মধ্যযুগের ঢাকায় বিদেশিরা


image_1324_368797ঢাকা সুপরিচিত শহর হলেও পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী মহানগর হিসেবেও খ্যাতিমান। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে ঢাকার নামকরণ করা হয়েছিল, তবে মোগল রাজধানী ঢাকায় প্রথম সুবাদার ইসলাম খান (১৬১০-১৬১৩ খ্রি.) এখানে আসার আগে থেকেই এই শহরের অস্তিত্ব থাকার কথা মির্জা নাথানের ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বি’তে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। নতুন এই রাজধানীতে বিদেশিরা বিপুল সংখ্যায় যে আসবে, তা স্বাভাবিক। কিন্তু রাজধানী হওয়ার আগেও জনপদ হিসেবে ঢাকার অস্তিত্ব থাকায় বিদেশিদের আগমন ঘটা অস্বাভাবিক ছিল না। মানসিংহের আমলের দুর্গ ইসলাম খানের আগে থেকেই ছিল এবং সম্রাট আকবরের আমলে মোগল পক্ষের এই সমরকুশলী নিজেও বাংলা অঞ্চলের মানুষ ছিলেন না, কাজেই সামরিক গুরুত্বের কারণে রাজধানী স্থাপনের আগেও কিছু না কিছু বিদেশি ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকায় বিদেশিদের আগমনের সুস্পষ্ট লিখিত ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত মোগল যুগ থেকেই পাওয়া যায়।

ঢাকার ইরানি সম্প্রদায়
মোগল আমলে সুবাদারসহ, আমাত্য-পদস্থরা প্রায় সবাই ছিলেন বিদেশি। প্রধানত ইরানি, আফগান, মধ্য এশীয়। ঢাকায় মোগল শাসনের প্রথম পর্বের প্রামাণিক ইতিহাসগ্রন্থ ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বি’ রচয়িতা মোগল সেনাপতি আলাউদ্দিন ইস্পাহানি ওরফে মির্জা নাথান এবং তাঁর বাবা মোগল সেনানায়ক ইতিমাম খাঁ ঢাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁরা ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত।
সুবাদার শায়েস্তা খানের প্রথম বাংলায় অবস্থানকালে (১৬৬৩-১৬৭৭ খ্রি.) তাঁর দিওয়ান ছিলেন রাজা ভগবান দাস বাহাদুর (সূত্র : Glimpses of Old Dhaka-Syed Muhammed Taifoor, 2nd Edn. P: 145)। পরবর্তী সময়ে হাজি শফি ইস্পাহানি বাংলার দিওয়ান হন, যিনি দিল্লির বাদশাহর কাছে শায়েস্তা খানের বিরুদ্ধে এক কোটি তিন লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগ আনায় জবাবদিহি করতে শায়েস্তা খানকে দিল্লি যেতে হয়েছিল। এই হাজি শফি ইস্পাহানি পরবর্তী সময়ে বাংলার দিওয়ান ও সুবাদার মুর্শিদ কুলি খানকে লালনপালন করেছিলেন। হাজি শফি ঢাকার ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ইরানি।
প্রকৃতপক্ষে বাংলায় ইরানিদের প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখা যায় ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয়ের পর থেকেই। বখতিয়ারের জন্ম আফগানিস্তানে। তাঁর সঙ্গে আসা উচ্চপদস্থদের অনেকেই ছিলেন ইরানি। বাংলায় সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সেই থেকে ইরানিদের বিশেষ প্রভাব ছিল কম্পানি আমল পর্যন্ত। ঢাকা থেকে মোগল আমলে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরে গেলেও এখানে প্রশাসনিক উপপ্রধান হিসেবে নায়েব নাজিমরা থেকে যান কম্পানি আমলেও। এ সময়ে বিপুলসংখ্যক ইরানি ঢাকায় হর্তাকর্তা শ্রেণীভুক্ত হিসেবে ছিলেন। ইরানি কবি-সাহিত্যিক ও সাধকরা মধ্যযুগের ঢাকায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। সুবাদার মিরজুমলা ও শায়েস্তা খান ছিলেন ইরানি উৎসের মানুষ। সাহিত্যিক, শিল্পী, সাধক, চিকিৎসক, শিক্ষক ও ব্যবসায়ী হিসেবে বর্তমানকাল পর্যন্ত বহু ইরানির নাম ঢাকার ইতিহাসে পাওয়া যায়। আধুনিক ঢাকার বিখ্যাত ইস্পাহানি পরিবারও এর অন্তর্ভুক্ত। তবে দরিদ্র ইরানিদেরও ঢাকায় প্রচুর দেখা গেছে। প্রধানত যাযাবর ইরানিরা ঢাকায় ছুরি, কাঁচি, চশমা, পেস্তাবাদাম ও কাপড় বিক্রি করতেন পাকিস্তানি আমলে। ষাটের দশকে বাহাদুর শাহ পার্ক (ভিক্টোরিয়া পার্ক) এলাকায় প্রায়ই ফুটপাতে তাদের নানা জিনিস ফেরি করতে দেখা যেত।

ঢাকায় গুরু নানকসহ শিখ গুরুরা
বিশ্বখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব গুরু নানককে (১৪৬৯-১৫৩৯ খ্রি.) নিরাকার একেশ্বরবাদী শিখ ধর্মের প্রবর্তক বলে মনে করা হয়। বর্তমান পাকিস্তানভুক্ত পাঞ্জাবের লাহোরের তালওয়ান্দি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। এই ধর্মের প্রধান কেন্দ্র ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বাংলাপিডিয়া’ ত্রয়োদশ খণ্ডের ২৭ পৃষ্ঠার বর্ণনা অনুযায়ী এই মহান ধর্মগুরু ধর্ম প্রচারার্থে ঢাকার রায়েরবাজার-ধানমণ্ডি এলাকায় আসেন এবং রায়েরবাজারের কুমারদের মধ্যে ধর্ম প্রচার করেন। একটি কূপ খনন করে সেখানকার মানুষের পানীয়জলের চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা করেন। জাফরাবাদে তিনি একটি ধর্মশালা স্থাপন করেন। ১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে গুরু নানক ভারতবর্ষ ভ্রমণ শুরু করেছিলেন। তাঁর অনেক পরে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে নবম শিখগুরু তেগ বাহাদুর সিং পাঞ্জাব থেকে ঢাকায় এসে বাংলাবাজার এলাকার সঙ্গতটোলায় ধর্মমন্দির স্থাপন করেন। দশম গুরু গোবিন্দ সিং ছিলেন তাঁর ছেলে এবং তিনিও ঢাকা সফরে এসেছিলেন।
