আমরা যারা ডাক্তার পেটাই !!!


dr-baby-620x349ঘরের খাও বনের মোষ তাড়াও!!!
ঘটনাটা বাস্তবে না হোক ডাক্তারি পেশার সাথে অনেকটাই যায়। আর ঘরের ভাত খেয়ে অন্তত বনে না হোক ঢামেক এ গিয়ে রোগী খেদানো, নিউরোসার্জারি, হার্ট সার্জারি, অ্যাবডোমেনাল বিবিধ সার্জারির জটিল কাজ মুফতে করেন কিছু চিকিৎসক। দিনে মাত্র তিন থেকে পাঁচটা সিঙ্গাড়া আর কয়েক কাপ লাল চায়ের বদলে চলে তাদের সেবাদান। মাস শেষে সরকার থেকে ফুটো পয়সাও বরাদ্দ নেই তাদের জন্য। যা নিজ চোখে দেখে না আসলে বিশ্বাস করতাম না। ফলে এতোদিন মানবাধিকার নিয়ে অনেক কথা উঠলেও এবার ডাক্তার অধিকারের বিষয়টি ঘুরে ফিরে এসেছে।

আজ দৈনিক পত্রিকাগুলো!!!
যখন জানালো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ছয় অনারারি চিকিৎসকের ওপর দুর্বৃত্তরা হামলে পড়েছে তখন অন্তত আমার জন্য সহ্য করা কঠিন হয়েছে। বিশেষ করে সংবাদবাণিজ্য আর লেফাফা দুরস্তির ষণ্ডাতান্ত্রিক সাংবাদিকতায় আমার কখনোই আগ্রহ ছিলোনা। ষণ্ডাতন্ত্র ও বুদ্ধিবৃত্তিকে এক করে ফেলার মতো ভুল সবাই করলে আমি অন্তত করতে আগ্রহী নই। পাশাপাশি কতিপয় ফরমায়েশি সাংবাদিকের মতো ডাক্তার নাম শুনলেই পশ্চৎদেশ জ্বালা করার উপযুক্ত কারণ আমার নাই।

দুর্বত্তদের হামলায় !!
ডা. মমিনুল ইসলাম (২৮) নামের এক অনারারি চিকিৎসক যখন গুরুতর আহত হন তখন ঐ পুরাতন প্রশ্ন আবার ফিরে এসেছে। আর কতটা নির্লজ্জ হওয়ার পর আমরা মেনে নিতে পারবো এহেন বর্বরতা। সেদিন গুণ্ডাপাণ্ডারা দলবল নিয়ে ঢামেক আক্রমণ করছে। পরে আক্রমণ থেকে বাঁচতে ডাক্তাররা বন্ধ করেছিলো মেইন গেট। পরে পত্রিকার পাতায় সংবাদ দেখে আঁতকে উঠতে হয় ডাক্তাররা নাকি প্রতিবাদ করতে গেইট আটকে দিয়েছে।

কিন্তু গতকাল শনিবার রাতের ঘটনাটা ভিন্ন!!
দৈনিক পত্রিকা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানতে পারি সাড়ে ৯টার দিকে হামলার ঘটনাটি ঘটেছিল। ভেতরে খাওয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় ঢামেকের মেডিসিন এবং সার্জারি বিভাগের ছয় চিকিৎসক চাঁনখারপুল সোহান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেতে যান। আমি বন্ধুবর কয়েকজন বড় ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছিলাম  রাতের খাওয়ার ক্ষেত্রে ঐটাই সবথেকে ভালো ব্যবস্থা। যাই হোক, তারা চাঁনখারপুল মোড়ে আসতেই ১৫-২০ দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁঠা নিয়ে তাঁদের ওপর চড়াও হয়। বাকিরা অক্ষত অবস্থায় দৌঁড়ে পালাতে পাড়লেও ডা. মমিনুল লাঠির আঘাতে গুরুতর আহত হন।

হবুচন্দ্র দেশের গবুচন্দ্র সংবাদ মাধ্যম
ডাক্তারদের উপর যতটাই হামলে পড়ুক বাস্তবতা ভিন্ন। বিগত দিনের ঘটনায় এক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম এটা ধারাবাহিক পরিকল্পণার এক পৌণ:পুণিক মঞ্চায়ন।  কে বা কাহারা বিশেষ গোষ্ঠীর মদদে দেশের সবখাত ধ্বংস করার পর নেমেছে চিকিৎসা পেশাকে শেষ করে দিতে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের উপরেই চলছে বর্বর আক্রমণ। কখনও প্রশাসনের লেবাছে, কখনো সাংবাদকিতার মুখোশে, কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায়। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি এর ভয়াবহ শেষ পরিণতি পুরো জাতিকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে?

অর্থনৈতিকভাবে যাঁরা সচ্ছল
তারা খুব সহজে চাইলেই ভারত কিংবা দেশের বাইরে অন্য কোথাও নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন। কিন্তু স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ তাঁদের শেষ আশ্রয়স্থল এই সরকারি হাসপাতালগুলোই। তাঁরাও কি বুঝতে পারছেন না এটা আর কিছুই না এক গভীর ষড়যন্ত্রেরই অংশ। তারা এমন কিছু করতে চাইছে যাতে ডাক্তাররা সবাই মিলে বেঁকে বসে। আর পুরো দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে।

