মৌলবাদী মোদি, সেকুলার কংগ্রেস ও তার বুদ্ধিবৃত্তিক পাণ্ডাদের কথা


ভারত বিভাগের প্রায় ১০ বছর আগে, ১৯৩৭ সালে প্রায় ৯৭ শতাংশ হিন্দু সদস্যের দল হিসেবে কংগ্রেস পরিচিতি লাভ করে একটি হিন্দু রাজনৈতিক দল হিসেবে। তবে তাদের এজেন্ডায় একটি সেক্যুলার দল হিসেবেই পরিচিত করানো হয়েছিল, ভারত বিভাগ নিয়ে তাদের বিশেষ মাথাব্যথাও ছিল না বললে চলে। এক্ষেত্রে পণ্ডিত জওহর লাল নেহরুকে ধন্যবাদ দিতে পারে কংগ্রেস, কারণ তাঁর হাত ধরেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেক্যুলারিজম এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ করে নেয়। এই বিষয়গুলোকে সুন্দরভাবে সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে বামপন্থার নামে মৌলবাদী হিন্দুত্বের পেছনে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন কিছু ব্যক্তি। অন্যদিকে প্রগতিশীল ভাব ধরে কংগ্রেসের জ্ঞানতাত্ত্বিক পাণ্ডা হিসেবে নিজেদের সেকুলার অবস্থান জারি রাখেন তারা। কথায় কথায় বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা কিংবা বাংলাদেশী তথাকথিত সেকুলার বুদ্ধিবেশ্যাদের মতো কৌশলী দুর্বোধ্য অপশব্দের কিছু প্রবন্ধ রচনায় গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল টাইপের বুদ্ধিজীবির উত্থান ঘটে। এই সময় দেখা যায় অরুন্ধতী রায়ের মতো নৈরাজ্যবাদী লেখকগণের বেশ পোয়াবারো। তারা একদিকে ঢাকঢোল পিটে সেকুলার চরিত্র প্রচার-প্রসার ঘটাচ্ছেন, অন্যদিকে কংগ্রেসের পেটোয়া বুদ্ধিজীবি হিসেবে পর্দার আড়ালে কাজও করে যাচ্ছেন।

প্রথমিক গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কংগ্রেস একটি সেকুলার দল, তবে সময়ের আবর্তে গাত্রাবরণের দিক থেকেই কংগ্রেস সেক্যুলার রাজনৈতিক দল । কিন্তু কার্যত তারা হয়ে ওয়ে পুরোপুরি মৌলবাদী হিন্দুদের একটি রাজনৈতিক সংগঠন। কার্যকারী প্রেক্ষিতে কংগ্রেস ও বিজেপীর মৌলিক পার্থক্য খুজেঁ বের করা বেশ কঠিন। বিজেপী-কংগ্রেস উভয়েই জানে ধীরে ধীরে ভোটের রাজনীতিতে হিন্দু ডানপন্থার কদর বাড়তির দিকে। তারা বুঝতে পারে একসময় হারিয়ে যাবে হিন্দু বামপন্থা উত্থানের শেষ সম্ভাবনাগুলো। সেসঙ্গে বর্ণপ্রথা ও অভিজাততন্ত্রের পক্ষে নীরব সম্মতি থাকায় কংগ্রেস আরো জোরেশোরে প্রণোদিত করে উগ্র হিন্দু ডানপন্থাকে। এক্ষেত্রে নিম্নবর্ণের কেউ ধীর লয়ে নেতৃস্থানীয় হয়ে উঠতে থাকলে তাকে শুরুতেই থামিয়ে দেয়ার কাজটা বেশ সূচারুরূপে করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন কংগ্রেসের কর্তাব্যক্তিরা। এ রকম একটি পটভূমির ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এ সময় কংগ্রেসের সামনে একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, তারা আগের মতো সেক্যুলারিজমের গাত্রাবরণে হিন্দু ডানপন্থাকে ধারণ করবে নাকি তাদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করবে।