ঢাকায় ইউরোপীয়রা
ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই ঢাকায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেক বিভিন্ন কারণে মানুষ এসেছিলেন। লিখিত ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে বেশ কিছু ইউরোপীয় নাম পাওয়া যায়। মোগল আমলেই তাঁদের অনেকের আবির্ভাব ঘটে। ঢাকায় আসা ইউরোপীয়রা প্রধানত যেসব দেশের এলাকার অধিবাসী ছিলেন :
১. ইতালি ২. ইংল্যান্ড ৩. ফ্রান্স ৪. পর্তুগাল ৫. হল্যান্ড
৬. আরমেনিয়া ৭. গ্রিস
ইংরেজ-ফরাসি-ওলন্দাজ-পর্তুগিজ-আরমেনীয়-গ্রিকরা প্রধানত বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে ঢাকায় দীর্ঘকাল প্রভাব-প্রতিপত্তির সঙ্গে বসবাস করেন। তাঁদের অনেকেই বংশানুক্রমিকভাবে ঢাকায় অবস্থান করেন। জেমস টেলরের বর্ণনা অনুযায়ী ঢাকার গ্রিক সম্প্রদায়ের লোকদের নারায়ণগঞ্জে লবণের বড় ব্যবসা ছিল। একাধিক বিদেশি বাণিজ্যকুঠির কথাও আলোচিত। তাঁদের বাণিজ্যের সূচনা মোগল আমলেই। তিনটি প্রভাবশালী বাণিজ্যকুঠি-সংশ্লিষ্টদের কথা প্রসঙ্গত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ফরাসি কুঠি, ফরাশগঞ্জ ও ঢাকায় ফরাসিরা
ঢাকায় ফরাসি কুঠির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার বহু আগে। আর ঢাকার ফরাসিদের স্মৃতি বহনকারী স্থানের নাম ফরাশগঞ্জ। ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি নৌবহর ঢাকায় এসেছিল। এরপর এ শহরে স্থাপিত হয়েছিল ফরাসি বাণিজ্যকুঠি। ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় ফরাসি কুঠির প্রধান ছিলেন এম গ্রেগোরি। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে নওয়াজিশ মোহাম্মদ ঢাকার নায়েব নাজিম থাকাকালে তাঁর অনুমতি নিয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে ফরাসিরা যে বাজার স্থাপন করেছিল তার বর্তমান নাম ফরাশগঞ্জ। ওয়াইজঘাট এলাকায় ফরাসিরা কিছু বাড়ি কিনে নিয়েছিল। বর্তমানে আহসান মঞ্জিল যেখানে অবস্থিত সেখানে আরো একটি ফরাসি কুঠি ছিল। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার ইংরেজ কুঠি অধিগ্রহণ করেন। তখন ওই কুঠির তৃতীয় কর্মকর্তা লুক স্ক্রেফটন, চতুর্থ কর্মকর্তা টমাস হাইন্ডম্যান ও পঞ্চম কর্মকর্তা স্যামুয়েল ওয়ালারসহ সেনাধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কাডমোর, চিকিৎসক ইউলসন ও কর্মচারীরা ফরাসি কুঠিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইংরেজ কুঠির দ্বিতীয় কর্মকর্তা উইলিয়াম সামার তখন কলকাতায় ছিলেন। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে ফরাসি কুঠিটি বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে তা ইংরেজ মালিকানায় যায়। ঢাকার বিখ্যাত আরমেনীয় ব্যবসায়ী পোর্গোজ সাহেব ফরাশগঞ্জ বাজারটি ইজারা নিয়েছিলেন। ঢাকা তথা সেকালের বাংলার অর্থনীতিতে ফরাশগঞ্জ বাজার ও ফরাসি সম্প্রদায়ের বিশেষ অবদান ছিল। এখানে ছিল ফরাসি ব্যবসায়ীদের মসলার পাইকারি আড়ত এবং এখান থেকেই ঢাকার মসলিন কাপড় ফরাসিরা রপ্তানি করত বিভিন্ন দেশে।
ইংরেজদের বিপদের দিনে (১৭৫৬ খ্রি.) কুঠির অধ্যক্ষ মনিয়ার কার্টিনসহ ফরাসিরা তাদের আশ্রয় দিলেও পরে ইংরেজরা অনেক ফরাসি সম্পত্তি দখল করে নিয়েছিল। বলা চলে তারা ফরাসিদের বিপরীত প্রতিদান দিয়েছিল। প্রথমবার ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে (প্রত্যর্পণকাল : ১৭৮৩ খ্রি.), দ্বিতীয়বার ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে ও তৃতীয়বার ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে (প্রত্যর্পণকাল : ১৮১৫ খ্রি.) ইংরেজরা ফরাসি কুঠি দখল করে নিয়েছিল। এসব কুঠি ছাড়াও তেজগাঁও এলাকায় ফরাসিদের মালিকানায় ছিল অনেক ইমারত। ইংরেজদের দখলের ফলে ফরাসিরা তাদের কুঠি, ফরাশগঞ্জ বাজার ও তেজগাঁওয়ের ইমারতগুলো বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিল (সূত্র : যতীন্দ্রমোহন রায়, ঢাকার ইতিহাস, ২০০৭ সংস্করণ, পৃ. ১৫৭)।

ইংরেজ বাণিজ্যকুঠি ও তার বাসিন্দারা
