আদি খাবার ভাত


চাল কিংবা কোনো শস্যদানা মানুষের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হওয়ার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এর মূল শিকড় খুঁজতে আমাদের পেছনে যেতে হবে অনেক অনেক দিন। বিভিন্ন প্রত্নস্থানে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে চাল, ধান ও সংশ্লিষ্ট শস্যকণা থেকে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ভাতের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা অনুযায়ী, নব্য প্রস্তর যুগের মানুষের স্থায়ী আবাসন তৈরি ও পুরোদস্তুর কৃষিকাজে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার সঙ্গে ভাতের ইতিহাস সম্পর্কিত। বিশেষ করে কাঁচা মাংস খাওয়ার অভ্যাস বদলে মানুষ যখন ঝলসানো কিংবা সিদ্ধ মাংস খাওয়া শুরু করে, ভাত বা ওই-জাতীয় খাবার গ্রহণ তখন থেকে শুরু। পাফড রাইস কিংবা বয়েলড রাইস শস্যকণাকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করার দুটি ধারা।

গৃহচাষ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ উপযোগী ধান উত্পাদনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন হলেও তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। পিএনএএসের (Proceedings of the National Academy of Sciences of the United States of Ameica) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাত হিসেবে গ্রহণযোগ্য চাল উত্পাদনকারী ধানের বয়স প্রায় ৮-১৩ হাজার বছরের মতো। ধারণা করা হয়, প্রাচীন চীনে প্রথম একটি বুনো প্রজাতির ধানগাছকে গৃহচাষের আওতায় আনা হয়েছিল। পরে বিশ্বখ্যাত জার্নাল নেচারে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে খাবার উপযোগী ভাত ও চাল উত্পাদনের পাশাপাশি গৃহচাষ নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছাপা হয়েছিল। এ প্রবন্ধে ধানের জিনোম বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করে এর উত্পাদন-সম্পর্কিত নানা তথ্য উপস্থাপিত হয়। এখানে বর্ণিত তথ্য থেকে দেখা যায়, চীনের পার্ল উপত্যকা থেকে শুরু করে পূর্ব এশিয়া হয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম বিস্তার ঘটেছিল ভাতের। এ বিস্তৃত গবেষণার আগে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের ভিত্তিতে ধরা হতো চীনের ইয়াংতেজ উপত্যকায় প্রথম ধান চাষ শুরু হয় বিধায় খাদ্যদ্রব্য হিসেবে ভাতের ইতিহাস সেখানেই ঘটে।
ধানগাছের শিকড় তথা ফাইটোলিথনির্ভর গবেষণা শুরু হলে দেখা যায়, ডায়াটংহুয়ান প্রত্নস্থানেই প্রথম ধান চাষ ও খাবার হিসেবে ভাতের প্রচলন হয়েছিল। এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক সমাবেশ থেকে প্রায় ১১-১২ হাজার বছর আগের ধানের শিকড়ের ফসিল তথা ফাইটোলিথ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে এ ফাইটোলিথের গাঠনিক সমাবেশের পরিবর্তন লক্ষ করা যায় আজ থেকে প্রায় ৮-১০ হাজার বছর আগে। এর থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, আনুমানিক ৮-১০ হাজার বছর আগে ওই এলাকায় ধান চাষ শুরু হয় বিধায় মানুষের খাদ্যতালিকায় ভাত স্থান করে নিয়েছিল। এরপর আনুমানিক তিন থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের আশপাশে নেপাল কিংবা বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভাত তৈরির উপযোগী ধান চাষ শুরু হয়েছিল। প্রমাণ হিসেবে ভারতবর্ষের অনেক প্রত্নস্থান থেকে ধানের তুষ, পুড়ে যাওয়া ধান ও চালের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। একইভাবে অনেক স্থানে মৃত্পাত্রের গায়েও ধান-চালের নিদর্শনের পুড়ে যাওয়া চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা খাদ্যদ্রব্য ভাতের ইতিহাস বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনেকে মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে ভারতবর্ষে খাদ্যশস্য হিসেবে ধানের গুরুত্ব ছিল। পরবর্তীকালে দ্বিতীয় ধাপের নগরায়ণেও ধানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে কালের আবর্তে ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্য হিসেবে স্থান করে নেয়। ভাতের প্রতি অধিক আসক্তি থেকে সাহিত্য ও উপকথায় ‘ভেতো বাঙালি’ শব্দটি চালু হতে দেখা যায়। যুগসন্ধিক্ষণের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাই কোনো ভনিতা না করে বলেই দিয়েছেন, ‘ভাত বিনে বাঁচিনে, আমরা ভেতো বাঙ্গালী’। সিদ্ধ ও আতপ চাল থেকে সাধারণত ভাত তৈরি হলেও রান্নার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। বিশেষত ঢাকায় মোগল অধিকার পর্বের পর থেকে বিভিন্ন মোগলাই ডিশের সঙ্গে একীভূত হয়ে এ ভাতকে আবিষ্কার করা গেছে নতুন রূপে। ভাতের সঙ্গে রকমারি মসলাযোগে যেমন তৈরি হয়েছে বিরিয়ানি, তেহারি কিংবা পোলাও, তেমনি স্থানীয় ঐতিহ্যে চিনি-গুড় কিংবা দুধ মিশিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পায়েস বাংলার খাদ্যদ্রব্যের ঐতিহ্যকে করেছে সমৃদ্ধ।
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s