শহীদুল জহিরের দিকে দেখি


শহীদুর জহির (১৯৫৩-২০০৮)

১১ সেপ্টেম্বর অকালপ্রয়াত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের জন্মদিন। মাত্র ৫৪ বছরের জীবনেই তিনি সৃষ্টি করেছেন বাংলা সাহিত্যের স্মরণীয় বেশ কিছু মুহূর্ত তার উপন্যাসে, তার গল্পে। বাংলা ভাষার এই কীর্তিমান লেখকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। বাঙলার পাঠশালা’র আয়োজনে ২১ অগাস্ট ২০১৩ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরকে নিয়ে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন শাহাদুজ্জামান। সেই বক্তৃতার উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে বর্তমান এই রচনাটি।  দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশে প্রকাশিত রচনাটি সরাসরি কপি পেস্ট করে সংরক্ষণ করে রাখলাম আগামীর জন্য। বাংলার মননশীল পাঠকের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকুক শহীদুল জহিরের রচনাগুলো এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

শাহাদুজ্জামান যেভাবে বক্তব্য দিয়েছিলেন……

আমার লেখালেখির সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে, তারা হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, আমি সাহিত্যের নানা শাখায় কাজ করার চেষ্টা করেছি। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ, পত্রিকার কলাম ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে। আমি বিভিন্ন সময় নানারকম প্রশ্ন, নানা রকম ভাবনা দিয়ে তাড়িত হই। তারপর সেই ভাবনা আর প্রশ্নগুলো বহন করে বেড়াই অনেকটা মালবাহী ট্রাকের মতো। ভার বোধ করি। একটা সময় সেই ভার লাঘব করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এসব প্রশ্ন আর ভাবনার বোঝাটাকে নামানোর ইচ্ছা হয়। একমাত্র লিখেই এ বোঝাটাকে নামাতে পারি। কিন্তু সব বোঝা তো সব জায়গায় নামানো যায় না। কোনো বোঝা নামাই গল্পে, কোনোটা উপন্যাসে, কোনোটা প্রবন্ধে, কোনোটা পত্রিকার কলামে। লেখালেখি করা তাই আমার কাছে একটা ভারমুক্ত হওয়ার ব্যাপার। লিখেই মনে ভার হয়ে থাকা প্রশ্নগুলোকে, ভাবনাগুলোকে মোকাবেলা করতে পারি। আমি যখন অন্যের লেখার পাঠক হই তখনও আমার সেই একই তাড়না কাজ করে। আমি এমন লেখাই পাঠ করতে চাই, যা আমাকে ভারমুক্ত করবে, যে লেখা আমার ভেতর যে প্রশ্নগুলো আছে, আমার ভেতর যে ভাবনাগুলো আছে সেগুলোকে মোকাবেলার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। শহীদুল জহির যখন আমি পাঠ করি, তখন আমার ঠিক সেরকম একটা অভিজ্ঞতা হয়। শহীদুল জহির পাঠ করতে গিয়ে আমি চিন্তার একটা নতুন দিগন্তে গিয়ে পৌঁছাই, আমার অনেক ভাবনার জট খুলে যায়, আমি সত্যি ভারমুক্ত বোধ করি। এবং পুরো প্রক্রিয়াটা ঘটে একটা গভীর আনন্দের ভেতর দিয়ে। পাঠক হিসেবে আমার পছন্দের তালিকায় শহীদুল জহির তাই অন্যতম একজন লেখক।

sj-b2শুরুতেই বলি কী করে শহীদুল জহিরের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটল। তার লেখার সঙ্গে আমাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। সম্ভবত নব্বই/একানব্বই সালের দিকে। আমি তখন আড্ডা দেয়ার জন্য নিয়মিত ইলিয়াস ভাইয়ের টিকাটুলির বাড়িতে যেতাম। তেমনি একটি আড্ডার দিন তিনি আমাকে একটা বই দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা পড়ে দেখো, সিগনিফিকেন্ট একটা কাজ।’ আমার মনে আছে, বইটার প্রচ্ছদে ছিল সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব আনাড়ি একটা স্কেচ, বইটার প্রডাকশন ছিল নিম্নমানের। চটি আকারের বইটির নাম জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এটা কোনো প্রবন্ধের বই হবে। অবশ্য প্রবন্ধের বই হিসেবেও নামটা আমার খুব ক্লিশে আর অনাকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। ইলিয়াস ভাই বললেন, এটা একটা উপন্যাস। আমি বাড়ি ফিরে বইটা পড়তে শুরু করি। বইটার প্রথম লাইন : ‘উনিশশ পঁচাশি সনে একদিন লক্ষ্মীবাজার শ্যামপ্রসাদ চৌধুরী লেনের যুবক আবদুল মজিদের পায়ের স্যান্ডেল পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিবিধানে ব্যর্থ হয়ে ফট করে ছিঁড়ে যায়।’ বলা যায় যে, বইটার এই প্রথম লাইনই আমাকে রীতিমতো বড়শির মতো গেঁথে ফেলে। স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরার অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা জানেন, স্পঞ্জের স্যান্ডেল এভাবেই খুব বেমক্কা, বেকায়দা জায়গায় ফট করে ছিঁড়ে যায়। এরপর তিনি আবদুল মজিদের স্পঞ্জের স্যান্ডেলটা নিয়ে এমনভাবে আলাপ শুরু করেন যেন সেই স্যান্ডেলটার প্রাণ আছে, ব্যক্তিত্ব আছে। এরপর তিনি ক্রমেই যে পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিবিধানে ব্যর্থ হয়ে এই স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতাটা ছিঁড়ে গেল সে পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যান আমাদের। এ ঘটনাগুলো ঘটছে পুরান ঢাকার প্রেক্ষাপটে এবং আমার সামনে উন্মোচিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল। একটা স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতা থেকে তিনি ধীরে ধীরে পাঠককে নিয়ে যান একটা বৃহৎ প্রেক্ষাপটে। মাইক্রো থেকে ম্যাক্রোতে। সম্ভবত দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতেই একটা দৃশ্য দেখতে পাই যেখানে একজন মাওলানা, যিনি বস্তুত একজন রাজাকার, মানুষের মাংস টুকরা টুকরা করে কাককে খাওয়াচ্ছেন। আরও দেখি সেই মাংসের একটা টুকরা মাওলানার প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে পড়েছে। প্রতিবেশী সেই মাংসের টুকরাটা হাতে তুলে নিয়ে আবিষ্কার করছে যে সেটা আসলে একজন মেয়ের আংটি পরা একটা কাটা আঙুল। আমি ক্রমেই টের পাই সাহিত্যের একটা নতুন অভিজ্ঞতার ভেতর ঢুকেছি আমি, একটা নতুন পৃথিবীতে ঢুকেছি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এভাবে আমি পাঠ করিনি কখনও। আমি এক টানে রুদ্ধশ্বাসে বইটা শেষ করি এবং বইটা শেষ করার পর আমার কোনো সন্দেহ থাকে না যে, মুক্তিযুদ্ধের ওপর শ্রেষ্ঠ বইটাই আমি পড়ে উঠলাম। এরপর থেকে আমি শহীদুল জহিরের লেখার জন্য বরাবর অপেক্ষা করেছি। তার পরবর্তী সব বই আমি মনোযোগের সঙ্গে পড়েছি। আমার বিবেচনায় তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন কথাসাহিত্যিক। আমার গল্প, অগল্প না গল্প সংকলনটি আমি তাকে উৎসর্গ করেছি।

johirআসলে সাহিত্যের মাঠে নানারকম চেষ্টা তো অবিরাম চলছে। অনেক পরিশ্রম, অনেক চেষ্টা। কিন্তু সব চেষ্টা, সব পরিশ্রম কোথাও গিয়ে পৌঁছায় না। আমের মৌসুমে যেমন হাজার হাজার মুকুল হয়; কিন্তু গুটিকয়েক মুকুলই কেবল আমে পরিণত হয়। সাহিত্যের অঙ্গনে এরকম বহু মুকুল ফোটে; কিন্তু আম হয়ে ওঠে গুটিকয় মাত্র। শহীদুল জহিরের লেখা পড়ার পর আমার মনে হয়েছে যে, তিনি সেরকম একটি সফল আম। যিনি সত্যিকার অর্থে মুকুল থেকে ফুটে বেরিয়েছেন। গল্প-উপন্যাসের সফলতার প্রশ্নে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ একবার বলেছিলেন, ‘আইদার ইট ওয়ার্ক অর ইট ডাজ নট।’ শহীদুল জহিরের লেখা পড়ার পর আমার মনে হয়েছে ‘ইট ডেফিনিটলি ওয়ার্কস।’ নিজে একজন প্র্যাকটিসিং লেখক হিসেবে, এই অভিনব ধারার লেখকের সঙ্গে পরিচিত হতে কৌতূহলী হয়ে উঠি। এক পর্যায়ে তার সঙ্গে পরিচয়ও ঘটে আমার। কিন্তু তিনি ভেতরগোটানো স্বভাবের মানুষ। তার সঙ্গে আড্ডায় মশগুল হওয়া সহজ নয়। তবে অভিজ্ঞতায় দেখেছি একবার তার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে গেলে অনেক আলাপই জমে ওঠে। আমার সুযোগ হয়েছিল তার সঙ্গে বিভিন্ন সময় বিস্তর আড্ডা দেয়ার। তিনি আমার লেখারও মনোযোগী পাঠক ছিলেন। সেসব আড্ডায় আমি যেমন তার লেখা সম্পর্কে আমার মতামত জানানোর সুযোগ পেয়েছি, আমার সৌভাগ্য হয়েছে নিজের লেখা সম্পর্কেও তার মতামত জানবার। আমার একটা বাড়তি আনন্দের ব্যাপার এই যে, তিনি আমার বই বিসর্গতে দুঃখ-এর একটা রিভিউ করেছিলেন। মেধাবী একটা রিভিউ। এবং সেটা তার জীবনের একমাত্র বুক রিভিউ।