ফরাসিদের মতোই গুলন্দাজ ও ইংরেজরা ঢাকায় বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেছিল। যতীন্দ্র মোহন রায়ের বিবরণ (প্রাগুক্ত) পড়ে মনে হয় যে ১৬৬০ থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই কুঠি স্থাপিত হয়েছিল। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ঢাকায় একটি এজেন্সি প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছিল মর্মে জেটি র‌্যাঙ্কিনের উদ্ধৃতি দিয়ে আহমদ হাসান দানী ঢাকা : এ রেকর্ড অব চেঞ্জিং ফরচুন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সাবেক আণ্টাঘর ময়দান অর্থাৎ বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কের পশ্চিম দিকে ঢাকা কলেজের সাবেক অবস্থানস্থলে ছোট একটি একতলা ইমারতে যাত্রা করেছিল কুঠিটি। টেবারনিয়ার ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে যখন কুঠিটি দেখেন তখন সেটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন মি. প্রাট। পুরনো নথিপত্র-বিবরণ ঘেঁটে সে সবের উদ্ধৃতিসহ মোগল ও নবাবি আমলে এই কুঠির কয়েকজন প্রধানের নাম উল্লেখ করেছেন যতীন্দ্রমোহন রায়। প্রাট ছাড়াও তাঁদের মধ্যে ছিলেন জন স্মিথ, রবার্ট এলওয়াজ, স্যামুয়েল, হার্বি, পিচু নিডহাম, রিচার্ড বিচার প্রমুখ।
ওলন্দাজ কুঠির ওলন্দাজদের কথা
ঢাকায় ইংরেজ কুঠি স্থাপনের নিকটবর্তী সময়ে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের আগে ওলন্দাজ কুঠি স্থাপিত হয়েছিল। টেভারনিয়ারের বর্ণনায় এই কুঠির উল্লেখ আছে। তিনি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে কুঠিটি দেখেছিলেন। যতীন্দ্রমোহন রায়ের বিবরণ অনুযায়ী মিটফোর্ড হাসপাতালের উত্তর-পশ্চিম কোণে কুঠিটি ছিল (সূত্র : যতীন্দ্রমোহন রায়, ঢাকার ইতিহাস)। অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে কুঠিটি বন্ধ হয়, পরে ১৭৫৩ সালে তারা আবার বাণিজ্য শুরু করে। কিন্তু ইংরেজরা একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হলেও বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসন প্রবর্তিত হলে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা ওলন্দাজ কুঠিপ্রধানকে বন্দি করে এবং কুঠিটি করায়ত্ত করে। এই ইংরেজ ও ওলন্দাজরা সবাই ছিল বিদেশাগত। মোগল আমল থেকেই পালতোলা কাঠের জাহাজে করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপ থেকে দূর বাংলার ঢাকায় তারা এসেছিল বাণিজ্য করতে। কিন্তু কূটবুদ্ধি আর শঠতার জোরে ইংরেজরা দেশ দখল করে নেওয়ার পর অন্য বণিকদের আর সহ্য করেনি। তারা একচ্ছত্র বাণিজ্যের মাধ্যমে লুণ্ঠনে প্রবৃত্ত হওয়ার ফলে ঢাকার ওলন্দাজ কুঠিপ্রধানকে বন্দি পর্যন্ত হতে হয়েছিল, বাণিজ্য করা তো দূরের ব্যাপার। তাই এই কুঠির অন্য ওলন্দাজদের পক্ষে দীর্ঘকাল আর ঢাকায় বসবাস করা সম্ভব হয়নি।
সেকালের ঢাকার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয়
মোগল আমল থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত ঢাকায় আগমনকারী ইউরোপীয়রা এসেছিলেন প্রধানত ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক কাজে। তাতে নিছক ভ্রমণ বা পর্যটনের জন্যও এসেছিলেন অনেকে। এখন আমরা ব্যবসায়িক-প্রশাসনিক তথা পেশাগত কারণে কিংবা নিছক পর্যটক হিসেবে ঢাকায় আগমনকারী ইউরোপীয়দের মধ্যে কয়েকজনের কথা জানার চেষ্টা করব। তাঁদের নাম নানা কারণে ঢাকার ইতিহাসে স্মরণীয়।
মানরিক
মোগল আমলে শাহসুজার শাসনকালে ঢাকায় আগমনকারী ইউরোপীয় পরিব্রাজক। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকায় আসেন। তিনি ভ্রমণের পর যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে ঢাকার বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি ও দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক কম থাকার কথা আছে। ঢাকাকে তিনি বাংলার প্রধান শহর উল্লেখ করে নারিন্দা ফুলবাড়িয়া প্রভৃতি স্থানের বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর আগমনের আগে মগ বাহিনীর আক্রমণ, ঢাকা দখল, ঢাকায় তাঁদের তিন দিন অবস্থান, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, প্রাসাদ ধ্বংস প্রভৃতির বর্ণনাও তিনি দিয়েছেন।
নিকোলাও মানুচি
মোগল আমলে ঢাকায় আগমনকারী বিখ্যাত ইতালীয় পর্যটক। ভারতীয় উপমহাদেশে মোগল আমলে সংঘটিত বহু ঐতিহসিক ঘটনা একেবারে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই পর্যটক ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের শুরুর দিকে দিল্লির সিংহাসনের অধিকার নিয়ে সম্রাট শাহজাহানের ছেলেদের মধ্যে যে লড়াই হয় তাতে আওরঙ্গজেব ও মুরাদ বখশের বিরুদ্ধে দারাশিকোর পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ঢাকাসহ বাংলায় তিনি নিবিড় ভ্রমণ করেন। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ভ্রমণ কাহিনী ‘স্টেরিয়া টু মোগল’ নামে প্রকাশিত হয়। তৎকালীন উপমহাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-কূটনীতির বিশদ প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ আছে বইটিতে। মিরজুমলার আমলে রাজমহল থেকে ১৫ দিনের নৌভ্রমণে তিনি ঢাকায় আসেন। ঢাকা সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন-
