নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির জয়রথ নেপথ্যের কিছু কথা


urlনরেন্দ্র মোদির সব থেকে বড় সাফল্য এ-যাবৎ অবহেলিত প্রান্তিক হিন্দু গোষ্ঠীর সমর্থন আদায় করা। বিশেষ করে নিু শ্রেণীর হিন্দুদের মনে বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলÑ মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে কংগ্রেস যে অলীক সেকুলারিজমের ধুয়ো তুলেছে, সেটাই তাদের প্রান্তিক করে দিয়েছে। ফলে কংগ্রেসের রাজনৈতিক দৃশ্যায়ন ও কল্পিত সেকুলারিজমকে দাঁতভাঙা জবাব দিতে এই অবহেলিত গোষ্ঠীর প্রায় প্রতিটি রায়ই গিয়ে জমা হয়েছে মোদির পক্ষে। মানুষের মনে বিশ্বাস দাঁড়িয়েছেÑ এবারের নির্বাচন শুধু একটি সাধারণ নির্বাচনই নয়, এবার তাদের সামনে কংগ্রেসের সীমাহীন ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ এসেছে। তারা মনে করেছেন, মোদি নির্বাচনে বিজয়ী হলে তারুণ্য ও নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে মোদি এই শ্রেণীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হওয়ায় ভোটে জনতার রায় পুরোটাই তার পক্ষে চলে আসে।

তবে সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে অর্থনৈতিক প্রসঙ্গটিই সবার আগে ঘুরেফিরে এসেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণী চেয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর নিু শ্রেণী তাদের যন্ত্রণায় ভরা ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি। পক্ষান্তরে ধনী শ্রেণী তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত পরিবেশে চেয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে অনেকটাই চটকদারভাবে এ তিন শ্রেণীর আশা আকাক্সক্ষাকে যুক্ত করতে পারায় জনগণের রায় বিজেপির পক্ষে চলে যায়। বিগত দশ বছরের শাসনে কংগ্রেসের কীর্তিকলাপ জনগণের সামনে উপস্থিত থাকায় গান্ধীনগর থেকে দিল্পি প্রায় সবখানেই এক ধরনের কংগ্রেসবিরোধী অবস্থান বিরাজ করছিল। তারা ক্ষমতায় কে আসবে তার থেকে বেশি আগ্রহী হয়েছিলেন একটি পরিবর্তনের জন্য। এক্ষেত্রে মোদির প্রচারণা, উপযুক্ত অবস্থান ও পদ্ধতিগত উপস্থাপনার পাশাপাশি মিডিয়া তার পক্ষে কাজ করায় জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা অনেক সহজ হয়ে যায় তার পক্ষে।

ভবিষ্যতে কোনো ইতিহাসবিদ যদি এবারের নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করতে চান, সেক্ষেত্রে একটি বিষয় প্রকট হয়ে উঠবেÑ তা হচ্ছে বাগাড়ম্বর। এই বাগাড়ম্বরে যারা পুরো নির্বাচনী পরিবেশ ফেনিল করে তুলেছিল, সেই কংগ্রেস অবস্থানগত সত্যের কাছে পুরোপুরি হার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে নির্বাচনের জয়রথ গিয়ে থামে সরাসরি বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির দোরগোড়ায়। নির্বাচনের আগে প্রতিবারের মতো এবারো ছড়ানো প্রপাগান্ডা চটকদার অনেক গল্পের জš§ দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি। মানুষ কিছু অলীক স্বপ্ন দেখানো বুলির থেকে যাপিত জীবনের বাস্তবতার মূল্য দিয়েছে বেশি, যেখানে কংগ্রেসের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। আরেকটু ভালো করে বললে কংগ্রেসের নৈতিক পরাজয় হয়ে উঠেছিল সময়ের দাবি, যেখানে জনগণ নরেন্দ্র মোদি কিংবা বিজেপির বিকল্প খুঁজে পায়নি। তাই এবারের নির্বাচনে মোদির বিজয়ের পাশাপাশি কংগ্রেসের পরাজয়ও মুখ্য হয়ে উঠেছে। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে কংগ্রেসের অবশ্যম্ভাবী পরাজয়ই এবার নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপিকে পথ দেখিয়েছে। তারা নির্বাচনের আগেই অবস্থানগতভাবে জয়লাভ করেছিল, জনমত জরিপের ফলাফল সরাসরি তাদের পক্ষে চলে যাওয়ায় তাদের নির্বাচনী প্রচারণা আরো বেগবান হয়েছে।

নির্বাচনের ব্যালটে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসবিরোধী একটি প্রতিরোধের ঝড় তুলতে সক্ষম হয় বিজেপি। বলতে গেলে এ ঝড়ের মুখে রাহুল গান্ধীর ঐতিহ্যবাহী দলটি তাদের আদর্শ, ইতিহাস আর সেকুলারিজমের বুলি নিয়ে খড়কুটোর মতো ঠুনকোভাবে উড়ে যায়। আর এই প্রতিরোধ ঝড়ের তীব্রতাকে আঁচ করার জন্য দেশজুড়ে বেকারত্ব, দুর্নীতির প্রসার, মুদ্রাস্ফীতি কিংবা আইনশৃঙ্খলার অবনতির দিকে দৃষ্টি দেয়াটাই যথেষ্ট। তার সঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত নানা আশাবাদী ও জীবনধর্মী বক্তব্য সেকুলারিজমের গালগল্প থেকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল ভারতবাসীর কাছে। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতির ছন্দপতনও ভারতের চলমান দুরবস্থার জন্য অনেকাংশে দায়ীÑ বিষয়টি কংগ্রেস জনগণকে বোঝাতে পারেনি। বিশেষ করে দীর্ঘ দশ বছর ক্ষমতায় থাকায় তাদের ওপর থেকে জনগণের আস্থা পুুরোপুরি সরে গিয়েছিল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s