বিশ্বের সাজানো বিপ্লব তথা ম্যানুফ্যাকচারড রেভল্যুশান


https://i0.wp.com/www.tomatobubble.com/sitebuildercontent/sitebuilderpictures/tumblr_mdy00.jpgগত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তা হলো, কোন বিপ্লব আসলে বিপ্লব নয়। ২০০০ সালে সার্বিয়ায় স্লোবোদান মিলোসেভিচের (Slobodan Milosevic) পতন পরবর্তীকালে জর্জিয়ার এডওয়ার্ড শেভার্দনাদজে (Edward Shevardnadze), কিরগিস্তানের আস্কার আকায়েভ (Askar Akayev) ও ২০০৪-এর নির্বাচনে ইউক্রেনের ভিক্তর ইউশেভচেঙ্কোর (Viktor Yushchenko) পতনের দিকে লক্ষ করলে এ প্রশ্নের ভিত্তি সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, এ ধরনের ঘটনাগুলো সমস্যায়িত নয়। তারা এ প্রসঙ্গে যুক্তি-তর্ক উত্থাপন করতে চাইছেন। তাদের দৃষ্টিতে এগুলো ১৯৮৯-এর ঘটনার ধারাবাহিকতায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে যাওয়া জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন।

ভেলভেট বিপ্লবের অনেক পরিশ্রমী তাত্ত্বিক টিমথি গ্যার্টন-অ্যাশ (Timothy Garton Ash) বলতে চাইছেন ভিন্ন কথা। তিনি মনে করেন, এ ঘটনাগুলো ভেলভেট বিপ্লবেরই ধারাবাহিকতা, যা ৩০ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। অন্য তাত্ত্বিকরা এ ঘটনাকে একটু ভিন্নভাবে দেখার পক্ষপাতী। তাদের দৃষ্টিতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের বিপরীতে এ ঘটনাগুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা পূরণের আরেক ধাপ অগ্রগতি মাত্র। এখানে প্রভাবিত নির্বাচন আয়োজনকে নিশ্চিত করে তুলতে জনগণের আন্দোলনের অন্তরালে সক্রিয় ছিল পশ্চিমের মদদপুষ্টরা। বস্তুত এগুলো জনগণের কোনো আন্দোলন তো নয়ই, বরং বহিঃশক্তির মদদে সুসজ্জিতভাবে গড়ে ওঠা একটি সড়ক প্রদর্শনী মাত্র। এ ঘরানার একজন তাত্ত্বিক জন লংল্যান্ড (John Laughland) এ ঘটনাকে জনশক্তি মিথের মতো যুবশক্তি মিথের একটি সফর মঞ্চায়ন হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যেখানে একটি প্রবল পরাক্রান্ত সরকারের পতন ঘটাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি রক কনসার্টই যথেষ্ট হয়ে যায়। তবে বিশ্লেষণের এ দুটি ক্ষেত্রেই কিছু সাধারণীকৃত উপমার ব্যবহার একে সমস্যায়িত করেছে। লংল্যান্ডের বিশ্লেষণে পাপেট মাস্টার যুক্তরাষ্ট্রের অদৃশ্য সুতার টানে এ বিপ্লব যেমন একটি পুতুলনাচের সফল মঞ্চায়ন, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন আর শ্রেণীসংঘাতকে এড়িয়ে গ্যার্টন অ্যাশ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ১৯৮৯-এর ভেলভেট বিপ্লবের সেকেলে ধারায়ই আটকে আছেন। তবে গভীর বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়, তথাকথিত এ বিপ্লবগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব, স্থানীয় বিরোধী দলগুলোর স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা ও জনগণের কিঞ্চিৎ অংশগ্রহণে এক ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

সার্বিয়ান বিপ্লব
২০০০ সালের সার্বিয়ান বিপ্লবকে দুটি সময়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব হিসেবে ধরা হয়। এ বিপ্লবের দ্বি-চরিত্র অনেক বিশ্লেষকের বয়ানে স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে একদিকে জনগণের বিদ্রোহকে ইউফোরিক উপমায় যেভাবে চিত্রায়ণ করা হয়েছে, সেখানে বিপ্লবের সব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকে, পক্ষান্তরে ক্লিনটন প্রশাসনও অনেক দক্ষতার সঙ্গে তথাকথিত ভেলভেট বিপ্লবের সফল মঞ্চায়ন সম্পন্ন করে। যাকে পরবর্তীকালে সৃষ্ট ধারাবাহিক প্রাচ্য সমস্যার একটি প্রোটোটাইপ হিসেবেও ধরা যেতে পারে।