ঢাকা নগরী সমগ্র বাংলার বিখ্যাত একটি নগরী, যেখানে সব সময় একজন সুবাদার বাস করতেন, যাঁর হাতে থাকত প্রভূত ক্ষমতা।… ঢাকা নগরী শক্তিশালী ও বিরাট না হলেও বহুলোকের বাস ছিল নগরীতে।… তখন সেখানে দুটি কারখানা, একটি ইংরেজদের আরেকটি ওলন্দাজদের। নগরীতে অনেক খ্রিস্টান, শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ পর্তুগিজ বাস করে এবং একটি গির্জাও আছে, যা পরিচালনা করেন অগাস্টিনো নামে এক পাদরি।
(সূত্র : মানুচির চোখে মোগল ভারত : ১৬৫৩-১৭০৮; মূল : নিকোলাও মানুচি, অনুবাদ : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু, ঐতিহ্য, ঢাকা; ২০০৪; পৃ. ৯৪-৯৫)।
ঢাকা ভ্রমণকারী ইউরোপীয় পর্যটকদের মধ্যে নিকোলাও মানুচি নিঃসন্দেহেই ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণদের একজন।
ট্যাভারনিয়ার
১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জানুয়ারিতে ঢাকায় এসেছিলেন ফরাসি পর্যটক জ্যাঁ ব্যাপ্টিস্ট ট্যাভারনিয়ার। তিনি বাংলার সুবাদার ইসলাম খানকে ‘লালবাগের প্রাসাদ প্রাঙ্গণের কাঠের তৈরি একটি অস্থায়ী গৃহে বাস করতে দেখেন (সূত্র : জেমস টেলর, Topography of Dacca, বঙ্গানুবাদ, ২০০১, পৃ. ৪৫)। এফবি ব্রাডলি বার্ট ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে লেখা Romance in an Eastern Capital গ্রন্থে (অনুবাদ, ২০১০, পৃ. ১৪৮)।
লিখেছেন যে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে লালবাগ কেল্লা নির্মাণ শুরু হওয়ার ১২ বছর আগে ট্যাভারনিয়ারের আগমনকালে বাবুবাজার মসজিদের উত্তর-পূর্ব দিকে ‘কাটরা পাকারতলী’র যে প্রাসাদে শায়েস্তা খান বাস করতেন, তার কোনো চিহ্নই তিনি দেখেননি। ট্যাভারনিয়ার ঢাকায় ইংরেজদের প্রধান হিসেবে প্রাট সাহেবকে দেখতে পান। বিদায়কালে ওলন্দাজদের সশস্ত্র দল তাঁকে ছয় ক্রোশ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিল বলেও তিনি লিখেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী তখন ঢাকা ছিল একটি বড় শহর।
জেমস হার্ট
ঢাকায় আগমনকারী প্রথম ইংরেজ হিসেবে জেমস হার্টের নাম প্রফেসর ড. আহমদ হাসান দানীর বর্ণনায় পাওয়া যায়। Dacca : A Record of Changing Fortunes গ্রন্থে প্রফেসর দানী এ সম্পর্কে লিখেছেন-
ঢাকায় প্রথম যে ইংরেজ আসেন বলে জানা যায়, তাঁর নাম জেমস হার্ট (James Hart)। তিনি কে ছিলেন বা কী কাজ করতেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। সম্ভবত তিনি ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আসেন। কম্পানির ফ্যাক্টরির কাছে একজন লোক খেসারত দাবি করে, সে একটা ডিক্রিও উপস্থাপন করে। ওই বছরে জেমস হার্ট ডিক্রি কার্যকর করেন বলে জানা যায়।… তিনি ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জমি, বাড়ি ও মালপত্র দান করেন। দৃশ্যত তিনি ওই বছরেই তাঁর ঢাকার বাড়ি ছেড়ে দেন এবং সে কারণে তিনি কম্পানির এজেন্ট ছিলেন না বলে ধারণা করা হয়। (সূত্র : বঙ্গানুবাদ : আবু জাফর, কালের সাক্ষী ঢাকা, ২০০৫, পৃ. ৩২)।
তিনি কম্পানির এজেন্ট না হলেও কম্পানির ফ্যাক্টরির কাজের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে কখনো না কখনো সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন এবং অন্তত কিছুকাল আবাসিক বাসিন্দা হিসেবে ঢাকায় ছিলেন।
টমাস প্রাট
মোগল শাসনামলে মিরজুমলা (১৬৬০-১৬৬৩ খ্রি.) সুবাদার থাকাকালে ঢাকার একজন প্রভাবশালী ইংরেজের নাম টমাস প্রাট। তাঁর মোগল বাদশাহ নিযুক্ত সুবাদারের অধীনে চাকরি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা জানা যায়। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা সফরে আসা ইউরোপীয় পরিব্রাজক মানুচির সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। সেই বিবরণ মানুচির ‘স্টোরিয়া’র দ্বিতীয় খণ্ডের ৮৬-৮৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে। সেই বর্ণনা অনুযায়ী টমাস প্রাট ঢাকায় বাস করতেন এবং নৌযুদ্ধের অস্ত্র নির্মাণ ও নৌকা নির্মাণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মিরজুমলার কাছ থেকে মাসে পাঁচ শ টাকা করে মাসোহারা গ্রহণ করতেন।
চয় ডেভিয়াটিস