imgrok_11613শহীদুল জহির তার লেখার ভেতর দিয়ে একটা আবহ তৈরি করেন, যে আবহের স্বতন্ত্র একটা চরিত্র আছে, বাংলা সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে যা নতুন। আমার পাঠের অভিজ্ঞতাকে যা একটা নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেয়। তার এই সাহিত্যিক আবহের ভেতর আমি কতগুলো প্রবণতা লক্ষ্য করি। ধরা যাক, তার ভাষা। গদ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার তো নানারকম আছে। মোটাদাগে বললে একদল গদ্য লেখক আছেনÑ আমি মূলত গল্প, উপন্যাস লেখকের কথা বলছিÑ যাদের কাছে ভাষা হচ্ছে তার কাহিনীটাকে, তার বিষয়টাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার বাহন। আবার আরেক ধরনের লেখক আছেন যাদের কাছে ভাষাটাই একটা বিষয়। ভাষা তাদের কাছে গল্পটা বলার মাধ্যম নয় কেবল, তারা ভাষার ভেতর দিয়ে একটা রহস্য তৈরি করেন, ভাষাটাকেই তারা একটা বিষয় হিসেবে উপস্থিত করেন, ভাষাটাকেই তার কনটেন্ট হিসেবে দাঁড় করান। শহীদুল এই দ্বিতীয় ধারার লেখক। ভাষার নিজস্ব চরিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা অনেকেই করেন; কিন্তু ওই যে বলছিলাম, ‘আইদার ইট ওয়ার্কস অর ইট ডাজ নট’; সবার চেষ্টার মধ্যে সেই মেধা থাকে না। শহিদুল যে মেধা আর প্রজ্ঞা সমেত ভাষা ব্যবহার করেছেন তা সফলভাবেই সাহিত্যে এক নতুন অ্যাটমোস্ফেয়ারের জন্ম দিয়েছে। বাংলা কথাসাহিত্য দীর্ঘদিন ধরে, পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের লেখকদের হাত ধরে যে ধারায় পুষ্টি পেয়েছে, সে ধারা থেকে শহীদুল বেশ বড় একটা বাঁক নিয়েছেন। তার সঙ্গে তার পূর্বসূরিদের মিল খুব সামান্য। খানিকটা মিল পাওয়া যায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের লেখক কমলকুমার মজুমদার যিনি সচেতনভাবে নিজস্ব একটা সান্ধ্য ভাষা তৈরি করেছিলেন, তার সঙ্গেও ঠিক মেলে না শীহদুলের ভাষা। বলা যায় তিনি স্বরূপে স্বতন্ত্র হয়ে হাজির হয়েছেন আমাদের সাহিত্যে।

গদ্য রচনার প্রকরণের দিক থেকে দেখলে বাক্য গঠনে তিনি ব্যাপকভাবে ‘প্যারেন্থিসিস’ ব্যবহার করেন, যার ব্যবহার ইংরেজি সাহিত্যে বিস্তর। প্যারেন্থিসিসের ক্ষেত্রে অনেকগুলো ছোট ছোট বাক্যাংশ মিলিয়ে একটা দীর্ঘ বাক্য তৈরি করা হয়। একটা দীর্ঘ বাক্যের ভেতর স্বয়ংসম্পূর্ণ অনেকগুলো বাক্যাংশ থাকে এবং সেই বাক্যাংশকে যদি ওই পূর্ণাঙ্গ বাক্য থেকে তুলে নেয়া হয়, তাতে সেই মূল বাক্যের কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি হয় না। ইংরেজি গদ্যে এই প্যারেন্থিসিসের অনেক ব্যবহার রয়েছে; কিন্তু বাংলা গদ্যে তেমন দেখা যায় না। শহীদুল তার কথাসাহিত্যে

প্যারেন্থিসিসের বহুল ব্যবহার করেছেন। এতে করে তার গদ্যের একটা বিশেষ আবহ তৈরি হয়েছে। এর চূড়ান্ত নিদর্শন সম্ভবত তার ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটা। সেই গল্পের কিছুটা অংশ আমি পড়ছি :

‘আমাদের মহল্লা, দক্ষিণ মৈশুন্দির শিল্পায়নের ইতিহাস আমাদের মনে পড়ে, মহল্লায় গরম পড়তে শুরু     করলে চৈত্র বৈশাখ মাসের তরমুজওয়ালারা তরমুজ নিয়ে আসে, আমরা তরমুজ খেতে শুরু করি,  আমরা তখন তরমুজ সম্পর্কে সচেতন হই, আমরা লক্ষ্য করি যে এই তরমুজওয়ালারা মহল্লার গলির সঙ্কীর্ণ একটি     জায়গার মাটিতে দেয়ালের পাশ ঘেঁষে, গোল গোল তরমুজের ছোটো ছোটো ঢিপি বানিয়ে বসে,…’

এভাবে তিনি কমা দিয়ে দিয়ে দীর্ঘ একটা পরিচ্ছদে গল্পটা লেখেন। পুরো গল্পটা তিনি লেখেন একটা পরিচ্ছদে। কমা দিয়ে দিয়ে তিনি অনেকগুলো বাক্যাংশকে মিলিয়ে গল্পটা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। বাংলা সাহিত্যে এরকম আরেকটা উদাহরণ হলো, কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাস পিঞ্জরে বসিয়া শুকÑ এই গোটা উপন্যাসটা একটামাত্র বাক্যে লেখা। ছোট ছোট বাক্যাংশের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ মৈশুন্দির অগণিত ডিটেইলস শহীদুল উপস্থিত করেন। পড়তে পড়তে ওই মহল্লার আঁটোসাঁটো পুনরাবৃত্তিমূলক জীবনটা আমাদের কাছে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। তিনি ওই গল্পটা শেষও করেছেন একটা কমা দিয়ে। এই কমা নিয়ে তার কাছ থেকেই ইন্টারেস্টিং একটা গল্প শুনেছি। ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটা আছে তার ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প বইটাতে। তিনি বলছিলেন প্রতিবার প্রেস থেকে প্রুফ এলে তিনি দেখতেন কম্পোজার গল্পটা শেষ করেছেন দাঁড়ি দিয়ে। তিনি আবার দাঁড়ি কেটে কমা করে দিতেন; কিন্তু পরের প্রুফে আবার দেখতেন সেটা দাঁড়ি হয়ে গেছে। তিনি আবার প্রুফ কারেকশন করে সেটাকে কমা করতেন। এক পর্যায়ে প্রুফরিডারের সঙ্গে এই নিয়ে তার বেশ একটা বিত-া হয়। প্রুফ রিডার তাকে বলেন, ‘আপনে সাহিত্য করতে আসছেন, বাংলা ব্যাকরণও মানবেন না? ব্যাকরণ জানেন না আপনে? কমা দিয়া কখনও কোনো লেখা শেষ হতে দেখছেন?’ তারপরও শহীদুল প্রুফ রিডারকে বলেছিলেন, নিয়ম যাই হোক লেখাটা শেষ হবে কমা দিয়েই। কিন্তু প্রুফ রিডার সে কথা মানেননি। বইটা যখন বের হলো, তিনি দেখলেন, গল্পটা দাঁড়ি দিয়ে শেষ করেই ছাপা হয়েছে। শহীদুল জহির খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং তিনি শুধু এই কমার দুঃখে সেই গল্পটা আবার তার পরবর্তী বইয়ে ছাপিয়েছিলেন, যেখানে তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, গল্পটা কমা দিয়ে শেষ হবে। ওই কমাটা তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন মহল্লার জীবনের ভিসাস সাইকেলটাকে বোঝাতে তিনি ঐ কমাটাকে রেখেই গল্পটা শেষ করেছিলেন, ওই জীবনের পৌনঃপুনিকতার ওপর জোর দিতে চেয়েছিলেন। দাঁড়ির মধ্য দিয়ে কাহিনীর যে পূর্ণচ্ছেদ ঘটে তা গল্পটার মূল সুরটাকে ব্যাহত করে। ফলে তিনি একটা কমার মধ্য দিয়ে গল্পটাকে উন্মুক্ত রেখে দিতে চেয়েছিলেন। শহীদুল জহির ছিলেন সেই লেখক যিনি একটা কমার দুঃখে দ্বিতীয়বার একটা গল্প ছাপান।