২০০০ সালের আগেও মিলোসেভিচ পতনোন্মুখ হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালের দিকে তিনি আন্দোলনের মুখে রাস্তায় ট্যাংক নামাতে বাধ্য হন। ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে সাধারণ নির্বাচনে বিরোধীদের মেনে নিতে অস্বীকার করায় তীব্র আন্দোলন তাকে প্রায় ক্ষমতা থেকে নামিয়ে ফেলেছিল। বিরোধীদের বারবার ব্যর্থতা ছাত্রদের এক সংঘবদ্ধ আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৯৬-৯৭ সালের এ আন্দোলনে প্রথমবারের মতো রক্ত ঝরে ১৯৯৮-এর শরতে এসে। কিন্তু মার্কিন লবির উপযুক্ত প্রভাবে এ আন্দোলন ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। এক্ষেত্রে ২০০০ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনটি বিশেষ ধারা যুক্ত মার্কিন কৌশলের কথা বলা যেতে পারে। প্রথমে ইউএস কংগ্রেস সেখানকার বিরোধীদের সমর্থনে ১৯৯৯ সালে ১০ মিলিয়ন ও ২০০০ সালে ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড় করে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রপন্থী তথাকথিত অনেক মানবাধিকার ও সমাজসেবী সংগঠন মাঠে সক্রিয় হয়। তারা বিরোধী সংগঠন অটপরকে (Otpor!) সহায়তা করতে বিভিন্নভাবে অগ্রসর হয়। ফলে মাঠে দেখা যায় হাজার হাজার বিরোধীকে। দ্বিতীয়ত, একইভাবে নেডের (National Endowment for Democracy- NED) সক্রিয় কর্মীদের কাজে লাগিয়ে আগত নির্বাচনকেও সফলভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয় যুক্তরাষ্ট্র। তৃতীয়ত, ভোয়িস্লাভ কস্তুনিচার (Vojislav Kostunica) বিরোধী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না করে লড়াই থেকে সরে আসতে জিনদিয়িচকে (Djindjic) চাপ প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় একটি মার্কিন সংগঠন নির্বাচনপূর্ব জরিপ করে। ৮৪০ জন ভোটারের ওপর করা তাদের জরিপে দেখানো হয়, কস্তুনিচা মিলোসেভিচকে পরাজিত করতে যাচ্ছেন। ১৯৯৯-এর দিকে সেখানে করা বোম্বিং বেশির ভাগ জনগণকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী করেছিল। তাই নির্বাচনী লড়াইয়ে এগিয়ে থাকতে অন্তরালে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট হলেও প্রকাশ্যে কট্টর যুক্তরাষ্ট্র বিরোধিতার অভিনয় করেন কস্তুনিচা। বিশেষ করে এক্ষেত্রে কস্তুনিচা যুক্তরাষ্ট্রের সব অর্থগ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সমর্থনকে ‘মৃত্যুকে চুম্বন করার’ সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ছিল অনেক স্পষ্ট। তারা কস্তুনিচাকে সামনে রেখে রাজনীতি এগিয়ে নিলেও সার্বিয়ান পুঁজিবাদীদের প্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট জিনদিয়িচ।
সার্বিয়ান বিপ্লবের মূল চরিত্র যদিও সাম্রাজ্যবাদী কারিকুরির ভিত্তিমূলে প্রোথিত, সেখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল মিলোসেভিচের অপশাসন ও ক্রমে দানা বেঁধে ওঠা জনরোষ। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সমর্থনপুষ্ট বিরোধী দলগুলোর মূল কর্মভূমিকা ছিল উত্তপ্ত জনরোষকে ক্রমে মিলোসেভিচের বিরুদ্ধে উসকে দেয়া। বিশেষত সার্বিয়ার মিলোসেভিচবিরোধী গণতন্ত্রকামীরা এ সময় তার বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করে একটি ইউফোরিক তথা মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র দান করতে সক্ষম হয়। তারা একদিকে প্রচার করে নির্বাচনে মিলোসেভিচের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, তাই তিনি নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে চাইছেন; অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে জেগে ওঠা জনস্রোতকেও প্রয়োজনের সময় কাজে লাগায় তারা।
অনেকটাই স্বতঃপ্রণোদিত এ আন্দোলন মিলোসেভিচের বিরুদ্ধে কর্মজীবী শ্রেণীর বিশেষত বেলগ্রেডের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত কলুবারা উন্মুক্ত কয়লা খনির ধর্মঘটকারী সাত হাজার শ্রমিককে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে তুঙ্গে ওঠে। এ সময় পুরো দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের ডাকা হরতাল জনমনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। কলুবারা কয়লা খনি এলাকায় কস্তুনিচা দুবার ভ্রমণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল, বিশেষ করে সরকারের বৈরী আচরণের বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেতার এ অবস্থান শ্রমিকদের আশাবাদী করে তোলে। ফলে এ বিপ্লবের উত্তাপ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ছাড়িয়ে কলুবারা কয়লা খনির শ্রমিকদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। তবে মিলোসেভিচের দুর্ভাগ্য খনি শ্রমিকদের অবস্থানগত সংকট পুরো পরিস্থিতিকে তার প্রতি বৈরী করে তোলে। তাই এ সময় তার পতন শ্রমিক ও নিম্ন শ্রেণীর জন্য একটি বিজয় হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে। এ সপ্তাহেই খনি শ্রমিকরা তাদের ডিরেক্টরদের পতন নিয়ে আন্দোলন শুরু করে, যারা প্রত্যেকেই মিলোসেভিচের পক্ষে কাজ করে আসছিল। একই সঙ্গে কারাগারের বন্দিরা কিছু ওয়ার্ডেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে মিলোসেভিচের পতন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি বিজয় হিসেবে গণ্য হয়। তবে কোস্তুনিকার যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানের জন্যই জনগণ তাকে মিলোসেভিচের বিরুদ্ধে বিজয়ী করে তুললেও সময়ের কাছে নতি স্বীকার করে নীতিগত ক্ষেত্রে তিনি বেশকিছু পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে বিপ্লবের নামান্তরে সব থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখে যুক্তরাষ্ট্রের বরাবরের সেই নির্বাচনকেন্দ্রিক মধ্যস্থতার নীতি।
জর্জিয়ার গোলাপ বিপ্লব
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও কৌশলগত নানা ক্ষেত্রে জর্জিয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইরানকে তুরস্কমুখী লাইনের ব্যাপারে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিবেশী আজারবাইজান থেকে এর মধ্য দিয়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের পাইপলাইন তৈরির কাজ শুরু হওয়ায় দেশটির অবস্থানগত গুরুত্ব বেড়ে গেছে। কিন্তু পুরোপুরি মার্কিন নিয়ন্ত্রিত জর্জিয়া পুতিনের স্বয়ংসম্পূর্ণ রাশিয়া গড়ার ক্ষেত্রে মূল অন্তরায় হিসেবে দেখা দেয়। গর্ভাচেপের একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড শেভার্দনাদজে (Edward Shevardnadze) ১৯৯২ সালের দিকে জর্জিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একজন শক্তিধর ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ন্যাটো সদস্যপদের একজন সমর্থক হিসেবে তিনি জর্জিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর প্রতীকী অনুপ্রবেশকে স্বাগত জানান। শেভার্দনাদজে এর বাইরে কসোভো ও ইরানে সৈন্য পাঠিয়ে সেখানে তাদের সম্পৃক্তির জানান দিয়েছিলেন। তার শাসনামলে ইসরায়েলের পর জর্জিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাথাপিছু সাহায্যগ্রহীতা দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে সময়ের আবর্তে দুটি কারণে শেভার্দনাদজের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বুশ প্রশাসনের মোহমুক্তি ঘটে। বিশেষ করে তার দুঃশাসনে সেখানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বেসরকারীকরণের সর্বগ্রাসী প্রভাব লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয়ত, যখনই তিনি বুঝতে পারলেন, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার থেকে সমর্থন সরিয়ে নিচ্ছে, তখনই তিনি তার বিদেশনীতিতে মস্কোকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। সার্বিয়ায় মিলোসেভিচকে সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ছিল অনেক সহজ। কিন্তু জর্জিয়ায় যুুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনেক জটিল অবস্থা লাভ করে। বিশেষ করে দাফতরিকভাবে তারা শেভার্দনাদজের প্রতি দাফতরিক সমর্থন অক্ষুণ্ন রাখে, অন্যদিকে দেশের মধ্যে প্রো-মার্কিন হেজেমনিতে বাতিকগ্রস্ত নাগরিকদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ইন্ধনও জোগাতে থাকে তারা। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনে তিনজন ব্যক্তি আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথমত, নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন স্কুল থেকে স্নাতক ৩৫ বছর বয়স্ক আইনজীবী মিখাইল সাকাশভিলি (Mikhail Saakashvili), যিনি শেভার্দনাদজের বিচারমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, সংসদের স্পিকার নিনো বুদর্্ঝানাদজে (Nino Burdzhanadze) এবং সাবেক স্পিকার জুরাব ঝ্ভানিয়ার (Zurab Zhvania) কথা বলা যায়, যারা প্রথম দিকে শেভার্দনাদজের পক্ষেই ছিলেন। পাশাপাশি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, এরা বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর গড়ে উঠেছিল। পাশাপাশি সেখানে আরো অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল, যেগুলোর পরিচালিত হতো যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের অর্থায়নে। পাশাপাশি তাদের প্রভাবে একশ্রেণীর ইংরেজিভাষী যুবক আত্মপ্রকাশ করেছিল, যারা পশ্চিমা-সমর্থিত বিপ্লবের জন্য মুখিয়ে ছিল। এ সময় সাকাশভিলের প্রণোদনায় একটি আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে, বিশেষ করে শেভার্দনাদজে ছুটিতে থাকায় তিনি সেটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু রাশিয়ার কাছে সাহায্যপ্রত্যাশী শেভার্দনাদজে যাতে দেশে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান আরো সংহত করতে না পারেন, সেদিকে সচেষ্ট হন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা। এ সময় আরো কিছু ওত্পর (Otpor!) নেতার সঙ্গে সাকাশভিলির সার্বিয়া ভ্রমণ ক্রমে দানা বেঁধে উঠতে থাকা চাপা ক্ষোভ আত্মপ্রকাশের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। বিশেষ করে সার্বিয়ায় আন্দোলনকারীদের সফলতা জর্জিয়ান বিক্ষোভকারীদের অনুপ্রাণিত করে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের ফিন্যান্সিয়াল টাইমস একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে জর্জিয়ার নির্বাচনে ঘটে যাওয়া বিভিন্নমুখী অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদন শেভার্দিনেজ সরকারকে নানা চাপের সম্মুখীন করে। এ সময় সেখানে ঘটে যাওয়া আরো কিছু ঘটনা সাক্কাসভিলের নেতৃত্বে আরেকটি সংগঠিত প্রতিবাদকে বিপ্লবে রূপ দিতে যথেষ্ট হয়েছিল। নির্বাচনী দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর বেকারত্ব থেকে নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিতে থাকে একটি সংঘবদ্ধ গণআন্দোলনের। এর পরের তিন সপ্তাহ শেভার্দনাদজে (Edward Shevardnadze) সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা দিক থেকে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করেও সফল হয়নি ফলে একটি বিপ্লব ও তার পতন সময়ের ব্যাপার হয়ে যায়। রাশিয়ান সমাজতাত্ত্বিক বরিস কাগার্লিিস্ক (Boris Kagarlitsky) জর্জিয়ার এ আন্দোলনের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেন এভাবে— ‘যখন যুক্তরাষ্ট্র বুঝে গেছে, জনরোষের সামনে শেভার্দানেজ সরকারকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, সেখানে তার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা ছিল বৃথা। তাই বিরোধীদের মধ্য থেকে নিজেদের নতুন মিত্র খুঁজে নিতে সচেষ্ট হতে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বরাদ্দকৃত অর্থগুলো বেশ সর্তকতার সঙ্গে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বিরোধীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এখানে সাজিয়ে তোলা গণআন্দোলনকে জনমুখী ও বিপ্লবী চেহারা দেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টায় কোনো কমতি ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হলেও জনরোষের মুখে বৈপ্লবিকভাবেই এই পতন অনিবার্য হয়েছে, সেটা প্রমাণ করা ছিল অনেক জরুরি।

– See more at: http://bonikbarta.com/austoprohor/2014/04/19/38232#sthash.KRhjjKVx.dpuf

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s