মোগল আমলে তেজগাঁওয়ে পর্তুগিজদের দ্বারা নির্মিত গির্জায় স্মৃতিফলকে প্রাপ্ত নাম। পাথরে তৈরি স্মৃতিফলকটির ভাষা অর্ধেক পর্তুগিজ, অর্ধেক আর্মেনীয়। চয় ডেভিয়াটিসের মৃত্যুর তারিখ ১৭১৪ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুন। তাঁর বিশদ পরিচয় জানা যায় না। Romance in an Eastern Capital গ্রন্থে ব্রাডলি বার্ট এ সম্পর্কে আলোকপাত করেন।
রেভারেন্ড লিওনার্দ
ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকের ঢাকায় ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের একজন পথিকৃৎ। খ্রিস্টধর্ম প্রচারক হিসেবে ঢাকায় এসে ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে একটি বিদ্যালয় খুলেছিলেন ঢাকার ছোট কাটরায়। সেখানে আরবি-ফারসির পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ছিল। ঢাকায় ৩২ বছর বসবাসের পর ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বর ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলে নারিন্দায় খ্রিস্টান কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয় (সূত্র : Syed Muhammed Taifoor, 2nd Edition, P : 23)।
জেমস রেনেল
ঢাকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও পুরনো মানচিত্রের প্রণেতা ছিলেন মেজর জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০) নামের এক ইংল্যান্ডবাসী। তিনি গোটা উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকার নিখুঁত মানচিত্র প্রণেতা হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এই কাজ তিনি শুরু করেছিলেন ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে থেকে। পূর্ববঙ্গের ভূপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে মানচিত্র তৈরির কাজে তাঁর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা। এই শহরে বাড়ি নির্মাণ করে সপরিবারে বাস করতেন এবং ঢাকায় বসবাসকালে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর তিনি বিয়ে করেন। ঢাকার নারিন্দার খ্রিস্টান কবরস্থানে তাঁর এক ছেলের সমাধি আছে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।
আলেকজান্ডার কানিংহাম
স্কটল্যান্ডের অধিবাসী স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম (১৮১৪-১৮৯৩ খ্রি.) ঢাকা ও সন্নিহিত এলাকার প্রত্নকীর্তির প্রজ্ঞাপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি উপমহাদেশে প্রত্নতত্ত্বচর্চার পথিকৃৎ। ১৮৩১ থেকে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর চাকরি শেষে মেজর জেনারেল হিসেবে অবসর নেন। তাঁর সুপারিশে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব জরিপ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৬১ থেকে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি এর প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন। ১৮৭৯-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সফরকালে তিনি ঢাকায় আসেন। তাঁর পরিদর্শন প্রতিবেদন Archaeological Survey Report (1879-80) পঞ্চদশ খণ্ডে লালবাগের কেল্লার পরী বিবির মাজারে বিবরণসহ ঢাকার অবস্থান শনাক্তকারী মানচিত্র সংযোজিত আছে।
জেমস ওয়াইজ
ঊনবিংশ শতকে ঢাকার ইংরেজ সিভিল সার্জন ছিলেন। তবে তাঁর প্রকৃত খ্যাতি নৃতত্ত্ববিদ হিসেবে। ঢাকা এলাকার গ্রামে ঘুরে ঘুরে গবেষণার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন এবং এই প্রয়োজনে এখানকার আঞ্চলিক বাংলা পর্যন্ত রপ্ত করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের মানুষের নৃতাত্ত্বিক উৎস সন্ধানে এবং সমাজব্যবস্থার গভীর বিশ্লেষণে তিনি যে শ্রম দিয়েছেন এবং নিষ্ঠার পরিচয় দান করেছেন, তা অতুলনীয়। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি রচনা করেছেন অমর গ্রন্থ Notes on the Races Castes and Trades of Eastern Bengal। গ্রন্থটি ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
চার্লস ডয়েলি
কম্পানি আমলে ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে কালেক্টর হিসেবে ঢাকায় এসেছিলেন চার্লস ডয়েলি। তাঁর বাবাও ছিলেন কম্পানির কর্মকর্তা। মোগল যুগের নির্মাণ নিদর্শন ও কম্পানি যুগের ঢাকার জনজীবনকে উপজীব্য করে অসাধারণ ও জীবন্ত সব ছবি এঁকে তিনি অমর হয়ে রয়েছেন। ঢাকা ও এর উপকণ্ঠে নিবিড় ভ্রমণ করে তার ছবি এঁকে রেখে গেছেন স্যার চার্লস ডয়েলি (১৭৮১-১৮৪৫)।
জর্জ চিনারি
১৮০৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ডয়েলির আতিথেয়তায় ঢাকায় আগমনকারী আইরিশ শৌখিন চিত্রশিল্পী। এই ঘনিষ্ঠজনের তিনটি এবং ঢাকার ওপর নিজের আঁকা ছবি নিয়ে চার্লস ডয়েলি প্রকাশ করেছিলেন বিখ্যাত বই Antiquities of Dacca.
