ইতিহাসের ধারায় মিশরের গণহত্যা


আন্দোলনকারীর আর্তচিৎকার

মিসরের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল, তা হচ্ছে মিসরের রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কয়ারের বিপ্লব কি শেষ পর্যন্ত তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবে? যারা সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন, তারা জানেন সেনাবাহিনী একবার ক্ষমতা নিলে সে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়। মিসরের ক্ষেত্রে এমনটিই হতে যাচ্ছিল। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, অনেক বিপ্লবই তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। ফ্রান্সের সাধারণ কৃষকরা রুটির দাবিতে ১৭৮৯ সালে ভার্সাই দুর্গের পতন ঘটিয়ে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। কিন্তু এরপরের চার বছরের ইতিহাস অনেক করুণ। সেখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। আর এর মধ্য দিয়ে ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্রী শাসন শুরু হয়েছিল। ফরাসি বিপ্লব রাজতন্ত্রের পতন ডেকে আনলেও নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে (১৮০৪)সেই রাজতন্ত্রই আবার চালু করেছিলেন।

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে বিপ্লবীরা সফল হয়েছিলেন। কিন্তু কেরনস্ক্রির ব্যর্থতাই রুশ বিপ্লবের চূড়ান্ত রূপদেয় নভেম্বরে। কেরনস্ক্রির নেতৃত্বে ‘মেনসেভিক’রা যদি সফল হতেন, রুশ বিপ্লবের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। ১৯৫২ সালে মিসরে সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসারদের বিদ্রোহ (ফ্রি অফিসার্স ক্লাব) রাজতন্ত্রের পতন ঘটালেও সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৫২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যে সময়সীমা,সেখানে জনগণের শাসন ছিল না; ছিল কিছু অভিজাত শ্রেণি আর গোষ্ঠীর শাসন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘গুরু’ অ্যারিস্টটল এটাকে শাসনব্যবস্থার বিকৃত রূপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যাকে তিনি বলেছেন ‘কতিপয়তন্ত্র’। ১৯৭৯ সালে আধুনিক এক রাষ্ট্র ইরানে বিপ্লব হয়েছিল। ওই বিপ্লব সেখানে প্রথমবারের মতো একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দিলেও ২০০৯ সালে ইরানে যে বিক্ষোভ সংঘটিত হয় তাতে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়, ইরানি সমাজে অসন্তোষ আছে। এর অর্থ পরিষ্কার, বিপ্লব তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি।

সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত আন্দোলনকারীর লাশ সরিয়ে নেয়া হচ্ছে

১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়ায় বামপন্থি সান্ডানিস্টদের বিপ্লব তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। মার্কসবাদী সান্ডানিস্টদের কাছেযে প্রত্যাশা মানুষের ছিল, তা পূরণ হয়নি। একদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উস্কানি (কনট্রা বিদ্রোহীদের সাহায্য), অন্যদিকে হতাশা; ফলাফল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সান্ডানিস্ট নেতা ড্যানিয়েল ওর্তেগা পরাজিত হন ১৯৯০ সালে দক্ষিণপšি নেতা মিসেস ভায়োলেটা বারিওস ডি চামোরোর কাছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও ওর্তেগা পরাজিত হয়েছিলেন, যদিও গেল বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আবারও বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু এখন সম্ভবত ওর্তেগাকে মার্কসবাদী বলা যাবে না। ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনে ‘পিপলস পাওয়ার’ কোরাজান আকিনোকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। প্রয়াত কোরাজানও তার শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে পারেননি।

অতি সাম্প্রতিককালে জর্জিয়া, ইউক্রেন আর কিরঘিজস্তানে যে বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে, ইতিহাসে তা ‘কালার রেভলিউশন’ হিসেবে খ্যাত। ২০০৩ সালে জর্জিয়ার বিপ্লব (গোলাপ বিপ্লব) এখন অনেকটা ফিকে হয়ে আসছে। সাকাসভিলি সেখানে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছেন। ২০০৫ সালের ইউক্রেনের ‘অরেঞ্জ রেভলিউশন’ শেভচেঙ্কোকে ক্ষমতায় বসালেও ২০১০ সালে নির্বাচনে তিনিহেরেগেলেন। কিরঘিজস্তানে ২০০৫ সালে ‘টিউলিপ রেভলিউশন’ অস্কার আকায়েভকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। বিপ্লবের’নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কুরমানবেক আকিয়েভ। আকিয়েভও ক্ষমতাচ্যুত হলেন আরেক বিপ্লবী রোজা অতুনভায়েভার দ্বারা। রোজা অতুনভায়েভা এখন সে দেশের প্রেসিডেন্ট। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত এই তিনটি দেশে বারবার ক্ষমতার পটপরিবর্তন প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষেরযে প্রত্যাশা, তা পূরণে তারা ব্যর্থ; বরং ক্ষমতা গ্রহণ করে তারা সেখানে কায়েম করেছিলেন একনায়কতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা। স্বজনপ্রীতি আর গোষ্ঠী প্রীতি বিপ্লবের স্পিরিটকেই নষ্ট করে দিয়েছিল। এভাবেই বিপ্লবের মধ্য দিয়েযে প্রত্যাশার জন্ম হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ করতে ব্যর্থ হন বিপ্লবীরা। তবে ব্যতিক্রম তো আছেই। দীর্ঘ ২৭ বছর জেলে কাটিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা (মুক্ত ১৯৯০) ১৯৯৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। যে বিপ্লবনেলসন ম্যান্ডেলাকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট করে ও সেখানে বর্ণবাদ ভেঙে দিয়েছিল, সেই বিপ্লবকে পুঁজি করে ম্যান্ডেলা আরেক টার্ম ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি থাকেননি। তাই তিনি আজ বিশ্ব নেতা।

মহাত্মা গান্ধী ভারতে ১৯৩০-এর দশকে অহিংস আন্দোলন করেছিলেন। তাঁর এই আন্দোলনে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়লেও তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন নি। ক্ষমতা তাঁর কাছে বড় ছিল না কোনোদিন। তবে তাহরির স্কয়ারের বিপ্লব যখন হোসনি মোবারকের পতন ঘটিয়ে মুরসিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে তখনই প্রশ্ন উঠেছিলো এটা আদৌ কোনো বিপ্লব নাকি আমেরিকার সাজানো কোনো নাটক। আর সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে বছর গড়ায়নি। একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তাদের রাজনৈতিক নেতাদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড মিসরকে একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন মিসরে যে নির্মম গণহত্যা চলছে বস্তুত তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। পরাশক্তির দুগ্ধপোষ্য লোক যদি অসম্ভব কিছু করে ফেলে সেটা কখনোই জাতির জন্য মঙ্গলর হয় না। আর আরব বসন্ত তাই মিসরের জন্য এক মূর্তি বিভীষিকার নাম। আজ মিশরে  যে গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে তার শেকড়টাও অনেক গভীরে সেই বিরিয়ানিখেকো তাহরির স্কয়ারের মার্কিন দালালদের চিৎকার ম্যাৎকারের মধ্যে লুকিয়ে আছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s