এ সময় হিন্দু সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রশ্নে নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষত কংগ্রেসের মুখোশ উন্মোচিত হলে একই সারিতে অনেক বিষয় সমস্যায়িত ও প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, যা বিজেপির পালে আরো হাওয়া সঞ্চার করতে সক্ষম বলে প্রতীয়মান হয়। এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বনিতা বর্ণপ্রথার নানা সমস্যার রাজনৈতিকীকরণকে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে ভারতীয় জনতা পাটির্র (বিজেপি) মতো উগ্র ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনও অর্থনীতিক পরিকল্পনাগুলোকে সামনে রেখে আংশিক বামপন্থার মুখোশ ধারণে বাধ্য হয়েছিল। এখানে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছিল প্রয়োজনে বিজেপি উচ্চ শ্রেণীর ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও নিম্ন শ্রেণীর সঙ্গে একই ধারায় কথা বলবে। এক্ষেত্রে ২০০৯ সালে প্রণীত বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারের কথা বলা যেতে পারে, যেখানে ২০১৪-এর ইশতেহার ওই একই কথা বলছে।

১৯ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ আধিপত্যবাদ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা হলে ভারতজুড়ে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরকরণের একটি প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। আশীষ নন্দী এটাকে সরাসরি ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন বা খ্রিস্টানকরণ প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে পরস্পর সম্পর্কিত অনেক বিষয় যুক্ত থাকতে দেখা গেছে। এ সময় একেশ্বরবাদ ও একটি গ্রন্থনির্ভর ধর্মীয় চেতনা ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। মৌলবাদী হিন্দু চেতনার সামনে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে উপস্থিত হতে দেখা যায় আর্য-সমাজ কিংবা রামকৃষ্ণ মিশনের মতো সামাজিক সংগঠনগুলোকে। এ সময় তারা নারী শিক্ষা ও অস্পৃশ্যতার মতো স্পর্শকাতর সামাজিক প্রপঞ্চকে কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এ সময় বহুঈশ্বরবাদী ও প্রতিমা পূজানির্ভর মৌলবাদী সনাতন মতবাদকে আস্তে আস্তে ফিকে করে দিতে থাকে। কারণ এ বিশেষ ধর্মাচার তখনকার ঔপনিবেশিক শাসককুল ও তাদের সংশ্লিষ্টদের কাছে বড্ড সেকেলে ও আদিম বলে বিবেচিত ছিল। আমরা এত দিন ধরে খ্রিস্টান ও মুসলিম বামপন্থার কথা শুনেছি। তবে হিন্দু বামপন্থার বিষয়টি সেই আদিকাল থেকেই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট থেকে গেছে। হিন্দু ধর্মের ক্ষেত্রে শুধু ডানপন্থাই আসে, কেন বামপন্থা নয়— এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই বললেই চলে।

সময়ের আবর্তে এ ধরনের প্রতিমাপূজা ও বিবিধ সনাতন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে বার্ষিক দুর্গাপূজার সময়ে নির্বাসনে পাঠিয়ে প্রায় বেশির ভাগ হিন্দু তথাকথিত আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসায়। এ সময় হিন্দু ধর্মের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তা সময়ের আবর্তে গভীর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সনাতন মতাদর্শ আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাওয়া মানুষ অনেক ক্ষেত্রে হেনস্তা ও অবহেলার শিকার হন। হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারার সামনে এ সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয় সেক্যুলারিজম কিংবা সব ধর্মের গ্রহণযোগ্যতার ডিসকোর্সগুলো, যা অনেক বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধও করে। এ ধরনের নীতির বড় রকমের গ্রহণযোগ্যতা লক্ষ করা গেছে মহাত্মা গান্ধীর শাসনকালে।

সবার রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা কিংবা অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর নিরন্তর সংগ্রাম তাঁকে মৌলবাদী ডান সংঘ ‘হিন্দু মহাসভার’ চক্ষুশূল করে। এ সময় ডান-বামঘরানার চিন্তাচেতনা পরস্পর মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা একসময় বামঘরানার হিন্দু মতবাদকে সত্তাতাত্ত্বিকভাব নাই করে দেয়। তবে পুরো বিষয়টিকে এভাবে সাধারণীকরণ না করাই ভালো। রাজনৈতিক পরিসরে, বিজেপি সবার আগে খাদ্যনিরাপত্তাকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছে। এক্ষেত্রে তারা মনে করে, প্রতিটি শ্রেণীপেশার মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব। এক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ক্ষুধা দূরীকরণে ৩৫ কেজি করে গম ও অথবা চাল স্বল্পমূল্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যেখানে পরিবারের আয়ের দিকে দৃষ্টি রেখে প্রতি কেজি গম অথবা চাল মাত্র ২ রুপিতে বিতরণের সরকারি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এক্ষেত্রে সবার মধ্যে বণ্টনের জন্য একটি সাধারণ বিধিমালা প্রতিষ্ঠায়ও সক্রিয় ছিল তাদের সরকার। এ সময় বেকার সমস্যা দূরীকরণ ও দেশের মানুষের কর্মসংস্থানে কিছু পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছিল, যেখানে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে নিরুত্সাহিত করা হয়। এখানে দেখা যাচ্ছে, মৌলবাদী মোদির একটি ধণতান্ত্রিক বা তথাকথিত সেকুলার পুঁজিবাদী চরিত্র সবদিক থেকেই স্পষ্ট।