জেমস টেলর
ঊনবিংশ শতকে ১৮২৫ থেকে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থানকারী সিভিল সার্জন, তবে তাঁর প্রধান কীর্তি ঢাকাবিষয়ক আকর গ্রন্থ A Sketch of the Topography and Statistics of Dacca. ঢাকাসহ গোটা পূর্ববঙ্গের মানুষের জীবন-জীবিকা, প্রকৃতি, বাণিজ্য, অর্থনীতি, যোগাযোগ, যাতায়াত ইত্যাদি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও বিশ্লেষণমূলক তথ্যসমৃদ্ধ এ গ্রন্থে ঢাকার রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি রূপ ফুটে ওঠে। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি সরকারের আদেশে কলকাতার মিলিটারি অরফান প্রেসে ছাপা হয়ে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল।
ডক্টর টি এ ওয়াইজ
ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকায় অবস্থানকারী বিখ্যাত ইংরেজ শিক্ষাবিদ। অবিভক্ত বাংলার প্রথম সরকারি কলেজ ঢাকা কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। কম্পানি সরকার কর্তৃক ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সেমিনার স্কুলকে এ কলেজের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়।
রেজিন্যাল্ড হেবার
১৮২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুন কলকাতা থেকে রওনা দিয়ে ১৬ দাঁড়বিশিষ্ট নৌকায় চেপে ৩ জুলাই ঢাকায় পৌঁছেছিলেন কলকাতার বিশপ রেজিন্যাল্ড হেবার। ১৮ দিন ঢাকায় থাকাকালে একটি প্রাসাদ চত্বরে তিনি বাঘ শিকার করেন এবং নায়েব নাজিম শামসুদ্দৌলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। শহরের বিশালতা ও দুর্গ-প্রাসাদ-মসজিদ-গির্জা এবং ফরাসি-ওলন্দাজ-পর্তুগিজ কুঠির ধ্বংসাবশেষ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। ব্রাডলি বার্টের Romance in an Eastern Capital গ্রন্থে (অনুবাদ : ২০১০, পৃ. ১৩৪, ১৩৫) এসব বর্ণনা রয়েছে।
হেনরি ওয়াল্টার
ঊনবিংশ শতকে ঢাকায় অবস্থানকারী ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি ১৮২৮ থেকে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের ঢাকাবাসীর অর্থ সাহায্য নিয়ে ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গের প্রথম ঝুলন্ত সেতু ‘লোহার পুল’ নির্মাণের প্রধান নেপথ্য ব্যক্তি ছিলেন।
নিকি পোগোজ
ঢাকার আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনি ছিলেন একাধারে সমাজসেবক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও জমিদার। প্রথমে ওয়াইজঘাটের বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর স্থানে, পরে আরমানিটোলায় তাঁর বাড়ি ছিল। এই আরমানিটোলা নামটিও আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের বসবাসের স্মারক হয়ে রয়েছে। ঢাকাবাসীর কাছে ওয়াইজঘাটের বাড়িটি ‘নিকি সাহেবে’র কুঠি নামে পরিচিত ছিল। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পোগোজ স্কুল ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ বা তার কাছাকাছি সময় পর্যন্ত বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। তিনি ঢাকা ব্যাংকের একজন পরিচালক ছিলেন। শেষ জীবনে ঢাকার সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি লন্ডনে চলে যান এবং ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মারা যান বলে জানা যায়।
আরাতুন সাহেব
ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে আরমেনীয় সম্প্রদায়ের বিখ্যাত ব্যক্তি। ফরাশগঞ্জের ডালবাজারে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী বিখ্যাত রূপলাল হাউসের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা তিনি। রূপলালের কাছে বাড়িটি বিক্রি করেছিলেন তিনি। সেকালের ঢাকার তিনি ছিলেন এক বিদ্যোৎসাহী ও শৌখিন জমিদার। তিনি ঢাকা নরমাল স্কুলের অধ্যক্ষও ছিলেন। ‘তাওয়ারিখে ঢাকা’তে মুনশি রহমান আলি তায়েশ (বঙ্গানুবাদ ড. এ এম এম শরফুদ্দিন, ২০০৭, পৃ. ১২৭) লিখেছেন যে আরাতুন দান-দক্ষিণা ও দরিদ্র পালনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ হয়ে যায় এবং তাঁর বংশধররা কলকাতাসহ নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
ডাক্তার ক্লিমন্তি
পর্তুগিজ সম্প্রদায়ের এই বিখ্যাত ভেষজ চিকিৎসক নায়েব নাজিম নুসরত জঙ্গের আমলে ঢাকার বেগমবাজারে নিজের বাড়িতে বাস করতেন। মুনশি রহমান আলি তায়েশ উল্লেখ করেছেন যে সেই যুগে চিকিৎসা করে তিনি লাখ লাখ টাকা উপার্জন করেছেন (সূত্র : মুনশি রহমান আলি তায়েশ ‘তাওয়ারিখে ঢাকা’) বঙ্গানুবাদ : ২০০৭, পৃ. ১২৮)।
আলেক্সিস আর গিরি
অষ্টাদশ শতকের ঢাকার গ্রিক সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি। জেমস টেলরের বর্ণনানুযায়ী তিনি ছিলেন কলকাতার গ্রিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর ছেলেরা ঢাকা ও বাকেরগঞ্জে আশ্রয়স্থল নির্মাণ করেন। ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে তাঁদের গির্জা তৈরি করেন। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় মৃত্যুবরণকালে তিনি অনেক সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন।
ঢাকার আফগান জনগোষ্ঠী