‘কুটির শিল্পের ইতিহাস’ ছাড়াও তার প্রায় সব গল্পেই প্যারেন্থিসিসের ব্যবহার রয়েছে, যা তার গল্পে একটা ভিন্নতর মেজাজ এনে দিয়েছে। তিনি তার শেষ দিকের লেখায় আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহারও শুরু করেছিলেন, বিশেষ করে ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে। তিনি ‘হয়ে’ না লিখে লিখতেন ‘হয়া’। দাঁড়িয়ে না লিখে ‘খাড়ায়া’ লিখতেন। যেমন, ‘…ভূতের গলির লোকেরা যখন এইসব বলে, তখন কেরোসিনের বাত্তির সুপিয়া আকতার এবং চম্পা ফুল গাছের ভাঙা একটা ডালের কথা প্যাঁচ খায়া জড়ায়া যায়…।’ আমাদের এখানে মান ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা ইত্যাদি নিয়ে বেশ নানারকম বিতর্ক আছে। পশ্চিমবঙ্গের গদ্য থেকে বাংলাদেশের গদ্যকে আলাদা করার চেষ্টা আছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক, সামাজিক জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সামাজিক জীবন থেকে নানাভাবেই ভিন্ন। ফলে ভাষার একটা আঞ্চলিক চেহারা থাকবেই। কিন্তু পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক কিছু শব্দ ব্যবহার করলেই তো তা পূর্ববঙ্গের সাহিত্য হয়ে ওঠে না। আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার ইন ইটসেলফ সাহিত্য প্রতিভার কোনো নমুনা হতে পারে না। দেখার বিষয়, কতটা সৃজনশীলভাবে, মেধার সঙ্গে তার ব্যবহার হয়েছে। মান ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে নানা রকম তর্ক আছে বলেছি; কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ বাদে সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষার মেধাবী ব্যবহার তেমন চোখে পড়ে না। এ ক্ষেত্রে শহীদুল সীমিত আকারে আঞ্চলিক ক্রিয়াপদের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যে মেধাবী বাক্যগুলো রচনা করতে শুরু করেছিলেন, তাতে আমি নিশ্চিতÑ বেঁচে থাকলে তার হাত দিয়ে গদ্য সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের আরও চমৎকার উদাহরণ আমরা দেখতে পেতাম।

