ে গেছে সোনার হরিণ। তাই বাংলাদেশের আদি যে আচার-অনুষ্ঠান, জীবনযাপন, কৃষিপ্রধান দেশের আবহমান জীবনাচরণ এগুলোর দিকে নজর দেয়ার বিকল্প ছিলো না। এই অবস্থাতেই শিল্পাচার্য তুলির মায়াবি আখরে ভাষা দিতে চেয়েছেন নবান্ন উৎসবকে। রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি এই আন্দোলন হযে যায় একটা অভূতপূর্ব সামাজিক আন্দোলন। তিনি চেয়েছিলেন তুলির আচড়ে মানুষের জীবনের ছবি ফুটিয়ে তুলতে যা দিয়ে নবান্ন আর বাংলাদেশী ঐতিহ্যগুলোকে গ্রাম থেকে শিল্পীদের মাধ্যমে শহরে নিয়ে আসা যায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s