বাংলায় প্রথমবারের মতো মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠাকারী ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির জন্ম হয়েছিল আফগানিস্তানের গরমসির এলাকায় তুর্কি জাতিভুক্ত খলজি সম্প্রদায়ে। প্রকৃতপক্ষে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকেই আফগানিস্তানের অধিবাসীরা সামরিক, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন কার্যোপলক্ষে এ দেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে এবং একপর্যায়ে এ দেশের জনগণের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আজ আর আলাদা করে তাদের শনাক্ত করার উপায় নেই। তবে ইংরেজ আমলে আফগানরা ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে বাংলা মুল্লুকেও বিভিন্ন ব্যবসাপাতি নিয়ে তারা হাজির হয়।
স্বাধীনতা-পূর্বকালে ঢাকা শহরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আফগান বসবাস করত। বাঙালিরা এককথায় তাদের কাবুলিওয়ালা বলেই চিনত বা ডাকত। মূলত তারা বিভিন্ন মসলাপাতি, শুকনো ফল, সিল্ক ও পশমি কাপড় ও শাল-চাদরের ব্যবসা করত। আবার তাদের বেশির ভাগই সুদের বিনিময়ে টাকা ধার-কর্জ দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। পরবর্তী সময়ে এ জন্য বোধ হয় তারা পাঠানের স্থলে কাবুলিওয়ালা নামেই বেশি পরিচিতি পায়।
মাথায় পাগড়ি ও বড় জোব্বা গায়ে শহরময় চষে বেড়াত এবং সুদের টাকা আদায়ের জন্য সাতসকালে কর্জগ্রহীতার দোরগোড়ায় গিয়ে হাজির হতো। সঠিক সময়ে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে উচ্চস্বরে হৈ-হাঙ্গামা বাধাতেও কসুর করত না তারা। এমনও প্রচলিত আছে যে এক মক্কেলের মৃত্যু হলে তার অসহায় পরিবার ঋণের অব্যাহতি চায়। কিন্তু কাবুলিওয়ালা কোনোভাবেই সায় না দিয়ে মৃতের কবরের ওপর লাঠি দিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হলে তার নিকটজনরা তাকে নিরস্ত করে এবং ঋণের টাকা পরিশোধ করে মুক্তি মেলে। তারা অসম্ভব গোঁয়ার, নির্ভীক এবং অনেক ক্ষেত্রে আড্ডাপ্রিয় ও বাচাল হিসেবেও পরিচিত ছিল।
স্ত্রী-পরিজন ছাড়াই গোত্রবদ্ধ হয়ে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় তারা বসবাস করত। প্রধানত শহরের নবাবপুর, বংশাল ও লালবাগের আশপাশের এলাকায় ভাড়া করা বাড়িতে তাদের বসতি ছিল। আবার অবসর সময়ে কোনো কোনো জায়গায় তারা জম্পেশ আড্ডাও জমাত। কাপ্তানবাজার রেলক্রসিং থেকে সামান্য দক্ষিণে নবাবপুর রোডের সেন্ট্রাল হোটেল ছিল তাদের সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দু। তবে ঠাটারীবাজার, বনগ্রাম এলাকায় ব্যাপকসংখ্যক উর্দুভাষী অভিবাসী থাকায় সেখানেও আড্ডাপ্রিয় কাবুলিদের দেখা যেত।
তবে আপাতভাবে তাদের রুক্ষ মনে হলেও অনেক উৎসবের দিনে বিশেষ করে ঈদের দিন সন্ধ্যার পরে শহরের খোলা ময়দানে কাবুলিরা পরিপাটি হয়ে গলায় ও দুই হাতে রঙিন রেশমি রুমাল বেঁধে হাজির হতো। উৎসুক জনতা তাদের প্রদর্শিত নাচ-গান উপভোগ করত।
তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাক্কালে এ দেশে থাকা আর নিরাপদ নয় ভেবে তাদের অনেকেই চলে যায়, যদিও অনেকেই বিনিয়োগকৃত টাকা আর তুলতে পারেনি।
ঢাকায় ধাঙড় সম্প্রদায়
ঢাকায় ধাঙড় সম্প্রদায়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল মোগল যুগ থেকে, যখন রাজধানী হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটে। সাধারণ্যে ঢাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা মেথর নামে পরিচিতি পান। রাজধানী ঢাকায় প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু লালবাগ কেল্লা ও আশপাশে স্থাপিত বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর, অধীন রাজকর্মচারীদের নির্মিত ইমারতরাজি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জঞ্জাল সাফের কাজে ধাঙড়রা নিয়োজিত থাকতেন। প্রথমদিকে রাজকর্মচারীদের অনেকে নিজেদের সঙ্গেই বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজনের সঙ্গে সঙ্গে মেথরও নিয়ে আসতেন। পরবর্তী সময়ে স্থানীয়ভাবেও অনেক লোককে ধাঙড়কর্মে নিয়োজিত করা হয়, যাদের প্রায় সবাই নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের। দরিদ্র হলেও ঢাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এ পেশা অনাকর্ষণীয় বিবেচিত হয়েছিল।
মোগল সূর্য অস্তমিত হতে থাকলে এদের কর্মক্ষেত্রও ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়ে। শুরু হয় ইংরেজ রাজত্ব। নতুন রাজধানী কলকাতার গোড়াপত্তন ও গুরুত্ব বাড়লেও অবহেলিত জনপদ পূর্বতন রাজধানী ও জেলা শহর ঢাকা একসময় আবার কর্মব্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করে। ঢাকায় গড়ে ওঠে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, কোর্ট-কাচারি, ভূমি অফিস, কুঠিবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, রেলওয়ে স্টেশন ইত্যাদি। এসব দপ্তর ও আবাসনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য লোক-লস্করের দরকার পড়ে। সিপাহি বিদ্রোহসহ নানামুখী ইংরেজ শাসনবিরোধী তৎপরতার কারণে এ জাতীয় নিম্নতর পদে অস্থানীয় এবং কম মজুরির অনুগত শ্রমিকদের কাজে লাগানোর নীতি গ্রহণ করা হয়। ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা উত্তর ভারতের দারিদ্র্যপীড়িত কানপুর, বিহার বিশেষত হাজারিবাগ এবং দক্ষিণের তেলেঙ্গানা ও তৎকালীন মাদ্রাজ প্রদেশ থেকে অনেক পরিচ্ছন্নতাকর্মী সংগ্রহ করে এ দেশে নিয়ে আসে।
ঢাকার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়