sj1শহীদুলের লেখার যে স্বতন্ত্র অ্যাটমোস্ফিয়ারের কথা বলছিলাম সেটা শুধু ভাষা দিয়েই তৈরি হয় না। বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও তার রয়েছে একেবারে ইউনিক একটা ধরন। তিনি তার গল্পে প্রায়ই একেবারে বিপরীতমুখী দুটি পরিস্থিতিকে জাক্সটাপোজ করেন, যাতে করে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়। যেমন ধরা যাক, তার ‘আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল নেই কেনো’ গল্পটা। সেখানে দেখা যাচ্ছে একজন নিম্নপদস্থ চাকরিজীবী আগারগাঁও কলোনিতে থাকেন। তিনি স্বল্পবাক, নিভৃতচারী একজন মানুষ, যিনি প্রতিদিন অফিস থেকে এসে কলোনির বাড়িটার বারান্দায় গিয়ে বসেন। ওই বারান্দাটাই তার নিভৃত শান্তির জগৎ, সেখানেই তিনি জীবনের স্বস্তি খুঁজে পান। অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে বসে থাকেন। এক পর্যায়ে বারান্দায় রাখা নয়নতারা ফুলের আকর্ষণে অসংখ্য প্রজাপতি আসতে শুরু করে। প্রজাপতিতে বারান্দা ভরে যায়। তারপর ওই প্রজাপতি দেখার জন্য আগারগাঁওয়ের লোকজন কলোনির সামনের মাঠে ভিড় করতে থাকে। তারা প্রজাপতি লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে থাকে। প্রজাপতি আসাতে বিশেষ সমস্যা না হলেও লোকজনের এই ভিড়, ঢিল ছোড়াছুড়িতে এই ভদ্রলোকের পক্ষে আর বারান্দায় এসে বসা দুরূহ হয়ে পড়ে। বারান্দাটা যে আর তার নিভৃত, শান্তির জায়গা থাকছে না সেটা ভেবে খুব মর্মাহত হন ভদ্রলোক। আর ঠিক তখনই একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার ঘটে। শহীদুল জানাচ্ছেন যে, ঠিক সেরকম একটা মুহূর্তে দেশে মার্শাল ল’ জারি হয়। এবং এই মার্শাল ল’ জারি হওয়ার মধ্য দিয়ে তার প্রজাপতিবিষয়ক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। সামরিক সরকার এসে হঠাৎ করে পার্শ্ববর্তী চিড়িয়াখানা উন্নয়নে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা চিড়িয়াখানায় নতুন শিম্পাঞ্জি নিয়ে আসে বিদেশ থেকে। তখন আগারগাঁওয়ের লোকেরা প্রজাপতি ছেড়ে শিম্পাঞ্জি দেখার জন্য দলে দলে চিড়িয়াখানার দিকে ছুটতে থাকে। এ ভাবে ওই ভদ্রলোক তার বারান্দার নিভৃত কোণটা আবার ফিরে পান। এখানে প্রজাপতি এবং মার্শাল ল’ এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গকে জাক্সটাপোজ করে একটা অদ্ভুত কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি করলেন তিনি। এবং এর ভেতর দিয়ে তিনি সামরিক শাসনের খুব মজাদার ভঙ্গিতে একটা ক্রিটিক করলেন। শহীদুলের লেখায় এমন অনেক বিপরীতধর্মী বিষয়ের একটা অ্যাবসার্ড জাকসটাপজিশন আছে, যা তার লেখার সেই স্বতন্ত্র চরিত্রটা তৈরিতে সহায়তা করেছে।
4454_93120392824_5210468_n
কৌতুকময়তাও তার লেখার একটা বড় বৈশিষ্ট্য। তার লেখায় প্রায়ই একটা চাপা কৌতুক থাকে। খুব উইটি। তার কৌতুককে কখনও কখনও আমার চার্লি চ্যাপলিনের মহৎ কৌতুকের মতো মনে হয়। চ্যাপলিন খুব গম্ভীরভাবে জীবনের দুর্বিষহ, ভয়াবহ বিষয়গুলোকে নিয়ে কৌতুক করেছেন। তিনি মানুষের মৌলিক দুটো তাড়না অশ্রু এবং হাসির অসাধারণ সমন্বয় করেছিলেন। চ্যাপলিনকে আইজেনস্টাইন তুলনা করেছিলেন শেক্সপিয়রের সঙ্গে। শহীদুলও প্রায়ই সমাজের সবচেয়ে কঠিন, বীভৎস ব্যাপারগুলো নিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে কৌতুক করেন। যেমন ধরা যাক তার ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’ গল্পটা। সেখানে খুব গম্ভীরভাবে তিনি খেলাটার বর্ণনা দিচ্ছেন। খেলাটার নিয়ম-কানুন পাঠকদের জানানোর জন্য শুরুতে তিনি বিভিন্ন জিনিসের সংজ্ঞা দিচ্ছেন। যেমন তিনি বলছেন, ‘ইন্দুর কাহাকে বলে?’ উত্তরে বলছেন, ‘ইন্দুর হচ্ছে ইন্দুর জাতীয় প্রাণী’, যথা, ‘ইন্দুর ভায়া পেয়েছে ভয়।’ তারপর আবার জিজ্ঞাসা করছেন, ‘বিলাই কাহাকে বলে?’ উত্তর দিচ্ছেন, ‘বিলাই হচ্ছে বিলাই জাতীয় প্রাণী’, যথা, ‘বিলাই ঘুরে জগৎময়।’ বেশ একটা কৌতুককর ব্যাপার তৈরি করছেন খুব গম্ভীর একটা ভঙ্গিতে। কিন্তু তারপর ক্রমেই এই ইন্দুর-বিলাই খেলার বর্ণনা করতে করতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটা বীভৎস বাস্তবতার দিকে নিয়ে যান পাঠকদের। মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, শক্তিমান, দুর্বল, এদের পারস্পরিক লড়াইয়ের নির্মম কতগুলো বাস্তবতার ভেতর ঢুকিয়ে ফেলেন পাঠককে। এরকম ভঙ্গি তার আরও অনেক গল্পেই আছে। ‘ইন্দুর বিলাই খেলা’ গল্পটা যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, সেই গল্পে তিনি ভিজ্যুয়াল ইমেজও ব্যবহার করেছেন। গল্পের ভেতর ছবি এঁকেছেন। তিনি খেলাটা বোঝাতে গিয়ে ইঁদুর, বিড়াল ইত্যাদির ছবি এঁকেছেন। খেলার ছক এঁকেছেন। তার ‘ডলু নদীর হাওয়া’ গল্পের এক চরিত্র যে ফাঁদ তৈরি করে সে ফাঁদের ছবিও তিনি এঁকে দেখিয়েছেন। অনেকটা বাচ্চাদের বইয়ের অলঙ্করণের মতো। এতে যেমন একটা কৌতুকের উপাদান আছে, তেমনি টেক্সট এবং ভিজ্যুয়াল দুটো ভিন্ন মাধ্যমে লেখা উপস্থাপন করে পাঠককে একটা নতুন ধরনের অভিজ্ঞতাও দিয়েছেন তিনি।
তার লেখার এই বৈশিষ্ট্যগুলোÑ বাক্য গঠনে প্যারেন্থিসিসের ব্যবহার, ভিন্ন দুটো বাস্তবতার জাক্সটাপজিশন বা কৌতুককর আবহÑ এ সবের মাধ্যমে পাঠককে তিনি একটা বেশ ঘোরের ভেতর ফেলে দেন। একটা জালের ভেতর আটকে ফেলেন। জালে আটকে তারপর পাঠককে তিনি মুখোমুখি করেন নির্দিষ্ট কয়েকটা জনপদের। ভূতের গলি, দক্ষিণ মৈশুন্দি, পদ্মনিধি লেন কিংবা কখনও কখনও সুহাসিনীর। এই দু’তিনটা গলি, মহল্লার ভেতর দিয়েই তিনি হাত দেন পুরো বাংলাদেশের প্রাণের ভেতর। যেমন মার্কেজের মাকানডো গ্রাম ঘুরে ফিরে এসেছে তার উপন্যাসে। শহীদুল তার গল্পের মধ্য দিয়ে মহল্লার একেবারে প্রান্তিক মানুষগুলোর মুখোমুখি করেন আমাদের। মহল্লার খুচরা মানুষ, আইসক্রিম বিক্রেতা, তরকারিওয়ালা, লেদ-মেশিনের অপারেটর, ডালপুরি বিক্রেতা প্রমুখের জীবনের জঙ্গমতা, প্রেম, সংগ্রামকে হাজির করেন তিনি আমাদের সামনে।
শহীদুল যে জনপদের জীবনকে উপস্থিত করেন তার লেখায় তার দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করব এখানে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শহীদুলের মহল্লার মানুষদের একটা যৌথ চরিত্র আছে। কোনো মানুষ যেন একা কোনো মানুষ নয়, সবাই মিলে একটা মানুষ। তারা যৌথভাবে চিন্তা করে, যৌথভাবে কাজ করে। যেমন ধরা যাক, ‘কোথায় পাবো তারে’ গল্পটাতে তিনি লিখছেন, ‘আমরা মহল্লার লোকেরা সেদিন রাতে আমাদের দিবসের কর্ম শেষে ক্লান্ত অবসরে আবদুল করিমের ময়মনসিংহ যাওয়ার সর্বশেষ খবর শুনি এবং বলি যে পোলাটা হালার ভোদাই।’ কিংবা ‘আমাদের মনে হবে যে আবদুল করিমের খোঁজ করা যায় এবং আমরা ভূতের গলিতে আবদুল করিমের খোঁজ করব।’ আবার আরেকটা গল্পে, ‘ভূতের গলির মানুষেরা বানর নিয়া ব্যস্ত থাকে, তারা দেয়ালের উপর অথবা দূরে ছাদের কার্নিশে লেজ ঝুলিয়ে বসে থাকা এই খয়েরী রঙের জানোয়ারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে, ঐ যে বান্দর।’ মহল্লার মানুষ যখন কিছু একটা ভাবে তখন যেন সবাই মিলে একসঙ্গে ভাবে, যখন কিছু একটা করে তখন তা একসঙ্গে করে। আমরা দেখছি আবদুল করিম কেন ময়মনসিংহ যাবে এটা নিয়ে পুরো মহল্লা একসঙ্গে মিলে ভাবছে। কিংবা ‘আমাদের কুটির শিল্প’ গল্পটায় জানাচ্ছেন, দক্ষিণ মৈশুন্দিতে যখন তরমুজওয়ালারা আসে তখন মহল্লার সবাই কী কী করে, তরমুজ নিয়ে মহল্লার সবাই কী কী ভাবে ইত্যাদি। এই যে কালেকটিভ থিংকিং, জনপদের এই যে যৌথ চরিত্রÑ এটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। এর একটা সমাজতাত্ত্বিক মাত্রাও আছে। পাশ্চাত্য দীর্ঘদিন ধরে, সেই রেনেসাঁ বা এনলাইটমেন্টের সময় থেকে চেষ্টা করেছে ব্যক্তিকে যৌথতার ভেতর থেকে বের করে ব্যক্তি হিসেবে হাজির করতে। ব্যক্তি তৈরির সংগ্রামই হচ্ছে পুরো পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাস। এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নাগরিক হচ্ছে আধুনিক বুর্জুয়া রাষ্ট্রের কাম্য অধিবাসী। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, কথিত উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকরা সেই অর্থে বুর্জুয়া একক ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। এখানকার ব্যক্তিরা নানাভাবে সামষ্টিক জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। পরিবার, মহল্লা, গ্রামবাসীর যৌথতা থেকে মুক্ত হয়ে স্বতন্ত্র ব্যক্তি তারা হয়ে ওঠেনি। এটা কি আমাদের দুর্বলতা না শক্তি? একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। আমি ডাক্তারি পড়েছি। এখন শিক্ষকতা, গবেষণা ইত্যাদির কাজ করলেও প্রথম দিকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছি। মনে আছে, গ্রামে একদিন একজন রোগী এসেছে। ২০/২২ বছরের একটা ছেলে। নারকেল গাছ থেকে পড়ে তার পা ভেঙে গেছে। তার মা-বাবা, বড় ভাই তাকে সঙ্গে করে এনেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে কী হলো? এর জবাব দিল বড় ভাই, কীভাবে নারকেল গাছে উঠেছিল ছেলেটা, তারপর গাছে ওঠার দড়ি ছিঁড়ে গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙে যায় ছেলেটার। পা কোথায় ভেঙেছে বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। আমি তাই জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক কোথায় তার ব্যথা হচ্ছে? তখন ছেলেটার মা আমাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন ঠিক কোথায় ব্যথা করছে। ব্যথা কোনদিকে থেকে কোনদিকে যাচ্ছে ইত্যাদি। ছেলেটার বাবাও কিছু তথ্য এর সঙ্গে যোগ করলেন। মজার ব্যাপার হলো, যে ছেলেটার পা ভেঙেছে সে কিন্তু একদম চুপ আছে, সে কিছুই বলছে না। তার অসুখের পুরো বর্ণনা দিচ্ছে তার পরিবারের অন্য সদস্যরা। অসুখটার যে সাফারিংস তা বর্ণিত হচ্ছে যৌথভাবে। অন্যভাবে যদি দেখি তাহলে বলতে হবে যে, ছেলেটার শারীরিক এই বিপর্যয়ের জন্য যে সাফারিং সেটা নেহাত একটা ব্যক্তির সাফারিং নয়, কালেকটিভ সাফারিং। ফলে এর ন্যারেটিভটাও কালেকটিভ। ছেলেটার অসুখে শুধু ছেলেটা নয়, পুরো পরিবারটাই সাফার করছে। আমি এখন ব্রিটেনে থাকি, সেখানে এভাবে প্রাপ্তবয়স্ক একজনের পক্ষে বাবা-মা, ভাই-বোন মিলে ডাক্তারের সামনে হাজির হওয়া এক অসম্ভব ব্যাপার। রোগীর সঙ্গে যদি কখনও আত্মীয়-স্বজন কেউ যায়ও তার ভূমিকা খুবই নগণ্য। রোগীকে একক ব্যক্তি হিসেবে ডাক্তারের মুখোমুখি হতে হবে। তার রোগের বয়ান তাকেই করতে হবে। ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে চিকিৎসাবিষয়ক সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে। তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার অন্য কাউকে দিতে গেলে নানারকম আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অথচ আমাদের অঞ্চলে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নানাভাবে মাখামাখি করে আছে পারিবারিক, গ্রাম, মহল্লার সিদ্ধান্তের ওপর। এশিয়া, আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে শুধু পরিবার নয়, কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মৃত পূর্বপুরুষের আত্মার সঙ্গে পরামর্শ করারও রেওয়াজ আছে। এখন এই যে যৌথতা, তা কী একটা দুর্বলতা না শক্তি? আধুনিক সমাজতাত্ত্বিকরা আবার এও দেখাচ্ছেন কী করে পাশ্চাত্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চর্চা করতে গিয়ে ব্যক্তিসর্বস্বতায় উপনীত হয়েছে। বুর্জুয়া সভ্যতা যে একক যুক্তিবাদী ব্যক্তির আদর্শ তুলে ধরেছিল তা কতটা কাম্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পোস্টকলোনিয়াল তাত্ত্বিকরা, সাবঅলটার্ন স্টাডিজের সমাজভাবুকরা। তারা ‘বিকল্প আধুনিকতা’র কথা তুলেছেন। যাহোক, সেসব ভিন্ন আলোচনা। শহীদুল তার গল্প-উপন্যাসে আমাদের এই জনপদের যৌথ চরিত্রকে তুলে এনেছেন। বিশ্বায়নের কালে আমাদের সমাজের যৌথ চরিত্রও ক্রমেই ভাঙছে। নাগরিক জীবনে তো তার ভাঙন শুরু হয়েছে বহু আগেই। পুরান ঢাকার জীবনে সেই নাগরিক যৌথতা এখনও হয়তো কিছুটা অবশিষ্ট আছে, যদিও তা ধ্বংসের দিকেই যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার কবিতাগুলোর কথা। এই বইটার নাম জীবনানন্দ কিন্তু দিয়েছিলেন ‘বাংলার ত্রস্ত নিলিমা’। বইটা তার মৃত্যুর পর প্রথম প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশকরা এর নাম দেন রূপসী বাংলা। নগরায়নের চাপে ভীত-সন্ত্রস্ত বাংলার প্রকৃতিকে অক্ষরে ধরে রাখার জন্য বাংলার প্রকৃতি নিয়ে এই অসাধারণ কবিতাগুলো লিখেছিলেন জীবনানন্দ। একজন কেউ বলেছিলেন, যদি কোনোদিন এমন হয় পারমাণবিক বোমায় উড়ে গেল এই বাংলা অঞ্চল, তার আর কোনো চিহ্ন রইল না। সেই হারানো বাংলাকে যদি তখন আবার রিকনস্ট্রাক্ট করার দরকার পড়ে তবে সেটা রূপসী বাংলার কবিতাগুলো থেকেই সম্ভব। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা যেভাবে দ্রুত আমাদের যৌথতা হারাচ্ছি, ক্রমেই ব্যক্তিসর্বস্বতার দিকে ধাবিত হচ্ছি, তাতে আমাদের এই যৌথ জীবনের রূপ খুঁজতে একদিন হয়তো আমাদের ফিরতে হবে শহীদুল জহিরের গল্পে, যেখানে আমরা দেখব দক্ষিণ মৈশুন্দির একটা ছেলে কেন ময়মনসিং যেতে চাচ্ছে সে কথা ভেবে পুরো মহল্লাবাসীর আর ঘুম আসছে না। আমাদের যৌথ জীবনের চমৎকার ডকুমেন্টেশন শহীদুল জহিরের এই লেখাগুলো।

