মুড়ির ইতিহাস


ভাষাগত আর পরিবৈশিক প্রেক্ষিতগত বৈচিত্র্য থাকলেও মুড়ির রয়েছে স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। আমরা ব্লগ, ফেসবুক আর বন্ধু মহলের আলোচনায় যেভাবে তুই মুড়ি খা, ভাই মুড়ি খান সুইটহার্ট তুমি মুড়ি খাও শব্দগুলো ব্যবহার করি তখন কেউ ভেবে দেখেছি কি কবে কখন কিভাবে এই মুড়ির উদ্ভব হয়েছিলো। আমরা জানি যে পাথর যুগের শিকারী সংগ্রাহক মানুষ একসময় মাংস ঝলসে খেতে শুরু করে।

প্রিয় ঝালমুড়িটা.. আহ !!

পরে তারা যাযাবর জীবন ত্যাগ করে স্থায়ী আবাসন তৈরি করে কিংবা তাদের খাদ্য সংগ্রাহক থেকে পরবর্তীধাপের খাদ্য উৎপাদনকারী সমাজে প্রবেশ করার সময়টা থেকেই শুরু হয়েছিলো মুড়ির ইতিহাস। মাংসের পাশাপাশি নব্য প্রস্তুর যুগের মানুষ যখন থেকে শস্যকণাকেও খাদ্য হিসেবে গ্রহণ ও উৎপাদন শুরু করেছিলো তখন মাংস ঝলসানোর মতো মৃৎপাত্রে করে মুড়ি ভেজে খাওয়া শুরু হয়ে থাকতে পারে।

এ শুধুই সাদা মুড়ি

ভারতের ইতিহাস মৌর্য যুগেরও বেশ আগে সেই জনপদের সময় তথা মগধের উত্থানপর্ব থেকে মুড়ির প্রচলন হয়েছিলো। অনেকে মনে করে বৈদিক যুগে দেবতাদের জন্য যে যজ্ঞ হতো না নৈবেদ্য পাঠানো হতো সেখানেও চালভাজার স্থান ছিলো। তাই আমরা ঐ চালভাজাকে মুড়ি তথা (Puffed Rice) আদিরূপ হিসেবে শনাক্ত করতে গেলে সেটা দোষের কিছু হবে না। ধারণা করা হিব্রু সভ্যতার সাথে মুড়ির ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। হিব্রু তথা হাবিরু, খাবিরু বা বর্তমান ইহুদি জাতি সৃষ্টির আদিকাল থেকেই যাযাবর ছিলো। বিভিন্ন জাতির তাড়া খেয়ে এক স্থান হতে অন্যস্থানে তাদের পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। তখন তারা বহনযোগ্য খাদ্য হিসেবে শুকনো মাংস বা জার্কির পাশাপাশি, কিশমিশ ও মুড়িকে অনেক গুরুত্ব দিতো। হিব্রুরা মুড়িকে পিপুজে ওরেজ (pitzputzey orez) নামে ডাকতো।

চকোলেটি টাইপের মুড়ি

যুদ্ধবাজ স্পার্টন কিংবা গণতান্ত্রিক গ্রিসেও মুড়িকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বহনযোগ্য ও সংরক্ষণযোগ্য সহজপাচ্য খাদ্য হিসেবে ধরা হতো। তারা মুড়িকে রাইজো সোফিত্তো (Riso soffiato) নামে ডাকতো বলে জানা যায়। একইভাবে দক্ষিণ ভারতে ছত্রপতি শিবাজী তার যোদ্ধাদের শুকনা খাবার হিসেবে চাক চাক গুড় এবং মুড়িকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমাদের দেশে এখন যে মজাদার মসলাসহ ঝালমুড়ি খেতে দেখি সেটার ইতিহাসও বেশ পুরাতন। ধারণা করা হয় মোগলাই ডিশগুলো স্পাইসি টেস্ট থেকে দেশীয় রন্ধনশিল্পীরা মুড়ির সাথেতেল মশলা মাখিয়ে তাকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারেন। মুঢঢি, ভুজা, মালারু,ভুজিয়া যে নামেই ডাকা হোক না কেনো দক্ষিণভারতে মুড়ি স্মরণাতীত কাল থেকে বেশ জনপ্রিয়।

কে না খেতে চাইবে এমন মুড়ি

পাঞ্জাবীরা অনেক ক্ষেত্রেই উৎসবপ্রিয় জাতি। তাদের যেকোনো গানের অনুষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় উৎসব আয়োজন এমনকি শিখদের গুরুদুয়ারার ভোগেও মুড়ির প্রচলন ছিলো বলে জানা গেছে। তারা মুড়িকে ফুলিয়ান নামে ডাকতো। তেলেগু শব্দ মারামার্লু মরিলুর কথা যেকোনো সিনেমাতে একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়। অনেক তেলেগু সিনেমার মধ্যে গানের অর্থ খুঁজতে গেলে দেখা যায় নায়ক তার ভালবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে বলছে [আইত্তাগিলু আতাবিম ফারপানু মুইত্তাই মারামার্লূ মরিলু আইন্দে নিবিদম, আইঙ্গাইদম কুনু আদি নি আদই] Oh my darling you so sweet just like rose, your love is crispy like puffed rice. 😀 । এগুলো সেখানে মুড়ির জনপ্রিয়তার বাস্তব প্রমাণ। এভাবে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই মুড়ির উপযুক্ত ব্যবহার রয়েছে। নিচের ছবিগুলোতে দেখুন মুড়ি কেমন জনপ্রিয় আর ফ্যাশনেবল খাবার। আর কেউ যদি মজা করে বলেই বসেন মুড়ি খা। তখন এই আইটেমগুলো থেকে বেচে নিয়ে বলবেন দেন ঐরাম মুড়ি খামু।

ওহ!! জাস্ট লাইক মাই সুইটহার্ট
ইয়ামমমমমমমমি..
ওয়ান মোর প্লিজ
খেতে মন্দ নয় অতোটা।
তো হয়ে যাক এক প্যাকেট
এটাও কিন্তু মুড়ি

আসুন সবাই মিলে মুড়ি খাই। পেটের আকৃতি কমাই। মুড়িবিলাসী এই পোস্ট যারা পড়ছেন কিংবা ছবিগুলো দেখেছেন ধন্যবাদ সবাইকে।

Advertisements

2 thoughts on “মুড়ির ইতিহাস”

  1. ভাইজান মুড়ি’কে তো জাতে তুলে দিলেন। এজন্য মুড়ি জাতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকিবে। তবে ভালো লাগল একটা অতি পুরনো দেশীয় খাবারকে সুন্দরভাবে তুলে আনলেন সেজন্য।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s