অন্যদিকে কংগ্রেস তাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই অর্থনীতির ক্ষেত্রে বামপন্থাকে সমর্থন করে। তারা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বেশকিছু পরিবর্তন বিবেচনায় এনেছিল। সব থেকে অবাক করার বিষয় কংগ্রেস কিংবা বিজেপি কারো নির্বাচনী এজেন্ডা কিংবা কর্মপরিকল্পনায় ডানধারার অর্থনৈতিক নীতি স্থান পায়নি। তবে ডানধারার প্রতিনিধিত্বকারী নীতিগুলো অনেকটা ধীরে ও গোপনীয়তার সঙ্গে সেখানে প্রবেশ করতে থাকে। ভোটের রাজনীতিতে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোটা জরুরি বলেই কংগ্রেসও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয় যুক্ত করেছিল। এ ধরনের বিষয়গুলোই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অবস্থানগত শূন্যতা তৈরি করেছিল, যার কিছু ছিল প্রয়োজনকে সামনে রেখে তৈরি করা, কিছু ছিল মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে ওঠা। জাতীয় পর্যায়ে সব শ্রেণীপেশা ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করে তোলার জন্য একটি সর্বজনগ্রাহ্য নীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি হয়ে ওঠে, যেখানে সংখ্যালঘু ও নিম্ন শ্রেণীকে বিশেষ প্রাধান্য দিতে হয়।

সবথেকে বড় কথা বিজেপি কিংবা কংগ্রেস প্রত্যেকের নীতিগত ক্ষেত্রে অনেকটাই অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্টটা থেকে যায়। সবথেকে বড় কথা কংগ্রেসও যদি মৌলবাদী হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষক না হয়ে সেকুলার দল হত, তবে তারা গুজরাট দাঙ্গার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করত। তারা অন্যায়ভাবে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা কিংবা সংখ্যাগুলো মুসলমান, বৌদ্ধ ও আদিবাসীদের উপর উগ্র মৌলবাদী হিন্দুদের অত্যাচারের বিচার করতো। কিন্তু তারা করে নাই। তাই নির্বাচন সামনে রেখে মোদি মৌলবাদ ও রাহুল সেকুলারের যে গ্যাস বেলুন উড়তে শুরু করেছে  একটা সময় দেখা যাবে বেলুন চুপসে গেছে ভেতরে গ্যাস নাই। তাই নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠানো নিয়ে আজ যে বক্তব্য রেখেছেন সেটা নিয়ে নতুন করে আশংকার কিছু নাই। কংগ্রেস এমন অনেক কিছু করেছে, আগের বার বিজেপিও এমন নানা কিছু করেছে। সেটা ভারত যা করার করবেই, সবার আগে দেশে সামলান। আর শিশুশিক্ষার সেই পাঠ, দুনিয়া বদলাতে পারে কিন্তু ভারত তার পররাষ্ট্রনীতি পাল্টাবে না। বিশেষ করে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, চীন, কিংবা পাকিস্তানকে কোনো ভারতীয় সরকার আর যাই করুক অন্তত রোমান্টিক আলিঙ্গন করবে না। বিষয়গুলো মাথায় রেখেই নির্বাচনপূর্ব নাচাকুঁদায় সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয় থাকা উচিত। আপনিই ঠিক করুন আপনার সামনে তিনটি অপশন….

১. টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিলস্টার, আব কি বার মোদি সরকার।

২. আম আদমি কি বাড়তি কাদাম, হার কাদাম পার বুলান্দ ভারত।

৩. পুরা রোটি খায়েঙ্গে, কংগ্রেস কো জিতায়েঙ্গে।

৩. চুপ র‌্যাহে হাম, খুশ হ্যায় হাম।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s