শহীদুলের আরেকটা প্রবণতা আমি লক্ষ্য করি। প্রায়ই তার গল্পগুলোর ভেতরে তিনি নানারকম সম্ভাবনা তৈরি করেন। যেমন ধরা যাক তিনি লিখছেন, ‘আহারে আবদুল হালিম, আহারে আমার পোলা, বলে তার মা হয়ত কাঁদে, নীরবে বিলাপ করে, মহল্লার লোকেরা হয়ত এই কান্নার শব্দ শুনতে পায়, অথবা পায় না, অথবা তার মা হয়ত আর কাঁদে না, হয়ত এতদিন পর ভূতের গলির লোকেরাও আবদুল হালিমের কথা ভুলে যায়, অথবা তারা হয়ত একেবারে ভুলেও যায় না।’ এভাবে তার গল্পে তিনি প্রায়ই ‘হয়ত’ কথাটা ব্যবহার করেন। ‘হয়ত’ শব্দটা ব্যবহার করে একটা গল্পের অনেকগুলো পসিবিলিটি তিনি তৈরি করেন। আবদুল হালিমের কথা যদি মহল্লার লোকেরা ভুলে যায় তাহলে গল্পটা একরকম হবে, আর যদি ভুলে না যায়, তাহলে গল্পটা অন্যরকম হতে পারে। অর্থাৎ একটা ঘটনার নানা রকম পরিণতি হতে পারে, ঘটনার ভেতর নানারকম সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে। এটাও আমাদের এই অঞ্চলের বাস্তবতার একটা বৈশিষ্ট্য। আমাদের বাস্তবতা খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। এই আনপ্রেডিক্টেবিলিটি আমাদের এই অঞ্চলের জনপদকে বুঝবার একটা চাবি। আবারও যদি পশ্চিমের কথা বলি, তাহলে দেখব, পশ্চিম দীর্ঘদিন একটা চর্চার মধ্য দিয়ে, বুর্জুয়া রাষ্ট্রকাঠামোতে কতগুলো সিস্টেম ডেভেলপ করেছে। সবকিছুকেই তারা প্রেডিক্টিবিলিটির আওতায় আনতে চেষ্টা করেছে, সেখানে আনপ্রেডিক্টিবিলিটির জায়গা নেই। আমি ব্রিটেনের যে শহরে থাকি সেখানে বাড়ি থেকে বের হয়ে সাড়ে আটটার একটা বাস ধরে আমি ইউনিভার্সিটিতে যাই, বাসস্টপে নেমে ১৫ মিনিট হেঁটে আমার অফিসে পৌঁছাই, সেখানে পথে একজন গিটারবাদককে গিটার বাজাতে দেখি, একজন ভিক্ষুককেও দেখতে পাই, একজন পত্রিকা বিক্রি করে। গত চার বছরে এই দৃশ্যপটের কোনো পরিবর্তন আমি দেখিনি। সাড়ে আটটার বাসটা সাড়ে আটটাই আসে। এটা খুবই কেজো ব্যাপার, চমৎকার। কিন্তু অন্যভাবে দেখলে ব্যাপারটা খুব মনোটনাস। এখানে কোনো সারপ্রাইজ নেই, এক ধরনের স্থবিরতা আছে। আমি যখন ঢাকায় আমার উত্তরার বাসা থেকে মহাখালী যেতাম, এই পথটুকু আমার কাছে প্রতিদিন ছিল নতুন। পুরো পথটাতে কখন কী ঘটবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। পথের মাঝখানে বিরাট একটা বোমা-টোমা ফেটে রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, বিরাট একটা মিছিলের কারণে আমি দু’ঘণ্টা বসে থাকতে পারি। পথে প্রতিদিন কত নতুন ঘটনা, দৃশ্য, মানুষ। আমার প্রায় প্রতিটি দিনই ছিল ভিন্ন। এ ধরনের অনিশ্চয়তার জন্য আমার একটা প্রস্তুতি ছিল। এখন ব্রিটেনে বাসস্ট্যান্ডে যখন দাঁড়িয়ে থাকি এবং কোনোদিন যদি বাসটা পাঁচ মিনিট লেট হয় আমি নার্ভাস বোধ করতে থাকি। অনিশ্চয়তাকে হ্যান্ডেল করার ক্ষমতা আমার ওখানে গিয়ে কমে গেছে। ফলে, ভাবা যায়, অনিশ্চয়তার একটা সম্ভাবনা, শক্তির ব্যাপারও আছে। যে সম্ভাবনাগুলো অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে পশ্চিমের দেশগুলোতে। এবং সত্যি বলতে তৃতীয় বিশ্বের এই আনপ্রেডিক্টিবিলিটি, এই কেওস, এই প্রতি মুহূর্তের সারপ্রাইজকেই সাহিত্যের পুঁজি করে বিশ্ব মাতিয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার লেখকরা। পাশ্চাত্যের আপাত-গোছানো সমাজের বিপরীতে ল্যাটিন আমেরিকার অগোছালো জীবনের মেধাবী রূপায়ণ সাহিত্যে এক নতুন বর্ণাঢ্যতার জন্ম দিয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকার লেখকদের সেই পথ ধরে আমাদের জনপদের এই অনিশ্চয়তা এবং বিবিধ সমান্তরাল সম্ভাবনার দিকগুলো শহীদুল তার লেখায় চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন।