এবার একটি প্রশ্ন সবথেকে জরুরী
তা হচ্ছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়লে কার লাভ? কেনো তারা এমনটি করছে বা ভবিষ্যতে আরও করবে? প্রথমত, দেশের উচ্চ ফিসগ্রহীতা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের প্রদায়ক, চিকিৎসক ও মালিকগণ উপকৃত হবেন। বিশেষ করে তারা দেশের ভেতরে অন্য একটি দেশ গড়ে তুলেছেন। তাদের নীতিমালাতেই বলা আছে সেটা জনগণের জন্য তৈরি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়। টাকা থাকলে আসো, পকেট ফাকা করে বাড়ি যাও। আর পকেটে টাকা নাই দূরে গিয়া মরো !! দ্বিতীয়ত লাভবান হবে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশে মানুষ পাঠানোর এজেন্সিগুলো। যারা পাতলা পায়খানা থেকে শুরু করে হালকা জ্বরেও মানুষকে ভারত-সিঙ্গাপুর পাঠাতে চেষ্টা করে।

আংশকা জন্ম দিয়েছে!!
এভাবে ডাক্তারদের উপর আক্রমণ চলতে থাকলে তারাও প্রতিবাদী হবে। হয়তো অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করে দেবে কোনো কোনো স্থানে। আর এই চক্রটি চাইছে ঠিক তেমন অবস্থা ঘটুক। আর ঐটা হলেই কিছু মিডিয়া সন্ত্রাসী ক্যামেরা তাক করেই রেখেছে। তারা ঐ দৃশ্য ধারণ করে জাতির সামনে বার বার প্রচার করে দেখাতে ডাক্তাররা কত বড় সন্ত্রাসী। তারা কসাই, তারা হৃৎপৃণ্ড মানুষের ভেতর থেকে বের করে আনে, মানুষের কাঁচা কলিজা কচকচ করে চিবিয়ে খায়। আর জনগণ এক কাপ কফি নিয়ে টিভির সামনে বসবে। টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের চার-ছক্কার স্টাইরে চেচাচে ওরে মার মার. মাল শালা।

কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন কি ?
যাদের টাকার গাঁটটা অনেক বেশি শক্তিশালী তারা চাইলে ভারত কিংবা সিঙ্গাপুর এমনকি আমেরিকাতেও যেতে পারেন। কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন আমরা যারা স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ তারা কি চাইলেই লাফ দিয়ে ভারত যেতে পারি। অবশ্যই পারি না। তাই অন্তত নিজেদের স্বার্থে হলেও ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অহেতুক অবস্থান নেয়া বন্ধ করা। মিডিয়ায় এখন তাই দেখানো হয় যার সাথে বাস্তবতার যোগসূত্র নাই বললেই চলে। তাই একজন মিডিয়াকর্মী হয়েও একদিন বলতে বাধ্য হয়েছিলাম ” Media isn’t a place for the reflection of reality”। এটা জানার পরেও যদি আমরা টিভির সংবাদের উপর নির্ভর করি, নিজের চোখ থেকে টিভি ক্যামেরা পত্রিকার হরফ বেশি বিশ্বাস করি তবে জাতির জন্য ক্রান্তিকাল উপস্থিত। আসুন নিজেদের স্বার্থে একটু সতেচন হই।

আমরা যারা ডাক্তার পেটাই !!!
একটিবার অন্তত ভেবে দেখি বিপদে পড়লে একটু পেটে ব্যাথা উঠলে পর্যন্ত এই ডাক্তারদের কাছেই যেতে হয়। একবার নিজেদের ডাক্তারদের অবস্থানে রেখে চিন্তা করুণ জাতি তাদের কতটুকু সুযোগ সুবিধা দিতে পেরেছে। যে দেশে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎ এমনকি হুমায়ুন আহম্মেদকে নিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ থাকে, যেদেশে বিশ্বকাপ উদ্বোধনে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয় সেদেশে বিপদের বন্ধু ডাক্তারদের জন্য কি করা হয়েছে? সহজ উত্তর ঘোড়ার আন্ডা। সবথেকে বড় কথা জাতি ডাক্তার হিসেবে যাদের চিনে তারা আসলে ডাক্তারসমাজের কলঙ্ক। যাদের ডাক্তারি পেশার সাথে কোনো যোগসূত্র নেই বরং ডাক্তারি পেশা ছেড়ে এখন পুরোপুরি রাজনীতিবিদ কিংবা কর্পোরেট কামলা তাদের হিসেব আর জীবনবাজি রেখে অনারারি পেশায় লড়তে থাকা ডাক্তারদের মেলানোটা ঠিক হবে না।

এদের মতো কিছু বেকুব আছে বলেই !!
আপনারা এখনও সুচিকিৎসা নামের বস্তুটাকে বাংলা অভিধানের বাইরে বাস্তবেও দেখতে পান। তাই নিজেদের প্রয়োজনে হলেও আসুন সংশোধন হই। অন্তত আর যাই হোক যেখানে সেখানে ডাক্তার পেটানো বন্ধ করি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এখন সময় হয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর। মনে করুন যারা ডাক্তার পেটায় তারা জাতির শত্রু, ওদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করুন। আর ডাক্তারদের প্রতি অনুরোধ করবো আপনারা উত্তেজিত হবেন না। গভীর ষড়যন্ত্রের মুখে দেশকে বিপর্যস্ত করার কাজে উস্কানি দেবেন না। এমন কিছু করতে চেষ্টা করুণ যাতে অন্তত আপনাদের প্রতি মানুষের ধারণা ভালো হয়, উন্নত হয়। আর ডাক্তার নামের কর্পোরেট কামলাদের বলবো সংশোধন হন, নয়তো গা থেকে ডাক্তার তকমাটা খুলে ফেলে তারপর ওষুদ বেচুন। সংবাদমাধ্যম কিংবা ফেসবুকে মীর জাফরের মতো নিজ পেশার মানুষগুলোকে গালি দেয়ার আগে অন্তত ভেবে নিন আপনার ঐ পেশার সার্টিফিকেট আছে বলেই আজ এতো বাহাদুরি।

Advertisements

3 thoughts on “আমরা যারা ডাক্তার পেটাই !!!”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s