কম্পানি আমলের শুরুর দিকে অর্থাৎ ইংরেজদের ভারতীয় উপমহাদেশে শাসনব্যবস্থা কায়েমের সূচনা পর্বেই ইউরোপীয় মিশনারিদের খ্রিস্টধর্ম প্রচারে জোর তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। ধর্মান্তর ও আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ সময়ে ঘটে। তবে মোগল যুগেও ঢাকায় খ্রিস্টান সম্প্রদায় অস্তিত্ববান ছিল। শাসকশ্রেণীর সহযোগী হিসেবে নব্য জমিদার ও ধনিক শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। ইংরেজ কর্তৃক পুরস্কৃত হওয়ার ফলে সামগ্রিক পরিবর্তনে এই শ্রেণী নীরব ভূমিকা পালন করে। জমিদারি লাভ, অফিস-আদালত, নতুন নতুন ব্যবসা ক্ষেত্র ও শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রগামী হওয়ায় এই শ্রেণী অতিমাত্রায় বিলেতি ভাবধারা ও চালচলনে নিজেদের আত্মীকৃত করে ফেলে। অনেকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং এদের কারো কারো সঙ্গে ইংরেজদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। অন্যদিকে ইংরেজ শাসন ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে এ দেশে প্রচুর ইংরেজ রাজকর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর আগমন ঘটে। দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে অনেক ইংরেজও এ দেশীয় নারীদের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়। ইংরেজ ও ভারতীয়দের সংমিশ্রণে এক নতুন সংকর জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটে, যা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
অনেক ক্ষেত্রেই অলিখিতভাবে তাদের অবস্থান ইংরেজদের নিচে এবং ভারতীয়দের ওপরে গণ্য করা হতো। এই জাতিগোষ্ঠী ইংরেজিকে নিজস্ব ভাষা হিসেবে গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় ভাষায় পারদর্শিতা, উন্নত পরিবেশ ও পদস্থদের সাহচর্য লাভের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির বিশেষ সুবিধা লাভ করত।
চাকরি ও ব্যবসার সুবাদে অন্যান্য অঞ্চলের মতো ঢাকায়ও তাদের আগমন ঘটে। বিশেষত রেল বিভাগে ব্যাপকভাবে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা চাকরিতে নিয়োজিত ছিল। এ ছাড়া মিশনারি ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা, হাসপাতালে ডাক্তার ও নার্স হিসেবে, ইংরেজি পত্রিকার প্রুফ দেখা, টেলিফোন-টেলিগ্রাফ দপ্তরে, গাড়ি মেরামতসহ বিভিন্ন প্রকৌশলগত কাজ, নবপ্রতিষ্ঠিত ব্যাংক ও বীমা কম্পানি, সওদাগরি অফিসে হিসাবরক্ষক, জাহাজ-স্টিমারে চাকরিসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ও ঠিকাদারি কাজের সঙ্গেও অল্প বিস্তর সংশ্লিষ্ট ছিল। তবে শ্রমনিবিড় কাজ বা ভারী কাজে তারা কমই নিয়োজিত থাকত। দাপ্তরিক কাজেই তারা অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত।
সরকারি আবাসন ব্যবস্থার বাইরেও ঢাকার বিভিন্ন এলকায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা বসবাস করত। অধিকাংশই পুরান ঢাকার বিশেষত লক্ষ্মীবাজার, ওয়ারী ও তেজগাঁও এলাকায় বসবাস করত। এ ছাড়া মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে বাবুবাজার এলাকায়ও অনেক পরিবার বাস করত। বাঙালি খ্রিস্টানদের সঙ্গে তাদের খাদ্যাভ্যাস ও বেশভূষায় কিছুটা পার্থক্যও ছিল। বিশেষ করে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়েরা পশ্চিমা ধাঁচের কাপড়-চোপড় পরিধান করত। অনেকটা ইংলিশ ঘরানার খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠায় অনেক পরিবারেই বাইরের খাবার অর্থাৎ হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও বেকারির খাবার গ্রহণের প্রবণতা ছিল। তারা প্রধানত ক্যাথলিক ধর্মানুসারী। নিজেদের ভিন্ন সংস্কৃতির বাহক বিবেচনায় একসময় বৈবাহিক কাজকর্মে বাঙালি খ্রিস্টানদের পরিবর্তে এই জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিত।
(সূত্র : ঢাকাবাসী প্রত্যক্ষদর্শী আলি মাহমুদ খান)।
ঢাকার বিহারি জনগোষ্ঠী
সাধারণভাবে ভারতের বিহার রাজ্যের অধিবাসীরা বিহারি হিসেবে পরিচিত হলেও ঢাকা তথা বাংলাদেশে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের অবাঙালি বা উর্দুভাষী ইসলাম ধর্মাবলম্বী উদ্বাস্তু/অভিবাসীরা বিহারি অভিধায় চিহ্নিত হয়েছে। যদিও দেশবিভাগের অনেক আগে মোগল কম্পানি যুগে বিহারি জনগোষ্ঠী ঢাকায় ছিল, কিন্তু দেশবিভাগের পরে ব্যাপক সংখ্যায় এই জনগোষ্ঠীর মানুষ ঢাকায় আসে ও স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। গোটা শহরে এই জনগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় প্রধানত ছিন্নমূল বিহারিদের পুনর্বাসন প্রয়াস চলে পাকিস্তানি আমলে। স্বাধীনতার পরে এ জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে আটকে পড়া পাকিস্তানি হিসেবে পরিচিত হয় এবং মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের ক্যাম্পে অবস্থান করে। এই ক্যাম্প জেনেভা ক্যাম্প নামে পরিচিত। ক্যাম্পে অবস্থানকারীদের বড় অংশ শিক্ষাবঞ্চিত এবং বিভিন্ন কায়িক শ্রমনির্ভর কারিগরি পেশায় নিয়োজিত। বড় জনসংখ্যার অভিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে ঢাকায় বিহারিরাই সর্বশেষ।

দৈনিক কালের কন্ঠের ঈদ সংখ্যায় খন্দকার মাহমুদুল হাসান এর লেখাটি হুবহু কপিপেস্ট করা হয়েছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s