এই কথার সূত্র ধরে ম্যাজিক রিয়েলিজমের কথা আসে। ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য প্রসঙ্গেই ম্যাজিক রিয়েলিজম কথাটি বিশেষভাবে আলোচিত। এবং শহীদুলের লেখার প্রসঙ্গেও নানাভাবে ম্যাজিক রিয়েলিজম প্রসঙ্গটি উঠে থাকে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপের সুযোগ বর্তমান পরিসরে নেই। সহজ কথায় বলতে গেলে ম্যাজিক রিয়েলিস্ট সাহিত্যে খুবই বাস্তববাদী বর্ণনার মধ্যে হঠাৎ এমন একটা অনুষঙ্গ এসে পড়ে, যেটা ঠিক যুক্তির বিচারে ধোপে টেকে না। যুক্তিনির্ভর আর যুক্তিহীন ব্যাপারগুলো অবলীলায় পাশাপাশি ঘটতে থাকে। আমি এখানে পাশ্চাত্য বুর্জুয়া যুক্তিবাদীতার কথা বলছি। মার্কেজের গল্পে বহুভাবে এই জাদু বাস্তবতার ব্যাপার এসেছে। একটা মেয়ে বিভিন্ন জিনিসে হাত দিচ্ছে এবং তার কোনটা নীল হয়ে যাচ্ছে, কোনটা লাল হয়ে যাচ্ছে, তা দেখে মেয়েটার দাদি বলছে, ‘তুই তো প্রেমে পড়েছিস।’ কিংবা মাঠে চাদর বিছিয়ে গল্প করছে কয়জন, হঠাৎ এক দমকা হাওয়া বইল তো দেখা গেল চাদর সমেত সবাই আকাশে ভাসছে। খুব যৌক্তিক বাস্তব গল্পকাঠামোর ভেতর মার্কেজ খুব মজাদার ভঙ্গিতে এসব আপাত অবাস্তব ব্যাপারগুলো ব্লেন্ড করেছেন। একটু আগে বাস্তবতার যে আনপ্রেডিক্টিবিলিটির কথা বলাছিলাম এর সঙ্গে এ ধরনের জাদু বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে। তবে মনে রাখা দরকার যে, জাদু বাস্তবতা ল্যাটিন আমেরিকার একার কোনো সম্পত্তি নয়। সেখানকার লেখকরা এর একটা সৃজশীল রূপ দিয়েছেন মাত্র। যুক্তির শাসনের বাইরের নানা অনুষঙ্গ আমাদের লোককাহিনীর পালা, কথকতার ভেতর ব্যাপকভাবে রয়ে গেছে। যেমন ধরা যাক জনপ্রিয় লোককাহিনী ‘রূপবান’। সেখানে বারো বছরের একটা মেয়ের স্বামী হচ্ছে বারো দিনের একটা ছেলে এবং সেই বার দিনের একটা শিশু স্বামীকে কোলে নিয়ে বার বছর ধরে মেয়েটা বনের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন সাধারণ যুক্তিপরম্পরায় এ এক অসম্ভব পরিস্থিতি, কিন্তু এ-নিয়ে কেউ কখনও প্রশ্ন তোলেনি। যুক্তির শাসনের বাইরে এই পালা কাহিনী দেখে চোখের জলে ভেসেছে মানুষ। তো এও এক জাদুবাস্তবতার উদাহরণ। এই যুক্তির শাসনের বাইরে থাকবার উপাদান পাশ্চাত্য লোককাহিনীতেও আছে; কিন্তু পাশ্চাত্য আধুনিক সাহিত্য নিজেদের বুর্জুয়া যুক্তির শাসনে বেঁধে রেখেছে। ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যিকরা আধুনিক সাহিত্যের এই শাসনকে উপেক্ষা করে জাদু বাস্তবতার যুক্তিকেই তাদের সাহিত্যের যুক্তি করে তুলেছেন। মার্কেজ, ফুয়েন্তেস, কার্পেন্তিয়ের, বোর্হেস প্রমুখ এক নতুন ধারার সাহিত্য চর্চার সূচনা করে বিশ্বসাহিত্যে একটা দমকা হওয়া তুলে দিয়েছেন। শহীদুল সাহিত্যে এই জাদু বাস্তবতার ধারণা দিয়ে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং তার নিজের লেখায় তা চর্চা করার চেষ্টা করেছেন। বাস্তবতা আর অবাস্তবতার দোলাচলের নানা মজার উদাহরণ আছে তার গল্পে। ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ গল্পে দেখা যাচ্ছে, একজন রাস্তার ধারে ওষুধ বিক্রির ক্যানভাসার পকেট থেকে একটা হাড় বের করে সামনের দর্শকদের দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘এটা কী?’ একটা পরিচিত জিনিসকে যখন সামনে রেখে জিজ্ঞাসা করা হয় ‘এটা কী’, তখন সেটা রহস্যময় হয়ে যায়। দর্শকরা ভাবতে থাকে, আমি যেটা ভাবছি, এটা হয়তো তা নয়, এটা নিশ্চয়ই অন্যকিছু। এভাবে কিছুক্ষণ দর্শকদের দ্বিধার মধ্যে রাখে ক্যানভাসার। তারপর নিজে থেকেই বলে যে, এটা একটা হাড়। তখন দর্শকরা বেশ নিশ্চিন্ত হয় এবং তাদের মুখে হাসি দেখা যায়। তারা আশ্বস্ত হয় যে, তারা যা ভাবছিল জিনিসটা আসলে তাই। কিন্তু তার পরপরই ক্যানভাসার দর্শকদের আবার বিভ্রান্ত করে ফেলে। সে বলে, ‘না, এটা কিন্তু হাড় নয়, এটা হচ্ছে একজন মেয়ে মানুষ, যার নাম হচ্ছে প্রীতিলতা।’ তখন সেই দর্শক এবং গল্পের পাঠক ওই হাড়ের মধ্যে একজন মেয়েকে দেখতে শুরু করে। একটা অস্থিখ-কে প্রসারিত করে ক্রমে একজন নারীতে রূপান্তরিত করেন শহীদুল। এরপর আরও বিচিত্র ব্যাপার ঘটতে থাকে গল্পে। আমরা দেখি সেই ক্যানভাসার একটা অদ্ভুত প্রাসাদে গিয়ে ঢুকছে। প্রাসাদে ঢোকার পর একটা জাদুবাস্তব পরিস্থিতির জন্ম হয়। অনেক ক্ষেত্রে তার গল্পে উপস্থাপিত জাদু বাস্তবতা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে আরোপিত লেগেছে। এই গল্পের শেষে জাদু বাস্তব এই দৃশ্যটিকেও আমার তেমন মনে হয়েছে। তেমনি ‘কাঠুরিয়া ও দাঁড়কাক’ নামের তার অসাধারণ একটা গল্পের শেষ দৃশ্যে যখন তিনি দেখাচ্ছেন কাকগুলো কাঠুরিয়াকে তাদের ঠোঁটে করে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তখন জাদু বাস্তবতার ডোজটা একটু বেশিই হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। প্রায় সরাসরি মার্কেজকে যেন হাজির করা হয়েছে। জাদু বাস্তবতা শহীদুলকে খানিকটা পেয়ে বসেছিল। তার শেষ উপন্যাস মুখের দিকে দেখি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি লেখা হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই ম্যাজিক রিয়েলিজমের উপাদানের ব্যবহার মাত্রা ছাড়িয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। তবে সন্দেহ নেই তিনি কথাসাহিত্যে যেসব অদ্ভুত জাদুর মুহূর্ত তৈরি করেছেন তার তুলনা আমাদের সাহিত্যে আর নেই।

আগের কথাটায় ফিরে আসি। আমাদের এই জনপদের ভেতরের চেহারাটা শহিদুল ধরেছেন একেবারে নিংড়ে। জীবনযাপনে যৌথতা, বাস্তবতার নানা সম্ভাবনা, যুক্তি আর যুক্তিহীনতার সহাবস্থান এসব নিয়েই আমাদের এই জনপদ। বিশ্বায়নের চাপে যা কাঁপছে অবিরাম। আমাদের জনপদের এসব বৈশিষ্ট্যকে দুর্দশা আর অক্ষমতার চিহ্ন হিসেবেই দেখানো হয় সবসময়। কিন্তু ব্যাপার তো তা নাও হতে পারে। এগুলোও তো হতে পারে ভবিষ্যৎ সভ্যতা তৈরির প্রয়োজনীয় রসদ। আমাদের একটা ধারণা তৈরি করে দেয়া হয়েছে যে, সভ্যতার ট্রেন হচ্ছে একটাই। যে ট্রেনটা পৌঁছেছে ইংল্যান্ডে, আমেরিকায়। সভ্যতার মনজিলে মকসুদে পৌঁছাতে হলে ইউরোপ, আমেরিকা যে ট্রেনে চেপেছে আমাদের সেই ট্রেনেই চাপতে হবে। আমরা কিছু দুর্ভাগা জাতি সেই ট্রেন ফেইল করে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে আছি পরের ট্রেনটা ধরব বলে। কিন্তু এটাই কি শেষ কথা? আমাদের কি ওই একই ট্রেন ধরতে হবে? নতুন কোনো ট্রেন লাইন ধরে সভ্যতা কি নতুন কোনো স্টেশনে গিয়ে পৌঁছাতে পারে না? ইউরোপ তাদের সে স্টেশনে পৌঁছাতে যেমন অর্জন করেছে, হারিয়েছেও অনেক। পাশ্চাত্যের অর্জন আর প্রাচ্যের শক্তি মিলিয়ে নতুন একটা সভ্যতার দিকে কী আমরা যাত্রা করতে পারি না? অলটারনেটিভ মর্ডানিটির কথা যে সমাজতাত্ত্বিকরা বলছেন তারা এমন একটা তর্কই তুলছেন। শহীদুলের সাহিত্য আমাকে এইসব সমাজ ভাবনার দিকেও টেনে নিয়ে যায়।

