সোনাঝরা সোনালু…


বৈশাখের তপ্ত দিনে রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া আর বাঁধনহারা পলাশ-অপরাজিতার ভিড়ে আরেকটি নাম খুঁজে নেয়া যায়। বাংলা নাম সোনালু হলেও এর লম্বা লম্বা ফলের কারণে সাধারণের কাছে এটি বানরলাঠি নামে পরিচিত। এটি একদিকে যেমন বেশ শক্তিধর ভেষজ, অন্যদিকে সুন্দর সোনালি হলুদ রঙের ফুল প্রকৃতিতে এনে দিয়েছে এক অপূর্ব বৈচিত্র্য। কবিরাজি চিকিত্সায় এর মূল পাতা-বীজ থেকে শুরু করে সবই গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ তৈরিতে এর মূলের ছাল, কচি পাতা, ফলের মজ্জা ও বীজের গুঁড়া ব্যবহার হয়। কবিরাজি ভাষায় সোনালু তিক্তরস ও উষ্ণতাবর্ধক ভেষজ। আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্রে এর অনেক গুণের কথা উল্লেখ আছে। ডালে ডালে যখন সোনালুর ফুলগুলো গুচ্ছ আকারে ঝুলে থাকে, তখন তা নিতান্ত বেরসিক মনেও দোলা দেবে। ছন্দ হারানো কবি এর সৌন্দর্যে মাতোয়ারা হয়ে খুঁজে পেতে পারেন কাব্য সাধনার অনুরাগ।
অনেকটা কৃষ্ণচূড়ার মতো গুচ্ছ আকারে ফুটলেও সোনালুর ফুলের গঠন ও রঙে রয়েছে বৈচিত্র্য। কৃষ্ণচূড়ার আগুনঝরা লাল রঙ যেমন প্রকৃতিতে এনেছে ঐশ্বর্য, তেমনি সোনালু ফুলের এই সোনারঙ প্রকৃতিতে এনেছে স্নিগ্ধতার মায়াবী পরশ। ওই কৃষ্ণচূড়ার লালে বিমোহিত হয়ে আপনার ভাবনাগুলো যখন ভাষা খুঁজতে চাইবে আকাশপানে, থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা সোনালুর কারণেই হয়তো আবার নিম্নমুখী হবে আপনার দৃষ্টিপট। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ এক অনুপম বৈপরীত্য যার মায়াবী আবেশ মোহাচ্ছন্ন করে দিয়েছে চারপাশের বৈশাখী করিডোর।�
বণিক বার্তার আলোকচিত্রী রিচার্ড রোজারিও বেশ কয়েক দিন ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন সোনালু ফুলগুলো। তিনি জানালেন, প্রকৃতির বদলের সঙ্গে এ ফুলের রঙ ও গঠন বদলে যায়। প্রথমে হালকা হলুদ, তারপর সোনালি হলুদ থেকে গাঢ় হলুদ। এর পর পরিণত ফুলগুলো ঝরে গিয়ে সুতার মতো সোনালুর কচি ফল সেখানে স্থান করে নেয়। ক্যামেরা হাতে রিচার্ড প্রস্তুত ছিলেন অনেক দিন আগে থেকেই। অপেক্ষা বৃষ্টি নামবে কবে, আর এই হালকা রঙের ফুলগুলো হয়ে উঠবে সোনালি থেকে গাঢ় হলুদ। তারপর ক্যামেরা হাতে, ক্লিক ক্লিক !!
ফুলের কাব্যিক সৌন্দর্যের মতো সোনালু একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ, যা প্রাকৃতিক, বৈকৃতিক বা পরিবর্তনজনিত ও নৈমিত্তিক রোগ সারাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কবিরাজি শাস্ত্রমতে, সোনালুর ফলকে বলা হয় উত্কৃষ্ট জোলাপ, যা বিভিন্ন রোগের মহৌষধ হিসেবে পরিচিত। আয়ুর্বেদীয় রীতি অনুযায়ী প্রাকৃতিক, বৈকৃতিক, নৈমিত্তিক রোগগুলো হয় ভিন্ন ভিন্ন কারণে। তাই এর চিকিত্সা পদ্ধতিও ভিন্ন। তবে এসব ক্ষেত্রে সোনালুর তৈরি জোলাপই একমাত্র ওষুধ, যা এসব রোগে টনিকের মতো কাজে করে। আয়ুর্বেদিক চিকিত্সকরা পদ্ধতি অনুসরণ করে সোনালু ফলের মধ্যকার মজ্জা ৩-৪ গ্রাম নিয়ে জোলাপ তৈরি করেন। এর জন্য তার সঙ্গে একটু গরম দুধ বা গরম পানি মেশাতে হয়। তার পর ওই জোলাপ ছেঁকে নিয়ে সকালের দিকে পান করতে হয়। জানা গেছে জ্বর, রক্তপিত্ত, যক্ষ্মা এমনকি পাইলসের মতো রোগেও জোলাপ অনেক কার্যকর। তাই সুন্দর ফুলের পাশাপাশি এর ভেষজ গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আপনার বাগানে স্থান দিতে পারেন একটি সোনালু গাছ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s