urlশহীদুল জহিরের লেখার প্রধানতম একটা থিম মুক্তিযুদ্ধ। নানভাবে, ঘুরেফিরে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তিনি তার লেখায় এনেছেন। আগেই বলেছি আমার মতে এ যাবৎ লেখা মুক্তিযুদ্ধের সেরা উপন্যাস জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ইত্যাদি শব্দ নিয়ে তো নানা রকম লেবু চটকানো হয়েছে, বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু কথা তো এই যে, বাংলাদেশের অস্তিত্ব, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই মুক্তিযুদ্ধের ভাবনার বাইরে দাঁড়ানোর কোনো উপায় নেই। সেই বোধ থেকেই শহীদুল তার অভিনব গদ্যে এ দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনে মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতকে তুলে এনেছেন বারবার। মহল্লার মানুষ অপ্রস্তুতভাবে মুখোমুখি হয়েছে যুদ্ধের নির্মমতার। মহল্লার রঙ্গপিয়াসী কাজের মেয়েটা পুরুষ চিনলেও রাজাকার চেনেনি। ফলে রাজাকারের সঙ্গে রঙ্গ করতে গিয়ে নিহত হয় সে। মুক্তিযুদ্ধ শহরের ছোট ছোট গলি, মহল্লার প্রান্তিক মানুষকে কি ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল, তছনছ করেছিল তাদের জীবন, বদলে দিয়েছিল সবকিছু তার অনুপুঙ্খ ব্যতিক্রমধর্মী বয়ান আছে শহীদুলের গল্পে। মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের কোনদিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। মুক্তিযুদ্ধের নানা মাত্রাকে চিনে নেয়ার প্রয়োজন পড়বে আমাদের বারবার। তখনও আমাদের ফিরতে হবে শহীদুলের কাছেই। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের নাগরিক মাত্রার নানা ব্যতিক্রমী ছবি আছে তার লেখায়।

তিনি প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিনের সংগ্রামের নানা বিচিত্র ধরনও উপস্থিত করেছেন তার লেখায়। মুখের দিকে দেখি উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখি, পুরান ঢাকার একটা ছেলে বানরের দুধ খেয়ে বড় হচ্ছে। কৌতূহলউদ্দীপক ব্যাপার হলো, ছেলেটার মা যখন হঠাৎ একদিন দেখতে পেল একটি দুগ্ধবতী বানর তার সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছে, স্তন দিচ্ছে, সে বাধা দিল না। এরপর নিয়মিত সেই মা তার বাচ্চাটাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে আসত যাতে বানরটা এসে বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়াতে পারে। মা এই কাজটা করত কারণ তার নিজের স্তনে দুধ ছিল না, আর দুধ কেনার পয়সাও তার ছিলো না। দারিদ্রকে এরকম অভিনবভাবে প্রকাশ করবার উদাহরণ আমি দেখিনি বাংলা সাহিত্যে। উপন্যাসে আমরা দেখি বানরের দুধ খেয়ে বড় হওয়া এই ছেলেটাই শেষ পর্যন্ত বিএমডব্লিউ গাড়ি চুরির চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। এই ছেলেটির জীবনের ভেতর দিয়ে পুরো বাংলাদেশের ভেতরের চেহারাটা তুলে আনেন শহীদুল। বিশেষ করে নব্বই দশকের মার্কেট ইকোনমির বাঁধভাঙা প্রভাবে কী করে এই জনপদের চেহারাটা বদলেছে, ভেতরের আন্তঃসম্পর্কগুলো কীভাবে টুকরো টুকরো করে নতুন রূপ নিয়েছে তার অসাধারণ বয়ান আছে এ উপন্যাসে। এ ছাড়া তার গল্পে, উপন্যাসে নানাভাবে বারবারই ঘুরে-ফিরে এসেছে অসাম্প্রদায়িকতা। অসাধারণ মমতায় সংখ্যালঘু মানুষের কথা তুলে এনেছেন তিনি। বাম ধারার রাজনীতি করা বিপ্লবী চরিত্রের কথাও আমরা পেয়েছি তার গল্পে। মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং বাম রাজনীতির প্রতি সহানভূতি ফুটে উঠেছে তার লেখায়। শহীদুলের রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়েও কথা বলার সুযোগ আর এখানে নেই।

তার ব্যক্তিজীবনের কয়েকটি কথা দিয়ে শেষ করব। অনেকেই জানেন যে শহীদুল জহির উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি যখন মারা যান তখন সম্ভবত জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন। তার দাফতরিক নাম শহীদুল হক আর সাহিত্যিক নাম শহীদুল জহির। শহীদুল হক এবং শহীদুল জহির কিন্তু ভিন্ন দু’জন মানুষ। শহীদুল হক গম্ভীর, কেতাদুরস্ত সফল আমলা। কিন্তু শহীদুল জহির ভেতরে ভেতরে ব্যাপক কৌতুকপ্রবণ আর কল্পনার দূরগামী এক যাত্রী। তবে দুই ক্ষেত্রেই মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন খুব স্বল্পবাক, ভেতর গোটানো। আমি নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে ঠিকানা জোগাড় করে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি তখন বেইলি রোডের সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন। প্রথমে তার বাসায় গিয়ে সত্যি বলতে কী, বেশ ধাক্কাই খেয়েছিলাম। দিনের বেলা প্রায় অন্ধকার একটা রুমের ভেতর থাকতেন তিনি। ঘরে একটা চৌকি, বেতের কয়েকটা শেলফ, ছাত্রদের হোস্টেলে সস্তা এই শেলফগুলো দেখা যায়, একটা আলনা, একটা টেবিল, সেখানে একটা ল্যাপটপ। একদিকে একটা টেলিভিশন, দুটো বেতের চেয়ার। মশারির দুটি প্রান্ত জানালার শিকের সঙ্গে বাঁধা। এই তার ঘর। আমার প্রথম ঘরে ঢুকে মনে হয়েছিল দস্তয়েভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের রাসকলনিকভের ঘরটা সম্ভবত এমন ছিল। রাসকলনিকভ, যার কাজ ছিল শুধু ভাবা। একজন যুগ্ম সচিবের বাসা এরকম হবে আমি ভাবিনি। তিনি অকৃতদার ছিলেন, বিয়ে করেননি। একাকী, দুই রুমের সরকারি কোয়ার্টারের একটা রুম নিয়ে তিনি থাকতেন। একেবারে ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষ তার ছিল, যাদের সঙ্গে তিনি শুধু কথাবার্তাই বলতেন। তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়টা বেশ একটু অস্বস্তিকরই ছিল আমার জন্য। কোনো প্রশ্ন করলে এক-দুই কথায় জবাব দিয়ে আবার চুপ হয়ে থাকেন। নিজে থেকে কোনো কথাই বলেন না। প্রথম পরিচয়ে মনে হয়েছে অদ্ভুত নিমগ্নতা তার চারপাশে একটা দূরত্ব তৈরি করে রেখেছে। যা হোক, পরবর্তী কয়েকটা সাক্ষাতের পর ধীরে ধীরে তার সঙ্গে এনগেজড হওয়া গেছে। এবং একবার এনগেজড হলে দেখেছি তিনি একটু একটু করে অনেক কথা বলেন, মজাদার আলাপ করেন। তার সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে, তার ব্যক্তিজীবন নিয়ে, তার প্রেম, তার সংসার করা না করা ইত্যাদি নিয়ে চমৎকার আড্ডা দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সামাজিক যোগাযোগ ইত্যাদির ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ ছিল না। কেউ খুব আগ্রহী হয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তার মর্যাদা দিতেন। অনেকেই তার সাক্ষাৎকার নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং তিনি তাদের সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কিন্তু কোনো রকম সাহিত্য গোষ্ঠী রক্ষা করা, সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া এসবে তার কোনো আগ্রহ ছিল না। আমার মনে আছে, একদিন তার জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করবে কিছু তরুণ। তারা তাকে আগেই জানিয়েছিল এবং অনুরোধ করেছিল সেখানে থাকতে। আমি সেদিন তার বাসায়ই ছিলাম। বললাম, আমি যাচ্ছি তাদের আলোচনায়, আপনি যাবেন না? উনি বললেন, আজকে বাংলাদেশের একটা ক্রিকেট খেলা আছে, টেলিভিশনে বসে ওটা তিনি দেখবেন। আর বলেছিলেন মনে আছে, ‘পাঠকের কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো।’ আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে তো নানারকমের দলাদলির ব্যাপার আছে, গোষ্ঠী আছে, শিষ্য আছে, গুরু আছে, কে কোন দশকের বড় লেখক তা নিয়ে বিতর্ক আছে, উনি এসবের থেকে শত হাত দূরে থাকতে চাইতেন। একটা সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, সাহিত্যের আড্ডায় এক সময় তিনি গেছেন, কিন্তু সেসব আড্ডা থেকে ফিরে তার মনে হতো সারা গায়ে কে যেন আঁচড় কেটেছে। কথাটা প্রায়ই মনে পড়ে আমার। ব্যক্তিগত আলাপে আমাকেও বলেছিলেন একদিন, একে অন্যের পিঠ চাপড়ানো কিংবা একে অন্যকে খামচে দেয়া, এই তো সাধারণ প্রবণতা আমাদের সাহিত্য মহলে। ফলে উনি এসব এড়িয়ে চলতেন। তার অল্প ক’জন সাহিত্যপ্রেমিক বন্ধু ছিল মাত্র। তিনি একটা গভীর মগ্নতায়, নিভৃতে প্রায় ধ্যানের মতো করে লেখালেখি করতেন। লেখকের কাজ হচ্ছে আন্তরিকতার সঙ্গে, শ্রদ্ধার সঙ্গে লিখে যাওয়া, সেটা তিনি করে গেছেন। কিছু প্রখ্যাত অগ্রজ লেখক কীভাবে তাকে উপেক্ষা করেছেন সে কথা তিনি জানিয়েছিলেন আমাকে। প্রকাশকের কাছ থেকেও কেমন অবহেলা তিনি পেয়েছেন সেটা আমি নিজে দেখেছি। কিন্তু এসবে তোয়াক্কা ছিল না তার। তিনি বরং একটা কমার দুঃখে এক গল্প দু’বার করে ছাপিয়েছেন। শহীদুল কোনো সাহিত্য সভার সভাপতি হননি কোনোদিন, কোনো টেলিভিশন টক শোতেও অংশ নেননি। কিন্তু তাতে তরুণদের তাকে খুঁজে নিতে সমস্যা হয়নি। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তার আশ্চর্য সাহিত্য সৃষ্টির ব্যাপারে ক্রমেই আরও বেশি করে আগ্রহী হয়ে উঠছে। সৎ সাহিত্য ধীরে, গোপনে মানুষের বুকে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

শহীদুল জহির প্রসঙ্গে আমার ব্যক্তিগত একটা দুঃখের ব্যাপার আছে। আমার এক বন্ধু আছেন কানাডায়, হাসনু, উনি বাংলা জার্নাল বলে একটা পত্রিকা করেন। হাসনু আমাকে অনুরোধ করেছিলেন শহীদুল জহিরের সঙ্গে একটা কথোপকথনে বসতে, যা তিনি তার পত্রিকায় ছাপাবেন। আমি শহীদুলের লেখার আগ্রহী পাঠক আর আমার লেখার সঙ্গেও তার মোটামুটি পরিচয় আছে, ফলে কথা ছিল আমরা আমাদের পরস্পরের ভাবনা, লেখা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলব। তিনি তখন বেইলি রোডের সরকারি কলোনিতে থাকেন। তার সঙ্গে টেলিফোনে ঠিক হলো যে আমি পরবর্তী এক শুক্রবার তার বাসায় যাব। শুক্রবারই আমাদের দু’জনের ছুটি। আমার দুর্ভাগ্য, যে শুক্রবারে তার বাড়ি যাওয়ার কথা ঠিক তার আগের সপ্তাহে তিনি মারা গেলেন হার্ট অ্যাটাকে। সেটা আমার একটা খুব ব্যক্তিগত বেদনার জায়গা যে, তার সঙ্গে একটা ফর্মাল কথোপকথন, যা রেকর্ডেড হয়ে থাকতে পারত, সেই সুযোগটা আমি হারিয়েছি। তার মৃত্যুতে ভীষণ শকড হয়েছিলাম। আমি বরাবরই গভীর আগ্রহে থাকতাম কবে তিনি আবার ভূতের গলি বা দক্ষিণ মৈশুন্দির মজাদার নতুন একটা গল্প নিয়ে হাজির হবেন।

তার মৃত্যুর দিনটা নিয়ে আমি পত্রিকায় নিবন্ধ লিখেছিলাম, ‘থেমে গেল দক্ষিণ মৈশুন্দির গল্প’ এই শিরোনামে। মনে আছে সেদিন অফিস থেকে ফিরছি গাড়িতে। আমার এক বন্ধু ফোন করে বলল যে, শহীদুল জহির মারা গেছেন। স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলাম। বিষণœতা চেপে ধরেছিল আমাকে। আমার মনে আছে, একটা ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল। আমি দেখছিলাম পাশের ফুটপাতের ওপর একটা ১০-১২ বছরের খুব দরিদ্র এক কিশোরী, ৫-৬ বছরের একটা ছোট ছেলেকে শক্ত হাতে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা হয়তো তার ভাই। খুব কৌতূহল উদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, আমি ঠিক আগের দিনই একটা লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তার একটা গল্প পড়ছিলাম, সম্ভবত সেটাই তার শেষ প্রকাশিত গল্প। সেই গল্পে ঠিক এরকম এক কিশোরী আর একটা ছোট ছেলেকে নিয়ে একটা দৃশ্য ছিল। জাদু বাস্তবতার মতো আমার মনে হচ্ছিল যেন বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে দৃশ্যটা উঠে এসেছে ফুটপাতের ওপর। সেই গল্পটার কয়েকটা লাইন আপনাদের আমি পড়ে শোনাচ্ছি এখন। গল্পটার নাম ‘দি মিরাকল অফ লাইফ’। তিনি লিখছেন :

‘একটা কিশোরী, কিংবা ছেমরি, অথবা মাইয়া, যাই হোক,     তাকে নিয়া কি করা যায়? তার নাম কিছু     একটা হইতে পারে। কারণ সে মানুষ, মানুষের তো নাম থাকে, তাই হয়ত তার নাম আছে, হয়ত তার নাম     পরী, লালু কিংবা আয়শা। সে যদি রেললাইনের কিনারায় বাবুই পাখির বাসার মতন তালি মারা ছিঁড়া     ছিঁড়া বাসার পচা নর্দমার পাশে খাড়ায় তখন তার মায়ে দৌড় পারে। তার মায়ে যাইয়া কার কার ভাত রান্ধে,     সালুন রান্ধে, রুটি বানায়। কারা কারা যেনো তা খায়। হয়ত তারা গাইল পারে, ‘এইসব কি রান্দস     মাতারি।’ তখন সে, হয়ত পরী, কিংবা হয়ত পরিবানু, অথবা লালু সে রেললাইনের কিনারায় দয়াগঞ্জ কিংবা     স্বামীবাগে কোনো ছোটো ভাই কিংবা ছোটো বোনের হাত ধরে খাড়ায়া থাকে। এবং তখন তার বাপেও দৌড়ায়। সেও যেনো কই কই যায়। হয়ত সে কিছু করে, কার রিক্সা চালায়, কার ঠ্যালাগাড়িতে হাত লাগায়, কিংবা হয়ত সে কিছুই করে না। সে পেটে শুল বেদনা নিয়া শুইয়া থাকে। তখন পরীকে নিয়া কি করা যায়? নেতা কিংবা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা সিভিল সোসাইটি কেউ জানে না আমরা এই পরীকে নিয়া কি করবো। এই পরীকে নিয়ে কি করা যায়, আমরা ভেবে পাই না।’   শহীদুল জহির এভাবেই গভীর মমতায় বাংলাদেশ নামের ভূখন্ডের একেবার ভেতরের বেদনা, সঙ্কট আর সম্ভাবনা জাদুকরের মতো তুলে এনেছেন তার অনন্যসাধারণ গদ্যে। যত দিন যাবে শহীদুল জহিরকে আমাদের নতুন করে খুঁজে নিতে হবে বলেই আমার বিশ্বাস।

বাঙলার পাঠশালা’র আয়োজনে ২১ অগাস্ট ২০১৩ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরকে নিয়ে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন শাহাদুজ্জামান। সেই বক্তৃতার উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে বর্তমান রচনা। – See more at: http://www.alokitobangladesh.com/feature-friday/2013/09/13/22188#sthash.x5knRW4i.dpuf
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s